চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রূপকথার মতো যে জীবন সংগ্রাম

বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ ক্রিকেট না খেললে কি হবে, মাত্র কয়েকটি দেশেই তা
নিয়ে যা উৎসাহ, উদ্দীপনা এবং দর্শকদের পাগলামো, তাতে গুটি কয়েক ক্রিকেটার
যে খেলোয়াড় থেকে মহানায়কে পরিণত হয়েছেন, সেটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। আর এ বিষয়ে তালিকার এক নম্বর আছেন ভারতীয় তারকারা।

অন্য খেলা চুলোয় যাক, আইপিএলের মতো ফটকাবাজির টুর্নামেন্টও এখন মহাক্রিকেটের ভূমিকায় অবতীর্ণ। দর্শক-আকুলতা, মিডিয়ার হামলে পড়া এবং পাবলিসিটির বহর দেখলে মনে হয়, এই একটি খেলা শুধু ভারতের জাতীয় সম্পদও! ক্রিকেট নিয়ে যেখানে এত মাতামাতি, সেখানে ক্রিকেটারদের খেলার জগৎ এবং তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সবার উৎসাহ যে থাকবে তা বলাই বাহুল্য। 

এই উৎসাহকে স্বীকৃতি দিয়ে তাই নিজের জীবনের না ঘটনা শুনিয়েছেন ষাটের দশকের বহু ক্রিকেটার থেকে সুনীল গাভাস্কর, সচীন টেন্ডুলকার পর্যন্ত। এ তালিকায় অন্যতম সেরা সংযোজন নিঃসন্দেহে যুবরাজ সিং।

যুবরাজের ক্রিকেটে যেমন উদ্দাম আকর্ষণে ভরা, তেমনই তার জীবন ছিলো একদা উদ্দামতায় ভেসে যাওয়া। তারপরও কঠিন এক রোগে আক্রন্ত হয়ে প্রবল লড়াইয়ের মধ্যদিয়ে তার ফিরে আসাওযেন আর-এক রূপকথার সদৃশ জীবন সংগ্রামের অভূতপূর্ব কাহিনি। এই যুবরাজ বা যুবিকে সবার কাছে উপস্থাপন করেছে তার খুব কাছের জন-একেবারে ছেলেবেলা থেকে পাশাপাশি থাকা বিশিষ্ট সাংবাদিক মকররন্দ ওয়েঁগাঁকর।

বলা বাহুল্য, মকরন্দ এমন অনেক ঘটনা শুনিয়েছেন, যা এতোদিন অজানা ছিলো আমাদের কাছে এবং যুবি এবং তার পরিবারকে চিনতে তা অনেকখানি সাহায্য করেছে। 

যে কোন খেলাতেই উন্নতির প্রধান তিনটি শর্ত হলো প্রতিভা, পরিশ্রম এবং অনুশীলন। সুতরাং যুবরাজকে নায়ক হতে গিয়ে এগুলো যে সফল ভাবে প্রযোগ করতে হয়েছে সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু তার ক্ষেত্রে এই পরিশ্রম এবং অনুশীলনটাই ছোটবেলায় অন্যভাবে দেখা গিয়েছিলো। অন্যভাবে মাানে খুব আতঙ্কের রূপে-অনন্ত খুব কাছ থেকে দেখে লেখকের তাই মনে হয়েছে।

কীরকম? যুবরাজের বাবা যোগরাজ সিংহ পাঞ্জাবের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার ছিলেন। ভারতীয় দলেও সুযোগ পেয়েছেন এবং কয়েকটি টেস্টও খেলেছেন। কিন্তু তার মনে বিরাট ক্ষোভ ছিলো যে, তাকে অন্যায়ভাবে ছেঁটে ফেলা হয়েছে এবং পারিবারিক চাপও তাকে সেরকমভাবে ক্রিকেটের প্রতি মনোযোগী হতে দেয়নি। এই সব ক্ষোভ থেকেই জন্ম নেয় এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা-ছেলে যুবরাজকে যেভাবে হোক বড় ক্রিকেটার করতে হবে।

সে জন্য ‘সৃষ্টিছাড়া’ নানা পথ বেছে নিতেও তিনি পিছপা হননি। চণ্ডীগড়ে যুবরাজদের বাড়িতে অনেক পরিশ্রম করে একটা বাগান বানিয়েছেন যুবরাজের মা শবনম। বাবা যোগরাজ সেটিতে নষ্ট করে ফেলতে দ্বিধাগ্রস্ত হননি। সেখানে তৈরী করেছেন ক্রিকেট পিচ এবং ছোট্ট যুবরাজকে রোজ অনুশীলনে বাধ্য করেন। সকাল থেকে রাত-বিশ্রাম প্রায় মিলতোই না। এ প্রসঙ্গে মকরন্ত অত্যান্ত ক্রুদ্ধ হয়েই লিখেছেন, তিনি তখন যুবরাজদের বাড়িতেই ছিলেন, রাত দশটা নাগাদ শোনেন, বারো বছরের যুবরাজ চিৎকার করে কাঁদছে। লেখক ছুটে গিয়ে দেখেন, যুবি ওর বুকে হাত ঘষছে। কারণ ওকে একটা ভেজা টেনিস বল দিয়ে ওর বুকে আঘাত করা হয়েছে। 

বিজ্ঞাপন

ফরসা বুকে কালশিটে দাগ পড়ে গিয়েছে। সে সব পাত্তা না দিয়ে যোগরাজ রাত দশটাতেই তাকে টেনে নিয়ে গিয়ে সতেরো গজ দূর থেকে ছোড়া ভেজা বল খেলতে বাধ্য করেছেন। মকরন্দ জানিয়েছেন, চন্ডীগড়ের তীব্র শীতে তারপরের দিন ভোরেই আবার যুবিকে উঠতে হবে এবং অনুশীলন করতে হবে। এই অনুশীলনের কুফলটা যোগরাজকে তিনি জানিয়ে বলেছিলেন, রোজ বারো ঘণ্টা অনুশীলন ওর কাছ থেকে খেলার আনন্দটা কেড়ে নেবে।

সেদিন যোগরাজ অনমনীয়ভাবে উত্তর দিয়েছিনে, ক্রিকেটের কঠিন দিকটা ওকে জানতে হবে। কে জানে, হয়তো বাবার কাছ থেকে শেখা এই কাঠিন্যই যুবরাজকে শুধু ক্রিকেটের নয়, জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াইটা লড়তে সাহায্য করেছিলো।

যদিও শক্তোপোক্ত ক্রিকেটার হিসেবে যুবরাজকে তৈরি করার ক্ষেত্রে তার বাবা যোগরাজের অবদান অনেকটাই, কিন্তু মা-বাবার বিচ্ছেদের পর থেকে মা-ই ছিলেন যুবরাজের কাছে সব কিছু। তার মা শবনম পাঞ্জাবের রাজ্যস্তরের প্রথম শ্রেণির বাস্কেটবল খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি অবশ্য ছেলেকে কোন দিনই বাস্কেটবলের দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেননি। মাঝে মাঝেই ছেলেকে নিয়ে খুব স্পর্শকাতরতায় ভুগেছেন। যেমন, শবনমের মজার একটি ধারণা ছিল। আসলে যুবরাজ ক্রিকেটারদের মধ্যে খুবই হ্যান্ডসাম এবং মহিলামহলে অসম্ভব জনপ্রিয়। এটা যে যুবরাজ বেশ ভালোরকমই উপভোগ করেন সেটাও বলা বাহুল্য।

এতে যথারীতি শবনম মনে নানা সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে। তার মনে হত, অনুশীলনের ফাঁকে বা ‘ক্ষণিকের বিশ্রাম’ যুবরাজ যদি কোন মহিলার সঙ্গে গল্প করেন, মিডিয়া সেটাকেই বড় করে দেখবে এবং প্রচার করবে। এই অগাধ বিশ্বাস এবং ধারণা থেকেই বোঝা যায়, শবনম অন্য মায়েদের মতোই। ছেলের ব্যাপারে একেবারে অন্ধ! যুবরাজের দুঃসময়ে, ক্যান্সার নিয়ে তার লড়াই করার সময় শবনম অবশ্য অন্য মায়েদের মতো ভেঙে পড়েনি। ছেলের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন।

সেদিক দিয়ে এরকম মা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। ২০১১ সালে বিশ্বকাপ চলার সময় যখন ভারতের একের পর এক জয় নিয়ে সারা ভারত উচ্ছ্বসিত, যুবরাজও খেলছেন দুর্দান্ত, তখন মাঠের বাইরে যুবরাজের জীবন যেনো স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছিল। পুরো বিশ্বকাপ জুড়ে যুবি কাশি, বমি, ঘুম না হওয়া আর গলাব্যথায় ভুগে চলছিলেন। অবশেষে ধরা পড়ে তার ফুসফুসে ক্যান্সার ।

যুবি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। সেই সময় তার জীবনকে যেনো ছারখার করে দিচ্ছিলো অমোঘ, নির্মম এবং হৃদয়বিদারক ওই একটি শব্দ-ক্যান্সার। তবে ঘুরে দাঁড়াতেও তার বেশি সময় লাগেনি। ক্রিকেট মাঠের প্রতিরোধ শক্তি, লড়াই-ই বোধহয় তাকে ওই শক্তি দিয়েছিলো। সেই লড়াইয়ে একমাত্র এবং যথার্থ সঙ্গী ছিলেন যুবির মা-শবনম।

মকরন্দ জানিয়েছে, বিদেশে যখন তার চিকিৎসা চলছে, তখন প্রবল যন্ত্রণায় মাঝে মাঝেই অস্থির হয়ে পড়ছিলেন যুবি। খাবার ছুড়ে ফেলে দিতেন। সেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভাবে সামাল দিতেন মা শবনম। পাথরের মতো শক্ত হয়ে ছেলের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।

আজ সেই যুবি ভারতের ক্রিকেটের মূল মঞ্চে অনেকটাই ফিরে আসতে পেরেছেন, তা সত্যিই এক পারিবারিক বিজয়ের গল্প। মকরন্দের লেখা পড়ে তা অনেকটাই আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যে যুবরাজ একসময় ভারতীয় ওয়ানডে দলের সহ অধিনায়ক ছিলেন, ২০০৭-এর-টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতার মূলকারিগর ছিলেন। সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের স্টুয়ার্ট ব্রডকে ৬ বলে ৬ ছক্কা মেরে, ২০১১-র আইসিসি বিশ্বকাপের ‘ম্যান অফ দ্য টুর্নামেন্ট’ হয়েছিলেন-তিনি। তবে তিনি যে শুধু অতীতের এই গৌরব নিয়েই দিন কাটাচ্ছেন তা না। বরং এখনও লড়াই অব্যহত রেখেছেন। যা সত্যিই মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার মতো।

(সৌজন্যে: বইয়ের দেশ)

বিজ্ঞাপন