চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রাজনীতিতে নারায়ণগঞ্জ কী বার্তা দিলো?

‘সন্ত্রাসের জনপদ’ বলে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে যে নির্বাচন হলো, সেখানে একজনও রক্তাক্ত হননি। ভোটের দিন বিকেলে একটু ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হলেও সেটিকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলাই শ্রেয়। আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিও এই নির্বাচন নিয়ে ওই অর্থে কোনো অভিযোগ করেনি। পরাজিত মেয়র প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খান অবশ্য বলেছেন,‘সূক্ষ্ম কারচুপির আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।’ বোঝাই যাচ্ছে, এটি বলার জন্য বলা। তবে ভোট গ্রহণ শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংবাদ সম্মেলনে প্রার্থী ও ভোটারদের ধন্যবাদ দিয়েছেন। বলেছেন, সবার সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছে।

এত ভালোর মধ্যেও কিছুটা বিতর্ক তৈরি করেছেন নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। নৌকায় ভোট দিয়ে সেটি তিনি সবাইকে ব্যালট পেপার দেখিয়েছেন, যা টেলিভিশনেও প্রচারিত হয়েছে। ভোট নাগরিকের অধিকার এবং এটি গোপনীয় বিষয়। এভাবে প্রকাশ্যে ব্যালট দেখানো বেআইনী। ফলে নির্বাচন কমিশন এজন্য তাকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেবে কি না—আমরা জানি না।

সিইসির কথাটি ধরেই এগোনো যায়। তিনি বলেছেন সবার সহযোগিতার কারণে ভালো নির্বাচন হয়েছে। বিষয়টিকে আরেকটু ঘুরিয়ে এভাবে বলা যায়, একটি ভোট কেমন হবে, তা এককভাবে নির্ভর করে পলিটিক্যাল উইল বা রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। অর্থাৎ সরকার যদি মনে করে নির্বাচনে কোনো প্রভাব বিস্তার করবে না, তাহলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে অবাধ ও ভালো নির্বাচন করা সম্ভব। কিন্তু সরকার বা সরকারি দল যদি নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে চায়, তাহলে নির্বাচন কমিশন যত স্বাধীন ও শক্তিশালীই হোক না কেন, সেই নির্বাচন শান্তিপূর্ণ এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করা কঠিন।সবার যে সহযোগিতার কথা সিইসি বলেছেন, সেটি মাঠে মারা যেতে বাধ্য। নারায়ণগঞ্জে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছিল বলেই বিনা রক্তপাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে বা হতে পেরেছে।

নারায়নগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে (নাসিক) নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হয়ে বিজয় চিহ্ন দেখান সেলিনা হায়াৎআইভী

এই ভোটে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী যে জিতবেন, তা সবারই জানা ছিল। এর মূল কারণ তার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা। নৌকা প্রতীক তাকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। অর্থাৎ তার যে জনপ্রিয়তা, তাতে তিনি স্বতন্ত্র দাঁড়ালেও যে জয়ী হতেন, সে বিষয়ে সন্দেহ কম। ফলে বিএনপিও জানত যে এই নির্বাচনে তাদের প্রার্থী জয়ী হবেন না। কিন্তু তারপরও তারা এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। তারা বলেছে, এটি একটি টেস্ট কেস। অর্থাৎ এই নির্বাচনের ওপর নির্ভর করছে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের ভবিষ্যৎ।

যদি তাই হয় তাহলে প্রশ্ন, নারায়ণগঞ্জের এই নির্বাচন বিএনপিকে কী বার্তা দিলো? অনেকদিন ধরেই একটা পপুলার কথা বাজারে চালু আছে যে, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ ৪০টি সিটও পাবে না। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ সেখানে ভিন্ন বার্তা দিলো। দেখা গেলো, এখানে বিএনপির প্রার্থী বিপুল ভোটের ব্যবধানে হেরে গেছেন। এই সমীকরণে যদি জাতীয় নির্বাচন হয় তাহলে তার ফলাফল কী হবে তা সহজেই অনুমেয়। ফলে নারায়ণগঞ্জের এই নির্বাচন বিএনপির ওপর কিছুটা মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করবে বলে ধারণা করা যায়।

বিজ্ঞাপন

কেউ হয়তো দ্বিমত পোষণ করবেন এই বলে যে, নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সমীকরণ টানা যৌক্তিক নয়। আবার সেখানে ব্যক্তি আইভীর যে গ্রহণযোগ্যতা—সেটি অন্য এলাকার অন্য প্রার্থীদের সঙ্গে তুলনীয় নয়। তাছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জয়-পরাজয়ের সঙ্গে সরকারের গদি বদলের সম্পর্ক না থাকায় সরকার এই নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, তা নিয়ে সরকারের খুব বেশি মাথাব্যথা হয় না। কিন্তু তারপরও বলা যায়, নারায়ণগঞ্জের আলোচিত এই নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমে এ মুহূর্তে বিএনপি-আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তার অনেকখানি ধারণা করা যায়।

নিয়ম অনুযায়ী ২০১৯ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে।ধরা যাক বিএনপির দাবি অনুযায়ী নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ সরকার গঠিত হলো। স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের অধীনে অবাধ-সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট হলো। কিন্তু তারপরও মানুষ কি নিরঙ্কুসভাবে বিএনপিকে বিজয়ী করবে? প্রায় ১০ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে বিএনপি। সংসদেও নেই প্রায় তিন বছর ধরে। প্রশ্ন হলো, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো ইস্যুতে বিএনপি কি জনগণের কাছে এটি প্রমাণ করতে পেরেছে যে, তারা আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশি ভালো?

রামপালসহ এরকম ইস্যুতেও কি বিএনপি ওই অর্থে কোনো জনমত তৈরি করতে পেরেছে? তাহলে বিএনপির তরফে যে দাবি করা হয়, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হবে—তার ভিত্তি কী? আর গত কয়েক বছরে বিএনপি যেরকম একটি মৃতঘোড়ায় পরিণত হয়েছে—তাতে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দলটি আসলেই কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে—তা নিয়েও সংশয় প্রকাশের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

একটি নির্বাচন কতটা অবাধ ও শান্তিপূর্ণ হবে—তার অনেকখানি নির্ভর করে সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতার ওপর। নারায়ণগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা পক্ষপাতমূলক ছিল না এবং সেখানে নির্বাচনি কর্মকাণ্ডে দায়িত্বপ্রাপ্তরাও চাপমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের এটিই সবশেষ বড় নির্বাচন। ফলে তারাও চায়নি শেষ মুহূর্তে এসে কোনো বিতর্কে জড়াতে। কেননা আগের অনেক নির্বাচনেই এই কমিশন বিতর্কিত ও সমালোচিত হয়েছে।

একটি ভালো নির্বাচন গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। নারায়ণগঞ্জে ভালো নির্বাচন হয়েছে মানে সেখানে গণতান্ত্রিক চর্চার প্রথম ধাপ অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু যে কাজটি বিএনপির প্রার্থী করতে পারতেন বা এখনও পারেন—তা হলো, এই প্রক্রিয়াকে আরেকটু এগিয়ে নিতে তিনি ভোটের আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণার আগেই সেলিনা হায়াৎ আইভীকে অভিনন্দন জানাতে পারতেন এবং তার বাসায় মিষ্টি ও ফুল পাঠাতে পারতেন। এতে করে রাজনীতিতে নতুন এই প্রার্থী দেশের গণতন্ত্র চর্চার ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকতেন। বিএনপি-আওয়ামী লীগের যে রেষারেষি, যে বিরোধ-সেখানে একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারত। এটুকু সহনশীলতা এবং পরাজয় মেনে নেয়ার মানসিকতা গণতন্ত্রের জন্য খুবই জরুরি।

নির্বাচনে একজন জিতবেন, একজন বা অনেকে হারবেন—এটিই স্বাভাবিক। খারাপ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কারো জয়ী হওয়ায় কৃতিত্ব নেই। বরং একটি খারাপ নির্বাচনে কেউ একজন জিতলেও সেখানে হেরে যায় নির্বাচনি ব্যবস্থা, হেরে যায় গণতন্ত্র এবং সর্বোপরি হেরে যায় মানুষ। পক্ষান্তরে একটি ভালো নির্বাচনে জয়ী হয় গণতন্ত্র, জয়ী হয় ভোটার তথা মানুষ। নারায়ণগঞ্জে গণতন্ত্র ও মানুষের যেমন জয় হয়েছে, ভবিষ্যতে সব নির্বাচনে এভাবেই গণতন্ত্র ও মানুষের জয় হবে-এটিই প্রত্যাশা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

বিজ্ঞাপন