চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শিখা মাসি ছিলেন আমার মায়ের বান্ধব

এক
নির্মলের মাকে আমরা ডাকতাম শিখা মাসি বলে। শিখা মাসির গায়ের রঙ কালো হলে কি হবে কথাবার্তায় তিনি আমার মায়ের মতোই ছিলেন। পার্থক্য শুধু আমার মার গায়ের রঙ হলুদ ফর্সা। আমার মার সঙ্গে শিখা মাসির ছিল খুব ভাব। দুজনেই ছিলেন বই পড়ার পোকা। পাড়ার লাইব্রেরি থেকে, এর ওর কাছ থেকে বই আনলে শিখা মাসি পড়া শেষ করে আমার মাকে সেই বই দিতেন। আমার মাও তাই করতেন।

নির্মলের সঙ্গে যখন ওদের বাড়ি যেতাম আমি খেয়াল করতাম শিখা মাসি আমাকে নির্মলের চেয়ে বেশি আদর করতেন। ভুলেও তিনি আমার কাছে মেডিক্যালে থাকা আমার মার কোনো খোঁজখবর নিতেন না। কিন্তু নির্মলের সঙ্গে যখন আমার দেখা সাক্ষাৎ হয় প্রথমেই সে আমার কাছে মার খবর জানতে চায়। আচ্ছা, নির্মল কেন সবসময় আমার সঙ্গে দেখা হলে মার খোঁজখবর জানতে চায়?

বিজ্ঞাপন

শিখা মাসি আমাকে দেখলে যত্ন আত্তি করে ভাত খেতে দেন। পায়েস খেতে দেন। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। শার্টের বোতাম লাগিয়ে দেন আর আমার দিকে কেমন এক দৃষ্টিতে যে তাকিয়ে থাকেন! নির্মলদের বাড়িতে চৈত্র সংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখ কিংবা উৎসব পার্বণে ভালোমন্দ রান্না হলে ও আমাকে ওদের বাড়িতে নিয়ে যেত।

মনে আছে একবার পহেলা বৈশাখে নির্মলদের বাড়িতে আমি আলু দিয়ে ঝোল ঝোল করে খাসির মাংস, পটল আর বেগুন ভাজি আর মাষ কলাইয়ের ঘন ডাল দিয়ে পেট পুরে ঘি-ভাত খেয়েছিলাম। ঘি-ভাত অনেকটা পোলাওয়ের মতো করে রান্না ভাত। খুব তৃপ্তি সহযোগে খেয়েছিলাম সেদিন। তখনকার দিনে পহেলা বৈশাখে আজকের দিনের মতো এরকম ধুম ধাম করে লোক দেখানো ইলিশ পান্তা খাওয়ার রেওয়াজ ছিল না।

বিজ্ঞাপন

আমাদের ছোটবেলার বৈশাখে বাড়ি বাড়ি ভালোমন্দ খাওয়ার চল ছিল। তবে নির্মলদের বাড়ি গেলে শিখা মাসি সবসময় আমাকে বলতেন, ‘সাবু, তোমার যদি তুমগো বাড়িতে ভালো না লাগে তাইলে তুমি সোজা আমার বগলে আইসা পড়বা।’

শিখা মাসি অবিকল মার মতো করে কথা বলেন। আমরা মেডিক্যালে মাকে দেখে যখন বাড়ি ফেরার জন্য মার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসতে চাই তখন মাও শিখা মাসির মতো করে বলেন, ‘বাসায় মন না বসলে আমার বগলে চলে আসবি।’

দুই
নির্মলদের বাড়ি থেকে বের হয়ে আমি যখন আমাদের বাড়ির পথ ধরি, বাড়ি ফেরা না পর্যন্ত আমার মনে হতে থাকে আমার মা বুঝি আমার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছেন। আমার সঙ্গে কথা বলছেন। অনেকক্ষণ ধরে এই মনে হওয়াটা আমার মধ্যে চলতে থাকে।

ঘরে ফিরলে আমার সেই ভুল ভাঙে…

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)