চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শারীরিক উপস্থিতিতে অধস্তন আদালতে বিচারিক কার্যক্রম শুরু

করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিন ভার্চুয়াল মাধ্যমে আদালত পরিচালনার পর অবশেষে বুধবার সকাল থেকে দেশের সকল অধস্তন আদালতসমুহে শারীরিক উপস্থিতিতে স্বাভাবিক বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের আদেশক্রমে গত বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের রেজিষ্ট্রার জেনারেল মো: আলী আকবর স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় ‘উপর্যুক্ত বিষয়ে নির্দেশিত হয়ে জানানো যাচ্ছে যে, প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ বিচারপতিগণের সাথে আলোচনাক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, দেশের অধস্তন সকল দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত এবং ট্র‍্যাইব্যুনালসমূহে ৫ আগস্ট হতে শারীরিক উপস্থিতিতে স্বাভাবিক বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের দেয়া ৩০ জুলাইয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বর্ণিত নির্দেশনা পালনের নির্দেশ দেয়া হল।’

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে হাইকোর্ট বিভাগের ৩০ জুলাইয়ের দেয়া ‘আদালত প্রাঙ্গণ এবং এজলাস কক্ষে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ’ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে–

বিজ্ঞাপন

১) করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রােধে আদালত প্রাঙ্গণ এবং এজলাস কক্ষে প্রত্যেকে আবশ্যিকভাবে শারীরিক ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন করবেন। এজলাস, সাক্ষীর ডক (Witness box) এবং কাঠগড়ার প্রয়ােজনীয় অংশে গ্লাস দিয়ে পৃথক পৃথক প্রতিরােধক প্রকোষ্ঠ প্রস্তুতের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাময়িকভাবে বিচারকবৃন্দ ও আইনজীবীবৃন্দ সাদা শার্ট বা সাদা শাড়ি/ সালােয়ার কামিজ ও সাদা নেক ব্যান্ড/ কালাে টাই পরিধান করবেন।

২) জেলা জজ/ মহানগর দায়রা জজ/ চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট/ চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের প্রবেশ পথে এবং প্রকাশ্য স্থানে হাত ধােয়ার ব্যবস্থা হিসেবে প্রয়ােজনীয় সংখ্যক বেসিন স্থাপনসহ সাবান পানির ব্যবস্থা করবেন। আদালতে উপস্থিত প্রত্যেকে যথাসম্ভব নিজ নিজ নাক, মুখ এবং চোখ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকবেন।

৩) আদালত প্রাঙ্গণে ও এজলাস কক্ষে প্রত্যেককে আবশ্যিকভাবে সার্বক্ষণিক মুখাবরণ (Face Mask) এবং হাত মোজা (Gloves) পরিহিত অবস্থায় থাকতে হবে।

৪) অত্যন্ত জরুরি কারণ ছাড়া সকলকে আদালত প্রাঙ্গণে আসা থেকে বিরত থাকতে হবে। আদালত প্রাঙ্গন ও আদালত ভবনে প্রবেশ করার সময় প্রত্যেকের শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে । আদালতে প্রবেশের মুহুর্তে কেউ শরীরে জ্বর জ্বর বােধ করলে বা কারাে শরীরের তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার চেয়ে বেশি, বা কোভিড-১৯ এর লক্ষণ সমূহ যেমন কাশি, শ্বাসকষ্ট, সর্দি, ঠান্ডাজনিত ঘন ঘন কাপুনি, পেশী ব্যথা, মাথা ব্যথা, গলা ব্যথা, স্বাদ বা গন্ধের অনুভূতি নষ্ট হওয়া, ডায়রিয়া ইত্যাদিতে আক্রান্ত বা কোভিড ১৯ আক্রান্ত কারাে সংস্পর্শে এসেছেন এমন কাউকে আদালত ভবনে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না। এজলাস কক্ষে প্রবেশের সময় আদালতের কর্মচারী দ্বারা প্রত্যেক ব্যক্তির শারীরিক তাপমাত্রা থামাল স্ক্যানার দ্বারা পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

৫) আদালতের সংশ্লিষ্ট বিচারক শুনানি কার্যক্রমের সময়সূচি এবং পদ্ধতি এমনভাবে নির্ধারণ করবেন যাতে আদালত ভবনে ও এজলাস কক্ষে কোনােরূপ ঝুঁকিপূর্ণ জনসমাগম না ঘটে। মামলা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ এজলাস কক্ষ ত্যাগ করার পর বিচারক পরবর্তী মামলা শুনানির জন্য গ্রহণ করবেন।

৬) একটি মামলার শুনানিতে প্রত্যেক পক্ষে সর্বোচ্চ দুই জন আইনজীবী অংশগ্রহণ করতে পারবেন। আর এজলাসকক্ষে ছয় জনের অধিক লােকের সমাগম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া প্রত্যেকে পরস্পরের মধ্যে কমপক্ষে ছয় ফুট শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখবেন। কোনাে মামলার শুনানিতে পক্ষগণের উপস্থিতি আইনগতভাবে আবশ্যক না হলে এজলাসকক্ষে শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট মামলায় নিযুক্ত আইনজীবী উপস্থিত থাকবেন। আদালতের বিভিন্ন শাখা এবং অফিসকক্ষে কমপক্ষে ছয় ফুট দূরত্ব বজায় রেখে কর্মকর্তা কর্মচারীদের বসার আসন বিন্যাস করতে হবে।

৭) জামিন শুনানি এবং আমলী আদালতে ধার্য্য তারিখের কারাগারে থাকা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কারাগার হতে প্রিজন ভ্যান বা অন্য কোন ভাবে আদালত প্রাঙ্গণে বা এজলাস কক্ষে হাজির করার আবশ্যকতা নেই।

৮) কোভিড-১৯ হতে সুরক্ষার লক্ষ্যে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনসহ শারীরিক এবং সামাজিক দূরত্ব কঠোরভাবে বজায় নিশ্চিত করতে তাৎক্ষনিক উদ্ভূত যে কোন পরিস্থিতি বিবেচনায় বিচারক প্রয়ােজনবােধে আনুষঙ্গিক যে কোন সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

বিজ্ঞাপন

৯) সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপার বা উপ পুলিশ কমিশনার কোর্ট পুলিশ পদায়ন বা বদলি করার ক্ষেত্রে জেলা জজ/ মহানগর দায়রা জজ/ চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট/ চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে আলােচনাক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন এবং স্বাস্থ্যবিধিসহ অন্যান্য সুরক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নে সহযােগিতা করবেন।

১০) আদালত প্রাঙ্গণে জনসাধারণের ব্যবহার্য স্থানসমূহ, সরঞ্জামাদি, এজলাস কক্ষ এবং আসবাবপত্র যথাযথভাবে জীবাণুনাশক দিয়ে স্প্রে করতে হবে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। এক্ষেত্রে, প্রয়ােজনে এ্যালকোহল এন্ড ক্লোরহেক্সিডিন (Alcohol and Chlorhexidine) ডিসপােজেবল এন্টিসেপ্টিক ওয়াইপ ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া আদালতের নথিপত্র যথাযথভাবে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। আদালতে জনসমাগমের সাধারণ স্থানসমূহ যেমনঃ এজলাস কক্ষ, করিডাের, বারান্দা, হলওয়ে, সিড়ি, লিফট, বিশ্রামাগার ও জনসাধারণ সমবেত হতে পারে এমন অন্যান্য জায়গায় সামাজিক দূরত্ব যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

১১) আদালত প্রাঙ্গণ এবং এজলাস কক্ষে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ রােধে এবং সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে বিচারকবৃন্দ আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সাথে আলােচনাক্রমে প্রয়ােজনীয় নির্দেশনা প্রদান করবেন। আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে তাদের কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথে আদালত প্রাঙ্গণ ত্যাগ করতে অনুপ্রাণিত করতে হবে।

১২) আদালতে আগত এবং অবস্থানরত প্রত্যেককে এই সুরক্ষামূলক নির্দেশনা আবশ্যিকভাবে প্রতিপালনে সহযােগিতা করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিচারক আদালতের এক বা একাধিক কর্মচারীকে সাহায্যকারী হিসেবে দায়িত্বে নিয়ােজিত করবেন এবং মনিটরিং এর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। আদালত প্রাঙ্গণে সকল প্রকার দোকানপাট বন্ধ রাখতে হবে এবং কোনাে ভ্রাম্যমাণ দোকানও বসতে দেয়া যাবে না।

১৩) আদালত প্রাঙ্গণে সহজে চোখে পড়ে এমন স্থানে সুরক্ষামূলক নির্দেশনাসমূহ এবং স্বাস্থ্যবিধি প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে।

১৪) নিজেকে কোভিড-১৯ থেকে রক্ষা করতে এবং অন্যকে সুরক্ষিত থাকতে সহায়তা করার লক্ষ্যে সবাইকে কাজ করতে হবে।

করোনাভাইরাস

এর আগে দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরুর দিকে আদালত পরিচালনা বন্ধ হয়ে গেলে অনেক আইনজীবী ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনার জন্য সোচ্চার হন। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের বিচারপতিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ‘ফুল কোর্ট সভা’ থেকে ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারির জন্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ জানানোর সিদ্ধান্ত হয়।

সেই প্রেক্ষাপটে ভার্চুয়াল উপস্থিতিকে স্বশরীরে আদালতে উপস্থিতি হিসেবে গণ্য করে “আদালত কর্তৃক তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ- ২০২০” নামে গত ৯ মে একটি অধ্যাদেশ জারি করেন (বর্তমানে যেটি আইন) রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ।

এরপর প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের আদেশক্রমে গত ১০ মে ভার্চুয়াল আদালত সংক্রান্ত কয়েকটি নির্দেশনা জারি করা হয়। যেখানে ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনার জন্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ, হাইকোর্ট বিভাগ এবং অধস্তন আদালত ও ট্রাইব্যুনালের জন্য আলাদা আলাদা ‘প্র্যাকটিস নির্দেশনা’ দেয়া হয়। এছাড়া আইনজীবীদের জন্য প্রকাশ করা হয় ‘ভার্চুয়াল কোর্টরুম ম্যানুয়াল’।

এরই ধারাবাহিতায় গত ১১ মে থেকে দেশের ইতিহাসে প্রথম ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমে দেশের অধস্তন আদালত, এরপর হাইকোর্ট এবং পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালত ও আপিল বেঞ্চের বিচারিক কার্যক্রম চলতে থাকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে। অবশেষে আজ থেকে আবার দেশের সকল অধস্তন আদালতসমুহে শারীরিক উপস্থিতিতে স্বাভাবিক বিচারিক কার্যক্রম শুরু হল। অন্যদিকে, দেশের উচ্চ আদালতে কবে থেকে শারীরিক উপস্থিতিতে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ফুল কোর্ট সভা অনুষ্ঠিত হবে ৬ আগস্ট। ভার্চুয়াল মাধ্যমে সে সভায় যুক্ত হবেন প্রধান বিচারপতিসহ সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের বিচারপতিগণ।