চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রাত ৮টার পর রাজধানীতে দোকানপাট বন্ধের পক্ষে তাপস

জরুরি পরিষেবা ছাড়া রাত ৮টার পর রাজধানীতে দোকানপাট ও শপিংমল বন্ধ রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস।

এ বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণের কথাও জানিয়েছেন তিনি। সোমবার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের দুই বছর পূর্তিতে নগর ভবনে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তাপস।

Reneta June

সংবাদ সম্মেলনে তাপসের পুরো বক্তব্য
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
দায়িত্বভার গ্রহণের ২ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হওয়ায় আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং কর্পোরেশনের পক্ষ হতে আপনাদেরকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আজকের এই বিশেষ দিনে আমি আপনাদের মাধ্যমে আমার প্রিয় ঢাকাবাসীর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই।

বিজ্ঞাপন

সংবাদ সম্মেলনে শুরুতেই আমি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। পরম কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করছি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা ৩০ লক্ষ বীর শহীদ ও ২ লক্ষ মা-বোনের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগকে। বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট এর কাল রাত্রিতে ইতিহাসের নির্মম হত্যাকাণ্ডে শাহাদত বরণকারী সকল বীর শহীদকে। শ্রদ্ধবনত চিত্তে স্মরণ করছি জাতীয় চার নেতাসহ এদেশের গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শাহাদত বরণকারী জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানগণকে।

প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
আপনারা অবগত আছেন, ঐতিহ্যের ঢাকা, সুন্দর ঢাকা, সচল ঢাকা, সুশাসিত ঢাকা ও উন্নত ঢাকার যে রূপরেখা ঘোষণা করেছিলাম, তা বাস্তবায়নে বিগত ২ বছরে আমাদের গৃহিত উদ্যোগ, সার্বিক অগ্রগতি এবং আগামীদিনের কর্মপরিকল্পনা গণমাধ্যমসহ ঢাকাবাসীকে ওয়াকিবহাল করতেই আজকের এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।

আপনারা জানেন, সারাবিশ্বের ন্যায় বিগত ২ বছরের অধিকাংশ সময় বাংলাদেশও করোনা মহামারীর চরম ভীতিকর পরিস্থিতিতে নিপতিত ছিল। ঢাকাবাসীর কল্যাণে এই করোনা মহামারীর মাঝেই আমরা নতুন কর্মস্পৃহা ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আমাদের বিস্তৃত কর্মযজ্ঞ শুরু করি। এরই ধারাবাহিকতায় বিগত ২ বছরে আমরা উন্নত ঢাকা গড়ার ভিত অনেকটাই সুদৃঢ় ও শক্তিশালী করার মাধ্যমে নতুন আরেকটি ধাপে উন্নীত হয়েছি।

নবোদ্যমে গৃহিত কর্মপরিকল্পনার আলোকে ঢাকাবাসীর মৌলিক সেবা নিশ্চিত করাকে আমরা বিগত ২ বছরে অগ্রাধিকার প্রদান করেছি। মশক নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা নিরসনে উদ্যোগ গ্রহণ করার পাশাপাশি ঐতিহ্যের সুন্দর, সচল, আধুনিক ও উন্নত ঢাকা গড়ার লক্ষ্যে আমরা নানাবিধ উদ্যোগ, কার্যক্রম ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলেছি। বেশকিছু উদ্যোগ ও কর্মসূচি বাস্তবায়নাধীন বা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অনুমোদন প্রাপ্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়াও প্রণয়ন করা হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী ‘ঢাকা শহরের জন্য সমন্বিত মহা পরিকল্পনা, ২০২০-২০৫০’।

সম্মানিত সাংবাদিকবর্গ ও প্রিয় নগরবাসী,
ঢাকাবাসীর প্রাত্যহিক জীবনযাত্রাকে স্বস্তি দিতে যে কয়টি বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তার মধ্যে মশক নিয়ন্ত্রণ অন্যতম। আমরা দেখেছি, শুধুমাত্র যথাযথ তদারকি, মানসম্পন্ন প্রয়োজনীয় কীটনাশক, পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতির অভাবে ২০১৯ সালে ডেঙ্গু সংক্রমণের ভয়াল তাণ্ডব।

আমি দায়িত্বভার গ্রহণের পর মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন এনেছি। শুরু করা হয়েছে বছরব্যাপী সমন্বিত মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম। নতুন এই কার্যক্রমের আওতায় পর্যাপ্ত লোকবল নিয়োগ, মানসম্পন্ন কীটনাশক ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয় ও মাঠ পর্যায়ে সরবরাহ করা হচ্ছে।

আমার দায়িত্বভার গ্রহণের পূর্বে কর্পোরেশনের শুধু পুরাতন ৫৭টি ওয়ার্ডেই মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালিত হতো। তাছাড়া, সে সময় প্রতি ওয়ার্ডে গড়ে মাত্র ৪ জন মশক কর্মী এবং প্রতি ৪/৫টি ওয়ার্ডের জন্য মাত্র একজন করে মশক সুপারভাইজার নিয়োজিত ছিল। দায়িত্বভার গ্রহণ করেই মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করার লক্ষ্যে আমরা প্রতি ওয়ার্ডে ১৩ জন মশক কর্মী ও ১ জন করে মশক সুপারভাইজার নিয়োগ করেছি। বর্তমানে প্রতি ওয়ার্ডে মোট ১৪ জন করে ৭৫টি ওয়ার্ডে সর্বমোট ১ হাজার ৫০ জন কর্মী লার্ভিসাইডিং, এডাল্টিসাইডিং এবং কীটনাশক প্রয়োগের বিশাল কর্মযজ্ঞ তদারকি ও সমন্বয় করে চলেছে।

