চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শত্রুমিত্র বদল ও উভয় সংকটে বাংলাদেশের রাজনীতি

শত্রুমিত্র বদল, মত বদল, পথ বদল ও উভয় সংকটই যেন বাংলাদেশের রাজনীতির নিয়তি হয়ে উঠছে। ছোট দল, বড় দল, বাম দল, ডান দল ও মধ্যপন্থী সকল দলেই চলছে বাঁক বদলের কৌশল ও উভয় সংকটের বিড়ম্বনা। গণতন্ত্র ও জনগণের দোহাই সবার মুখে মুখেই। কিন্তু এগুলো কেবলই বুলি চর্চার নামান্তর।

দেশ স্বাধীনের পরপরই আওয়ামী লীগের একটা অংশ যারা মুজিব বাহিনী পরিচয় দিয়ে যুদ্ধ করেছিল তারাই মুজিবের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। গড়ে তুলে গণবাহিনী। তারা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের শ্লোগান তুলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। মায়ের সাথে সৎ মা যুক্ত হলে যে মা হয় সে মায়ের রূপ যা হয় সমাজতন্ত্রের আগে বৈজ্ঞানিক সংযোজনেও তাই হল। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। যে দেশটিকে তারাই যুদ্ধ করে স্বাধীন করলো তারাই আবার এর স্থিতিশীলতার হুমকি হয়ে দাঁড়ালো। কেন এই ভূৃমিকা? এটা কি স্ববিরোধিতা না হঠকারিতা?

বিজ্ঞাপন

স্বাধীনতার ঘোষক দাবীদার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। তারা শ্লোগান দেন স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া, দেশ গড়েছেন খালেদা জিয়া। আবার সেই জিয়াই স্বাধীনতার প্রাণান্ত দুশমনদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন। স্বাধীন দেশে নাগরিকত্ব পান যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজম। মন্ত্রীত্ব পান মশিউর রহমান যাদু মিয়া, শাহ আজিজুর রহমান ও জুলমত আলী খান।

যে এরশাদ এখন স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার সুহৃদ তার আমলেই বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের দল ফ্রিডম পার্টি কুড়াল মার্কা নিয়ে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়। খুনী ফারুক স্বাধীনতার স্থপতি হত্যা করেও স্বাধীন দেশে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পায়! ফ্রিডম পার্টি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিষয়টিকে গর্বের বিষয় মনে করতো ও তা প্রকাশ্যে বলে বেড়াতো। সন্ত্রাস ও আতঙ্ক সৃষ্টিই ছিল এই দলটির আদর্শ! কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় ফ্রিডম পার্টির নেতা কথিত মেজর পীরের পুলিশের সাথে গোলাগুলি আজও মানুষদের মনে আতঙ্ক জাগায়। দলটি বিভিন্ন বেশে দেশব্যাপী সন্ত্রাসের আস্তানা গড়ে তুলেছিল। এমন একটি দল কিভাবে অনুমোদন পেতে পারল?

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর তৎকালীন স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে রাজপথের লড়াইয়ে শহীদ হন নূর হোসেন
১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর তৎকালীন স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে রাজপথের লড়াইয়ে শহীদ হন নূর হোসেন

মেজর জিয়া নিজেকে দাবী করতেন স্বাধীনতার ঘোষক আবার তিনিই স্বাধীনতার স্থপতি হত্যাকারীদের বুকে তুলে নিয়েছিলেন। স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন স্বাধীনতার পতাকা! তিনি সংবিধান হতে সমাজতন্ত্র উঠিয়ে দেন। চরম আশ্চর্যের বিষয় হল কতিপয় তুখোড় সমাজতন্ত্রী দাবীদারদেরকে দেখা যায় জিয়াকে সমর্থন জানাতে। তাদেরকে দেখা যায় জিয়ার ফ্রন্ট ও দলে যোগ দিতে। তারা কেন এমনটি করল? তবে কি তাদের অতীত রাজনীতি ভুল ছিল?

বিজ্ঞাপন

এরপর ক্ষমতায় এলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি গড়ে তুললেন জাতীয় পার্টি। সে দলেও অনেক সমাজতন্ত্রী দাবীদার নেতাকে যোগ দিতে দেখা যায়। দেশব্যাপী গড়ে ওঠে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জীবন দেন নূর হোসেন, ডাঃ মিলন, ফিরোজ জাহাঙ্গীরসহ আরও অনেকেই। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, বাম দল ও জামায়াত একযোগে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে রাজপথে নামে। গড়ে ওঠে ৮ দল, ৭ দল ও ৫ দল। তীব্র গণআন্দোলনের মুখে স্বৈরাচার এরশাদের পতন ঘটে। পরবর্তীতে কী দেখি? যারা শেষ সময় পর্যন্ত এরশাদকে রক্ষার চেষ্টা করেছে তারাই আবার এরশাদ বিরোধী দলগুলোর নেতা বনে গেছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবী ছিল তখন সর্বসম্মত দাবী। এ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ভোটে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন বেগম খালেদা জিয়া। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সাংবিধানিক ত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরোধিতা করে তারা। আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবীতে অনড় ভূমিকায় থাকে। তাদের দাবীকে উপেক্ষা করে বিএনপি একতরফা নির্বাচন দিয়ে দেয়। আন্দোলনের মুখে এ নির্বাচিত সংসদ ভেঙ্গে দিতে বাধ্য হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন বর্জন করে একসময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরোধিতাকারী বিএনপি। তারা দাবী তুলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের। নির্বাচন হয়ে গেল বিএনপিকে ছাড়াই। বিএনপি জামায়াতকে নিয়ে দেশব্যাপী অবরোধ দিল। পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ মারাকেও তারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই বলল। তারা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারকে অবৈধ বলল। আবার তাদেরই কথিত অবৈধ সরকারের অধীনেই সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করল। যুগ যুগ ধরে চলতে থাকা এই স্ববিরোধী ও রং বদলের রাজনীতি এবার পতিত হল এক নজিরবিহীন উভয় সংকটে।

ক্ষমতায় ১৪ দলীয় জোট ও মহাজোট। শরীক দলের নেতা প্রকাশ্যে সমালোচনা করছেন প্রধান শরীকের। এক্ষেত্রে তাদের এই ক্ষুব্ধতার সমাধান কী? সমাধান না হলে কী করবেন তারা? জোট ছেড়ে বিকল্প জোট গড়বেন? গড়লে কী হবে? পতিত স্বৈরাচার এরশাদকে মহাজোটের বাইরে ঠেলে দিলে যদি বিএনপির সাথে মিশে যায় তখন কী হবে? আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে চলে গেলে সরকারি দল হবে বিএনপি জামায়াত আর থেমে যাবে যুদ্ধাপরাধীর বিচার প্রক্রিয়া। থেমে যাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনীতির অগ্রসরমানতা। রেডিও টিভিতে আর শোনা যাবে না ৭ মার্চের ভাষণ।

বামপন্থী দলগুলোর মধ্যে যারা নির্বাচনকালীন সরকারে গিয়েছিল তারাও তখন হামলার শিকার হয়েছিল। আক্রান্ত হয়েছিলেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। হামলা ও হুমকিতেও তারা বহাল তবিয়তে রয়েছেন মন্ত্রীত্বের পদে। প্রধান শরীকের অবজ্ঞার জবাবে কেবলই বক্তৃতা বিবৃতি ছাড়া বামদের কি কোন পৃথক ভূমিকা নেয়ার সুযোগ আছে? আর আওয়ামী লীগেরও সুযোগ নেই বামদের বাদ দিয়ে আলাদা হয়ে যাওয়ার। যেমন বিগত নির্বাচনকালীন সরকার নানা প্রশ্নবিদ্ধ হলেও টিকে গেছে রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনু থাকার কারণে। তৎকালীন সময়ের মন্ত্রিসভায় সকল মন্ত্রীই যদি আওয়ামী লীগ দলীয় হতো তখন সেই নির্বাচনকালীন সরকার কি গ্রহণযোগ্যতা পেতো?

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হচ্ছে? সিপিবি, বাসদসহ কয়েকটি বাম দল মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষীয় শক্তি দাবীদার। তারা ১৪ দলীয় জোটের বাইরে অবস্থান করে সরকারের নানা নেতিবাচক বিষয়গুলো বলে যাচ্ছে। তাদের বলা অভিযোগ মিথ্যাও নয়। কিন্তু তাদের এই বিকল্প অবস্থান তাদের রাজনীতির সহায়ক না হয়ে কি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তিদের নিয়ে বাঁধা জোটের সহায়ক হতে যাচ্ছে না? একদিকে নৈতিকতা আরেকদিকে বাস্তবতা। কী করবে এসব বামপন্থী দলগুলো? পথ বদল, বাঁক বদল ও শত্রু মিত্র বদল ও উভয় সংকটই যেন নিয়তি হয়ে উঠছে বাংলাদেশের রাজনীতির। তবে কি এটাই চূড়ান্ত নিয়তি?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)