চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শেখ আবু হামেদ, যার ঋণ শোধ হবার নয়

মার্চ মাস শুরু হয়ে গেছে। ১৯৭১ সালে, এ মাসেরই ৭ তারিখ বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক অবসানে ঘোষণা দিয়েছিলেন, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম,”। এ মাসেই ২৫ তারিখ রাতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালী হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছিলো।

জাতির পিতাকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হলেও আগেই তার আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র দলীয় নেতৃবৃন্দ এবং পুলিশের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে জাতির কাছে পৌঁছে যায়। মুক্তিযুদ্ধে সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ যুদ্ধ জয়ে সহায়ক হতে পারে ভেবে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমানকে দিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি পাঠ করান।

এদিকে, কদিন আগেই আমরা শেষ করলাম ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। এমন এক মানুষের গল্প আজ বলবো যিনি বাঙালী জাতির ভাষা আন্দোলন এবং স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মুক্তিযুদ্ধ-উভয় ঐতিহাসিক পর্বে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যার জীবনের প্রতিটি কাজ নতুন প্রজন্মের জন্য হতে পারে দারুণ অনুপ্রেরণাদায়ী।

ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমেডিয়েট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণীসহ অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি নেয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করার নিমন্ত্রণ উপেক্ষা করে আমাদের পরিচিত কেউ যদি স্থায়ীভাবে গ্রামে ফিরে গিয়ে সমাজ পরিবর্তনে কাজ করেন, আমরা তাকে কী বলব? ব্যষ্টিক স্বার্থের প্রাধান্যে সমাজ, রাষ্ট্র যখন সাময়িক অবলম্বন মাত্র, তখন এমন “আত্মঘাতী” মানুষকে আমাদের বর্তমান লোভী সমাজে বড্ড বেমানান মনে হতে পারে।

যে রাষ্ট্রে কালো টাকা সাদা করার রাষ্ট্র স্বীকৃত সুযোগ থাকে, যে সমাজে ঘুষ ও সুদখোরদের বিশেষভাবে সন্মান ও সমীহ প্রদর্শন করা হয়, সন্তান ও বাবা-মারা যোগসাজশে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের খোঁজে জান বাজি রাখেন, যে সমাজে বিনয়ী কে বেকুব আর বদমেজাজিকে ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মনে করা হয় সেখানে উপরোল্লিখিত একজন মানুষের কথা অরণ্যে রোদনেও পর্যবসিত হতে পারে।

তারপরেও লিখতে হবে, নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের কথা। এতো ত্যাগ- তিতিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ কে কিছু লোভী, চশমখোর মানুষের হাতে ছেড়ে দেয়া যায় না। আমাদের দ্বিতীয় কোনো দেশ নেই, পৃথিবীর অন্য কোন গ্রাম বা শহরে বাড়ি নেই, দেশের বা বিদেশের কোনো ব্যাংকে কাড়ি কাড়ি টাকা নেই যে মূল ধারার সমাজের উপর কোনো নির্ভরতা নেই।

আমরা পুরোপুরি বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের সমাজ নির্ভর। ফলে সমাজ দূষিত হলে আমাদের জীবনও দূষিত হবে, সমাজ পঙ্গু হলে আমাদের জীবনও পঙ্গু হবে। সমাজে দুর্নীতিপরায়ণ মানুষের সংখ্যা যত বাড়বে আমাদের ধ্বংসের দিনও তত ঘনিয়ে আসবে। একমাত্র একটি সৎ, দেশপ্রেমিক, পরোপকারী ও বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্মই পারে সত্যিকারের সোনার বাংলাদেশ উপহার দিতে। ঘুষখোরসহ অন্যান্য দুর্নীতিবাজ মানুষগুলোকে যদি হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার শক্তিতে প্রশান্তি মহাসাগরে ফেলে আসা যেত, তাহলে শুদ্ধি অভিযান সহজ হত, কিন্তু তা তো আর সম্ভব নয়।

ফলে নতুন সৎ প্রজন্ম তৈরি করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। যে মানুষের জীবনীকে উপলক্ষ করে এত কথা বললাম, তিনি ভাষা সংগ্রামী, ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মরহুম শেখ আবু হামেদ। যে কাজটি আমরা এখনো কল্পনাও করতে পারি না, সেটা উনি পাকিস্তান আমলে করে দেখিয়েছিলেন।

