চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শুধু কালোটাকার মালিকদের শহর হবে রাজধানী ঢাকা!

আজ থেকে গুলশান ১-বাড্ডা, ধানমণ্ডি-এলিফ্যানট রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় রিক্সা চলাচল বন্ধ। বিকল্প ব্যবস্থা কি? বাচ্চারা সকালে স্কুলে যাবে কি করে? মিটারেতো কোনো সিএনজি যায় না, পাওয়াও যায় না। বাসে উঠা যায় না, গাড়ি কেনারও সামর্থ্য নেই। ঢাকা শহর কি তা হলে শুধু কালো টাকাওয়ালাদের জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে? অবস্থাদৃষ্টে এমন প্রশ্ন আসতেই পারে।

রিক্সা ঢাকায় যানজটের মাত্রা বাড়ায়, আবার রিক্সা কর্মসংস্থানেরও উপায়। যানজটে সার্বিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় আবার রিকসা গ্রামীণ অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখে। গ্রাম থেকে নদী ভাঙ্গা বেকার যুবকরা ঢাকায় এসে রিকসা চালায়। দৈনিক নিট আয় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা । এই টাকা গ্রামে কায়িক পরিশ্রম করে উপার্জন করা সম্ভব নয়। অবৈধ রিক্সার সংখ্যা নাকি প্রায় ৫ লাখ । দৈনিক ৫০০ টাকা নিট আয় হলে বছরে এই খাতে আয় ৯,০০০ কোটি টাকা। এই ৯,০০০ কোটি টাকা যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতিতে। বিনিয়োগ হচ্ছে গ্রামীণ জীবন ব্যবস্থার উন্নতিতে।

বিজ্ঞাপন

ব্যক্তিগতভাবে চালানো গবেষণা পরিসংখ্যানে দেখেছি, রিকশাচালকদের ৯৯% গ্রামে এনজিওর কিস্তির টাকা পরিশোধ করেন। গ্রামে ঘর গৃহস্থালি, গবাদি পশুসহ ক্ষুদ্র কুটির শিল্প বা ব্যবসায় প্রাথমিক পুঁজির যোগান আসে এনজিওগুলোর ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচী থেকে। সেই ঋণের টাকার কিস্তি খেয়ে পরে গ্রাম থেকে আয় করা সম্ভব হয় না। এছাড়া মফস্বলের ছোট শহরগুলো থেকে রিকসা চালিয়ে নিট ৫০০/৭০০ টাকা আয় করাও সম্ভব হয় না। একমাত্র ঢাকা শহরে রিকসা চালিয়ে কিস্তির টাকা, পরিবারের ভরণপোষণ দুইই যোগাড় করা যায়। এখন হঠাৎ ঢাকায় রিকসা চলাচল বন্ধ করে দিলে একদিকে ঢাকার সাধারণ মানুষ যেমন ভোগান্তিতে পড়বেন, তেমনি গ্রামীণ প্রান্তিক জনগণের জনজীবনেও ধ্স নেমে আসবে।

আমরা যানজট মুক্ত ঢাকা চাই, রিকসাবিহীন সুন্দর ঢাকাও চাই; আবার এইসব রিকশাচালক প্রান্তিক মানুষজনের স্বাভাবিক জীবনকে অস্বাভাবিক করতে চাই না। এখানে কোনটা বেশি জরুরি সেটা দেখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অবশ্যই সবচেয়ে বেশি জরুরি: রিক্সাচালনা থেকে বৎসরে যে ৯,০০০ কোটি টাকা গ্রামীণ অর্থনীতিতে সঞ্চালন হয়, তা যেনো কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করা।

বিজ্ঞাপন

দেশে এমন কোনো বিনিয়োগ হচ্ছে না যে ব্যাপক শিল্পখাত গড়ে উঠছে। বরং অর্থনীতি অনেক স্থবির অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকার বড় বড় কিছু অবকাঠামো হাতে নিয়েছে, সেগুলো সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত অর্থনীতি তার সুফল পাবে না। যখন অর্থনীতি তার সুফল পেতে শুরু করবে, প্রচুর নতুন কর্মসংস্থান হবে তখন আপনা থেকেই রিকশা চালানোর মত অমানবিক কাজ থেকে মানুষ নিজেকে গুটিয়ে নেবেন।

যানজটের জন্য কোনোভাবেই রিকশা এককভাবে দায়ী নয়, যানজটের জন্য ৬০ ভাগ দায়ী ট্রাফিক অব্যবস্থাপনা। ঢাকার যাত্রীবাহী বাস এবং টেম্পুগুলোকে নির্দিষ্ট জায়গায় থামা ও যাত্রী উঠানোর ব্যবস্থা করতে পারলে, যাত্রীর চাওয়ামতো রাস্তার যেখানে সেখানে যান থামিয়ে নামানোর ব্যবস্থা বন্ধ করতে পারলে, সিগন্যাল মেনে চললে, ট্রাফিক আইন মেনে চললে অর্ধেকের বেশি যানজট কমে যাবে। এর মানে দাঁড়াচ্ছে শুধুমাত্র পদ্ধতি অব্যবস্থাপনার কারণে যে যানজট হচ্ছে, তার দায়ভার গিয়ে পড়ছে রিকশাচালকদের উপর।

যখন সিএনজি অটোগুলো মিটারে চলবে, চাহিবামাত্র ট্যাক্সি পাওয়া যাবে, পর্যাপ্ত বাস পাওয়া যাবে, বাসগুলোতে নারী ও শিশু নিরাপদে চলাচল করতে পারবে, স্বাস্থ্যকর ফুটপাত থাকবে; তখন রিক্সার প্রয়োজনীয়তা ফুরাবে। এর বাইরে গিয়ে যদি শুধুমাত্র ঢাকাকে সুন্দর করার জন্য রিক্সা তুলে দেয়া হয়, তবে তা
১। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে
২। সামজিক আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হবে
৩। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাড়বে
৪। এনজিওগুলোর ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্থ হবে

রাজনৈতিক সুবিধাভোগী, কালোটাকার জৌলুসে রিক্সাকে যারা অবজ্ঞা করছেন; তারা এই সমাজ ও মানুষের প্রতি কোনো দায়-দায়িত্ব বোধ করেন না। কিন্তু রাষ্ট্রকে সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়-দায়িত্ব বোধহীন হলে চলবে না।

Bellow Post-Green View