চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শিশুদের নিয়েও এমন ভয়ঙ্কর গুজব?

মেসেঞ্জারে টুং টাং শব্দ। মেসেজ খুলতেই দেখি অপরিচিত একজনের বার্তা। তাতে লেখা রয়েছে ‘সাবধানবাণী’। অতি উৎসাহী ওই ফেসবুক ‘বন্ধু’র বার্তায় এক ধরনের বিরক্তিই প্রকাশ পেল। তারপরও চুপ থাকলাম।

কয়েকদিনের অসুস্থতায় একনাগাড়ে ঘুমের সুযোগ হয়েছিল। দুপুর বেলায় হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল আশেপাশের ফ্ল্যাটের বাচ্চাদের হইহুল্লোড় আর চিৎকার, চেঁচামেচিতে। এর মধ্যে আওয়াজ আসলো, এক বাচ্চা আরেক বাচ্চাকে বলছে- ‘ওই দিকে যাসনে, কল্লাকাটা ধরে নিয়ে যাবে! এই দিকে চলে আসো। বললাম না, কল্লাকাটা ধরে নিয়ে যাবে?’

বিজ্ঞাপন

গ্রামের বাড়িতে ফোন দিলাম মায়ের সাথে কথা বলতে। নানা বিষয়ে কথা হলো। একপর্যায়ে মা বললেন, এলাকায় একটা কথা ছড়িয়েছে। সত্য বলে মনে হয় না। তারপরেও এই বিষয়ে কিছু জানিস? বললাম কোন বিষয়, কী কথা ছড়িয়েছে? বললেন, পদ্মা সেতুতে বলি দেয়ার জন্য নাকি মানুষের মাথা কেটে নিয়ে যাচ্ছে?

চট্টগ্রামে জনতার হাতে আটক এক শিশু অপহরণকারী

পাশের গ্রামের কথা বললেন। সেখানকার একটি বাজারে নাকি দু’জন মানুষের মাথাবিহীন মরদেহ পাওয়া গেছে। এরপর থেকে এ বিষয়ে মাইকিংও করা হচ্ছে! সবাইকে, বিশেষ করে বাচ্চাদের সাবধানে রাখতে বলা হচ্ছে! বললাম, এগুলো আসলে গুজব। কুসংস্কার। এর কোনো ভিত্তি নাই। কারণ, এমন কিছু এখনও শুনি নাই।

শুরুতে মেসেঞ্জারে যে বার্তার কথা বলেছিলাম, সেটার ভাষাও প্রায় এক। সেখানে লেখা ছিল: ‘‘বাংলাদেশের পদ্মা সেতু নির্মাণ চলতি পথে বাধা হয়েছে। তাই ১০০০০০ বা তার অধিক পরিমাণে মানুষের মাথা প্রয়োজন। পদ্মা সেতুর কাজ চালাতে তাই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সারা বাংলাদেশজুড়ে ৪২টি দল বের হয়েছে এই মাথা সংরক্ষণের জন্য। এরা পথে ঘাটে, খেলার মাঠে, হাট বাজারে ইত্যাদি জায়গাই ঘুরে বেড়ায়। এদের কাছে আছে ধারালো ছুরি এবং বিষাক্ত গ্যাস, স্প্রে। যা ১০/১৫ হাত দূর থেকে স্প্রে করলে মানুষ অজ্ঞান হয়ে যাবে এবং তখন তারা মাথা কেটে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের লক্ষ্য মাথা কাটা। এর ভিতরে খুলনায় অনেক মাথা কেটে নেওয়া হয়েছে। তাই সাবধানে থাকবেন। বাসার সবাইকে সতর্ক করে দিবেন এবং বাসায় কোন ভিক্ষুক আসলে সাবধানে থাকবেন এবং কোন অপিরিচিত কেউ আসলে দরজা খুলবেন না (শাবধান বাঙালি)। বেশি বেশি ফরওয়ার্ড করুন। এবং অন্যের জীবন রক্ষা করুন।’’

কারও মেসেজের জবাবে সাধারণত অপ্রীতিকর বা তিনি কষ্ট পেতে পারেন এমন বার্তা দেই না। কিন্তু এবার আর সেটি পারলাম না। এই মেসেজের জবাবে লিখলাম: ‘মানুষের মাথা না, তোমার মতো গোবরভর্তি ছাগলের মাথা প্রয়োজন।’ তিনি মেসেজ সিন করলেন, কিন্তু কোনো জবাব দিলেন না।

এরপর থেকেই ভাবছিলাম, আসলে এ বিষয়ে কী লেখা যায়? লিখলে কি এই গুজব আরও ছড়িয়ে পড়বে? কিন্তু যখন বাড়িতে কথা বলার পর শুনলাম এই বিষয়ে ছড়িয়ে পড়া কল্পকাহিনী, বাচ্চাদের মুখে কল্লাকাটা ধরে নিয়ে যাওয়ার ‘সাবধানবাণী’, তখন আর না লিখে পারলাম না।

এই ভয়ঙ্কর ধারণা কি তাদের মানসিকতার বিকাশে কোনো ধরনের প্রভাব ফেলবে না? তারা কি অন্তত আগামী ৫-১০ বছর স্বাভাবিকভাবে চলাফেরার শক্তি ও সাহস পাবে? তাহলে কার স্বার্থে এসব ভয়ঙ্কর গুজব ছড়ানো হচ্ছে? এই শিশুরা যখন প্রাপ্তবয়স্ক হবে, আরও আধুনিক দুনিয়ার নাগরিক হবে, তখন তারা যদি এ বিষয়ে প্রশ্ন করে তখন কী জবাব দেবেন? জবাব দিতে না পারলে আপনার বা এখনকার সময়ের সবার জ্ঞানের দৌড় কোন পর্যন্ত সেটা যখন সে বুঝবে তখন আপনার কী অবস্থা হবে? একবারও কি বিষয়টা ভেবেছেন?

বিজ্ঞাপন

বরিশালে জনতার হাতে আটক শিশু অপহরণকারী

এই লেখা যখন লিখছি, এর মধ্যেই পদ্মা সেতু প্রকল্পের পক্ষ থেকে এই ঘটনাকে গুজব হিসেবে আখ্যা দিয়ে বিবৃতি এসেছে। কতোটা ডালপালা মেললে একটা গুজবকে গুজব হিসেবে আখ্যা দিয়ে কর্তৃপক্ষকে বিবৃতি দিতে হয়? বিষয়টা ভাবতেই গা শিউরে উঠছে।

পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সম্মান ও গৌরবের বিষয়। শুরু থেকেই এ সেতু নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র হয়েছে। এই সেতুর বেশিরভাগ কাজ যখন শেষ, তখন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে এ বিষয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। হিসাবটা কি মিলছে না? কারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে পদ্মা সেতুর বিষয়ে এ গুজব ইনবক্সে ছড়াচ্ছে? সেখান থেকে চায়ের দোকান, পাড়া-মহল্লা এমনকি মাইকিং করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে!

নব্বইয়ের দশকে শুনতাম এলাকার ব্রিজ-কালভার্টে বাচ্চাদের মাথা দিতে হয়। সেগুলোর আসলে কোনো ভিত্তি ছিল না। বলতে গেলে এসব ছিল কুসংস্কার। এখন দিন বদলেছে। প্রায় সবার হাতে হাতে মুঠোফোন। ইন্টারনেটের যুগ এখন। এর সুবাদে পুরো বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়। এরপরও কি আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের মানসিকতা এখনও ঠিক হয়নি? ২০১৯ সালে এসেও তাহলে তাদেরকে কেন এসব কুসংস্কার কেন বিশ্বাস করতে হচ্ছে? নাকি প্রতিপক্ষকে দমানোর জন্য সেই আদিম মানসিকতার কুসংস্কারই এখনও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে?

এ বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া দু’টি ভিডিও দেখেছি। ফেসবুকে প্রকাশিত ভিডিওর একটি বরিশালের গির্জামহল্লা এলাকার। আরেকটি খুব সম্ভবত চট্টগ্রামের। দু’টি ভিডিও ছেলেধরা বিষয়ক। এলাকার মানুষ তাদের ধরেছেন। অবশ্য বরিশালের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট নারী ওই শিশুর স্বজন বলে পুলিশ জানিয়েছে। চট্টগ্রামের বিষয়টি এখনও জানা যায়নি। এই গুজবকে সামনে রেখে মানব পাচারকারীরা যে সক্রিয় হয়ে উঠবে না, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে গুজবে কান দিয়ে অতি উৎসাহী কেউ যাতে অপ্রীতিকর কিছু ঘটাতে না পারে, সেই বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।

পদ্মা সেতু শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের কিছু না। তাদের ব্যক্তিগত সম্পদ বা সম্পত্তি না। জনগণের টাকায় নির্মিত এ সেতুতে শুধু আওয়ামী লীগের লোকজন যাতায়াত করবে, বিষয়টা এমনও নয়। এ সেতু হলে পুরো দক্ষিণাঞ্চলের চিত্র পাল্টে যাবে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। তাহলে এই সাধারণ বিষয়টা আমরা কেন বুঝতে পারছি না?

আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করতে হবে বলে এক্ষেত্রেও গুজব ছড়াতে হবে? না। বরং আওয়ামী লীগ যদি কোনো খারাপ কাজ করে, জনবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সেক্ষেত্রে তাদের বিরোধিতা করা যায়। কিংবা এই প্রকল্পে যদি কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়, তার বিরুদ্ধে কথা বলা যায়। তবুও এমন কুসংস্কার আর গুজব ছড়িয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার মতো অপরাধ করা যায় না। যদিও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সরকারি দল কিংবা বিরোধী পক্ষ সবাই যার যার মতো করে এর আগেও গুজব ছড়িয়েছে। 

তাই সবশেষে বলবো, ২০১৯ সালে এসে নব্বইয়ের দশকের কুসংস্কার ছড়ানো যেমন নীচু মানসিকতার পরিচয়, তেমনই প্রতিপক্ষ দমনে অপপ্রচারের আশ্রয় নেয়ার এই ঘটনা বহির্বিশ্বেও বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ণ করবে। সেখানে বিষয়টাকে আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা জামায়াতের বিষয় হিসেবে দেখা হবে না, সেখানে বরং দেশের অধিকাংশ মানুষকেই কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিসেবে দেখা হবে। তাই দেশের এবং নিজের স্বার্থে হলেও এসব কুসংস্কার আর গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকুন।

এরপরও যদি কেউ সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্য কোনো মাধ্যমে এমন কুসংস্কারাচ্ছন্ন আজগুবি খবর ছড়ায়, জনমনে ভীতি সৃষ্টি করে তাহলে তাদেরকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার কাজটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যথাযথভাবেই করতে হবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)