১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি অর্জন করে নিজের জন্মস্থলে ফিরে গিয়ে তিনি স্কুল করেছেন, কলেজ করেছেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে নিজ উপজেলায় নতুন প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগ গুছিয়েছেন। ৭১’এ যুদ্ধে গিয়েছেন।

বিনিময়ে নেননি কিছুই। সত্যিই উনি কিছু নেননি। প্লট নেননি, বাড়ি নেননি, নগদ অর্থ নেননি, এম পি হন নি, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হননি, ইউনিয়ন কিংবা উপজিলা পরিষদের চেয়ারম্যান হয়ে কাবিখা’র গম মেরে দেননি।

বাংলা ১৩৩৫ সালের ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ এবং ইংরেজি ১৯২৮ সালের ১৮ই মে তারিখে ব্রিটিশ ভারতের বিখ্যাত সরাইল পরগণার ঐতিহ্যবাহী নোয়াগাও ইউনিয়নের আঁখিতারা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন শেখ আবু হামেদ। মধ্যপ্রাচ্যের ইয়েমেন থেকে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে শেখ হামেদের পূর্ব পুরুষরা এ অঞ্চলে এসেছিলেন বলে জানা যায়।

সরাইলের বিখ্যাত শেখ সমীর ও শেখ এনায়েতের বংশধররা সেই আলোকিত ইতিহাসের সূর্য সন্তান হিসেবে আজো কাজ করে যাচ্ছেন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে। পিতামহ পীর শেখ গোলাম মোহাম্মদ ও পিতা পীরজাদা শেখ মাসিহুজ্জামানের অনিবার্য প্রভাবে শেখ হামেদ ছোট বেলা থেকেই ছিলেন পরোপকারি স্বভাবের। যতটুকু জানা যায়, ওই সময়ে প্রতিবেশী কালিকচ্ছ গ্রামের পাঠশালা উচ্চ বিদ্যালয়ে মুসলিম ছেলে-মেয়েদের পড়া খুবই কঠিন ছিল বিধায়, হামেদ মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশুনা করেন বাড়ি থেকে বেশ দূরের সরাইল অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে।

১৯৫১ সালে ইস্ট পাকিস্তান সেকেন্ডারি এডুকেশন বোর্ডে ১৭তম স্থান অধিকার করে মেট্রিক পাশ করেন হামেদ। ৫৩ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক, ৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে সন্মানসহ এম এ ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আজীবন অনুসারী ছিলেন শেখ হামেদ। শেখ মুজিব যখন যে আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন, শেখ হামেদ সমর্থন দিয়ে মাঠে নেমে পড়েছেন। ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠী ও পশ্চিম বঙ্গীয় হিন্দু এলিটদের বৈষম্যমূলক ও সাম্প্রদায়িক আচরণে ক্ষুব্ধ তৎকালীন পূর্ববঙ্গের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য হোসেন শহীদ সোহরাওয়ারদীর নেতৃত্বে শেখ মুজিবুর রহমান যখন কাজ করছিলেন তখন সরাইল, আখাউড়া এলাকায় “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” শ্লোগানে পাকিস্তান আন্দোলনে শামিল হয়েছেন শেখ আবু হামেদ।

বঙ্গবন্ধুর “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” গ্রন্থে আমরা খোদ বঙ্গবন্ধুর জবানে পাকিস্তান আন্দোলনের পটভূমির বিস্তারিত জানতে পাই। পশ্চিমবঙ্গের সাথে আমাদের যেমন সুখের সংসার ছিলোনা, পশ্চিম পাকিস্তানের সাথেও আমাদের সম্পর্ক টিকবেনা সেটা বুঝতে খুব বেশি সময় লাগেনি রাজনীতিবিদ ও সচেতন মানুষের।

বিজ্ঞাপন

দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ দেখে শেখ হামেদ তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দিয়ে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, ধর্মের মোড়কে পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের একসাথে চলা হবেনা।

১৯৪৯ সালে সরাইলে তার সভাপতিত্বে প্রথম ছাত্রলীগ এবং ৫৬ সালে আওয়ামী লীগ গঠিত হয়। এর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমা আওয়ামী লীগেরও সহ-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আলী আজম ভূঁইয়া। ১৯৬৫ সালে সরাইল অন্নদা উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচনে তার কাছে পরাজয় বরণ করেন তৎকালীন প্রভাবশালী মুসলিম লীগ নেতা আব্দুল মন্নাফ ঠাকুর। স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচন হলেও এর আঞ্চলিক প্রভাব ছিল ব্যপক। কারণ মন্নাফ ঠাকুরের এ পরাজয়ের মধ্য দিয়ে সরাইল অঞ্চলে মুসলিম লীগের রাজনীতির অবসান ঘটে।

