চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রুখো সাম্প্রদায়িকতা, জয় হোক অসাম্প্রদায়িকতার

দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যবাজরা ইদানিং খুব তৎপর হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে এখন বিভিন্ন ধর্মীয় ইস্যুতে মানুষকে উস্কে দিতে চাচ্ছে তারা। তারই নমুনা হলো নারীদের ভোটার আইডি কার্ডে পর্দা মেনে চলার দাবীতে কতিপয় হিজাব পরা নারীর সংবাদ সম্মেলন। টিএসসিতে মসজিদ থাকা স্বত্তেও কতিপয় নারীর মসজিদের স্থান নির্ধারণের দাবী। পুলিশ কর্তৃক একজন কপালে টিপ পরা শিক্ষিকাকে টিপ পরছিস কেন বলা। তাকে হেনস্থা করা। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে খুবই সরব ছিল জামাতে ইসলামী। দেশ জুড়ে সংগঠিত হয়েছিল জঙ্গী গোষ্ঠী। শায়খ আব্দুর রহমান,বাংলা ভাই, মুফতি হান্নান প্রভৃতি বিপথগামী ও বিপজ্জনক ব্যক্তি ধর্মকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে সন্ত্রাসবাদকে বেছে নিয়েছিল।সুইসাইড স্কোয়াড গঠন করে অনেক তরুনকে ঠেলে দিয়েছিল মৃত্যুর মুখে। বোমায় পা উড়ে গেছে তবু এসব সুইসাইড স্কোয়াডকারীর কোন আক্ষেপ ছিল না। বরং চোখ জুড়ে ছিল আনন্দের ঝিলিক। জান্নাতের দরোজা তাকে ডাকছে!

এসব তরুণদের এভাবেই মগজ ধোলাই করা হয়েছিল যে মানুষ হত্যার মতো চরম বর্বর কাজটি করেও তাদের বিশ্বাস তারা ভাল কাজ করেছে। আর এই ভালো কাজের জন্যই আল্লাহ তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন! এখন চার দল নেই তাই জামাত ও জঙ্গীদের কোন দৃশ্যমান তৎপরতা নেই। ক্ষমতায় আসলো অসাম্প্রদায়িক মতাদর্শে একীভূত হওয়া ১৪ দল।বর্তমানে এ জোটটিতেও চলছে দ্বিধা দ্বন্দ্ব। মাঝেমধ্যে বক্তৃতা বিবৃতিতে ও বৈঠকে ১৪ দল থাকে। কিন্তু সরকার পরিচালনায় নেই।

Reneta June

রাজনৈতিক কোন কর্মসূচিতেও নেই। যেমনটি ছিল বিরোধী দলে থাকার সময়। বর্তমানে এ জোটটির অসাম্প্রদায়িক মতাদর্শের জোটবদ্ধ কোন কর্মসূচিই নেই। এ জোটটির এক শীর্ষ নেতা বলেছেন, আমি ধর্ম কর্ম করেও নাস্তিক উপাধী পেয়েছি। সংগত কারণেই প্রশ্ন জাগে তবে কি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে তুষ্ট করতেই বাম নেতাদের দূরে সরিয়ে দেয়া হয়েছে? কারণ রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম ইস্যুতেও বাম সাংসদরা নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে এর বিরোধ করেছিল আর আওয়ামী লীগের এমপিরা ছিল রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম বহালের পক্ষে।সুতরাং সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী বামদের দূরে সরিয়ে দেয়াতে খুশি হওয়ারই কথা। রাষ্ট্র ধর্ম ইসলামের পক্ষে অনেক আওয়ামী লীগ দলীয় নেতাকেও কথা বলতে শোনা যাচ্ছে।বিভিন্ন আচরণেও তা ফুটে উঠছে।

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগ মাহে রমজানকে স্বাগত জানিয়ে মিছিল শোভাযাত্রা করেছে। তারা কি দূর্গা পূজা, বৌদ্ধ পূর্ণিমা ও খ্রীস্টানদের বড় দিনকে স্বাগত জানিয়ে কখনো মিছিল শোভাযাত্রা করেছে অথবা করবে।কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের এই মিছিল সম্পর্কে কী বক্তব্য। কী বক্তব্য মূল দল আওয়ামী লীগের? যেখানে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের এ সম্পর্কিত কোন কর্মসূচি নেই। চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের কেন এমন মিছিল। তবে কি ছাত্র লীগের সাংগঠনিক চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে গেছে? এই ছাত্রলীগতো আওয়ামী লীগের ছাত্রলীগ আওয়ামী মুসলিম লীগের ছাত্রলীগ নয়।ছাত্রলীগের রয়েছে অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক লড়াই সংগ্রামের এক উজ্জ্বল অতীত। তবে কেন সংগঠনটির সাম্প্রদায়িকতার কাছে এমন নতি স্বীকার?

রাজনীতিকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় মোকাবেলা করতে না পেরে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িক ভাবমানসের দুরভিসন্ধিমূলক চর্চা চলছে বেশ জোরেসোরে। জামাত হেফাজতের নেতাকর্মীরা গেলো কই?চারদলীয় জোট ক্ষমতা হারানোর পর জামাতের বড় বড় নেতারা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত হতে থাকে।ফলে কোণঠাসা হয়ে পড়ে জামাত। যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবীতে সোচ্চার আন্দোলন গড়ে উঠে শাহবাগে। এই আন্দোলনের বিপরীতে জামাত ও সাম্প্রদায়িক সঙ্গে গড়ে ওঠে হেফাজতে ইসলাম। তখন হেফাজত ইসলামকে দিয়ে সরকার পতনের দূরভিসন্ধি পরিচালনা করে বেশ জোরেসোরে। কিন্তু সেটাও সফল হতে পারলোনা। তাই হয়তো তারা এখন ভিন্ন কৌশল নিয়েছে।হয়তো বেছে নিয়েছে শত্রুর সাথে মিশে শত্রুকে ঘায়েল করার অপকৌশল।তারা তাই কেউ আওয়ামী লীগে যোগ দিচ্ছে। যুবলীগ ও ছাত্রলীগে যোগ দিচ্ছে। মিত্র বেশে ছড়িয়ে চলছে সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ। আওয়ামী লীগকে নিয়ে যেতে চাচ্ছে আওয়ামী মুসলিম লীগের দিকে।আর সেজন্য তারা ব্যবহার করে চলছে ধর্মীয় আবেগকে। আর এই আবেগকে ব্যবহার করেই ধ্বংস করতে চাচ্ছে আওয়ামী লীগের অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শিকতাকে।

পোশাকে ধর্ম নয় ধর্ম থাকে অন্তরে ও জীবনাচারে।লাল টিপ ইস্যুর বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেয়া হচ্ছে হিজাবকে। লাল টিপের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে একশ্রেনীর মুসলিম সাম্প্রদায়িকতাবাদী।তারা বলে লাল টিপ হলো পতিতা চিহ্নিত করনের মাধ্যম। তারই বদলা নিতেই হয়তো একটি বিদ্যালয়ে হিজাব পরা শিক্ষার্থীরা গেল। নইলে প্রতিটি বিদ্যালয়েরই ড্রেসকোড থাকে। তারা ড্রেসকোড অমান্য করে কেন হিজাব পরলো এই সময়ে? নিশ্চয়ই কোন মতলববাজেরা এদেরকে পাঠিয়েছে। তারা হিজাবকেই ইসলাম ধরে নিয়েছে। তাই হিজাবের বিরোধিতাকেই বলছে ইসলাম বিরোধিতা। সোশ্যাল মিডিয়ায় বলছে যারা টিপ নিয়ে সোচ্চার ছিলো তারা আজ হিজাব ইস্যুতে কোথায়? এভাবেই সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে যাচ্ছে সর্বত্র। আর সেটাকে অত্যন্ত কৌশলে সংক্রমিত করা হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাঝে।আর তাই দলটিকে অসাম্প্রদায়িক সঙ্গ হতে দূরে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে।দলটির কতিপয় নেতাও তাই কথা বলছে আওয়ামী মুসলিম লীগের সুরে।

সাম্প্রদায়িকতার বিপদকে রুখতে হলে দলটির অসাম্প্রদায়িকতার চর্চাকে জোরদার করতে হবে। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে যে ২১ দফার ভিত্তিতে ১৪ দলীয় জোট গঠন হয়েছিল। তার আদর্শিক ভিত্তিকে মজবুত করতে হবে। দলের নেতাকর্মীদের গড়ে তুলতে হবে আদর্শিক ধারায় উদ্বুদ্ধ করে। মৈত্রী গড়তে হবে আরও অপরাপর অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে। আওয়ামী লীগে বন্ধ করতে হবে আওয়ামী মুসলিম লীগের সুরে কথা বলা। চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের এমন মিছিলে খুব উল্লসিত সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। তারা একে সাধুবাদ জানাচ্ছে। বলছে ছাত্রলীগ এতদিন পরে একটা ভাল কাজ করলো। জামাত হেফাজত তাদের সাংগঠনিক শক্তি হারিয়ে মিশে যাচ্ছে আওয়ামী লীগেরই বিভিন্ন অঙ্গ সহযোগী সংগঠনে। ছড়িয়ে দিচ্ছে সাম্প্রদায়িক ভাবমানস।ধর্মের অপব্যাখ্যায় বিভ্রান্ত করছে নেতাকর্মীদের। আর দলটিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছে আওয়ামী মুসলিম লীগের আদর্শিকতার দিকে। সময় থাকতে সচেতন না হলে সমূহ বিপদের আশঙ্কা নয় কি?তাই দলের ভেতরে আদর্শিকতার চর্চা জরুরি। আর সাম্প্রদায়িকতার এই বিপদ ঠেকাতে অসাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর ঐক্য ও একীভূত কর্মসূচী প্রয়োজন। আর সে কর্মসূচির শ্লোগান হোকঃরুখো সাম্প্রদায়িকতা জয় হোক অসাম্প্রদায়িকতার।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)