এছাড়াও মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম গতিশীল করার লক্ষে বিগত ২ বছরে আমরা এডাল্টিসাইডিং কর্মযজ্ঞে ৩৭৫টি নতুন ফগার মেশিন, লার্ভিসাইডিং কর্মকাণ্ডে ৪০০টি নতুন হস্ত-পরিচালিত যন্ত্র (হ্যান্ড-স্প্রে মেশিন) এবং কিউলেক্স মশক নিয়ন্ত্রণ কাজে ব্যবহারের জন্য ২৫টি নতুন হুইল-ব্যারো মেশিন ক্রয় করেছি। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই, আমার দায়িত্বভার গ্রহণের পূর্বে বড় আকারের জলাশয়ে ও পতিত ভূমিতে মশক নিয়ন্ত্রণে বিশেষত কিউলেক্স মশকের বংশ বৃদ্ধি রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখা এই হুইল-ব্যারো মেশিনের সংখ্যা ছিল মাত্র ১২টি। নতুন ২৫টি মেশিনসহ বর্তমানে মোট ৩৭টি হুইল-ব্যারো মেশিন মাঠ পর্যায়ে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এডিস মশকের প্রকোপ থেকে ঢাকাবাসীকে মুক্তি দিতে আমরা গত বছর ১ এপ্রিল হতেই ভ্রাম্যমাণ আদালত ও জুন মাসের মাঝামাঝি সময় হতে চিরুনি অভিযান পরিচালনা শুরু করি। ২ অগাস্ট হতে নগর ভবনে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করি। এরই অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হতে ডেঙ্গু রোগীর যে তালিকা সরবরাহ করা হতো, নিয়ন্ত্রণ কক্ষ হতে সেই তালিকা ধরে ধরে আমরা প্রতিটি রোগীর সাথে কথা বলেছি। ডেঙ্গু রোগীর আবাসস্থল ও আশপাশের ৪০০ গজ এলাকার মধ্যে এডিস মশকের প্রজননস্থল ধ্বংস করতে বিশেষ লার্ভিসাইডিং ও এডাল্টিসাইডিং কার্যক্রম পরিচালনা করেছি।

এডিস মশকের প্রজননস্থল ধ্বংস করতে ২০২১ সালে আমরা ২৪ হাজার ৭ শত ৯টি বসত-বাড়ি, নির্মাণাধীন স্থাপনা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে Crush Program ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছি। অভিযানে আমরা ১ হাজার ১৪টি বাড়ি ও স্থাপনায় মশকের লার্ভা পেয়েছি। এর মধ্যে ৬৯৮টি বাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আমরা ৯৮ লক্ষ ৯৪ হাজার ৬০০ টাকা অর্থদণ্ড আরোপ ও আদায় করেছি।

ফলে নানাবিধ শঙ্কা পাশ কাটিয়ে ২০২১ সালে আমরা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছি। যদিওবা ২০১৯ সালের বিচারে ২০২১ সালে এই শহরে জনঘনত্ব যেমন বেড়েছে তেমনি প্রলম্বিত হয়েছে বর্ষাকাল। তারপরও ২০২১ সালের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাক-বর্ষা জরিপে এ বছর দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের যে ৭টি ওয়ার্ডকে উচ্চ ও মধ্যম মাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে অগ্রিম উদ্যোগের অংশ হিসেবে সেসব ওয়ার্ডে ইতোমধ্যে আমরা ৩ দিনের বিশেষ চিরুনি অভিযান পরিচালনা করেছি। অভিযানে প্রায় ৮ হাজার বসতবাড়ি, স্থাপনা ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে লার্ভিসাইডিং ও এডাল্টিসাইডিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময় প্রায় ২ শতাধিক স্থাপনায় প্রাপ্ত এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা হয়।

এছাড়াও এ বছর জুনের মাঝামাঝি সময় হতে আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি এবং তা বাস্তবায়নে ১০ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পদায়ন করতে মন্ত্রণালয়ে পত্র প্রেরণ করা হয়েছে। গতবারের চাইতে এবার আরও বেশি সফলতার সহিত এডিস মশক নিয়ন্ত্রণ করতে পারব বলে আমরা দৃঢ় প্রত্যয়ী ও আশাবাদী। তবে, সেজন্য অবশ্যই ঢাকাবাসীকে সচেতন হতে হবে। বাড়ির আঙ্গিনা ও আশপাশ, বাড়ির অভ্যন্তরে যাতে এডিস মশকের প্রজননস্থল সৃষ্টি না হয় এবং ছাদবাগানগুলো যেন অপরিচর্যিত না থাকে, সে বিষয়ে আমি ঢাকাবাসীর সচেতনতা ও আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি।

গণমাধ্যমের বন্ধুগণ,
আপনারা জানেন, আমি দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর যে ক’টি বিষয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করেছি তার মধ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অন্যতম। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম আধুনিকায়নের লক্ষ্যে আমরা জাইকা প্রণীত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মাস্টারপ্লান অনুযায়ী ওয়ার্ডভিত্তিক কর্মকাণ্ডে (ward-based approach) গুরুত্ব প্রদান করেছি এবং সে অনুযায়ী আমাদের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বর্জ্য সংগ্রহ ও তা সরাসরি কেন্দ্রীয় ভাগাড়ে নিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে আমরা ৩০টি কম্পেক্টর ভেহিক্যাল ক্রয় করছি। নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে আহবানকৃত আন্তর্জাতিক দরপত্রের মূল্যায়ন কার্যক্রম বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বর্জ্য সংগ্রহের পরিমাণ ও পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে আরও শতাধিক কম্পেক্টর ভেহিক্যাল ক্রয় করতে আমরা নতুন আরেকটি প্রকল্প গ্রহণ করছি।

অধিকতর কার্যকরভাবে খাল হতে বর্জ্য সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালনা করতে লং বুম, শর্ট বুমসহ বিভিন্ন আকারের প্রয়োজনীয় যান-যন্ত্রপাতি ক্রয় করাও আমাদের সক্রিয় পরিকল্পনায় রয়েছে। বর্তমানে খাল হতে বর্জ্য ও পলি উত্তোলনের পর তা খালের পাড়ে বা নির্দিষ্ট জায়গায় সংরক্ষণ করে রাখা হয়। আগামীদিনে সেসব বর্জ্য ও পলি উত্তোলনের পর উত্তোলনকৃত স্থানেই তা শ্রেণীবিভক্ত করে উত্তোলিত বর্জ্য সরাসরি কেন্দ্রীয় ভাগাড়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

আমাদের মাতুয়াইল কেন্দ্রীয় ভাগাড়ে নব অধিগ্রহণকৃত জায়গার মধ্য হতে ৩১ একর জায়গায় Intermediate Treatment Facility (ইন্টারমিডিয়েট ট্রিটমেন্ট ফেসিলিটি) সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়াও মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহের অধিক্ষেত্র বাড়াতে আমরা অঞ্চলভিত্তিক মেডিক্যাল বর্জ্য সংগ্রহকারী নিবন্ধনে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি। শীঘ্রই আমরা ২টি অঞ্চলে (১ ও ৪ নম্বর অঞ্চলে) মেডিক্যাল বর্জ্য সংগ্রহকারী নিবন্ধিত করব। গৃহস্থালি বর্জ্য সংগ্রহ করতে ৭৫টি ওয়ার্ডেই যেভাবে প্রাথমিক বর্জ্য সেবা সংগ্রহকারী নিবন্ধন কার্যক্রমে সফলতা পেয়েছি একইভাবে আগামীদিনে মেডিক্যাল বর্জ্য সংগ্রহ সেবায়ও আমরা ঢাকাবাসীকে সুফল দিতে পারব বলে আশাবাদী। সার্বিকভাবে বলা যায়, ২০২৩ সালের মধ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবো বলে আমরা আশাবাদী।

সুধীবৃন্দ,
জলাবদ্ধতা নিরসন আমাদের জন্য অন্যতম এক বড় প্রতিবন্ধকতা। বছর বছর ময়লা পানিতে নিমজ্জিত থাকা ঢাকাবাসীকে জলাবদ্ধতার কবল হতে মুক্তি দিতে আমরা সেই প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলায় দায়িত্বভার গ্রহণ করেছি। আপনারা জানেন, আমরা ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ওয়াসার কাছ হতে ১১টি মৃত প্রায় খাল, ২টি অচল পাম্প স্টেশন এবং জমাটবদ্ধ ময়লায় আবদ্ধ ৫টি অচল বক্স কালভার্টের দায়িত্ব গ্রহণ করি।

ইতোমধ্যে আমরা পাম্প হাউজ দুটিকে আংশিকভাবে চালু করতে সমর্থ হয়েছি এবং সেগুলো পুরোপুরিভাবে চালু করার লক্ষ্যে আমাদের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। ২০২১ সালে সাড়ে ২৭ কিমি দৈর্ঘ্যের ২টি বক্স কালভার্ট, ৭টি খাল এবং ৭০০ কিমি দৈর্ঘ্যের পাইপ নর্দমা হতে ৯ লক্ষ ৫৭ হাজার টন বর্জ্য ও পলি অপসারণ করা হয়েছে। ২০২২ সালে অদ্যাবধি ৩৭ কিমি এর অধিক দৈর্ঘ্যসম্পন্ন ১১টি খাল হতে এ পর্যন্ত আমরা ৪ লক্ষ ৪৪ হাজার টন বর্জ্য ও পলি অপসারণ করেছি।

জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এরকম ১২৫টি স্থান/ স্পট চিহ্নিত করে সেসব স্থানে আমরা নিজস্ব অর্থায়নে অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। স্বল্প মেয়াদী কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এসব অবকাঠামো নির্মাণ কাজের প্রায় ৯০ শতাংশ সমাপ্ত হয়েছে। আগামী জুন মাসের মধ্যে এ ধরনের সকল অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হবে বলে আশাবাদী। পাশাপাশি এ বছর নতুন আরও ১১টি স্থান/ স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। সেসব স্থানেও অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। এছাড়াও, ঢাকা মহানগরীর জন্য সমন্বিত মহাপরিকল্পনার আওতায় আমরা দীর্ঘ মেয়াদে জলাবদ্ধতা দূরীকরণে উদ্যোগ গ্রহণ করব।

খাল ও বক্স কালভার্ট হতে বর্জ্য ও পলি অপসারণ এবং অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়নের ফলে গত বছর ঢাকাবাসীকে জলাবদ্ধতায় নাকাল হতে হয়নি। অতি বৃষ্টি হলেও ১ ঘণ্টার মধ্যে বৃষ্টির পানি নিষ্কাষিত হয়েছে। এ বছর ঢাকাবাসীকে আমরা আরও বেশি মাত্রায় সুফল দিতে পারব বলে আশাবাদী। আমরা আশা করছি, এ বছর ৩০ মিনিটের মধ্যেই বৃষ্টির পানি নিষ্কাষিত হবে।

সম্মানিত উপস্থিতি,
যানজট নিরসনে সরকারের বহুমুখী কর্মপরিকল্পনা সাথে সমন্বয় রেখে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনও বৃহৎ কর্মযজ্ঞ এবং ভবিষ্যৎ কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে চলেছে। এর মধ্যে অন্যতম — বিদ্যমান সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন, নৌ-পথে সম্ভাব্য যাত্রাপথে যান চলাচলের ব্যবস্থা, নতুন ১৮টি ওয়ার্ডসহ দক্ষিণ সিটির অন্যান্য ওয়ার্ড ঘিরে সড়ক অন্তর্জাল (Network) সৃষ্টি, ঢাকা শহরের উপর যানবাহনের চাপ কমানো, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং গণপরিবহনের শৃঙ্খলা আনয়নের লক্ষ্যে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রম বাস্তবায়ন ইত্যাদি প্রাণিধানযোগ্য।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় রিক্সা, ভ্যান, ঘোড়ার গাড়ি, গরুর গাড়ি ও টালি গাড়ি ইত্যাদি ৭ লক্ষাধিক অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল করে থাকে। আমরা সেসব অযান্ত্রিক যানবাহনকে শৃঙ্খলায় আনতে দীর্ঘ ৩৪ বছর পর নিবন্ধন ও নবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। এই কার্যক্রমা ১ লক্ষ ৯০ হাজার ২১৭টি অযান্ত্রিক যানবাহনকে ইতোমধ্যে নিবন্ধন এবং সেগুলোর ডিজিটাল নাম্বার প্লেট প্রদান করা হয়েছে। আগামীদিনে নিবন্ধনবিহীন কোনও অযান্ত্রিক যানবাহন আমরা ঢাকা শহরে চলতে দেবো না।

ঢাকা শহরের গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনয়নের লক্ষ্যে আমরা পরীক্ষামূলকভাবে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রম চালু করতে সমর্থ হয়েছি। ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে ঘাটারচর থেকে কাঁচপুর যাত্রাপথে পরীক্ষামূলকভাবে বহু আকাঙ্ক্ষিত ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ যাত্রা শুরু করে। ঢাকা নগর পরিবহন ইতোমধ্যে জনগণের প্রত্যাশা ধারণ করতে পেরেছে বলেই জনসাধারণের মাঝে তা সমাদৃত হয়েছে। আরও ৩টি নতুন যাত্রাপথে ঢাকা নগর পরিবহন চালু করার লক্ষ্যে আমাদের কার্যক্রম পুরোদমে এগিয়ে চলেছে।

ঢাকা শহরে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থাকলেও শহরের মধ্যে চলাচল করা বাসগুলোর জন্য কোন টার্মিনাল নেই। আমরা বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমের আওতায় শহরের কোল ঘেঁষে ৪টি স্থানে ৪টি নতুন আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। এর মধ্যে কামরাঙ্গীরচরের তেঘরিয়া ও কাঁচপুরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন দুটি নতুন আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল নির্মাণ করবে। সেসব স্থানে জমি অধিগ্রহণসহ অন্যান্য কার্যক্রম শীঘ্রই শুরু করতে পারব বলে আমরা আশাবাদী। আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালগুলোর নির্মাণ সম্পন্ন হলে ঢাকার বাইরের বাসগুলোকে আর ঢাকা শহরের মধ্যে ঢুকতে দেওয়া হবে না।

ঢাকা শহরে পর্যাপ্ত পরিমাণে পার্কিং সুবিধা নেই। ফলে আমাদের মূল সড়কে যত্রতত্র যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহনগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হয়। সেই সমস্যা সমাধানে আমরা সকল যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহনের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে পর্যাপ্ত পরিমাণে নির্ধারিত স্থান চিহ্নিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। চিহ্নিত সুনির্দিষ্ট স্থানেই যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক পরিবহনগুলোকে অবস্থান করতে হবে এবং যাত্রী ওঠা-নামা করাতে পারবে। নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্য কোনও স্থানে কোনও ধরনের যান্ত্রিক- অযান্ত্রিক যানবাহন দাঁড়াতে কিংবা পার্ক করতে দেওয়া হবে না।

প্রয়োজনীয়তা ও যথাযোগ্যতা বিবেচনা করে নতুন ১৮টি ওয়ার্ডের খাল ও নদীর পাড় ঘিরে চার লেন পর্যন্ত প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ করা এবং ভিন্ন ভিন্ন গতির বিভিন্ন ধরনের যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহনের জন্য আলাদা আলাদা লেন করার কর্মপরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।

সুধীবৃন্দ,
এই নগরীর বাসযোগ্যতায় বায়ু, পানি, শব্দ দূষণ অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা। একইভাবে আমাদের প্রিয় এই নগরীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজ অবৈধ দখলে সয়লাব। নগরীর অলি-গলি, নালা- নর্দমা, খাল-জলাশয়, দোকান-বাজার, সড়ক-সড়কদ্বীপে – বলা যায় সর্বত্র অবৈধ দখলের কালো থাবায় বিপর্যস্ত এই শহর। দায়িত্বভার গ্রহণের পর হতে সেসব অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত আমি সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি। আজকের এই সংবাদ সম্মেলন হতে আপনাদের মাধ্যমে অবৈধ দখলদারদেরকে আমি সুস্পষ্ট একটি বার্তা দিতে চাই – সকল প্রকার অবৈধ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান সবসময়ই বলিষ্ঠ থাকবে। হোক সেটা বাজারে দোকান দখল, হোক তা খাল, পথচারী পারাপারের রাস্তা, সড়ক কিংবা খেলার মাঠ দখল। এ বিষয়ে আমরা কাউকে ছাড় দেবো না।

আপনারা দেখেছেন, আমরা ফুলবাড়িয়া সুপার, সুন্দরবন স্কয়ার, বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ হকার্স মার্কেটসহ অনেকগুলো মার্কেট হতে যেমন অবৈধ দখল উচ্ছেদ করেছি তেমনি দীর্ঘ ৮০ বছর ধরে দখলে থাকা রায় সাহেব বাজার ও মাইশা খালের জমিও উদ্ধার করেছি। একইভাবে দখলমুক্ত করা হয়েছে ধানমন্ডি হ্রদ ঘিরে গড়ে ওঠা সরকারি-বেসরকারি সকল অবৈধ দখলদারিত্ব।

আপনারা জেনে নিশ্চয় অবাক হবেন যে, বিগত ২ বছরে আমরা ৬ একরের বেশি অবৈধ দখল মুক্ত করেছি। উদ্ধারকৃত সেসব জমি, দোকান ও বাজারের আর্থিক মূল্যমান প্রায় ৫ শত ৭৪ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, উচ্ছেদকৃত বাজার (মার্কেট) ও স্থাপনাগুলোর অবৈধ পার্কিংও দখল মুক্ত করে আমরা ইজারার উদ্যোগ নিয়েছি। ইতোমধ্যে ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেটের পার্কিং ইজারা দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে।

রাজস্ব আদায়
আমি দায়িত্বভার গ্রহণের সময় ২০১৯-২০ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ৫২৪.০০ কোটি টাকা, যা ২০২০-২১ অর্থবছরে ৭০৩.৩১ কোটি টাকা এবং চলমান অর্থবছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ৬৭৭.০৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে সক্ষম হয়েছি। চলমান অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ৮০০ কোটি টাকা অতিক্রম করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে আমরা ৩০০ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় করার মাইলফলক স্থাপন করতে চলেছি। যথাযথ তদারকি এবং নতুন ২৩টি আর্থিক খাত হতে অর্থ আদায়ের ফলে রাজস্ব আদায়ে আমরা সাফল্য দেখাতে সক্ষম হয়েছি।

