চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

লড়তে লড়তে চলে গেলেন প্রণব দা

টেবিলটির বয়স কত, আমি ঠিক জানতাম না। ১৯৮৫ সালের মার্চে কলেজ উত্তীর্ণ আমি যখন টেবিলটিতে বসি, সেটির অবস্থা ছিল খুবই জরাজীর্ণ। জায়গায় জায়গায় টেবিলের চল্টা উঠে গেছে। টেবিলে উপরের থাকা রেক্সিনের অবস্থাও সঙ্গীন। এটির রং যে ছিল সবুজ, সেটা বুঝতে বেশ বেগ পেতে হতো। অনুজ্জ্বল এই টেবিল থেকেই সংকলিত হতো একটি জনপ্রিয় দৈনিক সংবাদপত্রের যাবতীয় উপাদান। টেবিলটির দুর্দশা দেখে মন খারাপ হয়ে গেলেও এই টেবিলটি ঘিরে চারপাশে যারা বসতেন, তাদের সান্নিধ্যে প্রফুল্ল হতে বেশি সময় লাগতো না। যদিও টেবিলটির মতোই তারাও ছিলেন দীপ্তিহীন। কিন্তু কাজে ডুবে থাকার সময় সেটা একদমই বোঝা যেত না।

দেশি-বিদেশি সংবাদ লেখা আর টেলিফোনে জেলা শহরের সংবাদ সংগ্রহের ফাঁকে ফাঁকে প্রাণবন্ত আড্ডায় বার্তা কক্ষের পরিবেশটা জমজমাট হয়ে উঠতো। জমিয়ে রাখতেন প্রাণের উত্তাপে টগবগিয়ে ফুটতে থাকা কয়েকজন প্রাণবন্ত যুবক। যাদের কোনও পিছুটান ছিল না। তাদের একজন ছিলেন প্রণব সাহা। সেই যে তার সঙ্গে পরিচয়, তাতে কখনও বিচ্ছেদ ঘটেনি। তাকে দীর্ঘ ৩৩ বছর খুব কাছ থেকে নানাভাবে দেখার সুযোগ হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

উড়নচণ্ডী হিসেবে প্রণব সাহা তখন দারুণভাবে সুখ্যাত। বেপরোয়া জীবন যাপনের জন্য দারুণভাবে আলোচিত কথাসাহিত্যিক বিপ্লব দাশের সুযোগ্য শিষ্য তিনি। কত বিচিত্র ভাবেইনা যাপন করেছেন জীবন! কখন কোথায় রাত কাটাতেন, তার কোনও ঠিক-ঠিকানা ছিল না। যেখানেই রাত, সেখানেই কাত। প্রকৃত অর্থেই তিনি ছিলেন বাউণ্ডুলে জীবনের প্রতিকৃতি। অনেকটা যেন দেবদাসের মতো। তবে কোনো পার্বতীর জন্য তিনি এমনটি করতেন কিনা সেটা আমি জানতাম না। অবশ্য এ ধরনের চরিত্র তখনকার সংবাদপত্রের সঙ্গে বেশ খাপ খাইয়ে যেত।

বিরোধী দলের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত দৈনিক বাংলার বাণীর অর্থনৈতিক অবস্থা তখন মোটেও সুবিধের ছিল না। সরকারি বিজ্ঞাপন খুব একটা পাওয়া যেত না। এ কারণে বেতন নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা লেগেই থাকতো। লোকবলও পর্যাপ্ত ছিল না। যারা কাজ করতেন, তাদের উপর ছিল প্রচণ্ড চাপ।

তখন সংবাদপত্রের রাতের শিফটই ছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই শিফট সন্ধ্যায় শুরু হয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত চলতো। আর ছিল লেট-নাইট ডিউটি। সারা রাত কাটাতে হতো অফিসে। কিন্তু যাতায়াতের তেমন সুব্যবস্থা ছিল না। বাধ্য হয়ে অফিসের নিউজ টেবিলেই ছেঁড়া অভিধানকে উপাধান বানিয়ে মশাদের সুখাদ্য হয়ে ঘুমাতে হতো। লেট-নাইট ডিউটি একদিকে ছিল অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ, অন্যদিকে খুবই কঠিন ও কষ্টকর। এমনও হয়েছে, কাজ করতে হয়েছে একাধিক শিফটে। আর এই কাজটি যে কজন দিনের পর দিন নির্দ্বিধায় ও নিঃস্বার্থভাবে করতেন, তাদের অন্যতম হলেন প্রণব সাহা। নিজের জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, ব্যথা-বেদনাকে প্রশ্রয় না দিয়ে গড়ে তুলেছেন একটি সংবাদপত্রের অবয়ব। কী পেয়েছেন, কী পাননি, তা নিয়ে কখনও আক্ষেপ করেননি।

তখনকার অধিকাংশ সংবাদপত্রের পরিবেশ-পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক অবস্থা, কতটা শোচনীয় ছিল, এখন সেটা অনুধাবন করা যাবে না। কেন জানি না, এই ধারাটা গড়ে উঠে সংবাদপত্রের প্রথম যুগ থেকেই। সংবাদপত্র হয়তো নিয়মিত প্রকাশিত হতো, কিন্তু যাদের রক্ত পানি করা শ্রমের বিনিময়ে পত্রিকা, তাদের জীবনের খবর কেউ রাখতো না। মো. আব্দুল জব্বারের গাওয়া বিখ্যাত সেই গানটির মতো, ‘প্রতিদিন কত খবর আসে যে/ কাগজের পাতা ভরে/ জীবন পাতার অনেক খবর/ রয়ে যায় অগোচরে’। সংবাদপত্রে কর্মরত অবস্থায় আর্থিক দুরবস্থার কারণে অনেকেই অকালেই ঝরে গেছেন। আবার কেউ কেউ ক্ষত বুকে নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে জীবন যাপন করেন। এভাবে যুগে যুগে নিজের জীবনকে তিলে তিলে ক্ষয় করে যারা গড়ে তুলেছেন আজকের সংবাদপত্র, তাদের একজন হলেন প্রণব সাহা। সে কথা কি কেউ মনে রাখবে?

বিজ্ঞাপন

ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়ও প্রণব সাহা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের বার্তা বিভাগে খণ্ডকালীন অনুবাদক হিসেবে তিনি যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন, তারই পথ বেয়ে বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলে তা পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগিয়েছেন। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর সিদ্ধেশ্বরীতে নিউজ সম্প্রচার শুরু করে চ্যানেল আই। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার জমজমাট অবস্থার মধ্যে আলাদা অবস্থান করে নিয়েছে স্যাটেলাইট এই টেলিভিশন। এই চ্যানেলটি সেই শুরু থেকেই নতুন ও ব্যতিক্রমধর্মী কিছু করার অঙ্গীকার নিয়ে দর্শকদের সামনে উপস্থিত হয়। শুরু থেকে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যারা সম্পৃত্ত হন, তাদের একজন হলেন প্রণব সাহা।

এরপর তো তার দিন-রাতগুলো একাকার হয়ে যায়। তার ধ্যান-জ্ঞান-সাধনা হয়ে ওঠে চ্যানেল আই। তার দায়িত্বের পরিধি যত বেড়েছে, ততই বেড়েছে চ্যানেল আইয়ের প্রতি তার আনুগত্য, তার নিষ্ঠা, তার ভালোবাসা। একটা পর্যায়ে সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন তিনি। দিনের বেশিরভাগ সময় তার কেটেছে এই প্রতিষ্ঠানে। এমনকি যেটুকু সময় বাসায় থাকতেন, সেখান থেকেও চ্যানেল আই থেকে দূরে থাকতে পারতেন না। এ কারণে কেটেছে অনেক নির্ঘুম রাত। তবে অনেক কঠিন জীবন পেরিয়ে এসে তিনি থিতু হয়েছিলেন। পেয়েছিলেন সুখের ঠিকানা। একটু একটু করে উপভোগ করছিলেন জীবনকে।

কিন্তু বুকের মধ্যে যে ক্ষয় প্রণব সাহা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিলেন, সেটি তাকে স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি। প্রায়শই অসুস্থ হয়ে তাকে কাটাতে হয়েছে হাসপাতালে। এই শহরের বিখ্যাত সব চিকিৎসকরা হয়ে ওঠেন তার আপনজন। একটা পর্যায়ে কোন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে, সে ব্যাপারেও তিনি হয়ে ওঠেন নির্ভরযোগ্য পরামর্শক। কতজনকেই বাতলে দিয়েছেন চিকিৎসার সঠিক পথ। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেও তিনি কখনো কাবু হয়ে পড়েননি। ভেঙে পড়েননি। হাল ছেড়ে দেননি। মৃত্যুকে তিনি খুব একটা পরোয়া করতেন না।

তার মস্ত একটা গুণ ছিল, জীবনকে খুব সহজভাবে নিতে পারতেন। এবং নিয়েছিলেনও। তার জীবনীশক্তি ছিল অপরিসীম। একাধিকবার চিকিৎসকরা যখন হাল ছেড়ে দিয়েছেন, তিনি ঠিকই ফিরে এসেছেন। কর্মক্ষেত্রের টান কখনই এড়াতে পারেননি। একটু সুস্থ হলেই নিয়মিত অফিস করেছেন। মিশে যেতেন স্বাভাবিক জীবন যাপনে। শামসুর রাহমানের কবিতার মতো, ‘কাজ করছি, খাচ্ছি দাচ্ছি, ঘুমোচ্ছি, কাজ করছি/খাচ্ছি দাচ্ছি চকচকে ব্লেডে দাড়ি কামাচ্ছি, দু’বেলা/পার্কে যাচ্ছি, মাইক্রোফোনি কথা শুনছি/ঝাঁকের কই ঝাঁকে মিশে যাচ্ছি’।
যতক্ষণ সুুস্থ থাকতেন, জীবনকে সম্ভোগ করতেন।

একইসঙ্গে তিনি নিয়েছেন একাধিক জীবনের চ্যালেঞ্জ। কখনো জীবনকে অবহেলা করেছেন। কখনো জীবনকে ভালোবেসেছেন। আবার কখনো জীবনকে তওয়াক্কা করেননি। চলে যেতে যেতে তিনি ফিরে এসে চমকে দিয়েছেন। এ কারণে কেন যেন মনে হতো, তিনি এত সহজে চলে যাবেন না। কিন্তু এবার তিনি চলে গিয়ে সব ধারণা ভুল প্রমাণ করে দেন। অবশ্য গেলেন লড়াই করে। সত্যি সত্যি তাঁর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে গেলো।

প্রণব দা’র সঙ্গে আমার কত কত স্মৃতি। চোখে জল নিয়ে সেই স্মৃতিগুলো কেমন যেন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে, ঠিক বুঝতে পারছি না।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View