চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শরীর বিচ্ছিন্ন আধুনিক মানুষ

শিরোনাম দেখে বেশ অদ্ভুত লাগতে পারে। মানুষ আবার অশরীরী হয় নাকি? একজন মানুষ মানে তার হাত থাকবে, পা থাকবে, মাথা, মুখ, চোখ, স্বাস্থ্য থাকবে। তার নিজ শরীরের উপলব্ধির অনুভূতি থাকবে। তার রূপ ,রস, গন্ধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে। কিন্তু কল্পনা করুন এমন এক মানুষ যারা দৃশ্যমান সবই আছে কিন্তু নিজের স্বাদ, গন্ধ নেয়ার ক্ষমতা নেই। সে অশরীরী, সে শুণ্য, ইথারে সব কিছুর অনুভূতি পায়। কেমন হবে বলুন তো। ব্যাপারটি সত্যিই বেশ দারুন কী?

অশীরীর মানুষের উদ্ভব
মনে করুন এমন মানুষ কিছু একটা খাদ্য গ্রহণ করলো। খাওয়ার ছবিটা ইথারে দিলো। প্রতিউত্তরে ইথারে কেউ বললো: ধুর এটা কোনো মেন্যু হলো?
আবার কেউ বললো: বাহ দারুন সুন্দর তো?
আবার আরেকজন একটা অদ্ভূত ইমোজি দিলো।
যে ব্যক্তি খেলো সে তখন সত্যিই বিভ্রান্ত তার আসলে কেমন লাগলো। সে তার খাবারের গন্ধ ভুলে গেল। এমনকি স্বাদও ভুলে গেল। কারণ খাওয়ার পূর্বেই সে যে ছবি পোস্ট করেছে ফেসবুকে সেখানে কী কমেন্ট আসছে সেটি দেখতে দেখতে সে শুধু গিলেছে। তার নাকে খাবারের গন্ধ, তার জিহ্বায় স্বাদ, তার পেটে হজম প্রক্রিয়ায় যে ঢেকুর তার কিছুই সে বুঝতে পারেনি। অথচ ইতোমধ্যে তার খাবারের ভার্চুয়াল স্বাদ পৌঁছে গেছে পাঁচ হাজার মানুষের কাছে, তার গন্ধে অস্থির হয়ে অনেক বন্ধুর স্ত্রী তাদের স্বামীকে ফোন করে অস্থির দেয়।

বিজ্ঞাপন

বলে, দেখো না ঐ রেস্টুরেন্টের খাবার কত চমৎকার! আমাদের এত কাছে আমরা এখনো যাইনি। স্বামী প্রবর তখন বিরস বদনে না পারছে বলতে, ‘শোনো, মাসের শেষ এখন কোনো রেস্টুরেন্টে খাওয়া যাবে না। তাছাড়া কাজের অনেক চাপ!’

অথবা আপনি একজন নাগরিক মানুষ। ঢাকা শহরে থাকেন। হঠাৎ বেশ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সাামাজিক মাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়ে সারা দুনিয়াকে জানিয়ে দিলেন আপনি বেশ অসুস্থ। আপনার প্রতি লাইক, কমেন্ট, শেয়ারে দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ সহমর্মিতায় উপচে পড়ে। আপনার ফেসবুক ওয়াল ভরে যায়। কিন্তু তাতে আপনার ক্ষণিক প্রশান্তি লাগছে বটে, কিন্তু স্ক্রিনে চোখ রাখতে রাখতে আপনার মাথায় ঝিম ধরছে, আপনার চোখ ব্যথা করছে। আপনার অসুস্থতার কোন সদগতি হয় না। সুদুর যুক্তরাষ্ট্র থেকে আপনার বন্ধু ফোনে বেশ কস্টকর অনুভূতি নিয়ে ফোন করলো। আপনার ভালো লাগলো বটে।

অসুস্থ হৃদয়ে আপনার স্যূপ খাওয়ার ইচ্ছা জাগলো। এমন কথা শুনে আপনার ঐ বন্ধু এক বাটি স্যুপের ছবি পোস্ট করে দিলো আপনার ওয়ালে। কিন্তু তাতে আপনার স্যুপ পানের ইচ্ছা আরো বেড়ে গেলো কিন্তু কেউ স্যুপ দিতে পারলো না। আপনার স্ত্রী কর্মজীবী। তার অফিসে কাজের ভীষণ চাপ। তাকেও বলতে পারছেন না।

নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে থাকতে, অফিস থেকে এসে সাামজিক মাধ্যমের বন্ধুদের সাথে চ্যাটিং করে, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আপটেড দিতে এবং পেতে, মেসেঞ্জারে বার্লিন, লন্ডন, মিউনিখে কথা বলতে বলতে জানাই হয়নি প্রতিবেশিকে। অন্যের কোমল পরশে বাটি থেকে স্যুপ তুলে দিলে পরম মমতায় পান করার ইচ্ছাটুকু মরে যায়। হয়তো উবার বা পাঠাও ফুডে অর্ডার দিলে স্যুপ পৌঁছে যেতো। কিন্তু তাতে কি প্রিয় মানুষের প্রীতির ছোঁয়া পাওয়া যেত? ‘ভার্চুয়াল ঈশ্বরের জন্ম’
বিশ্বজুড়ে প্রধানত বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে মানুষ সবচেয়ে বেশি সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাটাচ্ছে। ইদানিং ফেসবুকে যোগদানের দিনকে নুতন জন্মদিন হিসেবে ঘটা করে পালনের প্রবণতাও পরিলক্ষিত হচ্ছে। এমনকি সে কখন মারা যাবে এই তথ্য জানতে জাকারবার্গের কাছে ধর্ণা দিচ্ছে। ‘নতুন ঈশ্বর’ হিসেবে ফেসবুকের সৃষ্টিকর্তা আধুনিক মানুষের মৃত্যুর দিন-তারিখও বলে দিচ্ছে। কী অদ্ভুত এক বিবর্তীত আধুনিক মানুষ যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কাছে নিজের জন্ম-মৃত্যু সপে দিয়ে বসে আছে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে কাকে বিয়ে করবে সেটিও নির্ধারণ করে দিবে সামাজিক মাধ্যমের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

বিশ্বজুড়ে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা দু’শ কোটির বেশি। ২০১৭ সালে মার্ক জাকারবার্গ বৈশ্বিক গোত্র তৈরীর নতুন ইশতেহার ঘোষণা করে। সেই ইশতেহারে অনলাইনে অধিক সময় থাকার কারণে মানুষের জড়বুদ্ধিগ্রস্থ হওয়ার কারণে অফলাইন যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা কমাতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়ার ঘোষণা দেন তিনি। তাতে অবশ্য তার চলমান ব্যবসায়িক মডেলে বড় ধরণের পরিবর্তন আনতে হবে। এটি কি আদৌ তার পক্ষে সম্ভব হবে?

বিজ্ঞাপন

শরীরী মানুষের সক্ষমতা-অক্ষমতার সৌন্দর্য
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের ডক্টরেট ইউভাল নোয়া হারিরী। ইহুদি এই লেখক জেরুসালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। তার প্রথম আলোচিত বই ‘স্যাপিয়ান্স’। লেখক তার সর্বশেষ বই ‘টুয়েন্টি লেসনস ইন টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরিতে’ অনলাইন বনাম অফলাইনে এই বিষয়ে এক বয়ান হাজির করেছেন। তার বক্তব্য হলো: প্রত্যেক মানুষের শরীর আছে। একবিংশ শতাব্দিতে প্রযুক্তি মানুষকে তার শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। আমরা আমাদের গন্ধ ও স্বাদ নেয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছি। আমরা স্মার্টফোন ও কম্পিউটারে এতবেশি ডুবে আছি যে, সাইবার দুনিয়ায় কী ঘটছে সেটি নিয়ে যতটা হইচই তার চেয়ে আমার পাশের বাসায় কী ঘটছে সেটি নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নই। নিউইয়র্ক কিংবা লন্ডনে থাকা বন্ধুর সাথে কথা বলা যত সহজ, আমার পাশে থাকা স্ত্রীর সাথে কথা বলা তার চেয়ে অনেক কঠিন । কারণ সকালে ব্রেকফাস্টের টেবিলে স্ত্রী তখন মুখ, মাথা, চোখ সব স্মার্টফোনে গুজে দিয়ে আছে। অতীতে মানুষ কখনো তার আশেপাশের মানুষ ও পরিবেশ নিয়ে এতটা উদাসীন ছিলো না।

প্রাচীনকালে যারা শিকারে যেতো তারা খুবই সতর্ক এবং মনোযোগী ছিলো কারণ খাবার হিসেবে তারা যে মাশরুম সংগ্রহ করতে চায় তার আশপাশে কোন বিষাক্ত সাপ আছে কিনা কিংবা মাশরুমের সাথে কোন বিষাক্ত জাত যুক্ত কিনা।

জড়বুদ্ধির আধুনিক মানুষ
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা যায়, একজন স্যাপিয়ান্স মানব গড়ে ১৫০ জনের বেশি মানুষের সাথে গভীর জানাশোনা বা সম্পর্ক তৈরীতে অক্ষম। সামাজিক বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমরা যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করি তার প্রায়ই ভুলে যাই আমরা এই মাধ্যমের শুধু ভোক্তা নই পণ্যও বটে। যে কারণে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ জেনে বা ‘না জেনে’ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ক্যাম্ব্রিজ অ্যানালিটিকাকে মার্কিন নির্বাচন প্রভাবিত করার জন্য দিয়ে দেয়। শুধু তাই নয় বিজ্ঞানীরা আরো হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, অধিক সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা নিজের অজান্তে জড়বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষে পরিণত হয়। তাদের পক্ষে সৃষ্টিশীল চিন্তা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ থেকে কমনওয়েলথ স্কলারশিপে সম্প্রতি অক্সফোর্ডে পিএইচডি করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ডা. ফজলে রাব্বী। একদিন ন্যুফিল্ড স্কুল অব মেডিসিনের সুপারভাইজার তার কাছে জানতে চান তোমার ফেসবুক বন্ধু কতো ?
রাব্বী বললেন: প্রায় চার হাজার।
সুপারভাইজার যেন আকাশ থেকে পড়লেন, ও মাই গড!
এত বন্ধু! এদের সবাইকে তুমি ব্যক্তিগতভাবে চেনো ?
না ডক্টর !
‘আমার তো মাত্র দেড়’শ বন্ধু। এই দেখো এদের সাথে আমি সামাজিকভাবে যুক্ত। নিয়মিত বিরতিতে আমাদের দেখা হয়। রেস্টুরেন্টে খেতে যাই। সেসব ছবি আবার সামাজিক মাধ্যমে আপলোড করি।’
রাব্বী বলে, কী করবো ডক্টর। বন্ধু অনুরোধ গ্রহণ না করলে যে কষ্ট পায়? আর এটি তো যোগাযোগের একটি বিস্তৃত মাধ্যম?
এ কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠলেন তার সুপারভাইজার। তুমি একজন ব্যক্তি কত মানুষের কষ্ট লাঘব করতে পারো? জানা নেই শোনা নেই একটা মানুষ তোমার ভার্চুয়াল বন্ধু হলেই কী, না হলেই কী? এটি সামাজিক মাধ্যম। এর পূর্বেও পৃথিবী ছিলো। আমরা সামাজিক জীব ছিলাম।

রাব্বী ভাবেন, সত্যিই প্রাথমিক স্কুলে সমাজ বিজ্ঞান বইয়ে তাইতো পড়া হয়েছিলো, মানুষ সামাজিক জীব। মা-বাবা, ভাই-বোন, দাদা-দাদী, নানা-নানী চারপাশ নিয়ে আমাদের যে সমাজ। সেই সমাজ কি তথাকথিত স্পর্শহীন, স্বাদহীন, গন্ধহীন ভার্চুয়াল সমাজের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ নয়?

মায়ের সাথে দুর থেকে মেসেঞ্জার, ভাইবার, হোয়াইটসঅ্যাপ, ফোনে, ভিডিও কলে কথা বলার পরও আমরা কি কাছাকাছি গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ পেতে চাই না? মুখোমুখি বসার দিনের প্রয়োজনীয়তা কি সত্যিই ফুরিয়ে আসছে বলে মনে হয়? নাকি আমরা ভার্চুয়াল যোগাযোগের পরও হা-হুতাশ করি এমন শরীরী স্পর্শের জন্য।

মানবজাতি কি নিজেদের সৃষ্ট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে নিম্নমানের জড়বুদ্ধির ভার্চুয়াল মানুষে পরিণত হয়ে হেরে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে আছে? যে পৃথিবীতে ভাচুর্য়াল ফ্রাঙ্কেস্টাইনের দাস হয়ে আদেশ-নিষেধ মেনে চলাই শরীর বিচ্ছিন্ন আধুনিক যুক্ত মানুষের সম্মিলিত কর্ম হবে!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View