শেখ আবু হামেদ ১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় এক জনসভায় পাকিস্তানের গভর্নর খাজা নাজিমুদ্দীন উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করার ব্যাপারে জিন্নাহর ঘোষণা পুনরাবৃত্তি করলে ঢাকা কলেজের ছাত্রদের সাথে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সদস্য (সংস্কৃতি) হিসেবে ৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে কলেজ ছাত্র সংসদ আয়োজিত সভায় পরবর্তী দিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গের লক্ষ্যে উদ্দীপনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন।

২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে গিয়ে পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাসে আহত হন। “ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও তিতাস পাড়ের স্মৃতি” শীর্ষক গ্রন্থে শেখ হামেদ স্মৃতিচারণ করেছেন- “২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২১ ফেব্রুয়ারির দিন সকালে এ এফ রহমান হোস্টেলের আরমানিটোলা মাঠমুখী পশ্চিম দিকে অবস্থিত আমার কক্ষ থেকে বের হই। নুরুল আমিন সরকারের জারি করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের স্বপ্ন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেই কাঁদানে গ্যাস খেয়ে আহত হই।

যে গেইটে আহত হয়েছিলাম সে গেইটটি বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বন্ধ করা গেইট। আমার সঙ্গে ছিল সহপাঠী বেগমগঞ্জের জালাল, কুমিল্লার জয়নাল, বরিশালের হাশেম।…..ঢাকা কলেজের ছাত্র আমার সহপাঠী মাসুদ ও আমি পুলিশকে লক্ষ্য করে এবং গালি দিয়ে ঢিল ছুঁড়েছিলাম। এর প্রায় ১০ মিনিট আগে ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামী নেতৃবৃন্দ প্রতি ১০ জন করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়। দুপুরের দিকে গুলি হলো। দেখতে পেলাম বরকতের লাশ কয়েকজন ধরাধরি করে নিয়ে গেল হাসপাতালে। অনেকেই আহত ও আরও কয়েকজন শহিদ হলেন”।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন শেখ হামেদ’র এক শিক্ষক ডক্টর মরিশন তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে আসতে আমন্ত্রন জানান। শেখ হামেদ সেদিন উত্তরে বলেছিলেন, তার এলাকায় কলেজ নেই। একটা কলেজ প্রতিষ্ঠা করা তার আজীবনের স্বপ্ন।

১৯৬৯ সালে সরাইল কলেজ প্রতিষ্ঠা কল্পে গঠিত কমিটির আহবায়ক হিসেবে নিযুক্ত হোন। ১৯৭০ সালের ২৪ জুন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তৎকালীন এসডিওকে দিয়ে সরাইল কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ওই বছরেই সেপ্টেম্বর মাসে কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম চালু এবং কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের স্বীকৃতি আদায় করতে সক্ষম হন। এখন যারা কলেজের পরিচয়ে স্ত্রী-সংসার নিয়ে বেঁচে আছেন; সমাজে বিশিষ্ট জন হিসেবে বাড়তি সম্মান কামনা করেন, তাদের পক্ষে শেখ হামেদের অবদান ও ত্যাগের মহিমা অনুভব করাও হয়ত সম্ভব নয়।

অনুভব যদি করতেন তাহলে শেখ হামেদের ইতিহাস কে জীবিত রাখতে বছরে একটা স্মরণ সভা অন্তত আয়োজন করতেন। যাই হউক, কলেজের কথায় ফিরে আসি। তৎকালীন সরাইল থানার সকল ছাত্র –যুবক, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলের সমর্থন নিয়ে কলেজ প্রতিষ্ঠিত করেন শেখ হামেদ। সরাইল কলেজ শুধুমাত্র একটা কলেজ না, পুরো সরাইল তথা উত্তর ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার লাইফলাইন। সরাইল কলেজে যারা প্রথম দিকের ছাত্র বা যারা ইতিহাসের প্রত্যক্ষদর্শী তাদের সাথে কথা বললে জানা যায়, শেখ হামেদ কী পরিমাণ শ্রম আর অধ্যবসায় দিয়ে কলেজের কার্যক্রম চালু রেখেছিলেন।

