চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রাসেল আহমেদ ফিল্মমেকার হতে চেয়েছিল

চারদিকে সাবঅল্টার্ন মুভমেন্ট চলিতেছে। আর্ট-কালচারের প্রতিটি শাখায় ছড়িয়ে পড়ছে পোস্ট-মডার্নিটি। ফারুকীরা সিনেমার ভাষাটা পাল্টে ফেলার চেষ্টা করছে– এ অবস্থায় ‘নৃ’ মুভির কাজে হাত দিলেন রাসেল আহমেদ। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত আমাদের চিন্তা এই ‘নৃ’ নিয়ে। প্রথমে মাথায় এসেছিল ‘নিড়ানি’, আমরা সব সামাজিক আগাছা পরিষ্কারের মিশনে নেমেছিলাম। মিশনটা এখনও চলছে—আমার দৃষ্টিতে সেই ‘নিড়ানি’র মোডিফায়েড রূপ আজকের ‘নৃ’। আশির দশকের পটভূমিতে মানুষের ভালবাসার গল্প। না, চটকদার প্রেম নয়– সাদামাটা ভালোবাসার গল্প। রাসেলকে জিগাইলাম, ‘মিউচ্যুয়াল সেক্ম নাই, রেপ সিন নাই, আইটেম সং নাই, স্টার আর্টিস্ট নাই, এমনকি অ্যাকশনও নাই, গাড়ি উল্টাইয়া যাওয়ার দৃশ্যও নাই– তোমার সিনেমা পাবলিক খাইবো ক্যান?’ উত্তরে স্মিত হেসে রাসেল বললো: ‘সূর্য দীঘল বাড়িতে এগুলো ছিল না ভাই, এরপরও পাবলিক হল ভেঙে সিনেমা দেখেছে। ‘জীবন থেকে নেয়া’য় পাবলিক নিজের জীবন দেখতেই হলে গেছিল।’ মানব সভ্যতার এই জাত-পাতের বিভাজন রাসেল বিশ্বাস করতো না, ধর্মীয় সংস্কার-কুসংস্কার বিভেদের দেয়ালগুলো ভেঙে ফেলাই ছিল তার চিন্তার সূত্রমুখ।

২.
‘নৃ’র স্ক্রিপ্টিংয়ের সময় আমাকে কিছু কাজও দিয়েছিল রাসেল। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ৪টি ধর্ম– ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মের যোগসূত্রগুলো বের করার কাজ। ঘাঁটতে ঘাঁটতে রাসেলকে কইলাম, ’মুসলিম আর খ্রিস্টানরা একই শয়তানকে বিশ্বাস করে কিন্তু তাদের সৃষ্টিকর্তা আলাদা।’ বললাম, ‘ত্রিশূলটা দেখতে আরবি হরফে ‘আল্লাহ’ লেখার মতো। একটা গ্রাফিক্সের চমক থাকতে পারে এ নিয়ে। শশ্মানের মধ্যে একজন ত্রিশূল নিয়ে হাজির হলো, ঝড়ের বিজলীতে ‘আল্লাহ’ লেখা দেখলো শিশুটি।’ রাসেল হেসে বললো, ‘সাঈফ ভাই, আপনার এই অ্যাগ্রেসিভ চিন্তার কারণে অনেক ভালো উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত মাঠে মারা যায়।’ শিক্ষা নিলাম, ভালো উদ্যোগের জন্য সহনীয় হতে হবে, নমনীয় হতে হবে। ‘নৃ’তে এমন কিছু থাকবে না যা সাধারণ পাবলিকের ধর্মানুভূতিতে আঘাত করতে পারে।’

৩.
‘নৃ’ সিনেমায় আমার লেখা একটা সংলাপও আছে! চরিত্রের প্রয়োজনে সামান্য পরিবর্তন করেছে: ‘বহুরূপী কার্বনের মতো সত্যের অনেকগুলো রূপ। এক রূপে প্যারাসিটামলেই সেরে যায় জ্বর। অন্যরূপে মাতৃছায়ায়, আরও অন্যরূপে হোমিওপ্যাথি বা স্বাভাবিক অনাচিকিৎসায়। সবারই জ্বর সারে!’

৪.
সহজ-সরল এই জীবনের গল্পটা চিত্রায়নের জন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির তীর্থভূমি বরিশালকেই বেছে নিয়েছিল রাসেল আহমেদ। ব্রিটিশদের হাতে তৈরি এক আধুনিক শহর বরিশাল। বড় বড় গির্জা আর মন্দিরের শহর, মসজিদও আছে পাল্লা দিয়ে। এই শহরে এখনও জর্ডন রোড আছে, আছে ব্রাউন কম্পাউন্ড। মুখে মুখে এখনও বেলসপার্ক আছে। আছে খ্রিস্টান কলোনি, গোরস্থান। শংকর মঠ, রামকৃষ্ণ মিশন, শীতলাখোলা মন্দিরও আছে! গল্পটাও বরিশাইল্যা পটভূমিতে, তবে ছবিটা সার্বজনীন। ধর্মীয় সহাবস্থানের যে শিক্ষাটা বরিশাল শহর রাসেলকে দিয়েছে, সেটাকেই সে বাজি রেখেছে ডেব্যু ফিল্মে। ‘নৃ’ সিনেমার গল্পটা সম্প্রদায় ভাঙার গল্প নয়, যোগসূত্রের গল্প! মেকিংয়ের জাদুতেও চমক থাকছে, সিনেমার ফটোগ্রাফি দেখে, টিজার দেখে এটা নিশ্চিত! ফিল্ম ল্যাঙ্গুয়েজ বেশ ভালোভাবেই ভাষা বা রাষ্ট্রের সীমানা ডিঙিয়েছে।

৫.
রাসেল আহমেদ ফিল্মমেকার হতে চেয়েছিল।

রাসেল আহমেদ আমাকে একটা বিষয় কনফার্ম করেছিল। ফিল্ম আমার বোঝার দরকার নাই, আমার কনটেন্ট বুঝলেই চলবে। আমার টেস্ট অনুযায়ী প্রোডাকশন ওই দিয়ে দেবে। কিভাবে দেবে, এ নিয়ে আমি মাথা ঘামাতাম না। আস্থা ছিল রাসেল এমন এক ডিরেক্টর, যে ক্যামেরার সামনে টিকটিকি-তেলাপোকা-মাকড়শাকেও ক্যারেকটার বানিয়ে ফেলতে পারে। হাসিমুখে এক অদ্ভুত যাদুবাস্তবতা। ওর ফার্মের নাম ছিল ‘উইজার্ড ভ্যালি’!

রাসেল আমাকে বুঝিয়েছে: হুমায়ুন নিজে ফিল্মে না নেমে যদি গল্প-স্ক্রিপ্টে মনোযোগ দিতেন, তানভীর মোকাম্মেল যদি হুমায়ুনের স্প্রিপ্টে কাজ করার সুযোগ পেতেন– তাইলে ‘আগুনের পরশমনি’ একটা আন্তর্জাতিক মানের মাস্টারপিস হয়ে উঠতে পারতো। টোকন ঠাকুর বা কামরুজ্জামান কামুর মতো কবিতা ছেড়ে হঠাৎ ফিল্মে ঝাপিয়ে পড়াটা আমি বা রাসেল মানিয়ে নিতে পারতাম না।
রাসেল আহমেদ লিখতো, প্রকাশ করতে চাইতো না। কবি হিসেবে পরিচিতির কোনো তাগিদ নেই, গল্পের পেছনে ছোটা মানুষটি গল্পকার খ্যাতিও চায়নি কখনো।

হ্যাঁ, সে ফিল্মমেকার হতে চেয়েছিল।

এবং সিনেমার সামাজিক-অর্থনৈতিক চাপ তাকে হত্যা করেছে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

শেয়ার করুন: