চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

লকডাউন ব্যর্থ হলো, রেড জোন কি সফল হবে?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির পর সাউথ কোরিয়া কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিনের পরীক্ষা চালাতে যাচ্ছে। চলতি মাসেই মহামারি করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের প্রথম ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। আরেকটি খবর হলো। সব নাগরিককে ভ্যাকসিন দিতে সিরিঞ্জ কিনছে কানাডা৷ দেশের সব নাগরিককে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটি। ভ্যাকসিনের জন্য প্রয়োজন হয় এমন ৩ কোটি ৭০ লাখ লিয়ন সিরিঞ্জ সরবরাহের জন্য একটি আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে ক্রয়াদেশ দিয়েছে জাস্টিন ট্রুডোর দেশ কানাডা৷ তারা বিপুলসংখ্যক সিরিঞ্জ কিনে রাখছে এজন্য যে যখনই ভ্যাকসিন হবে তখনই যাতে কানাডার নাগরিকরা ভ্যাকসিন পেতে পারে৷

বেসরকারি হিসাবে কানাডার বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ। ২০১৬ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা ৩ কোটি ৪০ লাখ। সিরিঞ্জের ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়েছে ৩ কোটি ৭০ লাখ। সিরিঞ্জের পাশাপাশি ভ্যাকসিন দেয়ার জন্য আনুষঙ্গিক যা যা লাগে সবই তারা আগাম কিনে রেখে দিচ্ছেন৷ চীনের তৈরি একটি ভ্যাকসিন মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করছে কানাডা। প্রথম দফায় চীন নিজেরা মানবদেহে প্রয়োগ করে সাফল্য পেয়েছে। এখন কানাডা সেটির ট্রায়াল করছে। ভ্যাকসিন উৎপাদনের জন্য একটি কোম্পানিকে দায়িত্বও দিয়েছে জাস্টিন ট্রুডোর সরকার।

বিজ্ঞাপন

ভ্যাকসিন উৎপাদন ও প্রয়োগ সহ তৎসম্পৃক্ত সবধরনের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে কানাডা। তবে কি ভ্যাকসিন সম্পর্কিত আগাম কোন খবর পেয়ে গেল দেশটি? সংগত কারণেই এ প্রশ্ন জাগে৷ কিন্তু করোনা নিয়ে আমাদের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা কি? পৃথিবীর বেশকিছু দেশ লকডাউন দিয়ে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার কমাতে সক্ষম হয়েছে৷ কিন্তু বাংলাদেশে লকডাউন পরবর্তী সময়ে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বাড়লো৷ তবে কেন এই অপরিকল্পিত লকডাউন দেয়া হলো আবার তা খুলেও দেয়া হল? এখন লকডাউন নয় বলা হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে৷ সরকার ৫ টি নির্দেশনা জারি করেছে৷ নির্দেশনাগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ অফিস আদালত, দোকানপাট, ব‌্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্র স্বাস্থ‌্যবিধি মেনে চলা ও সংক্রমণ রোধের কার্যপদ্ধতি অনুসরণ ও গণপরিবহনে চলাচলের সময় স্বাস্থ‌্যবিধি মেনে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা।

বিজ্ঞাপন

নির্দেশনার মধ্যে আরও আছে, জনসম্মুখে সব সময় মাস্ক পরিধান ও স্বাস্থ‌্যবিভাগের নির্দেশনা মেনে চলা ও দলীয় নেতাকর্মীরা নিজেরা স্বাস্থ‌্যবিধি মেনে চলবেন এবং তা প্রতিপালনে জনগণকে সচেতন করবেন। আরও বলা হয়েছে, জনপ্রতিনিধিদের করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। জনপ্রতিনিধিরা অঞ্চলভিত্তিক তদারকির মাধ‌্যমে সংক্রমণ রোধের পাশাপাশি স্বাস্থ‌্যসেবা নিশ্চিতকরণেও ভূমিকা রাখবেন। আপৎকালীন সময়ে স্বাস্থ‌্যবিধি মেনে অসহায়-দুস্থ মানুষের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন।কিন্তু বাস্তবতা কী? লকডাউন খোলার পরে স্বাস্থ্যবিধি কারা মানলো? বাজার হাট ও গণপরিবহনে চলছে বেপরোয়া গণচলাচল৷ শতকরা কতজন মানুষ মাস্ক, গ্লাভস পরছে? আর কয়জন জনপ্রতিনিধি করোনা সংক্রমনে জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলায় ভূমিকা রাখছে?এই করোনাকালে আরও উঠছে ত্রাণ চুরির অভিযোগও৷

বিজ্ঞাপন

বিদেশী গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে অনেক ভীতিকর খবর বেরোচ্ছে৷ তারা বলছে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানির কারণ ঘটবে বাংলাদেশে৷ কিন্তু এসব প্রতিরোধে কি আমাদের কোন পরিকল্পনা ও পূর্ব প্রস্তুতি আছে?
ডক্টরস প্লাটফর্ম ফর পিপল’স হেলথ আয়োজিত অনলাইন বৈঠকে চিকিৎসক নেতৃবৃন্দ বলেছেন, সঠিকভাবে লকডাউন কার্যকর না হওয়ায় সারা দেশে করোনাভাইরাসের সামাজিক সংক্রমণ ঘটে গেছে। তাই জুন মাস আমাদের জন্য কঠিন সময়। এই সময়ে করোনায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটতে পারে। এ বিষয়ে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ অপ্রতুল ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে পারস্পরিক সাংঘর্ষিক বলেও তারা অবহিত করেছেন৷ লকডাউন ও সরকারি ছুটির পর আরও বেড়ে গেলো করোনা সংক্রমণ৷ সুতরাং এসব কি অহেতুক কিংবা অপরিকল্পিতভাবে দেয়া হলো না?

লকডাউনের পর এবার দেয়া হচ্ছে জোনভিত্তিক নির্দেশনা৷ রেড জোন, ইয়েলো জোন ও গ্রিন জোন এই তিনজোনে বিভক্ত হবে বিভিন্ন এলাকা৷ রেড জোনে কার্যকর হবে এলাকাভিত্তিক লকডাউন, ইয়েলো জোনে বাড়িভিত্তিক লকডাউন ও গ্রিন জোনে থাকবে বিশেষ সতর্কতা৷ কিন্তু এতে কতটা প্রতিরোধ হবে করোনা সংক্রমণ৷ শহর হতে গ্রামে যেভাবে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুহার বেড়ে চলছে এর শেষ কোথায়? সে তুলনায় আমাদের স্বাস্থ্যসেবা কতটা কার্যকর? ভিয়েতনাম, চীন, লাওস লকডাউন দিয়ে সংক্রমণ কমাতে পারলো আমরা কেন পারলামনা?করোনা ভেকসিন কবে বেরোবে? এই ভেকসিন ছাড়া কি করোনা ঝুঁকি হতে বাঁচার কোন রাস্তা আছে?পৃথিবীর সব দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীরা কি ভ্যাকসিন ইস্যুতে সমন্বিত তৎপর হয়েছে?বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভ্যাকসিন ইস্যুতে কি বক্তব্য?আর বাংলাদেশ করোনা টেস্ট যোগ্যতাও কতোটা অর্জন করতে পারলো?

কানাডা হয়তো ভ্যাকসিন বেরোনো মাত্রই তা নেয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে৷ বাংলাদেশ কি জরুরী ভিত্তিতে ভ্যাকসিন নিতে সক্ষম হবে? সংবাদ পত্রে খবর বেরিয়েছে, ‘শুধু ঢাকাতেই করোনা আক্রান্ত সাড়ে ৭ লাখের বেশি’ ব্রিটেনের প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টকে এমন তথ্যই জানালেন আইসিডিডিআর,বি’র কর্মকর্তা জন ক্লেমেনস। আর বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশে করোনা বিস্ফোরণেরও আশংকা করছেন৷ প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসকে রুখে দিতে সক্ষম হয়েছে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ দেশ ফিজিও। দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ফিজি পুরোপুরি করোনামুক্ত।

গত মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ৯৩ হাজার জনসংখ্যার দেশ ফিজিতে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। কড়াকড়ি আরোপ এবং সীমান্ত বন্ধ করে আড়াই মাসের মধ্যেই প্রাণঘাতী ভাইরাসটি রুখতে সক্ষম হয়েছে দেশটির সরকার। ফিজিতে এ পর্যন্ত ১৮ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন৷ কিন্তু বাংলাদেশ কেন তা পারলোনা? সাধারণ ছুটি ও লকডাউনের ফল কি ইতিবাচকের স্থলে আরও নেতিবাচক হলোনা? লকডাউনে দেখা দিলো ডাক্তার সংকট৷ বেসরকারী হাসপাতালগুলোতে তালা ঝুললো৷ নকল মাস্ক সরবরাহে ডাক্তারদের সুরক্ষা হল বিপন্ন৷ আরও কি দেখা গেল? মন্ত্রী ও সচিবরা সরকারী হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে ভর্তি হচ্ছে বেসরকারী হাসপাতালে৷ এতে কি সরকারি হাসপাতালের প্রতি তাদের নিজেদেরই আস্থাহীনতা প্রকাশ পেলোনা?পরিকল্পিত ও সমন্বিত ব্যবস্থাগ্রহন ব্যতিরেকে যে কোন সুফল হয়না লকডাউন,লকডাউন খুলে দেয়া ও সাধারন ছুটি তার উদাহরন৷ ভুল হতে শিক্ষা নিয়ে সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত জোনভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত৷ লকডাউন ও সাধারণ ছুটিতে করোনা মৃত্যুহার বাড়লো৷ মানুষের প্রত্যাশা জোনভিত্তিক পরিকল্পনার পরেও যেনো এর পুনরাবৃত্তি না ঘটে৷

এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)