চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শীত প্রস্তুতির টোটাল প্যাকেজ

এখনই ভোরের কুয়াশা এবং ঠাণ্ডা বাতাস জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী। তাই এখনই সময় শীতের জন্য প্রস্তুত হওয়ার।

শীতের জন্য যতো প্রস্তুতি নিতে হয়, অন্য আর কোনো ঋতুর জন্যই তার প্রয়োজন হয় না। শীত এলেই গরম কাপর, লেপ-কাঁথা গুছিয়ে নেয়া, ত্বকের যত্ন, শরীরের যত্ন আরও কতো ব্যাপারেই না খেয়াল রাখা প্রয়োজন হয়। পরিবারে নবজাতক থেকে শুরু করে প্রবীণ পর্যন্ত সবারই আলাদা আলাদা যত্ন নিতে হয় শীতে।

আগেই সব প্রস্তুতি নিয়ে রাখলে হুট করে শীত চলে এলেও রোগ-বালাই থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে শীত সামলে নেয়াও সহজ হয়। জেনে নিন শীত প্রস্তুতির টোটাল প্যাকেজ:

শিশুর যত্ন
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের রেজিস্ট্রার ডাক্তার মালিহা আলম সিমি বলেছেন, শীতে শিশুদের জ্বর, সর্দি কিংবা কাশি খুব সাধারণ ঘটনা। ঋতু পরিবর্তনের কারণে এই সমস্যাগুলো হয়। তাপমাত্রা পরিবর্তনের এই সময়টাতে শিশুদের পোশাকের দিকে বাড়তি খেয়াল রাখতে হবে।

‘যেহেতু বিকেলের দিকে তাপমাত্রা কিছুটা কমে আসে, তাই এই সময়টাতে শিশুকে কিছুটা ভারী পোশাক পরাতে হবে। ফুল হাতা গেঞ্জি এবং পায়জামা পরিয়ে রাখলে ঠাণ্ডা লাগার ভয় অনেকটাই কমে যাবে।’

নবজাতক এবং শিশুদেরকে অবশ্যই কান ঢাকা টুপি এবং পা মোজা পরিয়ে রাখতে হবে। শীতকালে নিয়মিত উষ্ণ গরম পানি দিয়ে শিশুকে গোসল করাতে হবে। তবে বেশিক্ষণ পানিতে রাখা যাবে না। যেসব শিশুর পানি দিয়ে খেলার অভ্যাস আছে তাদের দিকেও বাড়তি নজর রাখতে হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

চ্যানেল আই অনলাইনকে ডাক্তার মালিহা আলম সিমি বলেন: সাধারণত দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের সর্দি হলে নাকের ড্রপ দিলেই ভালো হয়ে যায়। দুই বছরের বেশি বয়সী শিশুদের নাকের ড্রপেও সর্দি না সারলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আনুষঙ্গিক ওষুধ খেতে হবে। অ্যালার্জি কিংবা হাঁপানির সমস্যা থাকলে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে যেন শিশু ধুলাবালিতে না খেলে। এক্ষেত্রে ঘরে কার্পেট থাকলে সরিয়ে ফেলতে হবে। ঘর ঝাড়ু দেয়ার সময় কিংবা ধুলো ঝারার সময় শিশুকে সেখানে না রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

যা খেতে হবে
শীতকালে কী খেতে হবে সে প্রসঙ্গে চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন লালমাটিয়ার ডায়েট অ্যান্ড ফিট এর পুষ্টিবিদ আদিবা ফারজিন জুলি।

তিনি বলেছেন, শীতে প্রচুর ভিটামিন সি জাতীয় ফল ও সবজি খেতে হবে। এতে কোল্ড অ্যালার্জির সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। গরম খাবার হিসেবে হালকা লিকারের লেবু চা কিংবা ঘরে তৈরি ভেজিটেবল স্যুপ খেতে পারেন। এছাড়াও মৌসুমের শাকসবজি খেতে হবে। গাজর এবং টমেটো ভালো করে ধুয়ে কাঁচা খেতে হবে। অ্যান্টি অক্সিডেন্টযুক্ত এসব খাবার খেলে ত্বক ভালো থাকবে।

বিজ্ঞাপন

শীতকালে অনেকেই পানি কম খান। ত্বক ভালো রাখতে প্রচুর পানি খেতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, সাথে খাবার তালিকায় প্রোটিন এবং ফ্যাটও রাখা জরুরী।

ত্বক ও চুলের যত্ন
শীতে বাতাসের আর্দ্রতা কম থাকে। সেই সাথে বাতাসে বেড়ে যায় ধুলা। এমন আবহাওয়ায় ত্বক হয়ে যায় খসখসে ও মলিন। ফলে ত্বক ফেটে যাওয়া, চুলকানি, ফুসকুড়িসহ নানা সমস্যা দেখা দেয়। তাই শীতকালে ত্বকের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় দরকার বাড়তি যত্ন ও সতর্কতা।

এই সময়ে ময়েশ্চারাইজার যুক্ত সাবান ব্যবহার করতে হবে। গোসলের পরে এবং রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে অবশ্যই পুরো শরীরে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে হবে। সপ্তাহে অন্তত দুইবার গরম পানির মধ্যে সামান্য সোডা বাই কার্বোনেট মিশিয়ে পা ভিজিয়ে রাখতে হবে কিছুক্ষণ। এরপর ঝামা পাথর অথবা ব্রাশ দিয়ে পায়ের গোড়ালি ভালো করে ঘষতে হবে। এতে পা ফাটার সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। ঠোঁট শুকিয়ে গেলে পেট্রোলিয়াম জেলি লাগাতে হবে। ঠোঁটের মরা চামড়া টেনে তোলা যাবে না কিছুতেই। এছাড়াও বার বার জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজানো যাবে না। এতে ঠোঁট ফাটার প্রবণতা আরও বেড়ে যায়।

শীতকালে ত্বকের মতোই চুলও রুক্ষ হয়ে যায়। চুলের রুক্ষতা দূর করতে তেলের কোনে বিকল্প নেই। সপ্তাহে অন্তত দুই দিন হট অয়েল ম্যাসাজ করে শ্যাম্পু করে ফেলুন। এরপর ভালো মানের কন্ডিশনার ব্যবহার করতে হবে অবশ্যই। এছাড়াও মাসে কমপক্ষে দুইবার ডিম, কলা ও অলিভ ওয়েল একসঙ্গে ব্লেন্ড করে প্যাক তৈরি করে ব্যবহার করুন। এতে চুল থাকবে মোলায়েম।

শীতের পোশাক
সোয়েটার, শাল, চাদর, জ্যাকেট, মাফলার, কান টুপি ইত্যাদি পোশাক দীর্ঘ দিন ব্যবহার না করার ফলে ধুলো-ময়লা এবং জীবাণু জমে যায়। তাই ব্যবহারের আগে ভালো করে ধুয়ে অবশ্যই কড়া রোদে শুকিয়ে রাখতে হবে। ধোয়ার জন্য ডিটারজেন্ট ব্যবহার না করে শ্যাম্পু ব্যবহার করুন। এতে উলের কাপড় নরম থাকবে। রোদে শুকিয়ে আলমারিতে রাখার আগে ন্যাপথালিন দিয়ে রাখুন। এতে কাপড়গুলোতে পোকামাকড়ের আক্রমণ হবে না।

লেপ-কম্বল
গত শীতে তুলে রাখা লেপ-কম্বল বাইরে বের করে রাখুন। যেদিন কড়া রোদ থাকে সেদিন রোদে দিয়ে রাখুন সারাদিন। কয়েকদিন কড়া রোদে দেয়ার পরে ভালো করে ঝেড়ে নিতে হবে। এতে ধুলাবালি থাকলে সেগুলো ঝরে যাবে। এরপর পরিষ্কার করে কভারে লেপ বা কম্বল ভরে নিন। ভাঁজ করে আলমারিতে তুলে রাখুন। যদি কম্বল বেশি ময়লা হয়ে গিয়ে থাকলে ড্রাই ওয়াশ করিয়ে নিতে পারেন।

ঘরের প্রস্তুতি
শীতে ঘরের মেঝে যেহেতু ঠাণ্ডা থাকে তাই মেঝেতে ব্যবহার করতে পারেন শতরঞ্জি, ফ্লোর ম্যাট কিংবা মাদুর। কার্পেটে ধুলা আটকে যায় তাই কার্পেট ব্যবহার না করাই ভালো। যাদের ধুলা-বালিতে অ্যালার্জি আছে তাদের কার্পেটে সমস্যা হতে পারে। এছাড়াও ঘরের জানালায় ভারি পর্দা ব্যবহার করতে পারেন এই সময়টাতে। তবে ঘরের যে জানালা দিয়ে রোদ আসে, ঘরে রোদ ঢোকার জন্য সেই জানালার পর্দা সরিয়ে রাখুন। রুম হিটার, ওয়াটার হিটার, গিজার ইত্যাদি যন্ত্রপাতি ঠিক আছে কিনা দেখে নিন। নষ্ট হয়ে থাকলে এখনই সারিয়ে ফেলুন সেগুলো।

বাগানের যত্ন
শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে শীতে ত্বকের মতোই বারান্দার বা বাগানের গাছগুলোও মলিন হয়ে যায়। তাই এইসময়ে গাছেরও বাড়তি যত্ন প্রয়োজন। খেয়াল রাখুন যেন প্রতিদিন সকালের হালকা রোদ পায় গাছগুলো। প্রতিদিন টবের মাটির দিকে খেয়াল রাখুন। মাটি শুকিয়ে গেলেই পানি দিন। তবে অতিরিক্ত পানি দেয়া যাবে না। আর খুব বেশি কুয়াশা কিংবা ঠাণ্ডা পরলে গাছগুলোকে রাতের বেলা ঘরে ঢুকিয়ে রাখুন। দিনের বেলা রোদ উঠলে আবার বারান্দায় দিয়ে দিন।

শীতে প্রচুর ধুলা থাকে বাতাসে। তাই সপ্তাহে অন্তত একদিন গাছের পাতা ধুয়ে দিন এবং পাতায় পানি স্প্রে করুন। অনেক গাছেরই পাতা ঝরে যায় এই সময়ে। কিন্তু গাছ কিন্তু বেঁচে থাকে। তাই পানি দেয়া বন্ধ করা যাবেনা পাতা ঝরে গেলেও।

বিজ্ঞাপন