চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রেল সার্ভিস কবে একটু সভ্য হবে?

আমাদের রেল সার্ভিস জনসাধারণের জন্য আরামদায়ক হতে আর কত বছর লাগবে? জন্মের পর থেকে দেখছি, রেলে ভ্রমণ করা মানে একটা যুদ্ধ করা। সবাই তো ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম কিংবা সিলেটে সরাসরি কমলাপুর থেকে এসি বগিতে চড়বে না। সবাই চাইলেও পারে না। সিট কম এবং অনেকের সামর্থ্যও নেই। এসি বগিতে টিকেট কেটেও ভিড়ের চোটে ট্রেনে উঠতে অনেকের জান বের হয়ে যায়। স্বাধীনতার এতগুলো বছর পর রেলের এই দুর্দশা কেন থাকবে?

অথচ মানুষের প্রথম পছন্দ রেল। কদিন আগে জরুরী কাজে বাড়ি গেলাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়া যেতে কমলাপুর থেকে বাসে সময় লাগার কথা ৩ ঘণ্টা। আর ট্রেনে দুই ঘণ্টা। নারায়ণগঞ্জের গাউছিয়াতে একটি ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ চলমান বলে অনেকদিন হল মানুষ পারতপক্ষে এই রাস্তা দিয়ে যেতে চায় না। ট্রেনে যেতে চায় মানুষ। এরপরেও আমি ভাবলাম, একটু আলসেমি করে সকাল ৯ টার দিকে বাসেই যাব।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

সোহাগের কাউন্টারে গিয়ে শুনলাম, রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম। কুমিল্লা, চট্টগ্রামের বহু গাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে ঢাকার দিকে আসায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কেও মহা যানজট দেখা দিয়েছে। ঢাকা থেকে বের হওয়াও যাচ্ছে না। সকাল ৭ টার বাস কমলাপুর থেকে বের হয়ে যাত্রাবাড়ীতে আটকে আছে। কাঁচপুর অতিক্রম করা যাচ্ছে না।

ভাবলাম, সড়ক পথে গেলে ১০ ঘণ্টায়ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছাতে পারব কিনা, নিশ্চয়তা নেই। খোঁজ নিয়ে জানলাম, ১২ টার দিকে জয়ন্তিকা আছে। সিলেটের ট্রেন জয়ন্তিকা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত কোনও সিট খালি নেই। কাউন্টারে লাইনে দাঁড়িয়ে সিলেট পর্যন্ত একটা সিট পাওয়া গেল। ভাড়া ৪২৫ টাকা, প্রথম শ্রেণিতে। ভাবলাম প্রথম শ্রেণি মনে হয় এসি হবে। কিন্তু নন এসি বগি, চেয়ার কোচ। জয়ন্তিকাতে চলে গেলাম। মাত্র ২ ঘণ্টা লাগল কমলাপুর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসতে।

সময় কম লাগলেও এই ট্রেনের সাথে উন্নত বিশ্বের সাধারণ ট্রেনের একটু তুলনা করলাম। দ্রতগতির ট্রেনের কথা আর এখানে বললাম না। আমাদের ট্রেন ঘণ্টায় কত কিলোমিটার বেগে চলে? ৫০/৬০? ১০০ কিলোমিটার বেগে চললে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যেতে সময় লাগবে ১ ঘণ্টা। একটু দ্রুতগতির ট্রেন নিজের দেশে জীবনে আর দেখে যেতে পারব বলে মনে হয় না। এতদিনে যখন হয়নি, সামনের দিনে হবে এমন আশা করি না। যদিও সরকারি অনেক প্রকল্পের কথা শোনা যায়। জয়ন্তিকার প্রথম শ্রেণির বগিতেও সিট খুব ময়লা। আর প্রচণ্ড গরম লাগল। ঢাকা থেকে যারা সিলেট যাবে এই বগিতে, তাদের কথা ভেবে কষ্ট লাগল। সিটের নিচ থেকে দুই একটি পোকাও বের হয়ে আসল।

আমাদের গণপরিবহন ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের জন্য এখনো সেই আগের মতই কষ্টদায়ক। তাই সামান্য তাড়াতাড়ি কোথাও পৌঁছাতে পারলে আমরা বলি, ‘আলহামদুলিল্লাহ’। জয়ন্তিকায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছে স্টেশন দেখে মন ভালো হওয়ার বদলে খারাপ হয়ে গেল। এত ধুলাবালি, ময়লা, ভিক্ষুক, রঙচটা স্টেশন এই যুগে খুব হতাশাজনক। বোঝার বয়স থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশনের এই মলিন চেহারা দেখে আসছি। অথচ দেশের অর্থনীতি এখন অনেক বড়, অনেক বড় বাজেট হয় এখন। রেলসহ অন্যান্য সকল ক্ষেত্রের কর্মকর্তাদের বেতন বেড়েছে, সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে। জজ, ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদদের জন্য যখন ইচ্ছা তখন ভালো টিকেট পাওয়া যায় ঠিকই। কিন্তু সাধারণ মানুষের অবস্থা খুব খারাপ। স্টেশনের ওয়েটিং রুম এবং বাথরুমগুলোর অবস্থা কত খারাপ, সেটি ভাষায় প্রকাশ করার মত না। পাবলিক টয়লেট বলে যা আছে সেটি এত নোংরা যে রাস্তার পাগলও নাক সিটকাবে।

বিজ্ঞাপন

এমপি, ডিসি, এসপি, কিংবা জজ অর্থাৎ খুব প্রভাবশালীরা সমাজে সংখ্যায় খুব কম। সাধারণ, ক্ষমতাহীন মানুষের সংখ্যাই বেশি। কিন্তু দেশের বেশিরভাগ মানুষই রেলের মানসম্মত সার্ভিস পাচ্ছে না।

বাড়িতে জরুরী কিছু কাজ সেরে দু’দিন পর প্রথম তারাবির রাতে ঢাকায় আসব বলে পরিকল্পনা করলাম। জীবনে প্রথম ট্রেনে উঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকা আসার পথে কোনদিন লাইনে দাঁড়িয়ে কাউন্টার থেকে সিটসহ টিকেট পাইনি। কালোবাজার থেকে কিনতে হয়েছে সবসময়। কালোবাজারে টিকেট বিক্রি করা লোকগুলো আমাদের খুব পরিচিত। পুলিশও এদেরকে চেনে খুব ভালোভাবে। টিকেট শুরু থেকেই কালোবাজারে চলে যায়। বেশি টাকা দিয়ে কিনতে হয়। যথারীতি কালোবাজার থেকে মহানগর গোধূলির টিকেট কেনা হল। ভাবলাম, আজ মনে হয় রেলে উঠতে সুবিধা হবে। আমার ভাবনায় ভুল ছিল। আমাদের ‘ঠ’ বগি। কবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশন থেকে যুদ্ধ না করে রেলে উঠেছি, সেটিও এখন আর মনে পড়ে না।

আপনি যদি একা হন, তাহলে মানুষের সাথে ধাক্কাধাক্কি করে, অন্যদেরকে গায়ের জোরে পেছনে ফেলে কোনোমতে উঠে যেতে পারবেন। কিন্তু সাথে যদি থাকে, বউ, বাচ্চা বা অসুস্থ কেউ তাহলে কপালে কী আছে, আপনি জানেন না। মানুষের চাপে আপনি আপনার ব্যাগ বা খুব মূল্যবান কিছু হারিয়ে ফেলতে পারেন। আর যদি ভুল করে অন্য কোনও বগিতে উঠে পড়েন, তাহলে নিজ বগিতে ফিরতে পারবেন বলে মনে হয় না।

এক বাবাকে দেখলাম কিশোরী মেয়েকে নিয়ে এক বগি থেকে আরেক বগিতে যাওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। মানুষ আবার তাদেরকেই বকাবকি করছে। পা ফেলার কোনও জায়গা নেই ট্রেনের ভেতরে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেশাব, পায়খানা আটকে আপনাকে বসে বা দাঁড়িয়ে থাকতে হবে ট্রেনের ভেতর। কেউ আপনাকে সামান্য সুযোগ দেবে না যাওয়ার। সুযোগ দিলেও আপনার যেতে ইচ্ছে করবে না। টয়লেটে পর্যন্ত মানুষ বসে থাকে। ছেলেদের জন্যই খুব বিব্রতকর, আর মেয়েদের জন্য কেমন হতে পারে, একটু ভাবুন।

দেশের অন্যান্য রেলস্টেশনের কথা বাদ দিলাম। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের কিছু কথা বলি। পৃথিবী কোথায় চলে গেছে! পৃথিবী কেন, বাংলাদেশের কথাই ধরুন। আমরা এখন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করছি। ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণা এখন মানুষের মনে মনে। কিন্তু কমলাপুর রেলস্টেশনের কুলি, ট্রলি আর টয়লেটগুলো দেখলে কি মনে হবে, বাংলাদেশ একটি স্যাটেলাইট এর মালিক? কুলিরা এখনো ময়লা কাপড়ে লুঙ্গি পরে কুলিগিরি করছে। কোনও নির্দিষ্ট হার নেই মজুরির। যার কাছ থেকে যত নিতে পারে। ইচ্ছেমত মজুরি নিতে গিয়ে যাত্রীদের সাথে দুর্ব্যবহারও করতে ছাড়ে না এরা। রেলের অধিকর্তারা কি একবারও স্টেশনে ব্যবহৃত ট্রলিগুলোর দিকে তাকিয়েছেন? এই ট্রলিগুলোর বয়স কত, কেউ বলতে পারবেন? জং ধরতে ধরতে কী এক ভয়ংকর মলিন চেহারা নিয়েছে ট্রলিগুলো!

বিশ্বের যে কোনো দেশে বাইরে থেকে মূল শহরে প্রবেশের সময় নানাবিধ সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, পানির ফোয়ারা, ডিজিটাল ডিসপ্লে থাকে। মানুষ বুঝতে পারে, শহরে প্রবেশ করছে। মানুষ সুন্দর সুন্দর দৃশ্য দেখে আনন্দ পায়, শিশুরা হাত তালি দিয়ে উঠে। আর আমরা যখন ট্রেনে করে ঢাকায় প্রবেশ করি তখন আমাদেরকে স্বাগত জানায় নানারকম দুর্গন্ধ, বস্তি, অন্ধকার চিপাগলি, এখানে সেখানে পড়ে থাকা মাদকাসক্তদের অভয়ারণ্য পরিত্যক্ত বগিগুলো। এমন না যে, আমাদের রেলের অধিকর্তারা বা রাজনীতিবিদরা উন্নত বিশ্বের রেলের চেহারা সম্পর্কে জানেন না। তারা খুব ভালো করে জানেন। কদিন পর পর উন্নত বিশ্ব সফরে যান তারা। খোঁজ নিলে হয়ত জানা যাবে, বিদেশের অনেক পরামর্শকও বাংলাদেশে কাজ করছেন। কিন্তু রেলের দুর্গন্ধময়, অরাজকতাপূর্ণ চেহারা বদলায় না। এমন না যে আমি ননএসি বগিতে চড়ে, লোকাল ট্রেনে চড়ে উপরের বর্ণনা দিয়েছি। আমি এসি বগির যাত্রী হয়েই এমন বর্ণনা দিয়েছি। গরীব মানুষগুলো তো নিজেদের দুর্দশার কথা বর্ণনা করতে ভাষায় খুঁজে পাবে না। দেশের মানুষের করের টাকায় বাজেট হয়। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে কেনা ইঞ্জিন, বগি কদিন পরই অচল হয়ে পড়ে থাকে। ডেমো ট্রেনে প্লাটফর্ম থেকে উঠতে মই লাগার মত অবস্থা হয়। প্লাটফর্ম আর ট্রেনের মধ্যে এত বড় গ্যাপ থাকে যে এর ফাঁক গলে যে কোনো সময় মানুষ পড়ে যেতে পারে। এত দুর্দশা আর বিড়ম্বনার পরেও মানুষের প্রথম পছন্দ এখনো রেল। মহাসড়কের অবস্থা খুব খারাপ। কুমিল্লা থেকে ঢাকায় আসতে কখনো কখনো ১০/১২ ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে। অথচ ঈদের সময় নয় এখন। ঈদ যখন আসবে তখন কী হবে, আমরা ভেবে পাইনা। সারাবিশ্বে গণপরিবহনের মেরুদণ্ড হল রেল ব্যবস্থা। বাংলাদেশ কেন রেলে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারছে না, তার কারণ খুঁজে বের করে সমস্যা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা নিতে হবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন