চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রোহিঙ্গা, ঠেঙ্গার চর ও চীন বিতর্ক

রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটা নতুন তর্ক উস্কে দিয়েছেন সংসদ সদস্য মঈনুদ্দিন খান বাদল। রোববার সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় তিনি রোহিঙ্গাদের ঠেঙ্গার চরে স্থানান্তর না করার দাবি জানিয়েছেন। তার মতে, রোহিঙ্গাদের এই চরে পাঠানো হলে এটা স্থায়ী পুনর্বাসন হবে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের স্থায়ী পুনর্বাসনের সুযোগ নেই। কারণ তখন মিয়ানমার বলবে, বাংলাদেশ তার নিজেদের লোক নিয়ে গেছে; যা তারা এরইমধ্যে বলছে।

মি. বাদলের এই কথা খুবই যুক্তিযুক্ত এবং তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা রোহিঙ্গারা এখন কক্সবাজারে আছে অস্থায়ী ক্যাম্পে এবং বিশ্ববাসীও জানে এটা আপৎকালীন। কিন্তু এ বিষয়ে এখন আর রাখঢাকের বিষয় নেই যে, যারা রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার নিয়ে সোচ্চার, সেসব দেশও চায় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশেই থাকুক এবং এজন্য তারা জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে প্রচুর পয়সাপাতিও দিচ্ছে।

কিন্তু রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার রক্ষা এবং তাদের প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে বাংলাদেশ নিজেই এখন বহুমাত্রিক সংকটে নিপতিত। দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক চাপে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। কক্সবাজারের টেকনাফের স্থানীয় মানুষেরাই এখন সংখ্যালঘু; সেখানের পরিবেশ-প্রতিবেশ ধ্বংস। সুতরাং ১০/১১ লাখ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ার কোনো বিকল্প নেই।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, রোহিঙ্গারা যেতে না চাইলে তাদের জোর করে পাঠানোটা অমানবিক এবং এটি বাংলাদেশ তাদের জোর করে পাঠালে তাদের আশ্রয় দিয়ে বিশ্বব্যাপী যে প্রশংসিত হয়েছে, ঠিক তার উল্টো প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হবে। কারণ মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জীবনের নিরাপত্তা নেই। সেখানে গেলেই তাদের বন্দুকের মুখে পড়তে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের শরণার্থী ক্যাম্পে আর যাই হোক তাদের জীবন-মরণের কোনো সমস্যা নেই। খাওয়া-দাওয়ারও অসুবিধা নেই।

ফলে তারা যেতে চাইবে না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশ এই বোঝা কতদিন বইবে? এর মধ্যে সম্প্রতি ভারত থেকেও বেশ কিছু রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। শুধু রাখাইন রাজ্যের মুসলিম জনগোষ্ঠীই নয়, বরং মিয়ানমারের অন্য সংল্যালঘুরাও সেখানে এখন বিপদাপন্ন। অনেকেই বাংলাদেশে প্রবেশ করতে চাইছে। তাদের জন্য সীমান্ত খুলে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, কোনও অবস্থাতেই মিয়ানমারের অধিবাসীদের জন্য বাংলাদেশের সীমান্ত খুলবে না। ৬ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের বিশেষ দূত অ্যাঞ্জোলিনা জোলির সাথে সাক্ষাৎ শেষে তিনি সাংবাদিকদের জানান, মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্ডার সিল করে দেয়া হয়েছে। এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের কোনো কন্ডিশন দিয়ে পাঠায় না। কিন্তু নেয়ার সময় নানা ধরনের শর্ত আরোপ করে।

এরকম বাস্তবতায় জাতীয় সংসদে নতুন করে ঠেঙ্গার চরের প্রসঙ্গটি তোলেন মঈনুদ্দিন খান বাদল। এ সময় তার সঙ্গে আরেক সংসদ সদস্য রুস্তুম আলী ফরাজী রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে সংসদ সদস্যেদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন। স্মরণ করা যেতে পারে, ভারতে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ নিয়ে বিতর্ক উঠলে পরিস্থিতি সচক্ষে দেখা এবং এ বিষয়ে সংসদে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য নবম সংসদেও একটি বিশেষ কমিটি করা হয়েছিল।

Advertisement

তবে যেখানে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিশ্ব এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাবশালী দেশও রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে নমনীয় করতে ব্যর্থ হচ্ছে, সেখানে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি কী করবে বা করতে পারবে, তা নিয়ে সংশয়ের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।

ফাইল ছবি

এই সংশয়ের মূল বা একমাত্র কারণ মিয়ানমারের আচরণ বা তাদের স্বভাব। রোহিঙ্গা ইস্যুতে সারা বিশ্ব যেখানে তাদের বিরুদ্ধে, সেখানে তারা এতটাই নির্লিপ্ত ও নির্ভার যে, আপাতদৃষ্টিতে এটি মনেই হয় না যে, তাদের দেশ থেকে জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে একটি পুরো জনগোষ্ঠী প্রতিবেশী রাষ্ট্রে পালিয়ে এসেছে এবং এই বিষয়ে তাদের কোনো গ্লানি আছে। বরং তারা বরাবরই তাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণই বিশ্ববাসী দেখছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, মিয়ানমারে বাণিজ্যিক স্বার্থ থাকায় যে চীন মূলত তার পাশে আছে এবং পরোক্ষভাবে রাশিয়াও—যাদের কারণে জাতিসংঘ নিরাপদ পরিষদ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে শক্ত কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না, সেই চীন ও রাশিয়াকে, মূলত চীনকে বাদ দিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের নমনীয় করা আদৌ সম্ভব হবে কি না?

রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে শুরু থেকেই বহুপাক্ষিক বিশেষ করে জাতিসংঘের মধ্যস্থতার দাবি উঠেছে। কিন্তু জাতিসংঘের মধ্যস্থতা দূরে থাক, খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইলেও যে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে না তা এরইমধ্যে প্রমাণিত। কারণ এই অঞ্চলে ভারত ও চীনকে ‘বাইপাস’ করে বা ভারত ও চীন না চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের একার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। এমনকি এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র একা যুদ্ধ করতেও সাহস করবে না। ফলে ত্রিপক্ষীয় বা বহুপাক্ষিক সমাধানের প্রক্রিয়া যেহেতু ব্যর্থ হয়েছে, ফলে এখন মনেই হচ্ছে যে, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান একমাত্র চীনের হাতেই।

বাংলাদেশেও চীনের প্রচুর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলমান। বড় বড় সব প্রকল্পেই তার বিনিয়োগ আছে। চীনকে এখন এটি বোঝানো দরকার যে, যদি তারা রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে এগিয়ে না আসে, অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারকে চাপ না দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের কারণে বাংলাদেশ যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে পড়বে—তাতে চীনের বিবিধ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও মুখথুবড়ে পড়তে পারে।

ফলে চীনকে এটি বোঝানো দরকার যে, তার স্বার্থেই বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা সংকটের ভিকটিম হওয়ার থাক থেকে বাঁচাতে হবে। মিয়ানমারে চীনের বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প থাকায় সেখানে তার যেমন স্বার্থ আছে, বাংলাদেশেও চীনের বাণিজ্যিক এবং কূটনৈতিক স্বার্থ আছে। এই অঞ্চলে ভারতের সাথে তাকে কৌশলগত খেলায় টিকে থাকতে গেলে ভারতের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র বাংলাদেশকেও তার বাইপাস করা বা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)