সে সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স, মাস্টার্স করা একজন মানুষ এলাকায় কলেজ স্থাপন করে সেটা টিকিয়ে রাখতে ছাত্র সংগ্রহ থেকে শুরু করে অন্য যে দু-একজন শিক্ষক ছিলেন তাদের বেতন, ভাতা ম্যানেজ করতে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধান সংগ্রহ পর্যন্ত করেছেন বলে আমার কাছে প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন স্মৃতিচারণ করেছেন। শেখ আবু হামেদের প্রথম ব্যাচের ছাত্র জনাব আব্দুর রুউফ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন।

কলেজ ততোদিনে চালু হয়ে গেছে। এলাকায় দারুণ উত্তেজনা। এদিকে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাঙ্গালী জাতি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রায় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। ১৯৭০ এর নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে আওয়ামী লীগ জিতলেও পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকরা শেখ মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চাইলেন না। শাসক গোষ্ঠী একদিকে ক্ষমতা না দিতে সময় ক্ষেপণ করার কৌশল নিল, পাশাপাশি গোপনে অস্ত্র ও সেনা আনতে লাগল। ২৫শে মার্চ রাতে শুরু করল গণহত্যা। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে শুরু হয়ে গেল সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। রাজাকাররা শেখ আবু হামেদের কালিকচ্ছের বাড়ি পুড়িয়ে দিতে চাইল।

পরিবার পরিজনকে কোন রকমে আপাত নিরাপদে রেখে হামেদ পাড়ি জমালেন প্রতিবেশী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায়। দীর্ঘ ৪০ মাইল হেঁটে, সাঁতরে হামেদ আগরতলায় পৌঁছেছিলেন বলে তার বিভিন্ন লেখা থেকে জানা যায়। জুন মাসে মুজিবনগর সরকারের অধীন নরসিংহগড় যুব শিবিরে পলিটিকাল ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে যোগদান করেন।

যুবকদের অনুপ্রেরণা দিয়ে সশস্ত্র যুদ্ধে যেতে মানসিক ভাবে তৈরি করার গুরুদায়িত্ব পালন করতেন তিনি। দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭১ এর ৩০ ডিসেম্বর কলকাতা হয়ে দেশে ফিরে শেখ হামেদ নতুন উদ্দীপনায় সরাইল কলেজের পুনরুজ্জীবনে মনোনিবেশ করেন।

কলেজ তার জীবনের একটা বড় সময় নিয়ে নিয়েছে। কলেজ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা, বিনা বেতনে পড়ানো থেকে নানাবিধ সামাজিক সেবা মূলক কাজে শেখ হামেদের অবদান কৃতজ্ঞ মানুষেরা এখনো আবেগ দিয়ে স্বীকার করেন। ইতিহাস, ক্রীড়া, ও কাব্য চর্চা, সভা, সমিতি করেও আবু হামেদ জীবনের অনেক সময় ব্যয় করেছেন।

জীবন দিয়ে যে কলেজ আবু হামেদ দিয়ে গেলেন, তার এখন বিশাল সব ভবন, শ’শ ছাত্রছাত্রী। প্রায় প্রতি বছর সরাইল কলেজের দু/একজন আমার বিশ্ববিদ্যালয়েও উচ্চশিক্ষা নিতে আসে। তাদের জিজ্ঞেস করি, তোমাদের কলেজের প্রতিষ্ঠাতার নাম জানে কিনা? উত্তরে যা শুনেছি, তাতে হতাশ আর ক্ষুব্ধ না হয়ে পারিনি। কিন্তু এ নতুন প্রজন্ম কে দায়ী করা যায় না। দায়ী তারাই যারা ইতিহাস কে বিকৃত করতে চায়, ইতিহাসের ঘরে সিঁধ কেটে চুরি করতে চায়। কিন্তু তারা জানেনা, ইতিহাসের পাহারাদার ইতিহাস নিজেই।

শেখ আবু হামেদরা তাদের জীবন-যৌবন দিয়ে আমাদের মায়ের ভাষা বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ে দেশ মাতৃকার স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এনে দিতে ঘর বাড়ি, পরিবার ছেড়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছেন। অকৃতজ্ঞের সমাজ তার অবদান ভুলতে বা ভুলাতে চাক, এতে কিছু যায় আসে না। তাদের প্রতি আমাদের ঋণ শোধ করাও হয়ত সম্ভব নয়। কিন্তু তাদের বিদেহী আত্মার শান্তি আমরা দিতে পারি, যদি সততা, নিষ্ঠা নিয়ে সমাজ ও দেশের জন্য কাজ করতে পারি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন