চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রাবেয়া খাতুন: প্রিয় লেখকের প্রতিকৃতি

রাবেয়া খাতুন এবার ৮৫ বছরে পদার্পন করলেন। ২৭ ডিসেম্বর তার জন্মদিন। ৬০ বছরেরও অধিককাল তিনি নিবিষ্টচিত্তে, একাগ্র সাধনায় একলব্যের মত বৈদিক-প্রেরণায় সাহিত্য রচনার সাথে সম্পৃক্ত। বাংলা ভাষার খুব কম লেখকই এতো দীর্ঘকাল সাহিত্য রচনার সুযোগ পেয়েছেন। 

মুসলিম সমাজের অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগে জন্মগ্রহণ করেও রাবেয়া খাতুন কী করে আলোর ঠিকানা সন্ধান করলেন এ বড় বিস্ময় আমার কাছে? কে তাঁকে স্বশিক্ষিত করল? কে প্রেরণা জোগালো? বড় লেখক হবার গুণাবলী তিনি কী করে অর্জন করলেন। এসব প্রশ্ন জাগে আমার মনে। প্রকৃত অর্থে মুসলিম নারীদের মধ্যে বলিষ্ঠ ও সর্বার্থে সুসাহিত্যিকের বড় অভাব। কবিতায় সুফিয়া কামাল কিংবা গদ্য-প্রবন্ধে বেগম রোকেয়া কিংবা সাংবাদিকতায় নূরজাহান বেগম, পরের প্রজন্মের সেই শক্তিমান শিল্পী কোথায়? মুসলিম নারী লেখকদের কথা একবারেই হাতে গোনা যায়। কিন্তু কথাসাহিত্যিক একেবারেই দুর্লভ। গল্প-উপন্যাস পরিশ্রম সাপেক্ষ রচনা-রাবেয়া খাতুন সেই দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছেন, একাকী। ঠিক মহিলা হিসাবে তিনি কখনও বিবেচিত হননি। মহিলা লেখকদের কাতারেও তাঁর নাম উচ্চারণ হয়নি কখনও। নারী লেখক হিসাবে বিভাজনের সীমানা তৈরি করেননি।

বিজ্ঞাপন

তাঁর লেখক জীবনের সূচনাপর্বেই সহযাত্রী ছিলেন শামসুদ্দীন আবুল কামাল, আবদুর গাফ্ফার চৌধুরী, হাসান হাফিজুর রহমান, আহসান হাবীব, কাইয়ুম চৌধুরী, মির্জা আবদুল হাই, সৈয়দ শামসুল হক, জহির রায়হান প্রমুখ যশস্বী ও কীর্তিমান লেখকেরা। বাঙালি মহিলাদের হাতে সাহিত্য যেমন নারীর লালিত্য ও রমণীয়তা গুণে অসাহিত্য হয়ে ওঠে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কিন্তু রাবেয়া খাতুন পঞ্চাশ বছর আগে থেকেই ছিলেন চ্যালেঞ্জিং। নারী নয়, একজন প্রকৃত লেখক হিসাবেই তিনি স্থায়ী আসন লাভ করেছেন বাংলা সাহিত্যে। রাবেয়া খাতুনের রচনাকর্মের মধ্যে কোনো মেয়েলিপনা নেই এটি এক আশ্চর্য ব্যতিক্রম। এই ধারায় পরে আমরা পেয়েছি রিজিয়া রহমান কিংবা সেলিনা হোসেনকে। রাজিয়া খানের কথাও আমি স্মরণ করছি।

রাবেয়া খাতুনের বিপুল, অজস্র, বহুমুখী রচনাসম্ভারের সামনে দাঁড়ালে বিস্মিত হতে হয়। ক্লান্তিহীন, নিরন্তর তিনি সৃষ্টি সাধনায় মগ্ন থেকেছেন। শুনেছি, প্রতিদিন তিনি অফিস করার মত রুটিন বেঁধে লেখার কাজ করে থাকেন। এই নিষ্ঠা বাঙালি লেখকদের মধ্যে খুব বেশি দেখা যায় না। আর আমাদের দেশে লেখকেরা যত না ব্যস্ত লেখায় তার চেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা আদায়ের চেষ্টায়। মোহহীন সাধক প্রকৃতির লেখকেরা এই সমাজে দুর্লভ হয়ে উঠছেন। রাবেয়া খাতুনকে দেখলে তাই শ্রদ্ধায় নত হয়ে যাই। আপন ঘোরে, নিজস্ব বলয়ে বৃত্তাবদ্ধ অসাধারণ এই লেখক এখনো আধুনিকতম সৃজনশীলতায় নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন। এবং প্রতি বছর বাংলা ভাষায় প্রকাশিত বছরের উল্লেখযোগ্য দু’তিনটি উপন্যাস তিনি উপহার দিচ্ছেন আমাদের। এবং এই নিয়ে তাঁর কোন অহংকার নেই। অনালোচিত থাকলেও তিনি বিচলিতও নন। নিজের আনন্দময় জগতে নিজেই গুটিয়ে থাকেন এবং নিজের শক্তি সম্পর্কেও তিনি পূর্ণাঙ্গ কোন ধারণা পোষণ করেন না।

