চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শমী কায়সার, মোবাইল চোর ও প্রতিবাদের ভাষা

অন্যায়ের প্রতিবাদ করা জরুরি। কিন্তু সেই প্রতিবাদের ভাষা কী হবে, সেটি আরও বেশি জরুরি। আপনি আমার প্রতি একটা অন্যায় আচরণ করলেন, তার অর্থ এই নয় যে আমি আপনার বাবা-মা তুলে গালি দেব।

সাবেক জনপ্রিয় অভিনেত্রী এবং ব্যবসায়ী নেতা শমী কায়সারের ইস্যুটা এখন মনে হচ্ছে অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে এবং শমী কায়সার যে অন্যায়টি করেছেন, সেটি ঢাকা পড়ে যাবে। কেননা একটি সাংবাদিক সংগঠনের বিবৃতিতে শমী কায়সারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে লেখা হয়েছে, তিনি যদি ক্ষমা না চান তাহলে তার সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ-খবর নিয়ে সাংবাদিক সমাজ নিয়মিত সংবাদ পরিবেশন করে জাতিকে বিস্তারিত জানাতে বাধ্য হবে।’ ধারণা করা যায়, এই একটি বাক্য পুরো বিষয়টিকে নষ্ট করে দেবে এবং শমী কায়সারের ক্ষমা চাওয়ার প্রসঙ্গটি আর হালে পানি পাবে না।

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশ। একাংশ মানে এখন সাংবাদিকদের ইউনিয়ন দুটি ভাগে বিভক্ত। একটি আওয়ামীপন্থি এবং অন্যটি বিএনপি। জাতীয় প্রেসক্লাব এখনও দুটি ভাগে বিভক্ত হয়নি। কিন্তু এখানে নির্বাচনে প্রার্থিতা এমনকি সদস্য পদও দেয়া হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়। কে কোন প্যানেল থেকে ভোটার হলেন সেটি আরও রাখঢাকের বিষয় নয়। নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্যানেলেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। অথচ এই সাংবাদিকরাই বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার সবক দেন।

শমী কায়সারকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়ে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের যে অংশটি চিঠি দিয়েছে, তাদের প্যাডে প্রতিষ্ঠানের নামের নিচে লেখা রয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অবিচল’।

বিএফইউজে সভাপতি মোল্লা জালাল, মহাসচিব শাবান মাহমুদ, ডিইউজে সভাপতি আবু জাফর সূর্য ও সাধারণ সম্পাদক সোহেল হায়দার চৌধুরীর বরাতে ওই বিবৃতিতে বলা হয়, ‘একজন শহীদ সাংবাদিকের মেয়ে হয়ে পিতার পেশার উত্তরসূরীদের ‘চোর’ বলে সম্বোধন করে শমী কায়সার প্রকারান্তরে তার পিতাকেই নিকৃষ্টভাবে অসম্মান করেছেন।

শুধু তাই নয়, একজন সেলিব্রিটি হিসেবে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে ‘মোবাইল ফোন হারানোর’ সূত্র ধরে যে আচরণ করেছেন তা সেলিব্রিটিদের প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তার মতো একজন অভিনেত্রী ও ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ অত্যন্ত গর্হিত ও নিন্দনীয়।

ঘটনাটি ঘটে গত ২৪ এপ্রিল, জাতীয় প্রেস ক্লাবে। একটি অনুষ্ঠান চলার সময় মোবাইল ফোন হারিয়ে ফেলেন অভিনেত্রী ও ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) প্রেসিডেন্ট শমী কায়সার। এ সময় তিনি অনুষ্ঠানটির সংবাদ সংগ্রহ করতে আসা সাংবাদিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং তাদের চোর বলে সম্বোধন করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শমি কায়সারের তীব্র সমালোচনা হয়।

কিন্তু ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের প্যাডে লিখিত ওই বিবৃতির সবশেষ লাইনটি এরকম, শমী কায়সার সাংবাদিকদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা না চাইলে ভবিষ্যতে তার সংবাদ বর্জন এবং তার সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ-খবর নিয়ে সাংবাদিক সমাজ নিয়মিত সংবাদ পরিবেশন করে জাতিকে বিস্তারিত জানাতে বাধ্য হবে।

এ বিষয়ে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিও শমী কায়সারের আচরণের নিন্দা জানিয়েছে এবং নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তিনি ক্ষমা না চাইলে সাংবাদিক সমাজ তাকে বয়কট করবে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু সেখানে শমী কায়সারের সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ-খবর নিয়ে সাংবাদিক সমাজ নিয়মিত সংবাদ পরিবেশেনের মাধ্যমে জাতিকে জানাতে বাধ্য হবে’—এ জাতীয় কোনো বাক্য নেই।

বস্তুত ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের প্যাডে লিখিত বিবৃতির ওই বাক্যটি প্রতিবাদের নামে একটি অশোভন বিষয়কে উসকে দিয়েছে এবং সাংবাদিকদের একটি অংশ যে মানুষকে ব্ল্যাকমেইল করে এবং পয়সা না দিলে সংবাদ ছেপে দেয়ার হুমকি দেয় বলে অভিযোগ ওঠে, সেটিরই বহিঃপ্রকাশ।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবাদের ভাষা এরকম হয় না। এ জাতীয় ভাষা মূলত সাংবাদিকতার ডিগনিটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। শমী কায়সার একটি অন্যায় করে যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধিকৃত হচ্ছেন, তেমনি এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে এখন সাংবাদিকরাও যদি ধিকৃত হতে শুরু করেন, সেটা খুবই দুঃখজনক। ‍

যদি কারো বিরুদ্ধে এমন কোনো অভিযোগ থাকে যা সংবাদযোগ্য এবং সে বিষয়ে তথ্যপ্রমাণসহকারে সংবাদ হতেই পারে। যে কারো বিরুদ্ধেই সংবাদ হতে পারে। কিন্তু এর আগাম হুমকি দেয়ার অর্থ হলো তাকে ব্ল্যাকমেইল করা। শমী কায়সার যে অন্যায় আচরণ করেছেন সেজন্য তিনি  ঘটনাস্থলেই দুঃখপ্রকাশ করেছেন। তবে সাংবাদিকরা এটি যথেষ্ট মনে না করে তাকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান।

এটিও যৌক্তিক এবং শমী যদি তাদের দাবি অনুযায়ী প্রকাশ্যে ক্ষমা না চান তাহলে তার সংবাদ বর্জনের ঘোষণাও সাংবাদিকরা দিতে পারেন। আবার সবাই সেই ঘোষণা মানবেন এমনটি নাও  হতে পারে। কারণ প্রত্যেকটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান নিজের মতো করে চলে। কোনো একটি সাংবাদিক সংগঠন একটি ঘোষণা দিলে সব সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও, অনলাইন সেটি মানবে বা সেই দাবির দাবি একাত্মতা জানাবে, এটিও ভাবার কোনো কারণ নেই।

শমী কায়সার যা করেছেন, সেটি অবশ্যই অপরাধ এবং এটি সাংবাদিক সমাজের জন্য অসম্মানের। কিন্তু এ বিষয়ে সাংবাদিকদেরও আত্মসমালোচনা করা দরকার।

জাতীয় প্রেসক্লাবে যারা সারাদিন ঘোরাঘুরি করেন এবং বিভিন্ন সেমিনার ও অনুষ্ঠান কাভার করেন তাদের মধ্যে কতজন প্রকৃত সাংবাদিক এবং কতজন স্বীকৃত গণমাধ্যমে কাজ করেন? খোঁজ নিলে জানা যাবে, তাদের মধ্যে একটা বড় অংশেরই কোনো পরিচয় নেই। কোনো স্বীকৃত গণমাধ্যমে কাজ করেন না।

সাংবাদিকতার কার্ড ঝুলিয়ে নানা জায়গা থেকে সুবিধা নেয়ার ধান্দায় থাকেন এবং বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের রাজনীতি করেন। তাদের কাছ থেকে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা আশা করার ‍সুযোগ নেই। সুতরাং শমী কায়সারের আচরণের প্রতিবাদ করা যেমন জরুরি, তেমনি কারা সাংবাদিক হচ্ছেন, সাংবাদিকদের মধ্যে কতজন প্রকৃত সাংবাদিক এবং কতজন ধান্দাবাজ—সেটি চিহ্নিত করা আরও বেশি জরুরি।

শমী কায়সার

চাইলেই যেকেউ একটি ভুইফোঁড় প্রতিষ্ঠানের কার্ড ঝুলিয়ে সাংবাদিক হয়ে যাবেন এবং পয়সা না দিলে সংবাদ লিখে দেয়ার হুমকি দেবেন—এরকম লোকগুলোকে সাংবাদিকতার মতো একটি অত্যন্ত সম্মানজনক পেশা থেকে বিদায় করতে পারলে শমী কায়সার কেন, রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও সাংবাদিকদের কটাক্ষ করার সাহস পাবেন না।

আগে সাংবাদিকদের আত্মসমালোচনাটা বেশি জরুরি। তাদের মেরুদণ্ড সোজা করা দরকার। তারা যদি দলীয় লেজুড়বৃত্তি করতে থাকেন, ঢাকা শহরে একটি প্লট ও নানাবিধ সুবিধা পেতে দলীয় কর্মীতে পরিণত হন, তখন শমী কায়সার কেন, তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ লোকও সাংবাদিকদের ‘চোর’ বলে গালি দিলেও তার শক্ত প্রতিবাদ হবে না।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন