চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রাজনৈতিক সরকারের আমলেও কেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা?

জনগণের টাকা নিয়ে পরের ধনে পোদ্দারি করতে করতে যেন খেই হারিয়ে ফেলছে আমলারা? বালিশ কাণ্ড, পর্দা কাণ্ড, ইলেকট্রিক ফ্যান কাণ্ড, ছাগল কাণ্ড, খিচুরী কাণ্ড আরও কত কি?

এগুলো কি কেবলই ইস্যু সৃষ্টি করে অর্থ ছাড় করা নয়? অথচ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী খিচুরি প্রশিক্ষনের পক্ষে সাফাই গেয়ে চলেছেন৷ এই সাফাইকে জনগণ কিভাবে গ্রহণ করছে তা কি তিনি বুঝেন? তিনি বলছেন, খিচুড়ি নিয়ে হৈ চৈ করার মতো অবস্থা নেই। অর্থাৎ স্কুলের বাচ্চাদের জন্য রান্না করা খাবার খিচুড়ি ব্যবস্থাপনা দেখতে বিদেশে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের যে প্রস্তাব করা হয়েছে তা নিয়ে হৈ চৈ করার মতো অবস্থা নেই বলে মন্তব্য করলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন। তিনি তার বক্তব্যে আরও যুক্ত করেন, সাংবাদিকতায় বিএনপি-জামায়াতের লোকজন ঢুকে পড়েছে৷  তারাই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অহেতুক সংবাদ পরিবেশন করে হইচই ফেলে দিচ্ছে ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে।

বিজ্ঞাপন

এভাবেই মন্ত্রী খিচুড়ি প্রশিক্ষণের জন্য কর্মকর্তাদের বিদেশ প্রেরণ নিয়ে গণমাধ্যমে পরিবেশিত সংবাদের সমালোচনা করেন। তার এ সমালোচনা যৌক্তিক না অযৌক্তিক তার জবাব দেবে কে? অবশেষে ব্যাপক সমালোচনার মুখে খিচুড়ি রান্না শিখতে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের বিষয়টি বাতিল করতে বলল পরিকল্পনা কমিশন।এক্ষেত্রে সচিবালয় ও মন্ত্রণালয়ের ভুল সিদ্ধান্ত ও ভুল সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাইয়ের কি কোন জবাবদিহিতা নেই? কেন তারা জনগণের অর্থ বাজে খরচ করতে চেয়েছিল? প্রাথমিক বিদ্যালয়ের  ফিডিং কর্মসূচির আওতায় একটি প্রকল্পে বিদেশে গিয়ে ডিম-খিচুড়ি, সবজিসহ অন্যান্য খাবার রান্না ও প্রসেসিং শিখতে পাঁচ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছিল। এছাড়া দেশে একই বিষয়ে প্রশিক্ষণের জন্য আরও চাওয়া হয়েছিল ১০ কোটি টাকা। খিচুড়ি রান্না শেখার জন্য ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের ভারত সফরে পাঠানোর প্রস্তাবও করেছিল প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। কেন এই টাকার মালিক কি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর না জনগণ?তারা কি জনগণের মত নিয়েছে?

বিজ্ঞাপন

জনগণের টাকা হাতিয়ে নিতে আমলারা ক্রমশ বেপরোয়া হয়ে উঠছে৷ জবাবদিহিতা না থাকায় তাদের এই বেপরোয়াপনা৷  বিল্ডিং দেখতে বিদেশ যাবেন সরকারের ৩০ কর্মকর্তা। এতে প্রত্যেক কর্মকর্তার পেছনে ব্যয় হবে ৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে ৯৭৩ জন পরামর্শকের জন্য ১৯ কোটি ৮২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। ‘গণগ্রন্হাগার অধিদফতরের বহুতল ভবন নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পে এসব ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। বিল্ডিং নির্মাণ প্রকল্পখাতে এ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।এদিকে প্রায় ৫শ’ কর্মশালার ভুয়া বিল দেখিয়ে ১৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে। শুধু কি তাই? সংবাদপত্রে এসেছে  ঠিকাদারির দায়িত্ব নিয়ে কাজ না করেই টাকা তুলে নিয়েছে পরিচালকের ভাগ্নে ও চাচাত ভাইয়ের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

এছাড়াও পরিবার পরিকল্পনার অধিদপ্তরের কর্মশালাগুলো যেন হয়ে উঠছে অবৈধ অর্থ উপার্জনের খাত। গেল দুই অর্থবছরে কর্মশালা না করেই ভুয়া বিল জমা দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে অসাধু কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেট। তবে কি বলবেন এসব সংবাদও বিএনপি জামাতের সাংবাদিকরা করেছে?সংবাদটি কে করলো সেটা মুখ্য না সংবাদটি সত্য কিনা সেটা মুখ্য?