দুর্ভাগ্য যে, আমাদের রাবেয়া খাতুনের সাহিত্য নিয়ে আমাদের দেশে ভালো কোন প্রবন্ধ রচিত হয়নি। তাঁর রচনাসমূহ বিস্তৃত গবেষণার অপেক্ষা রাখে। বহু বিচিত্র বিষয়ে নিয়ে উপন্যাস ও ছোটগল্প লিখেছেন। আমাদের বিগত ৫০ বছর সময়কালের রাজনীতি, গণমানুষ, সম্পর্কে, মধ্যবিত্তের বিকাশ, মুক্তিযুদ্ধ, নারী-পুরুষ, ইতিহাস, দেশ ভাবনা, জনপদ, অসংখ্য প্রসঙ্গ তাঁর রচনায় চিত্রায়িত হয়েছে। হয়তো কোন গবেষক সেসব নিয়ে গবেষণা করবেন। তাতেও হয়তো রাবেয়া খাতুনের সঠিক মূল্যায়ন হবে না।

আজকের দিনের সস্তা পাঠকেরাও রাবেয়া খাতুনের সাহিত্যরস পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন কিনা আমার জানা নেই। সমকাল তাঁদেরকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারে না। রাবেয়া খাতুন সেই সৌভাগ্যবান বড় লেখক। সমসাময়িককাল তাঁকে পূর্ণভাবে সনাক্ত করতে পারেনি। তাঁর সমসাময়িক লেখকেরাও অনেকটাই উদাসীন থেকেছেন তাঁর ব্যাপারে। উচ্ছ্বসিত হননি তাঁরা। কিন্তু এটাও বিবেচ্য লেখক স্বীকৃতির কোন অপূর্ণতা নেই রাবেয়া খাতুনের। আজ থেকে ৪০ বছর আগে তিনি উপন্যাসে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন। ৬০ বছর ধরে পত্র-পত্রিকায় তাঁর উপস্থিতি রাজসিক। ৩৮ বছর বয়সে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ধন্য হন। আমাদের দেশের সব বড় পুরস্কারই তিনি পেয়েছেন। এ বড় কম ব্যাপার নয়। রাবেয়া খাতুন জন্মগত ভাবেই লেখক, হয়তো সে কারণেই আমাদের বেড়ে ওঠার সময় থেকে আমরা তাঁর লেখার সঙ্গে পরিচিত।


রাবেয়া খাতুন অসম্ভব দরদী ও মমতাময়ী লেখিকা। তাঁর মমতার উজ্জ্বল উদাহরণ হচ্ছে শিশুসাহিত্য। আশ্চর্য কুশলতায়, সহজ, সরল আড়ম্বরহীন ভাষায় রাবেয়া খাতুন তাঁর চিরন্তন শিশুসাহিত্যগুলো লিখেছেন। দুঃসাহসিক অভিযান দিয়ে তাঁর সূচনা। সুমন ও মিঠুর গল্প, একাত্তরের নিশান, লাল সবুজ পাথরের মানুষ, সোনা হলুদ পিরামিডের খোঁজে, রক্তমুখী শিলা পাহাড়, রোবটের চোখ নীল, সুখী রাজার গল্প, ঈশা খাঁ, তীতুমীরের বাঁশের কেল্লা, এসব অসামান্য গ্রন্থ তিনি লিখেছেন। আমরা এসব বই পড়ে একদা মুগ্ধ হয়েছিলাম। বহুবিচিত্র বিষয় নিয়ে তিনি ছোটদের জন্য লিখেছেন। জীবনী, ইতিহাস, সায়েন্স ফিকশন, ভ্রমণ, রূপকথা, সাধারণ জীবনের গল্প, অনবদ্য ভাষায় এসব লিখেছেন খালাম্মা।

আমরা ধারণা, কেবল ছোটদের জন্য লিখলেও খালাম্মা যশস্বী হতেন। বহুকিছু লিখেছেন বলেই তাঁর শিশুসাহিত্য তেমনভাবে আলোচনায় আসেনি। শুধু এককভাবে রাবেয়া খাতুনের বিস্তৃত শিশুসাহিত্য আলোচনার অপেক্ষা রাখে। আমরা তাঁর ছোটদের লেখার দুর্দান্ত ভক্ত। দূর শৈশব থেকেই আমরা তাঁর লেখা পড়ে আসছি। শিশু একাডেমির ‘শিশু’ পত্রিকায় সে সব লেখা পড়ে রোমাঞ্চিত হয়েছি। তখন ভাবতেও পারিনি, একদিন এই লেখকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হবে, সখ্য হবে। খালাম্মা আন্তরিকভাবে আমাদের গ্রহণ করবেন এবং আমরা তাঁর স্নেহরসে সিক্ত হব।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

বিজ্ঞাপন