প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
ঢাকাবাসীর মৌলিক সমস্যা সমাধানে উল্লিখিত উদ্যোগ ও কার্যক্রমের পাশাপাশি ওয়ার্ড-ভিত্তিক সুষম ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে আমরা আরও কিছু উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে চলেছি-

কাঁচা বাজার নির্মাণ
আমরা প্রতিটি ওয়ার্ডেই একটি করে কাঁচা বাজার প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। ইতোমধ্যে ইসলামবাগ, হাজারীবাগ, মেরাদিয়া, সূত্রাপুর, কাঁঠাল বাগান, মিরনজিল্লা ও খিলগাঁওয়ে কাঁচা বাজারসহ বহুমুখী বাজার (মার্কেট) নির্মাণের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ইসলামবাগে কাঁচা বাজারসহ বহুমুখী বাজার (মার্কেট) নির্মাণের লক্ষ্যে ঠিকাদার নিযুক্ত করা হয়েছে। হাজারীবাগ ও মেরাদিয়ায় কাঁচা বাজারসহ বহুমুখী বাজার (মার্কেট) নির্মাণে দরপত্র কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সূত্রাপুর, কাঁঠাল বাগান, মিরনজিল্লা ও খিলগাঁওয়ে কাঁচা বাজারসহ বহুমুখী বাজার (মার্কেট) নির্মাণে স্থাপত্য নকশা প্রণয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

এছাড়াও আরও ১০/১২টি ওয়ার্ডে কাঁচা বাজার নির্মাণে সম্মানিত কাউন্সিলরদের কাছ হতে আমরা প্রস্তাবনা পেয়েছি। প্রস্তাবিত সেসব জমির মালিক বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ ও সংস্থা বিধায় তা সম্পত্তি বিভাগ কর্তৃক যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র নির্মাণ
আমরা প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত একটি করে সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি। চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন ওয়ার্ডে ২৪টি সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। যেসকল ওয়ার্ডে কোনও সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র নেই এমন পুরাতন ১৯টি ওয়ার্ড ও নবসংযুক্ত ১৮টি ওয়ার্ডে মোট ৩৭টি নতুন সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র নির্মাণ ও ৬টি বিদ্যমান পুরাতন সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র সংস্কার ও উন্নয়নসহ মোট ৪৩টি সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে।

গণশৌচাগার
বিগত ২ বছরে ২, ৩, ৫, ৬, ১১, ১২, ১৮, ১৯, ৩৩, ৩৯, ৪১, ৫৫, ৫৮, ৬৪, ৬৬ ও ৬৯ নম্বর ওয়ার্ডে নতুন ১৭টি গণশৌচাগার নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৩টি গণশৌচাগার নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে, অবশিষ্ট ১৪টির নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। সংস্কার করা হয়েছে ২টি গণশৌচাগার।

খেলার মাঠ
আমরা প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে খেলার মাঠ/পার্ক প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্নক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এরই অংশ হিসেবে বিগত ২ বছরে ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডে লক্ষীবাজার খেলার মাঠ, ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডে টিকাটুলি খেলার মাঠ, ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডে আলমগঞ্জ খেলার মাঠের উন্নয়নের পর তা সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে বকশিবাজার খেলার মাঠের উন্নয়ন কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

আপনারা জানেন, ঐতিহ্যবাহী ধুপখোলা মাঠটি দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে ছিল। আমরা ধুপখোলা খেলার মাঠের উন্নয়নে উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। সেখানে আন্তর্জাতিক মানের একটি ফুটবল মাঠ, মাঠের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে শিশুদের খেলার জন্য আলাদা স্থান (Play Zone) এবং ৭ হাজার ৭৩০ বর্গফুট আয়তনের একটি বাস্কেটবল মাঠ প্রতিষ্ঠা করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

নাম ‘মুক্তাঙ্গন’ হলেও দখলদারদের কবল হতে মুক্তি মেলেনি জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন নানা ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষী হয়ে থাকা ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের উন্মুক্ত স্থানটির। আমরা সেখানে সকল ধরনের দখলদারিত্বের অবসান ঘটিয়ে বাস্কেটবল মাঠসহ আরও বেশ কিছু অনুষঙ্গে উন্মুক্ত স্থানটিকে মুক্তভাবে সাজিয়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।

এছাড়াও ৭০ নম্বর ওয়ার্ডে মেন্দিপুর খেলার মাঠ, ৪ নম্বর ওয়ার্ডে বাসাবো বালুর মাঠ এবং ২ নম্বর ওয়ার্ডে ভূইয়ার মাঠের উন্নয়নে আমাদের কর্মযজ্ঞ চলমান রয়েছে। উন্নয়নের পর সকলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডের শহীদ শেখ রাসেল পার্ক, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মতিঝিল পার্ক, ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের মালিটোলা পার্কসহ আরও বেশ কয়েকটি মাঠ ও উদ্যান।

খাল সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি
কালুনগর খাল, জিরানী খাল, মান্ডা খাল ও শ্যামপুর খাল পরিষ্কার ও খননসহ পাড় ঘেঁষে পায়ে হাঁটার পথ (ওয়াকওয়ে) নির্মাণ, খেলার মাঠ ও শিশু উদ্যান স্থাপনসহ সকলের জন্য একটি নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি, পানি নিষ্কাশন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দূষণমুক্ত নির্মল পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘খাল পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি’ শীর্ষক প্রকল্প প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়েছে। ৮৯৮.৯৩ কোটি টাকার এই উন্নয়ন প্রকল্প বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে বিবেচনাধীন রয়েছে।

আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল পুনরুদ্ধার
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার অভিপ্রায় অনুযায়ী পুরান ঢাকা ও কামরাঙ্গীরচরের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল পুনরুদ্ধার করে দৃষ্টিনন্দনভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। স্বল্প মেয়াদী কাজের অংশ হিসেবে আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলে পানি প্রবাহ সচল রাখার জন্য নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে পলি অপসারণ, ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার এবং দুই পার্শ্বে সীমানা স্থাপনের কার্যক্রম আগামী মাসে শুরু করা হবে। এছাড়াও দীর্ঘমেয়াদী কাজের অংশ হিসেবে ‘বুড়িগঙ্গা আদি চ্যানেল পুনরুদ্ধার ও উন্নয়ন’ কাজ এর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আমরা আশা করছি, আগামী মাসেই পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করতে পারব। পরবর্তীতে বুড়িগঙ্গা আদি চ্যানেলের খনন ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে ডিপিপি প্রণয়ন করে তা প্রকল্প প্রস্তাব হিসেবে প্রেরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণ
রাজধানী ঢাকার সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অন্যতম চারণভূমি। তাই বিবর্ণ ও ধূসর হয়ে চলা ঢাকার ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। তারই অংশ হিসেবে আমরা ঐতিহ্যবাহী নর্থ ব্রুক হল তথা লালকুঠি ভবনের সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছি। এছাড়াও ঐতিহ্যবাহী রূপলাল হাউজ ও আহসান মঞ্জিলের সামনের রাস্তা প্রশস্থ করা, সেখানে গণপরিসর সৃষ্টি করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যাতে করে মানুষ ঢাকার ঐতিহ্য অবলোকনের পাশাপাশি নদী হতেও এসব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।

ঢাকা ফটক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্ত্বর ও ৩ নেতার মাজার সংলগ্ন এলাকায় ঢাকার তৎকালীন মোঘল সুবেদার মীর জুমলা কর্তৃক নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটি ঢাকা ফটক তথা মীর জুমলা গেইট নামে সুপরিচিত। কিন্তু এটা আমাদের অত্যন্ত দুর্ভাগ্য যে, মোঘল স্থাপত্য শৈলীর অনন্য নিদর্শনটি প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। আমরা ঐতিহ্যবাহী সেই ঢাকা ফটকের ঐতিহ্য সংরক্ষণে উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।

কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা
আপনারা জানেন, কামরাঙ্গীরচরে একটি কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় আমরা কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। সেলক্ষ্যে আমরা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানও নিয়োগ করেছি। নিয়োগকৃত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠায় ইতোমধ্যে তাদের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে। আশা করছি যে, আগামী অর্থবছর হতে আমরা সেখানে কার্যক্রম শুরু করতে পারব। তবে সেজন্য ব্যাপক বিনিয়োগের প্রয়োজন। বিশ্ব ব্যাংকের অন্যতম উইন্ডো ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশনসহ দেশি-বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠান সেখানে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আমরা সেগুলো পর্যালোচনা করছি। বিনিয়োগ চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত সেখানে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে আমাদের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।

৫০ তলাবিশিষ্ঠ ‘শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র’ নির্মাণ
কামরাঙ্গীরচরের কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক অঞ্চলকে ঘিরে আমরা বিশদ উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। সেখানে ৫০ তলাবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক মানের একটি সম্মেলনে কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ভবনটিতে ৫ তারকা মানের আবাসিক হোটেলসহ বিশ্বমানের অন্যান্য সুবিধাদির সন্নিবেশ ঘটানো হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নামে আমরা আন্তর্জাতিক সেই সম্মেলন কেন্দ্রের নামকরণ করছি।

ফকিরখালীতে স্মার্ট ইকো সিটি প্রতিষ্ঠা
৭৫ নম্বর ওয়ার্ডের ফকিরখালীতে পরিবেশবান্ধব একটি ইকো স্মার্ট সিটি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে আমরা আমাদের মনোযোগ নিবদ্ধ করেছি।

নতুন জনবল নিয়োগ
নতুন ৫টি অঞ্চলসহ ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ১০টি অঞ্চলে বিভক্ত। কিন্তু এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, নতুন অঞ্চলের জন্য শুধু আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ছাড়া সাংগঠনিক কাঠামোর আর কোনও জনবল নেই। সেসব অঞ্চলের জনবল কাঠামো এখনো অনুমোদন পায়নি। নতুন অঞ্চলের জনবল কাঠামো যেন দ্রুততম সময়ে অনুমোদন লাভ করে সেজন্য আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

শুধু তাই নয়, পূর্বেকার পাঁচটি অঞ্চলের জন্য অনুমোদিত জনবল কাঠামোতেও বিভিন্ন পদে প্রয়োজনীয় লোকবলের ঘাটতি ছিল। আমরা সেসব শূন্য পদে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করে চলেছি। আপনারা জানেন, কর্পোরেশনের ভারী গাড়ি চালকের তীব্র সংকট ছিল। আমরা তা অনেকটা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি। বিগত দুই বছরে আমরা ভারী গাড়ির ৪৭ জন চালক নিয়োগ দিয়েছে। এছাড়াও প্রথমবারের মতো ১ জন কীট নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা, ৪ জন রেজিস্ট্রেশন সহকারি (জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধিকরণ), ১ জন সহকারি আইন কর্মকর্তা,  ৪ জন সহকারি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাসহ মোট ৩৫ ধরনের পদে সর্বমোট ২৫২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

নতুন আইন/ প্রবিধান
আমরা নতুন ৪টি প্রবিধান প্রণয়ন করেছি। (ক) ইমারত নির্মাণ এবং পুনঃনির্মাণের জন্য আবেদনের উপর কর (খ) প্রাইভেট হাসপাতাল, প্যারামেডিকেল ইনস্টিটিউট, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ইত্যাদি নিবন্ধিকরণ ফি (গ) বেসরকারি বাজারের জন্য নিবন্ধনের ফি (ইজারা) এবং (ঘ) বেসরকারি ট্রাক টোল/ মাসুল বাবদ ফি আদায়ে এসব প্রবিধান প্রস্তুতপূর্বক করে অনুমোদনের জন্য তা স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রেরণ করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগরীর জন্য সমন্বিত মহাপরিকল্পনা (২০২০-২০৫০)
আপনারা জানেন, জাতিসংঘ ঘোষিত ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট-২০৩০’ এর ‘লক্ষ্য ও অভীষ্ট’ অর্জন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ‘ঘোষিত রূপকল্প-২০৪১’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকা মহানগরীকে একটি বাসযোগ্য, আধুনিক ও মর্যাদাশীল শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমরা ‘ঢাকা মহানগরীর জন্য সমন্বিত মহাপরিকল্পনা (২০২০-২০৫০) ‘ প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।

‘স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯’ অনুযায়ী নগরীর জন্য মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা আমাদের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু ইতোপূর্বে সেটা কখনোই করা হয়নি। আমি দায়িত্বভার গ্রহণের পর সে বিষয়ে মনোযোগ দেয় এবং ঢাকা শহরকেন্দ্রিক যতগুলো মহাপরিকল্পনা আছে সবগুলো মহাপরিকল্পনাকে সমন্বয় করে আমরা ‘ঢাকা মহানগরীর জন্য সমন্বিত মহাপরিকল্পনা ২০২০-২০৫০ (Integrated City Master Plan for Dhaka 2020-2050)’ প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করি। মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে ইতোমধ্যে আমরা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করেছি। মহাপরিকল্পনায় ভূমি ব্যবহার, যান চলাচল ব্যবস্থাপনা, নর্দমা ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রতিবন্ধকতা, ঐতিহ্য সংরক্ষণসহ অন্যান্য আরও অনেক বিষয়াদি সন্নিবেশ করে Detail Area Plan(DAP), Revised Strategic Transport Plan (RSTP), Drainage Master Plan, Waste Management Master Plan, Sewerage Master Plan-সহ ঢাকা শহরের জন্য অনুমোদিত সকল মহাপরিকল্পনা সমন্বিত করে এই মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলেছে।

দীর্ঘমেয়াদী এই মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের লক্ষ্যে ৭৫টি ওয়ার্ডেই সম্মানিত কাউন্সিলরবৃন্দের সহযোগিতায় রিক্সাচালক, গৃহিনী, ব্যবসায়ী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেনি-পেশার মানুষের সাথে মতবিনিময় সভার (Participatory Rural Appraisal-PRA) আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়াও নগর নিয়ে কাজ করা গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ নিয়ে ‘নগর চিন্তাবিদদের নিয়ে কর্মশালা (Urban Thinkers’ Workshop)’, নগরে কার্যরত ২৬টি সংস্থার সংস্থা প্রধানদের সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

উল্লেখযোগ্য আরও কিছু কার্যক্রমঃ

➢ ঢাকা শহরের অভ্যন্তরীণ যানজট নিরসন এবং যানবাহন চলাচলের গতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বেড়িবাধ সড়কের রায়ের বাজার স্লুইচ গেইট হতে পোস্তগোলা ব্রিজ পর্যন্ত সড়ককে ৬ লেনে প্রশস্থকরণে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

➢ চৌরাস্তাসহ সড়কসমূহের উন্নয়নে সমীক্ষা পরিচালনা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সংকেত স্থাপনের লক্ষ্যে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কাজ চলমান রয়েছে।

➢ ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো, জলাবদ্ধতা নিরসন ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

➢ মগবাজার মোড় হতে বেইলী রোড পর্যন্ত রাস্তা প্রশস্তকরণ ও চৌরাস্তার উন্নয়নে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

➢ বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের গলি ১৪ ফুট হতে বাড়িয়ে ২০ ফুট প্রশস্ত করা হয়েছে এবং পান্থপথ মোড় হতে সোনারগাঁও রোড, বাসাবো বৌদ্ধ মন্দির হতে কালি মন্দির রোড পর্যন্ত বিদ্যমান রাস্তা ৩০ ফুট প্রশস্তকরণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

➢ ৫টি নতুন পথচারী পারাপার সেতু নির্মাণ ও ২টি পথচারী পারাপার সেতু সংস্কার করা হয়েছে।

➢ ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন ৩টি উড়াল সেতুর নিচে নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কাজ চলমান রয়েছে।

➢ ডিসিএনইউপি প্রকল্পের আওতায় শহীদ মতিউর পার্কের সংস্কার ও ল্যান্ডস্কেপিং করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগরীকে রক্ষায় আহবান, আবেদন ও আনুকূল্য প্রার্থনা – 

শহর পরিকল্পনা অত্যন্ত দুরূহ একটি মহাযজ্ঞ। আর ঢাকা শহরের মতো পরিকল্পনাহীন শহরে সেই ব্যবস্থাপনা আরও বেশি দুরূহ। তাই ঢাকা শহরকে একটি সচল, আধুনিক ও মর্যাদাপূর্ণ শহর হিসেবে গড়ে তুলতে কেন্দ্রীয় সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের একান্ত সহযোগিতা প্রয়োজন। সেজন্য ঢাকাবাসীর কিছু নিয়ম-নীতি পরিপালন করা একান্ত আবশ্যক। না হলে যতই বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হোক না কেন, আমরা যতই স্বপ্ন দেখি না কেন, সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপায়ন করা সম্ভব হবে না – যদি না এখনই ঢাকামুখী জনস্রোত রোধ করা যায়। বাস্তবিকতার নিরিখে এটি সুস্পষ্ট যে, ঢাকা শহর ২ কোটিরও বেশি জনগোষ্ঠীর ভার বহনে অক্ষম। এই শহরে দুই কোটির বেশি জনগোষ্ঠীকে ধারণ করার সক্ষমতা নেই। কিন্তু প্রতিনিয়ত মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সুতরাং সরকারকে সে ব্যাপারে এখনই পরিকল্পনা নিতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ‘গ্রাম হবে শহর’—যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন, সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ত্বরাণ্বিত করতে হবে। সেজন্য জরুরিভিত্তিতে ঢাকার আশপাশের শহর, এলাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে পরিকল্পিত নগরায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত — শহর পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনাকে একটি সময়সীমায় আওতায় নিয়ে আসতে হবে, সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে। শহর কখন জেগে উঠবে, কখন ঘুমাবে – সে বিষয়ে পৃথিবীর অন্যান্য শহরের মতোই সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ঢাকা শহরের জন্যও থাকা আবশ্যক। সুতরাং আমরা মনে করি, ঢাকা শহরকে একটি বাসযোগ্য ও উন্নত শহর হিসেবে গড়ে তুলতে অন্যান্য অনুষঙ্গের পাশাপাশি রাত আটটার মধ্যে বেসরকারি অফিস, দোকান-পাট, বাজার (মার্কেট), শপিং মল ইত্যাদি বন্ধ করতে হবে। খাবার হোটেল রাত ১০টার পর খোলা রাখা যাবে না। ঔষধালয়, চিকিৎসালয় ইত্যাদি একান্ত জরুরি সেবা ও প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট সময়ের পর খোলা রাখতে হলে কর্পোরেশনের বিশেষ অনুমতি নিতে হবে। এতে যেমন শহরের কার্যক্রম শৃঙ্খলায় আসবে তেমনি লোকজনও তাদের পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধবদের সাথে সময় কাটাতে পারবে, পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন মজবুত ভিত্তি লাভ করবে।

তৃতীয়ত — আমরা যে খালগুলোর দায়িত্ব বুঝে নিয়েছি, সেগুলো হতে বর্জ্য ও পলি অপসারণ করে চলেছি। খাল পুনরুদ্ধার ও সেগুলোর উন্নয়ন এবং সেখানে নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। কিন্তু খালে যদি পায়োঃবর্জ্য মিশে যায় তাহলে আমাদের সকল উদ্যোগ ব্যর্থ হবে। নান্দনিকতা নোংরা ও দূষিত পরিবেশে বিলীন হয়ে যাবে। সুতরাং এখন থেকেই আমাদেরকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। আগামী পহেলা জুলাই থেকে আমাদের নর্দমায় কোন পয়োঃবর্জ্য/ পানির সংযোগ আমরা আর দিতে দেবো না। পয়োঃবর্জ্য/ পানি ব্যবস্থাপনা ওয়াসার দায়িত্ব। ওয়াসা সেই দায়িত্ব পালন করবে বলে আমরা আশাবাদী। ওয়াসা সেই দায়িত্ব পালন করুক বা না করুক, আমরা আমাদের স্ট্রম স্যুয়ারেজে আর কোন পয়োঃবর্জ্যের/ পানির সংযোগ দেবো না। সেজন্য, ঢাকাবাসীকেও আমরা অনুরোধ করছি – আপনারা আপনার বাড়ি/ভবনে যথানিয়মে সোক ওয়েল ও সেফটিক ট্যাংক নির্মাণের ব্যবস্থা নিন। নতুবা এই শহরকে বাঁচাতে আমাদেরকে কঠোরতা প্রদর্শন করতে হবে।

চতুর্থতঃ আমরা পথচারীবান্ধব একটি শহর গড়ে তুলতে চাই। সেজন্য আগামী অর্থবছর থেকেই হকার ব্যবস্থাপনাকে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসতে চাই। ঢাকা শহরে দেখা যায়, যার যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই শহরের বিভিন্ন রাস্তা-ঘাট, হাঁটার পথ, পথচারী পারাপার সেতু দখল করে জনগণ ও যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। এ ধরনের মনোবৃত্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রচুর অর্থ ও পরিশ্রমের বিনিময়ে এসব অবকাঠামো সৃষ্টি করা হয়ে থাকে। সেগুলো বিভিন্নভাবে দখল হচ্ছে – এটা মেনে নেওয়া যায় না। আমরা অনুধাবন করি যে, তাদেরকে পুনর্বাসন করা প্রয়োজন। সে বিষয়ে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা হকার ব্যবস্থাপনাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পুলিশ প্রশাসনসহ সকল অংশীজনের সাথে মতবিনিময় করব। পর্যায়ক্রমে যাতে তাদেরকে সরানো যায় সেজন্য আমাদের ধারাবাহিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। রাস্তাগুলো কিভাবে হকার মুক্ত করা যায়, হাঁটার পথসমূহ কিভাবে উন্মুক্ত করা যায় — সেটাই হবে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। সেই প্রেক্ষিতে আমরা মনে করি, কিছু কিছু সড়ক/ এলাকাকে আমরা লাল চিহ্নিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করব। সেসব সড়কে কোনভাবেই কোনও হকারকে বসতে দেওয়া হবে না। কিছু সড়ককে হলুদ চিহ্নিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হবে। সেসব সড়কে সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য হকাররা বসতে পারবে, তাদের ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারবে। সময়সীমার বাইরে সেসব সড়কেও কোনও ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না। এভাবে হকার ব্যবস্থাপনাকে নিয়ন্ত্রণ এবং শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসা যাবে।

পঞ্চমতঃ ঢাকা শহরে যে পরিমাণ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার চেয়ে অনেক কম প্রতিষ্ঠানই কর্পোরেশনের কাছ হতে বাণিজ্য অনুমতি গ্রহণ করে থাকে। অনেকেই বাণিজ্য অনুমতি ছাড়াও নির্বিঘ্নে ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। আগামী অর্থবছর হতে এ বিষয়ে আমরা কঠোর হবো। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন এলাকায় বাণিজ্য অনুমতিবিহীন আর কোনও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেওয়া হবে না।

সম্মানিত সাংবাদিকবৃন্দ,

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার অভিযাত্রায় ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত রাজধানী গড়ে তোলার লক্ষ্যে সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সহিত মেয়র হিসেবে আমার ওপর অর্পিত পবিত্র দায়িত্ব আমি পালন করে চলেছি। আমি মনে করি, আমার ৫ বছর মেয়াদের মধ্যে প্রথম বছরে উন্নত ঢাকার সোপান পানে ১টি মজবুত ভিত্তি রচনা করতে সক্ষম হয়েছি। দ্বিতীয় বছরে সেই ভিত যেমন শক্তিশালী হয়েছে তেমনি পেয়েছে নতুন মাত্রাও।

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, অতীতের ন্যায় আগামী দিনেও গণমাধ্যমের আন্তরিক, বস্তুনিষ্ঠ ও দূরদর্শী সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে এবং ঢাকা শহরের জন্য সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সকলের আন্তরিক প্রচেষ্ঠায় আমরা একটি আধুনিক, সচল ও উন্নত ঢাকা গড়ে তুলতে সক্ষম হবো, ইনশাআল্লাহ।

আপনাদেরকে আবারও ধন্যবাদ জানিয়ে আমার বক্তব্য এখানেই শেষ করছি।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু