চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শরতের শিউলি ফুলের কাহিনী ও হেমন্তের নিঃশব্দ আগমন

দুই সপ্তাহ আগেও ছিল বর্ষা। হয়ে গেল হেমন্ত। মাঝখান থেকে শরতকালটাই বেমালুম উবে গেল। তেমনভাবে টেরও পাওয়া গেল না। একের পর এক নিম্নচাপ, ঘূর্ণাবর্তে বর্ষা দীর্ঘায়িত হতে হতে এবার ছুঁয়ে ফেলল অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত। ঘন ঘন বৃষ্টিতে আর মেঘ ঢাকা আকাশে বর্ষা জুড়েছিল গোটা ভাদ্র আর আশ্বিন। কার্তিকের একেবারে প্রথম লগ্নে উত্তুরে বাতাসে চামড়ায় ধরতে শুরু করেছে টান। ভোরের দিকে শীত শীত ভাব। সকালে ঘাসের ডগায় শিশিরবিন্দু।

আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, আবহাওয়াটা হেমন্তের। তাহলে শরত কালটা গেল কোথায়? না শরৎ এবার চুরি হয়ে গেছে! নিঃশব্দে আগমন ঘটেছে হেমন্তের। হেমন্ত বাংলার মায়াবী ঋতু। এই ঋতুর রূপ, রঙ, গন্ধ সবকিছুই আলাদা। এই মৌসুমে চারপাশ আলোকিত করে ফোটে দেবকাঞ্চন, হিমঝুরি, ধারমার, রাজঅশোক।

বিজ্ঞাপন

মাটিতে সোনালি রোদ্দুরের পরশ। ভোরে হালকা শীত, শিশিরভেজা প্রকৃতি। নদীর ধারে সফেদ কাশফুলের দোল দুলুনি জলাশয়ের শালুক পাতায় জল টুপটুপ। কখনও কয়েক ছিটে ইলেশগুঁড়ি বৃষ্টি। কোনও পুরনো শিউলি ফোটার ছোঁয়া নিয়ে হেমন্তে নবীন ভোর ও আলো।

এই শিউলিরও ফুলেরও একটা মনকেমন করা ব্যথা আছে। কবি তো লিখে গেছেন?—‘‘শিউলি ডালে কুঁড়ি ভরে এল/টগর ফুটিল মেলা/মালতীলতায় খোঁজ নিয়ে যায়/মৌমাছি দুই বেলা।’’ শিউলি ফুলের আরেক নাম শেফালি। দিনের আলোর স্পর্শে এই কমলা-সাদা ফুলটি তার নিজস্বতা হারায়। সূর্য ওঠার আগেই গাছ থেকে খসে পড়ে মাটিতে। টুপটাপ, গালিচার মতো বিছিয়ে থাকে শিশির-ভেজা কমলা-সাদা বৈভব। শিউলি ফুলের পিছনে লুকিয়ে রয়েছে কিছু পৌরাণিক কাহিনি।

নাগরাজের অপরূপা লাবণ্যময়ী কন্যা পারিজাতিকা সূর্যের প্রেমে পড়েন। কিন্তু দিনমণির-র কাছে সে পবিত্র প্রেম নজরে পরে না। শেষে দিনমণি সূর্যকে না পেয়ে পারিজাতিকা আত্মহনন করেন। তার দেহের ভস্ম পারিজাত ফুল রূপে স্বর্গে ফুটে ওঠে। সূর্যের স্পর্শমাত্রাই সে নীরব ব্যর্থ প্রেমিকার মতো ধরে পড়ে মাটিতে। এই পারিজাত হল স্বর্গের শ্রেষ্ঠ কুসুম। পারিজাত শিউলিরই নামান্তর। পুষ্পপুরাণে রয়েছে অন্য গল্প। পারিজাত স্বর্গের ফুল।

শরৎ-হেমন্তের সকালে শিউলির সৌরভ বাঙালির প্রাণে আনে উৎসবের মেজাজ। শ্রীকৃষ্ণের দুই পত্নী সত্যভামা ও রুক্মিনীর মনে খুব দ্বন্দ্ব যে কৃষ্ণ কাকে বেশি ভালোবাসেন। সত্যভামা না রুক্মিনী কাকে। কৃষ্ণ উদাসীন থাকেন এ প্রশ্নে। শেষে একদিন তাঁরা আবদার করলে পারিজাত ফুল যদি কৃষ্ণ এনে দিতে পারেন স্বর্গ থেকে, তাহলেই বোঝা যাবে কৃষ্ণের পত্নীপ্রেমের গাঢ়তা। কৃষ্ণ স্বর্গ থেকে চুপিচুপি পারিজাত বৃক্ষ চুরি করে আনেন। সত্যভামা সকালে ঘুম ভেঙে দেখেন তার প্রাসাদে একটি অপূর্ব পারিজাত বৃক্ষ এহং সেই ফুলের গুচ্ছ বিছিয়ে রয়েছে রুক্মিনীর প্রাসাদকোণে। এ দিকে স্বর্গের ফুল পারিজাত চুরির অপরাধে দেবরাজ ইন্দ্র আভিশাপ দেন, পারিজাত কেবল ফুল ফুটেই ঝরে যাবে। ফল হবে না কখনও সে ফুলের। তা না হোক, আমরা তো শিউলি-শেফালিকা-পারিজাত যে মানেই ডাকা হোক, তার ফুলটাই ভালোবাসি। শরৎ ঋতুর শ্রেষ্ঠ সে ফুল।

বিজ্ঞাপন

শিউলি ঝরা শেষে গুটি গুটি পায়ে আসে হেমন্তকাল। কিন্তু তার লক্ষণ কী আমরা দেখতে পাচ্ছি? সন্ধ্যাটি ইদানীং যেন একটু তাড়াতাড়ি চলে আসছে, কাজে ব্যস্ত নাগরিকের চোখে পরিবর্তনের লক্ষণ বলতে এটুকুই। ফুলে ফুলে ভরা শিউলি, ছাতিম কোথায় মুখ লুকিয়ে আছে কে জানে? রোদ তো এখনো সেই আগের মতোই ঘাম ঝরানো। আচমকা কোনো দুর্যোগ ছাড়া আকাশ বরাবর যেমন থাকে তেমনি আছে রৌদ্রকরোজ্জ্বল। দিনের লোডশেডিংয়ে পাখার চক্কর থেমে গেলে শরীর স্যাঁতসেঁতে হয়। সবকিছু আগের মতোই আছে, এর মধ্যে হেমন্ত কোথায়?

আমাদের প্রিয় রাজধানী ঢাকায় হেমন্ত পড়েছে নগরায়ণ আর কৃত্রিমতার ক্রসফায়ারে। এখানে যা আছে, সেটি তার শবদেহ। হেমন্ত সজীব-সপ্রাণ শহরের কোলাহল, মেকি জাঁকজমক, বিত্ত-বেসাতের জৌলুস থেকে দূরে। সেখানে সকাল-সন্ধ্যায় আকাশে কুয়াশার ঘনঘোর। হাওয়ায় হিমেল স্পর্শ। পথের পাশের জংলা গাছপালা, ঝোপঝাড়, মাঠের দুর্বা ঘাস সারারাত ঝরেপড়া শিশিরে ভিজে ওঠে। আর সেই শিশির বিন্দুতে সকালের সোনা রোদ হীরার কুচির মতো দ্যুতিময় হয়ে ছড়ায় তার সাত রঙের বর্ণালি।

বিকেল বেলায় গ্রামগুলোর ওপর চেপে থাকা কুয়াশার সঙ্গে রান্নাঘর থেকে ওঠা ধোঁয়া মিশে গিয়ে মলিন ধূসর বিশাল এক শামিয়ানার মতো আড়াল করে রাখে আকাশ। সন্ধ্যায় সবাই মিলে গলা সাধতে শুরু করে শেয়াল পণ্ডিতেরা। ডানা ঝাপটে নৈশ অভিসারে যাত্রা শুরু করে বাদুড়ের ঝাঁক। ধানখেত, আখখেত, সবজি খেতের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে এগিয়ে যাওয়া নদীটির মন্থর স্রোতে ঝিলমিল করে ওঠে কুয়াশার ভেতর দূর দিগন্তে ডুবতে থাকা সূর্যের ম্লান আলো। সেদিকে তাকালে ‘চোখের সকল ক্ষুধা মিটে যায় এইখানে’ এসে।

কুয়াশাচ্ছন্ন হেমন্তের রূপ আছে জীবনানন্দের কবিতায়। বাংলার বর্ষার রূপ যেমন নতুন করে আবিষ্কার করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তেমনি হেমন্তের অন্তর্গত সত্তাটি ধরা পড়েছিল জীবনানন্দের চোখে। ‘হেমন্তের ঝড়ে আমি ঝরিব যখন/পথের পাতার মতো তুমিও তখন/আমার বুকের পড়ে শুয়ে রবে? অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন’, ‘প্রথম ফসল গেছে ঘরে/হেমন্তের মাঠে মাঠে ঝরে/শুধু শিশিরের জল’, এমন অজস্র পংক্তিতে তিনি এঁকেছেন হেমন্তের ছবি। চালতার পাতা থেকে ঝরে পড়ছে শিশির বিন্দু, স্তব্ধ রাতের অন্ধকারে গাছের শাখায় শিকার ধরতে ওতপেতে আছে পেঁচা, মাকড়সার জালে জমেছে মুক্তোর মতো শিশির বিন্দু। আর মাঠে মাঠে পেকে উঠছে ধান। কেমন করে পরিপুষ্ট হচ্ছে সেই ধান? তিনি লিখেছেন, ‘শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপর মাথা রেখে/ অলস গেঁয়োর মতো এই খানে কার্তিকের ক্ষেতে;/ মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার, চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ/তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান…’। এই ধানে কেটে যাবে কৃষকের আকাল-অনটন। সচ্ছলতার সুখ আসবে গ্রামের ঘরে ঘরে।
হেমন্তে প্রকৃতি একটু অন্যরকম। জংলা জলাজমিতে ফোটে অজস্র শালুকফুল। এ সময় জীবজন্তুর মধ্যেও কেমন উদাস উদাস ভাব আসে। নতুন কাপড় নিয়ে তাদের কোন আদিখ্যেতা নেই। রোদ-হিম মাখতে, সাদা মেঘের ভেলা দেখতে তো আর পয়সা লাগে না। তারা বিনেপয়সায় পাওয়া প্রকৃতির উত্তাপ গায়ে মাখে।

নির্মম সত্য হচ্ছে, এখন এই সব দৃশ্য দেখবার, উপভোগ করবার মানুষ এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। সবাই আচ্ছন্নের মত ছুটছে। কখনও গাড়ি-বাড়ি কখনও প্রতিষ্ঠা, পদ-পদবি, খ্যাতির মোহে, আবার কখনও উৎসবের দাবিতে সবার মধ্যে ছুটে চলার প্রবণতা। মাঝে দু-একটা চোগোপ্তা খুন, অদৃশ্য ঘাতকের আনাগোনা, ‘সব ষড়যন্ত্র, ষড়যন্ত্রকারীদের বিষদাঁত ভেঙ্গে ফেলা হবে’ বলে মিথ্যে আশ্বাস! এমন পরিবেশে প্রকৃতি বা প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা এখন বাতুলতা। এখন প্রকৃতির সৌন্দর্য অনুসন্ধানের ‘বাতুলতা’ কারো মধ্যে খুব একটা দেখা যায় না।

রবীন্দ্রনাথ মানুষ আর পশুর পার্থক্য করতে গিয়ে বলেছিলেন, পশুর আছে গুহা, মানুষের আছে পথ। গুহাতে পশুরা আটকে যায়, মানুষ কিন্তু আটকায় না। সে অনাগারিক। তার আগার নেই, পথ আছে। মানুষের সে-পথ প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগে নানা অভিজ্ঞতায় ভরে ওঠে। তবে রবীন্দ্রনাথ এটাও বুঝেছিলেন, মানুষ তার এই চলার পথকে মাঝে মাঝে নিজেরাই আটকে দেয়। আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়। প্রকৃতিকে লুঠ করে নিজের ভাণ্ডার পূর্ণ করতে চাইলে মানুষ ধনের কারাগারে আটকে যায়। নাগরিক সভ্যতা আকাশ-আঁচড়া বাড়ি তৈরি করে। সে বাড়ি আর বিত্ত যখন বেজায় রকম চেহারা নেয়, তখন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের বিচ্ছিন্নতা অনিবার্য, সমাজের থেকেও আলাদা হয়ে যায় মানুষ। এ মানুষের নিজের তৈরি গুহা।

পশুরা গুহাতে বন্দি থাকে না, কোনও কোনও সময় তারা প্রকৃতির টানে বাইরে আসে। আর যে মানুষ প্রকৃতির টানে নানা কল্পনায় সাজিয়ে তুলত তাদের উৎসবের গল্প, তারাই এখন ইভেন্টের গুহায় বন্দি। বেচারা মানুষ রুদ্ধশ্বাসে ছুটছে বিত্ত আর বৈভবের পেছনে। এ চলার যেন শেষ নেই!

Bellow Post-Green View