চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শিলাইদহ: কবির জন্মস্থান জোড়াসাঁকোর চেয়ে সত্য জেনো

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমনটি বলেছিলেন, “রাশিয়ায় অবশেষে আসা গেল।” আমিও তেমনটি বলতে পারি- ‘জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে অবশেষে আসা গেল।’ এই তীর্থস্থান দর্শন বেশ দেরিতেই হলো আমার। গিয়েছিলাম বিগত বছরের শেষ সপ্তাহে। যথারীতি সবার মতোই আমিও ‘ভ্রমি বিস্ময়ে’- এক তলা থেকে আরেক তলা, এ-ঘর থেকে ও-ঘর ঘুরছি। তবে যে ঘরটিতে এসে শিহরিত-স্তম্ভিত হয়ে পড়ি, সেটি কবির আঁতুড় ঘর। শুধু বিশ্বকবি নন, তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথসহ ঠাকুর বংশের অনেকেই সে ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন। শিহরিত হওয়ারই কথা। কিন্তু স্তম্ভিত কেন? এতো ছোট্ট কক্ষ! অন্য কক্ষগুলোর হিসেবে এটিকে কক্ষ বলা চলে না। মনে হয় অপরিকল্পিতভাবে হঠাৎ হয়ে-যাওয়া ক্ষুদ্র কুঠুরি। কোনো জানালা নেই, কিন্তু পাশাপাশি দু’দুটো দরজা। জন্মটা না থাকলে মানুষের জীবনে আর তো কিছুই থাকতো না। অথচ সেই জন্মের স্থানটি এতো অবহেলার! এতো গুরুত্বহীন! এ-রকম বিখ্যাত বিদ্যা-বিত্তশালী বংশের ক্ষেত্রেও! ওখানে দাঁড়িয়ে এ-অনুভূতি মনে হয় সবারই হয়।

প্রকোষ্ঠটির সামনে সম্ভবত অসিতকুমার হালদারের মন্তব্য ফ্রেমে বাঁধাই করে সাঁটানো আছে- তাতে একই প্রতিক্রিয়ার কথাই উৎকীর্ণ। তবে এ হচ্ছে কলকাতার বিখ্যাত জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির, মানে প্রিন্স দ্বারকানাথের নাতি এবং মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের চৌদ্দতম সন্তানের নিছক দেহী-জন্মের কথা। সেদিন জন্মমাত্র সহজাত-স্বাভাবিক সুতীব্র চিৎকার নিশ্চয় দিয়েছিলেন, কিন্তু সে সবের স্মৃতি-অনুভূতি তো তাঁর থাকার কথা নয়। নিজেই বলেছেন :

জীবনের সিংহদ্বারে পশিনু যে ক্ষণে
এ আশ্চর্য সংসারের মহানিকেতনে
সে ক্ষণ অজ্ঞাত মোর। (‘নৈবেদ্য’: ৮৯ সংখ্যক কবিতা)

রবীন্দ্রনাথ অবশ্য তাঁর যে জন্মস্থানের কথা বলেছেন সেটি প্রশস্ত-সুউচ্চ, ক্রমপ্রসারিত দিকচক্রবাল যার ক্ষেত্রসীমানা, ঊর্ধ্বে আকাশ অবধি। আর সে জন্ম কোনো সুদূর অতীতের একটি জন্ম বা প্রথম জন্মের ক্ষণ।

রবীন্দ্রনাথ যেমনটি বলেছেন ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে:
আমি বেশ মনে করতে পারি, বহু যুগ পূর্বে যখন তরুণী পৃথিবী সমুদ্রস্লান থেকে সবে মাথা তুলে উঠে তখনকার নবীন সূর্যকে বন্দনা করছেন, তখন আমি এই পৃথিবীর নূতন মাটিতে কোথা থেকে এক প্রথম জীবনোচ্ছ্বাসে গাছ হয়ে পল্লবিত হয়ে উঠেছিলুম।

