চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

লকডাউনে পরিবার ও দেশ বদলের সঙ্গী হওয়ার দারুণ সুযোগ

বর্তমান বিশ্বে এক মূর্তমান আতঙ্ক করোনা মহামারি। সারাবিশ্বে লাশের মিছিল সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।  বাংলাদেশেও করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন যেভাবে বেড়ে চলছে সে পরিস্থিতির কবলে পড়াতো আমাদের সময়ের ব্যাপার মাত্র, যদি এখনো সাবধান না হই। এ থেকে বাচাঁর একমাত্র উপায় হলো ঘরে থাকা আর নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা! সরকারের নানা দপ্তর আমাদের নিরাপদে রাখার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। কিন্তু আমরাই ভ্রুক্ষেপ করছিনা তাদের কথা, তাই দিন দিন ৯, ১৮, ৩৫ হতে কয়েকদিনের ব্যবধানে লাফিয়ে এখন দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা ৪০০ এবং ৫০০ এর অধিক হয়ে দাঁড়িছে। আশার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশে যেভাবে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে সেভাবে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়েনি। কিন্তু আক্রান্তের এ উচ্চগতি ভয়াল থাবা নিয়ে এগিয়ে আসছে না তো?

আসল কথায় আসা যাক, নগরায়ণের আর বিশ্বায়নের এ যুগে যান্ত্রিক মানব ও দানবে পরিণত হয়ে উঠছি দিনকে দিন। বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছি বস্তুবাদী এ সমাজের পেছনে ছুটতে ছুটতে। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে আর যান্ত্রিকতার আদলে জীবনযাপন করতে করতে আমরা অনেকটা নিঃসঙ্গ ও নির্মম হয়ে উঠেছি। মায়া-মমতা আর ভালোবাসার পরম তৃপ্তির জায়গাটি হারিয়ে ফেলতে বসেছি। ভবিষ্যতের দিনগুলো আরো খারাপের দিকে যাবে, যদি না এখনি শুধরাতে না পারি নিজেদের। পাশ্চাত্যের প্রখ্যাত দার্শনিক অধ্যাপক পি সরোকিন বর্তমান পারিবারিক ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরেছেন এভাবে, ‘‘পূর্বে মানুষ আনন্দ লাভ ও চিত্ত বিনোদনের উদ্দেশ্যে ফিরে যেত পরিবারের নিভৃত আশ্রয়ে। পূর্বে পরিবার ছিল আমাদের আগ্রহ ঔৎসুক্য ও আনন্দ উৎফুল্লতার কেন্দ্রস্থল। পারিবারিক জীবনেই আমরা সন্ধান করতাম শান্তি, স্বস্তি, তৃপ্তি ও আমাদের নির্মলতা। কিন্তু এখন পরিবারের লোকজন হয়ে গেছে বিচ্ছিন্ন। বিক্ষিপ্ত কিছু লোক একসাথে বসবাস করলেও তার মূল উদ্দেশ্য বিনষ্ট হয়ে গেছে। হারিয়ে ফেলেছে সকল প্রীতি ও মাধুর্য, অকৃত্রিমতা, আন্তরিকতা ও পবিত্রতা।” আমরা এখন বৃদ্ধাশ্রমের কথা শুনি যা জন্মদাতা মাতা-পিতা কে রাখার শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবই পরিচিত। সে দিন বেশি দূরে নেই যখন আপনি-আমি সেই নির্মম আশ্রয়স্থলে যেতে বাধ্য থাকবো কারণ, আমরাই তো নির্মমতায় আমাদের সন্তানদের বড় করে তুলছি। আমাদের বাচ্চারা দাদা-দাদীর কোলে-কাঁখে থেকে মানুষ হওয়ার পরিবর্তে শুধু বেড়ে উঠছে ডে-কেয়ার সেন্টারে অথবা ভাড়াটিয়া কাজের বুয়ার কাছে। যেখানে কোমলমতি সন্তানেরা বেড়ে ওঠছে ঠিকই কিন্তু মানসিকভাবে নয়। তাদের অধিকাংশই এখন মাদক সন্ত্রাস , কিলার , গডফাদার যাই বলিনা কেন , এর দায় তার পরিবারের। সন্তানের উপযুক্ত সময়ে তাকে নৈতিক ও মানবিক শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এ অবস্থা। আমাদের মনে আছে নিশ্চয়ই রবীন্দ্রনাথের ছুটি গল্পের কথা ! যেখানে বলা আছে- তেরো-চৌদ্দ বছরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই। শোভাও নাই, কোন কাজেও লাগে না। স্নেহের উদ্রেক করে না, তাহার সঙ্গ সুখও বিশেষ প্রার্থনীয় নহে। তাহার মুখে আধো-আধো কাথাও ন্যাকামি, পাকা কথাও জ্যাঠামি এবং কথামাত্রই প্রগলভতা। গল্পটির আরেক জায়গায় বয়ঃসন্ধিকালের কিশোর সম্বন্ধে বলা হয়েছে তাহার চেহারা এবং ভাবখানা অনেকটা প্রভুহীন পথের কুকুরের মতো হইয়া যায়। সন্তানের শৈশব আর বয়ঃসন্ধিকালে পিতা-মাতার ভূমিকা অপরিহার্য। সমাজ জীবনের মূল্যবোধের যত অবক্ষয় ঘটেছে তার অধিকাংশেরই কারণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে দুর্বল পারিবারিক ব্যবস্থা।প্রবাদে আছে, “তৃণলতা সহজেই তৃণলতা, পশুপাখি সহজেই পশুপাখি, মানুষ প্রাণপণ চেষ্টায় তবে মানুষ”।

বিজ্ঞাপন

মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার একমাত্র মাধ্যম হলো পারিবারিক নার্সিং যা যৌথ পরিবার প্রথার মধ্যে বিদ্যমান বহুলাংশে। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় যার উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। হাতেগোনা যে কয়েকটি যৌথপরিবার এখনো টিকে আছে সেখানেই বেড়ে ওঠবে মানবিক শক্তিতে বলীয়ান আমাদের আগামীর প্রজন্মের নির্ভেজাল কিছু ভালো মানুষ।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বায়নের এ যুগে একক পরিবার ব্যবস্থায় চলছে যান্ত্রিক জীবন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে শহুরে একক পরিবার ব্যবস্থায় ও থাকে নানা রকমের কষ্টের প্রতিচ্ছবি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য বাংলাদেশ কাস্টমস আমদানি-রপ্তানির যেন বিঘ্ন না ঘটে তাই দৈনিক ২৪ ঘন্টাই কাজ করতে হয় এর মাঝে আমরা ১২ ঘন্টা করে ডিউটি করি, কাজের মাঝে আলাপ কালে আমার এক বিবাহিত সহকর্মী আবেগ ভরা কন্ঠে বলেন- খুব ভোরে চলে আসি যখন আমার বাচ্চা ঘুমায়, আবার অফিস শেষ করে রাতে এমন সময় বাসায় যাই যখন আদরের সন্তানকে গভীর ঘুমেই পাই।  এরকম কষ্টের ছাপ হয়তো সরকারী-বেসরকারী, গার্মেন্টস সেক্টরসহ অনেক দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চোখে-মুখেও দেখা যায়। তাছাড়া, জন্মদাতা-বাবা-মায়ের জন্য মন কাঁদে কিন্তু ব্যস্ততায় সময় দিতে পারে না অনেকে। স্ত্রীর সাথে যে প্রাণ খোলে জমিয়ে আড্ডা দিবে তার ফুরসত ও হয়তো পান না।

এই লকডাউন এর বিশাল সময়টা কি হয়ে উঠতে পারে না এত দিনের জমানো শত কষ্ট ও আবেগের সুন্দর সমাধান?? আসুন না এই সময়টাতে সব ধরনের পূণ্য কাজে সময়টা ব্যয় করি।

-যে বা যারা বাবা-মায়ের কাছে আছেন, তারা তার পিতা-মাতাকে এমনভাবে আদর-স্নেহ করেন যেমনটা ছোট বেলায় আপনার সাথেও করেছিলেন তারা, তাহলে হয়তো এতদিনের জমানো কষ্টগুলো ভুলে আপনার প্রতি অনেক খুুশি হবেন।
-যে সন্তানের কাছে কর্মব্যস্ততায় চোরের মতো ছিলেন, দেখা না দিয়ে, আদর না দিয়ে শুধু অফিস -অফিস আর অফিস নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, দেন না এই বিশাল সময়টা তাদের তরে উৎসর্গ করে। তাদেরকে অনেক নৈতিক শিক্ষা দিতে পারেন যা তাদের সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
-যে স্ত্রীর কাজের কোন মূল্যায়ন করতেন না, মাঝে মাঝে স্ত্রীর সেই সস্তা কাজে সাহায্য করে দেখেন না আসলে তারা কত কষ্ট করে আপনাকে আর পরিবারকে এগিয়ে নিতে।
-যে স্ত্রী তার শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে খারাপ ব্যবহার করতেন তারা হয়তো স্বামীর সামনে তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করবেন যেন স্বামী বুঝতে পারে আপনি আসলেই ভালো, আসুন না লোক দেখানো সাময়িক ভালোটা চিরস্থায়ী ভালোতে পরিণত করে পৃথিবীটা সুন্দর করার পাশাপাশি পরকালের পুঁজিটাও অর্জন করি।
-যারা পরকীয়ার মতো মারাত্মক খারাপ কাজে আসক্ত ছিলেন এখন তো স্বামী-স্ত্রী একসাথে আছেন তাই এই সময়টা হয়ে উঠতে পারে নিজেকে শুধরানোর অনেক বড় হাতিয়ার।
– যারা নেশাগ্রস্থ থাকেন তারাও তো এই সময়ে নিজেকে নেশার করাল থাবা থেকে বাঁচিয়ে তুলতে পারেন।
– যে সামাজিক অপরাধের সাথে জড়িত সে হয়তো তার অপরাধ চক্রের সেই সঙ্গকে আর কাছে পাচ্ছেন না , তাই সেখান থেকে বেড়িয়ে আসেন, এখনি সময় ।

পরিশেষে, কবি গুরুর ভাষায় –
“মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।”
লকডাউনের এই সময়ে সকল জরা-জীর্ণতাকে মুছে ফেলে নিজেকে বদলে পরিবার, সমাজ ও দেশকে বদলে ফেলতে পারি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)