বিজ্ঞাপন

কথায় কথায় বিএনপি জামাতের শত্রু জুজু দেখিয়ে আর কতদিন?এসব সিদ্ধান্ত যে আমলারা নিচ্ছে তা কি দলীয় রাজনৈতিক সরকারের অজানা?রাজনৈতিক সমর্থনে কি তারা এসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না আমলাদের স্বেচ্ছাচারিতায়?দ্বিতীয়োক্তটি হলে এর জবাবদিহিতা আবশ্যক নয় কি?এসব বরাদ্দের সুবিধাও কিন্তু আমলারাই নেবে৷ বিদেশ সফরে কোন রাজনৈতিক কর্মীকে পাঠানো হবেনা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এই আমলাদের সুযোগের পক্ষেই সাফাই গাইলেন। কিন্তু তিনি কি মন্ত্রী হয়েছেন আমলাতান্ত্রিকতায় না রাজনৈতিক জটিলতায়? তাকে মন্ত্রীর চেয়ারে বসিয়েছে নিশ্চয়ই রাজনৈতিক দল আমলারা নয়। তাই নয় কি? ক্ষমতায় রাজনৈতিক দলের পরিবর্তন হলে আজ তিনি যাদের সুবিধার পক্ষে সাফাই গাইলেন তাদের মাঝে কেউ কি তার কথা শুনবেন তখন? রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ছাড়া কে তার পক্ষে থাকবে সেসময়?

ভুয়া কর্মশালার বিল ভাউচার দেখিয়ে ১৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নিলো পরিবার কল্যান অধিদপ্তর। ঠিকাদারীর দায়িত্ব নিয়ে কাজ না করেই টাকা তুলে নিয়ে গেছে পরিচালকের ভাগ্নে ও চাচাতো ভাইয়ের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান৷  এখানেও কিন্তু কোন রাজনৈতিক নেতাকর্মী জড়িত নয়৷এ অভিযোগে কি কোন আমলা গ্রেপ্তার হলো? বিল্ডিং দেখতে বিদেশ সফরে যাবেন ৩০ কর্মকর্তা৷ প্রত্যেক কর্মকর্তার পেছনে ব্যয় হবে ৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকা৷ এ কর্মকর্তাদের মাঝেও কিন্তু রাজনৈতিক কর্মী নেই৷ যত দোষ নন্দ ঘোষ রাজনৈতিক কর্মীর সামান্য একটু দোষ পেলেই মুখিয়ে ওঠে সবাই৷ আমলাদের অনিয়মের তদন্ত কমিটিতে কোন রাজনৈতিক কর্মী থাকেনা থাকে আমলারাই৷ কিন্তু রাজনৈতিক কর্মীর কোন অনিয়মের তদন্ত কমিটিতে রাজনৈতিক নেতা থাকেনা সেখানেও থাকে আমলারাই৷ কেন দেশে কি তবে রাজনৈতিক সরকার নয় আমলার সরকার?

আমলা সিন্ডিকেটেই দুর্নীতি করেছে শাহেদ করিম। কিন্তু পরিচয় তুলে ধরা হচ্ছে তার রাজনৈতিক পরিচয়টি?মাস্ক দুর্নীতির অভিযোগে এক সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রী গ্রেপ্তার হলো৷ জিকে শামীমেরও রাজনৈতিক পরিচয়টাই সামনে আনা হলো৷ কিন্তু আমলারাই যে তাকে দিয়ে এসব অপকর্ম করাচ্ছে এ বিষয়টা সামনে আসছেনা৷ এভাবেই শত অনিয়ম করেও তারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে৷ অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক কর্মীদের ফাঁসিয়ে তারা থেকে যায় তফাতে৷নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানোর তাদের জুড়ি মেলা ভার৷ ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলাস্বাস্থ্য য় ‘যার জমি আছে ঘর নেই, তার নিজ জমিতে গৃহনির্মাণ’ প্রকল্পের ঘর নির্মাণে নানা অনিয়ম ও দু’র্নীতির অ’ভিযোগ উঠেছে।  উপজে’লার হাবিবপুর গ্রামে প্রকল্পের একটি ঘরের কাজ সম্পন্ন হওয়ার দুইদিন পর দেয়াল ধসে পড়েছে। এখানেও আমলারা দোষ চাপিয়ে দিচ্ছেন নির্মান শ্রমিকদের উপর৷ ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের দুর্নীতি খুঁজতে গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সেল কাজ করছে। কিন্তু আমলাদের অনিয়ম দুর্নীতি খুঁজতে কোন রাজনৈতিক সেল কি তৎপর রয়েছে৷ রয়েছে কি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সেল অথবা সংসদীয় সেল?

হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ফাঁস হওয়ার পরেও আমলাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। অন্যদিকে, সরকারি কর্মচারী আইন ২০১৮ প্রণয়নের মাধ্যমে তাদের এক ধরনের দায়মুক্তি দেওয়া হল। এতে বলা হয়েছে, ফৌজদারি মামলা ছাড়াও দুর্নীতির মামলায় আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করার আগে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গ্রেপ্তার করতে চাইলে সরকারের অনুমতি নিতে হবে৷ কিন্তু কোন রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করলে দলের কোন পূর্বানুমতি লাগেনা। বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার করা যাবেনা এই উদ্দেশ্যে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল। অনেকেই বলছেন সে আদলেই সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীরা ইনডেমনিটি আদায় করে নিলো। কিন্তু প্রশ্ন এ ইনডেমনিটি কি দুর্নীতি দুর্বৃত্তায়নের ক্ষেত্রকে আরও প্রসারিত করবেনা?রাজনীতির নীতিনির্ধারকদের কাছেই এ প্রশ্নটা রইলো৷

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)