চিঠিখানি ইন্দিরা দেবীকে লিখেছিলেন কুষ্টিয়ার শিলাইদহ থেকে ৯ ডিসেম্বর ১৮৯২।

আর যদি এ-জন্মের কথাই ধরি, চিরসুন্দরের কবি ‘জীবনস্মৃতি’তে লিখেছেন যে, কলকাতার বাড়িতে একদিন পত্রপল্লবের ফাঁক দিয়ে সূর্যোদয় সন্দর্শনের পর তাঁর চোখের উপর থেকে যেন একটা পর্দা সরে গেলে দেখলেন: “…একটি অপরূপ মহিমায় বিশ্বসংসার সমাচ্ছন্ন, আনন্দে এবং সৌন্দর্যে সর্বদাই তরঙ্গিত।”

তিনিই ‘পদ্মাপ্রবাহচুম্বিত শিলাইদহ’ থেকে ইন্দিরা দেবীকে এবারে লিখলেন: পৃথিবী যে বাস্তবিক কী আশ্চর্য সুন্দরী তা কলকাতায় থাকলে ভুলে যেতে হয়। এই-যে ছোটো নদীর ধারে শান্তিময় গাছপালার মধ্যে সূর্য প্রতিদিন অস্ত যাচ্ছে, এবং এই অনন্ত ধূসর নির্জন নিঃশব্দ চরের উপরে প্রতি রাত্রে শত সহস্র নক্ষত্রের নিঃশব্দ অভ্যুদয় হচ্ছে, জগৎ-সংসারে এ-যে কী একটা আশ্চর্য মহৎ ঘটনা তা এখানে থাকলে তবে বোঝা যায়। (‘ছিন্নপত্রে’র ১০ নম্বর চিঠি)।

কাজেই কলকাতায় কবি হয়তো নিজের মধ্যে এক শিল্পিসত্তাকে অনুভব-আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। কিন্তু সেই বৈভবপূর্ণ প্রাসাদে নয়, এই শিলাইদহের গ্রামীণ নৈসর্গিক জনপদে জগত ও জীবনকে নবরূপে অন্তরঙ্গভাবে উপলব্ধি করলেন। এর পূর্বে তাঁর কাব্যে শিল্পকুশলতা অবশ্যই ছিল, কিন্তু স্বকীয়তা আর অভিনবত্ব ধরা দিল এবারে, ‘সোনার তরী’র বহমানতা থেকে। বলছেন: আমি শীত গ্রীষ্ম বর্ষা মানিনি, কতবার সমস্ত বৎসর ধরে পদ্মার আতিথ্য নিয়েছি, বৈশাখের খররৌদ্রতাপে, শ্রাবণের মুষলধারাবর্ষণে। পরপারে ছিল ছায়াঘন পল্লীর শ্যামশ্রী, এ পারে ছিল বালুচরের পাণ্ডুবর্ণ জনহীনতা, মাঝখানে পদ্মার চলমান স্রোতের পটে বুলিয়ে চলেছে দ্যুলোকের শিল্পী প্রহরে প্রহরে নানাবর্ণের আলোছায়ার তুলি। এইখানে নির্জনসজনের নিত্যসংগম চলছিল আমার জীবনে। অহরহ সুখদুঃখের বাণী নিয়ে মানুষের জীবনের বিচিত্র কলরব এসে পৌঁছচ্ছিল আমার হৃদয়ে। মানুষের পরিচয় খুব কাছে এসে আমার মনকে জাগিয়ে রেখেছিল। তাদের জন্য চিন্তা করেছি, কাজ করেছি, কর্তব্যের নানা সংকল্প বেঁধে তুলেছি, সেই সংকল্পের সূত্র আজও বিচ্ছিন্ন হয়নি আমার চিন্তায়। সেই মানুষের সংস্পর্শেই সাহিত্যের পথ এবং কর্মের পথ পাশাপাশি প্রসারিত হতে আরম্ভ হলো আমার জীবনে। আমার বুদ্ধি এবং কল্পনা এবং ইচ্ছাকে উন্মুখ করে তুলেছিল এই সময়কার প্রবর্তনা (“সূচনা”, ‘সোনার তরী’)।

বিজ্ঞাপন

তাহলে এই হচ্ছে শিল্পশ্রষ্টা ও কর্মসাধক রবীন্দ্রনাথের মানস-জন্মভূমি। “ভাষা ও ছন্দ” (‘কাহিনী’) কবিতায় নারদের জবানিতে বাল্মীকিকে বলেছিলেন “ঘটে যা তা সব সত্য নহে/ কবি, তব মনোভূমি/ রামের জনস্থান অযোধ্যার চেয়েও সত্য জেনো।” সে-কথাটি একটু ভিন্নভাবে রবীন্দ্রনাথ ও শিলাইদহের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। রবীন্দ্রনাথের জীবন ও সাধনার বিশ্লেষণে তো বটেই, কবির আপন অনুভব বিবেচনায়ও বিষয়টি এভাবেই ধরা পড়ে।

যেমন, ইন্দিরাকে লেখা সে সময়কার চিত্ত ও চিত্র বিধৃত পত্রাবলি প্রসঙ্গে বলেছেন: আমাকে একবার তোর চিঠিগুলো দিস- আমি কেবল ওর থেকে আমার সৌন্দর্যসম্ভোগগুলো একটা খাতায় টুকে নেব- কেননা, যদি দীর্ঘকাল বাঁচি তা হলে এক সময় নিশ্চয় বুড়ো হয়ে যাব- তখন এই সমস্ত দিনগুলো স্মরণের এবং সান্ত্বনার সামগ্রী হয়ে থাকবে…।

অর্থাৎ এ-জীবনের যে স্মৃতিতর্পণ তা শিলাইদহের সে ‘অজ্ঞাতবাস’কে কেন্দ্র করে করতে চান। তবে হ্যাঁ, শিলাইদহই কেন্দ্র, আর শাহজাদপুর-পতিসর ভূখণ্ড আর পদ্মা-গড়াই-ইছামতী-আত্রাই-নাগর নদনদীর জলপথজুড়ে ছিল রবীন্দ্রনাথের বিচরণ। অন্যত্র থাকবার সুবিধা ছিল না। আর শিলাইদহ বাসের আরেকটি তাৎপর্যময় দিক হলো পারিবারিক ‘ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড়’ এখানেই রচিত হয়েছিল। বিবাহের পর জনাকীর্ণ জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির পর উত্তর ভারতের গাজীপুরে একান্ত সংসারজীবন হয়েছিল বটে, তবে তা নিতান্তই মাসকয়েকের জন্যে। তারপর এই শিলাইদহে স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের নিয়ে নিজস্ব গার্হস্থ্যজীবন। এরপর শান্তিনিকেতনের জীবন তো আবার এক বৃহৎ কর্মযোগের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ‘জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে/ এই তিন নিয়ে’ মানবজীবন; তা বিবাহিত মানুষের সংসারজীবনই তো জীবনের পরিণত পর্যায়- রবীন্দ্রনাথের সে পর্বটি যেহেতু শিলাইদহেই প্রথম পূর্ণতা পেয়েছিল, তাই বলা চলে, রবীন্দ্রনাথের জীবনোপলব্ধির সবচেয়ে বহুমাত্রিক ঘটনাবলিও এখানে সম্পন্ন হয়েছিল।

জীবনসায়াহ্নে মানুষ ফিরে যেতে চায় তার শৈশব-কৈশোরে- তার আসল-আদরের ঠিকানায়। রবীন্দ্রনাথও চেয়েছেন। কোথায় স্থিতু হতে চেয়েছিলেন কবি? জোড়াসাঁকোর বাড়িটিতে? বোলপুর-শান্তিনিকেতনে? কই এমন স্মৃতিকাতরতা তো দেখিনি। বরং শান্তিনিকেতনের একটি ঘটনা স্মরণ করি শচীন্দ্রনাথ অধিকারীর সূত্রে- ১৯৩৭ সালের কথা: উত্তরায়ণের বারান্দায় কবি আত্মীয়স্বজনপরিবৃত হয়ে বসে আছেন। কবি কিন্তু অন্যমনস্ক হয়ে বসে রয়েছেন, দৃষ্টি যেন স্মৃতির রাজ্যে নিবদ্ধ, একটি প্রশ্নেরও তিনি জবাব দিচ্ছেন না। কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস ফেলে আপন মনে বলে উঠলেন-আর একবার শিলাইদহে গেলে বড়…। আর কথা শেষ করতে পারলেন না।

অনাদি-অনন্ত মহাকালব্যাপী চিরবহমান জীবনপ্রবাহে জন্মান্তরে বিশ্বাসী রবীন্দ্র আবারও ফিরতে চেয়েছেন এখানেই। লিখছেন শিলাইদহ থেকে: আমি প্রায় রোজই মনে করি, এই তারাময় আকাশের নীচে আবার কি কখনও জন্মগ্রহণ করব! আর কি কখনও এমন প্রশান্ত সন্ধ্যাবেলায়, এই নিস্তব্ধ গোরাই নদীটির উপর, বাংলাদেশের এই সুন্দর একটি কোণে এমন নিশ্চিন্ত মুগ্ধ মনে জলিবোটের উপর বিছানা পেতে পড়ে থাকতে পাব! হয়তো আর কোনো জন্মে এমন একটি সন্ধেবেলা আর কখনও ফিরে পাব না। তখন কোথায় দৃশ্যপরিবর্তন হবে-আর, কিরকম মন নিয়ে বা জন্মাব। এমন সন্ধ্যা হয়তো অনেক পেতেও পারি, কিন্তু সে সন্ধ্যা এমন নিস্তব্ধ ভাবে তার সমস্ত কেশপাশ ছড়িয়ে দিয়ে আমার বুকের উপরে এত সুগভীর ভালোবাসার সঙ্গে পড়ে থাকবে না। আমি কি ঠিক এমনি মানুষটি তখন থাকব! (‘ছিন্নপত্র’: ৮৪)।

তো এই রবীন্দ্রনাথের এবছর ১৫৭তম জন্মবার্ষিকীর প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে, “রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্মে শিলাইদহের প্রভাব”। শিলাইদহের প্রভাব যে সর্বাধিক এটা সর্ববাদিসম্মত বিষয়। রবীন্দ্রনাথ নিজে বলেছেন “আমার যৌবন ও প্রৌঢ় বয়সের সাহিত্যরস-সাধনার তীর্থস্থান ছিল পদ্মাপ্রবাহচুম্বিত শিলাইদহ পল্লীতে।” তা এই দুটো বয়সই তো সৃষ্টি ও কর্মের। পুত্র রথীন্দ্রনাথ পিতৃস্মৃতি তর্পণ করতে গিয়ে বলেছেন, “গবেষক জীবনচরিত-লেখকেরা সঠিক খবর দিতে পারবেন, তবে সাধারণভাবে আমার ধারণা, বাবার গদ্য ও পদ্য দুরকম লেখারই উৎস যেমন খুলে গিয়েছিল শিলাইদহে, এমন আর কোথাও হয়নি।” ‘সোনার তরী’ থেকে ‘চিত্রা’, ‘ক্ষণিকা’, ‘খেয়া’, ‘বলাকা’ ‘গল্পগুচ্ছ’, ‘চোখের বালি’, ‘গোরা’, ‘গীতাঞ্জলি’, ‘গীতিমাল্য’, ‘গীতালী’ কিংবা ‘গীতাঞ্জলী’ রচনা ও অনুবাদ- এসব বাদ দিলে কোন রবীন্দ্রনাথ অবশিষ্ট থাকে? পূর্বে থাকে বয়ঃসন্ধির চঞ্চলময় চিত্তের অভিব্যক্তি, পরে থাকে স্মৃতিকাতরতা আর আসন্ন জীবনাবসানের অভিজ্ঞান-উপলব্ধি। সম্পূর্ণ রবীন্দ্রনাথই আমাদের শ্রদ্ধেয়, তবে যৌবন-প্রৌঢ়ের রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রিয়, বিশ্ববাসীর সম্মানিত।

তারপরও এবারের জন্মবার্ষিকীর প্রতিপাদ্য বিষয়টি আরেকটি তাৎপর্যে আমাদের গ্রহণ করতে হবে। জমিদারি কার্যোপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ গিয়েছিলেন শিলাইদহেন। তবে প্রমথ চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, “আমার জন্মগত পেশা জমিদারি, কিন্তু আমার স্বভাবগত পেশা আসমানদারি।” এই আসমানদারি মানে ‘কবিতা কল্পনালতা’য় চড়ে অলৌকিক ভুবনে বিচরণ। তাই বলে সেটা করেই শেষ করেননি তিনি। বিশেষ করে এ-পর্ব থেকেই শুরু হলো তাঁর মৃত্তিকা ও মানুষ সংলগ্ন হয়ে থাকা। দেখলেন, তাঁর জমিদারিতে প্রজাদের দিনযাপন মানে বৃহত্তর যে জীবনধারা, তা দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন, অশিক্ষা-অস্বাস্থ্য দ্বারা পঙ্কিল। “বড়ো দুঃখ, বড়ো ব্যথা-সম্মুখেতে কষ্টের সংসার/ বড়োই দরিদ্র, শূন্য, বড়ো ক্ষুদ্র, বদ্ধ, অন্ধকার। (“এবার ফিরাও মোরে”, ‘চিত্রা’)।” সিদ্ধান্ত নিলেন, “এই-সব মূঢ় মূক ম্লান মুখে/ দিতে হবে ভাষা এই-সব শান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুকে/ দিতে হবে আশা…।”

আর এজন্য কবিমানসীকে বললেন, “এবার ফিরাও মোরে, লয়ে যাও সংসারের তীরে/ হে কল্পনে, রঙ্গময়ী। দুলায়ো না সমীরে সমীরে/ তরঙ্গে তরঙ্গে আর, ভুলায়ো না মোহিনী মায়ায়।”
শুধু এই ছন্দোবদ্ধ গীত নয়, শুধু উদ্বেগ নয়, উদ্যোগও নিলেন। কলকাতা শহরের মানুষ, জমিদার-নন্দন এই যুবাপুরুষ বিলাস-ব্যসনের পরিবর্তে কর্মযোগী হলেন। আধুনিক পদ্ধতিতে কৃষিকাজ, নতুন নতুন ফল-ফসলের চাষাবাদ, দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন, স্বেচ্ছাসেবী ‘কিশোর ব্রতী-বালক দল’ ও ‘কর্মীসঙ্ঘ’ গঠন, পল্লীসমাজের সার্বিক উন্নয়নে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ. স্কুল-ক্লাব-চিকিৎসালয় নির্মাণ সাপেক্ষে আদর্শ গ্রাম তৈরি, জমিদারি শাসন সংস্কার করে মণ্ডলী প্রথা প্রবর্তন, রায়ত-চাষাদের নিয়ে সমবায় আন্দোলন, গ্রামীণ মেলার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, তাঁতশিল্প প্রসারে বিদ্যালয় ও কারখানা স্থাপন, লোকসাহিত্য সংগ্রহ, লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণ- কি না করলেন! এই কর্মযোগের ধারাবাহিকতাই শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতন। শিল্পি যে শুধুই কল্পনালোকবিহারী হবেন না, তাঁরও যে সামাজিক দায়িত্ব আছে এবং সেটা যে এমন আন্তরিক ও বহুমাত্রিকভাবে প্রতিপালন করতে হয় রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ থেকে সেই দীক্ষাই নিয়েছিলেন। আর আমরাও যদি সেই শিক্ষাটা গ্রহণ করি তবেই নিজেদের রবীন্দ্রভক্ত হিসাবে দাবি করা সার্থক হবে, রবীন্দ্রজন্মজয়ন্তী পূর্ণতা পাবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন