চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রূপান্তরিত করোনাভাইরাস কি আরো বেশি সংক্রামক?

সার্স-কোভ-২ বা কোভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রূপ বদলাতে থাকে। চীন থেকে ইউরোপ-আমেরিকায় আসার পর বিজ্ঞানীরা এর জিন সিকোয়েন্সিং করে নাম দেন ডি-৬১৪, কিন্তু পরে এটি ভয়াবহভাবে ছড়াতে ছড়াতে আরো বেশি সংক্রামক হয়ে উঠে। গবেষকরা যাকে বলছেন ভাইরাসের রুপান্তর।

গবেষকরা বলছেন, মানুষ থেকে মানুষের সংক্রমণের সময় ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে এর রূপ পরিবর্তন করছে। বারবার এ পরিবর্তনকে তারা চিহ্নিত করেছেন জি৬১৪। বিশ্বে এখন পর্যন্ত যে ভাইরাস ছড়াচ্ছে তার জিন সিকোয়েন্স মূলত ডি-৬১৪জি৷

বিজ্ঞাপন

এ ভাইরাস মানুষের কোষে ছড়িয়ে যেতে পারে, যা উহানের পর ইতালিতে দেখা দিয়েছিলো৷ এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ১ কোটি ৪৪ লাখের অধিক মানুষ ও মারা গেছেন ৬ লক্ষাধিক।

এখন বড় প্রশ্ন হলো, এভাবে ভাইরাস তার অবস্থান বদলের সাথে সাথে চরিত্র বদলানো বা রুপান্তরের কারণে মানুষের জন্য আরো বেশি সংক্রামক বা প্রাণনাশক হয়ে উঠছে? এবং এটি কি ভবিষ্যতে করোনাভাইরাস ভ্যাকসিনের সাফল্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে?

এবিষয়ে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন এর গবেষক ডা. লুসিয়াস ভ্যান ডর্প বলেছেন, ভাইরাসগুলোর কোনো মহাপরিকল্পনা নেই। তারা ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে৷ কিছু পরিবর্তন ভাইরাস পুনরুৎপাদন করতে সহায়ক আর কিছু এটিকে বাধা দেয়। অন্যরা কেবল নিরপেক্ষ আচরণ করে।

যে রুপান্তরটি উদ্ভত হয়৷ তা খুব বিস্তৃত হতে পারে, এটি প্রাদুর্ভাবের প্রথম দিকে ছড়িয়েছিলো-এটি ‘প্রতিষ্ঠাতা প্রভাব’ নামে পরিচিত।

গবেষক ড. ভ্যান ড্রপ এবং তার দলের বিশ্বাস, এই রুপান্তরটি সাধারণ৷ কিন্তু এটি বিতর্কিত।

অধিকাংশ ভাইরোলজিস্টের বিশ্বাসের মতোই শেফিল্ড ইউনিভার্সিটির ড. তুষান ডি সিলভা ব্যাখ্যা করে বলেছেন, এবিষয়ে বলার যথেষ্ট তথ্য আছে যে, রুপান্তরের প্রথম দিকের চেয়ে এখন একটা ‘সিলেক্টিভ অ্যাডভাঞ্জ’ পাচ্ছে। যদিও লোকদের মধ্যে ‘এটি আরো সংক্রমণযোগ্য’ বলার পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি’- তিনি নিশ্চিত যে, এটি নিরপেক্ষ নয়’।

স্ক্রিপপস ইউনিভার্সিটি ইন ফ্লোরিডার অধ্যাপক মিশেল ফারজান এর মতে, বৃহত্তর পরিসরে এর সংক্রামণের বিষয়টি প্রমাণিত নয় এখনো।

কিন্তু আন্তর্জাতিক এক গবেষণা বলছে, বর্তমান ভাইরাস আসল ভাইরাসটির চেয়ে আরো বেশি সংক্রামক। রুপান্তরের ফলে এমনটা ঘটছে৷ তবে এটি মানুষকে আরো বেশি অসুস্থ করে তুলে কিনা সেটার প্রমাণ মেলেনি৷

বিজ্ঞাপন

ইউরোপ-আমেরিকা থেকে ভাইরাসে আক্রান্ত লোকের নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলোর জিন বিন্যাসের মাধ্যমে পরিচালিত গবেষণার ফলাফল বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সেলে’ প্রকাশিত হয়েছে৷

গবেষণার সাথে যুক্ত একজন গবেষক এরিকা চলমান বলেছেন, এই করোনাভাইরাসই এখন প্রাধান্য বিস্তার করছে৷

জিন বিন্যাসের সাথে সাথে বিজ্ঞানীরা এখন পরীক্ষাগারে মানুষ ও প্রাণীর কোষের ওপরেও পরীক্ষা চালিয়েছে। এখন তারা জানতে পারছেন যে, পরিবর্তিত ভাইরাসটি সংক্রমণের দিক থেকে আসল ভাইরাসের তুলনায় শক্তিশালী।

তারা বলছেন, করোনাভাইরাস কোন একটি কোষকে আক্রান্ত করার সময় তার ভেতরে ঢুকতে স্পাইক প্রোটিনের কাঠামো ব্যবহার করে থাকে এবং রুপান্তরের ফলে সেই কাঠামোতেও পরিবর্তন ঘটে।

গবেষকরা এখন পরীক্ষা করে দেখছেন, টিকার সাহায্যে এই ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে আনার ওপর এই পরিবর্তনের কোন প্রভাব পড়ে কীনা।

বর্তমানে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের লক্ষ্যে যেসব গবেষণা চলছে, তার বেশিরভাগই এই স্পাইক প্রোটিনকে টার্গেট করেই করা হচ্ছে। তা ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে হচ্ছে।

একইভাবে নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনোম প্রযুক্তি সেন্টার এর ড. নেভিলা সানজানা এ গবেষণায় একধাপ এগিয়ে গেছেন। তার ল্যাব গবেষণা থেকে বিশ্বাস যে, পরিবর্তিত ভাইরাসটি উহানে শুরুর ভাইরাসের চেয়ে বেশি সংক্রামক৷

দুটি সমীক্ষা বলছে যে, এই রুপান্তরিত ভাইরাসের পরিমাণ রোগীদের মাঝে বেশি রয়েছে৷ এটি অন্যদের কাছে বেশি সংক্রামক মনে হতে পারে৷ যদিও তারা প্রমাণ পায়নি যে, এর দ্বারা অধিকতর অসুস্থ হয়ে পড়েছে বা বেশিদিন হাসপাতালে ছিলো।

জীব বিজ্ঞানী বেটি কোরবারও বলছেন যে, করোনাভাইরাসের বর্তমান রুপটি প্রথম দিকের চেয়ে বেশি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে৷পরিবর্তিত ভাইরাসটি অনেক বেশি সংক্রামক। তবে রোগ কতোটা গুরুতর হবে তাতে নতুন ভাইরাসের ভূমিকা কী সেবিষয়ে আমরা কোন প্রমাণ পাইনি।

গবেষকরা বলছেন, পরিবর্তিত ধরনটি দ্রুত বিস্তার ঘটে নাক, সাইনাস ও গলায়। একারণেই এটি খুব সহজে আশেপাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এটিকে নির্মূল করতে মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সক্রিয় হতে হবে৷