চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রবি বাবুর শ্বশুরালয় এবং পূর্বপুরুষের ভিটা দর্শন

এক জীবনে কত কিছু নিয়েই না লিখেছেন। বলতে গেলে হেন কোনো বিষয় নেই, যা তাঁর লেখার বিষয়বস্তু হয় নি। তাঁর লেখার পরিমাণ হয়ে আছে অনন্ত এক বিস্ময়। এক জীবনে একজন মানুষ এত লেখেন কী করে? এত এত লেখার পরও অনেক বিষয় রয়ে গেছে অনালোচিত। অনালোকিত। অনাবিষ্কৃত। ব্যক্তিগত অনেক কথাই তিনি ঊহ্য রেখে গেছেন। পারিবারিক জীবন নিয়ে খুব বেশি মুখ খোলেন নি। বিশেষ করে স্ত্রী আর শ্বশুরালয় নিয়ে বোধকরি তাঁর এক ধরনের অস্বস্তি ছিল। ছিল নির্লিপ্ততাও। না হলে এ বিষয়ে তিনি কেন এত নিশ্চুপ ছিলেন?

তাঁর লেখনি, তাঁর কর্মকাণ্ড ও তাঁর জীবন নিয়ে এন্তার লেখা হয়েছে এবং হচ্ছে। তাঁকে নিয়ে গবেষণাও তো কম হচ্ছে না। নিত্য-নতুনভাবে উম্মোচিত হচ্ছেন তিনি। কত কত বিষয় নিয়ে আলোকপাত করা হচ্ছে। তাঁর মন মজেছে, এমন নারীদের নিয়েও তো লেখার কমতি নেই। কিন্তু তাঁর শ্বশুর বাড়ির বিষয়ে খুব বেশি তথ্য বা লেখা পাওয়া যায় না।

বিজ্ঞাপন

অথচ শ্বশুর বাড়ি নিয়ে তাঁর অনেক স্মৃতি, অনেক মুগ্ধতা, অনেক নস্টালজিয়া থাকার কথা। সেটি তো শুধু শ্বশুরালয় নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁদের বংশের অনেক ইতিহাস, অনেক ঐতিহ্য, অনেক গৌরব। তাঁর শ্বশুর বাড়ি যে গ্রামে, সেই গ্রামটি তো তাঁর মাতুল বাড়িও। এ গ্রামের সঙ্গে পারিবারিক বন্ধন অনেক আগে থেকেই। এমনকি তাঁদের পূর্বপুরুষ পিঠাভোগের জমিদার জগন্নাথ কুশারী এ গ্রামের পতিত ব্রাহ্মণের ঘরে বিয়ে করার অপরাধে জাতচ্যুত হয়ে শ্বশুরালয়ে ওঠেন এবং সেই সুবাদে এখানে দীর্ঘ দিন বসবাসও করেছেন। একটা সময় পূর্বপুরুষদের কেউ কেউ জ্ঞাতি কলহে বিরক্ত হয়ে কলকাতা যান এবং সেখানেই থিতু হন।

পরবর্তীকালে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা ঠাকুর পরিবার হিসেবেই বিখ্যাত হন। কিন্তু তার আগে যে গ্রামটিতে বসবাস, সেখানকার আলো-হাওয়া-জল-মাটি তো বংশানুক্রমে তাঁর দেহ-মনে প্রবাহিত হওয়ার কথা। আর কিছু না হোক, অন্তত মায়ের জন্মস্থান বলে কথা। মামা বাড়িতেও কতবারই এসেছেন। খেয়েছেন দুধ ভাত। সেই স্মৃতি কি তাঁকে উদ্বেলিত করেনি? তাহলে এ নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই কেন?

জরুরি এক কাজে একদিনের ঝটিকা সফরে খুলনা যাওয়ার পর সুযোগ পেয়ে ছুটে যাই দক্ষিণডিহি গ্রামে। খুলনার ফুলতলা উপজেলা থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। যশোর জেলার সীমানা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। আলো ঝলমল সকালে ইজিবাইকে গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে সেখানে যাই। শতাধিক বছর আগে এ পথ নিশ্চয়ই এমন সুগম ছিল না। দুই পাশে তরুসার। ছায়াময়। তার ফাঁকে ফাঁকে নয়নমনোহর গ্রামীণ দৃশ্যপট। সবুজ ধানখেত। পাখিদের কলকাকলি।

দূর থেকেই দ্বিতল সাদা একটি বাড়ি দৃষ্টি কেড়ে নেয়। পারিপার্শ্বিক পরিবেশের মধ্যে ব্রিটিশ ঘরানার বাড়িটির আভিজাত্য ও পরিপাট্য নজর না কেড়ে পারে না। নিচের তলায় চারটি ঘর। উপরের তলায় দুটি। সামনে বড় একটি খোলামেলা বারান্দা। তাতে মনের আনন্দে লুটোপুটি খেতে থাকে দুষ্টুমিষ্টি রোদ।

বাড়িটি বেণীমাধব রায়চৌধুরীর। তিনি ছিলেন কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর এস্টেটের সেরেস্তাদার। তাঁর স্ত্রী দাক্ষায়ণী দেবী। তাঁদের একমাত্র কন্যা ভবতারিণীর জন্ম সম্ভবত ১৮৭৪ সালের ১ মার্চে। ফুলি নামেই কাছের মানুষদের কাছে পরিচিত ছিলেন। জোড়াসাঁকো পরিবারের প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর দক্ষিণদিহি গ্রামের রামনারায়ণ চৌধুরীর কন্যা সারদা দেবীকে বিয়ে করেন। উভয় পরিবারই ছিলেন পিরালি বংশোদ্ভূত। এই দম্পতির কনিষ্ঠ সন্তান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন সাহিত্যে।

সারদা দেবীর পিসি আদ্যাসুন্দরীর ঘটকালিতে ভবতারিণীকে বিয়ে করেন রবি। ১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর ব্রাহ্ম মতে বিয়ে হয়েছিল জোড়াসাঁকোর মহর্ষি ভবনে রবিদের পৈত্রিক নিবাসে। এটি ছিল ব্যতিক্রমধর্মী এক ঘটনা। বিয়েতে কোনো আড়ম্বর ছিল না। এমনকি নিজের পৈত্রিক নামটিও হারিয়ে ফেলতে হয় ভবতারিণীকে। বিয়ের পর স্বামী তাঁর নামকরণ করেন মৃণালিনী।

১৯ বছরের বিবাহিত জীবন ছিল আড়ম্বরহীন। তবে আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও সারল্য দিয়ে পরিবারের সবার হৃদয় জয় করতে সক্ষম হন তিনি। বিত্তবান পরিবারের পুত্রবধূ হয়েও তাঁর মধ্যে দেখানদারি ভাব একদমই ছিল না। পাঁচ সন্তানের জননী হন তিনি। তিন কন্যা ও দুই পুত্র মাধুরীলতা, রথীন্দ্রনাথ, রেণুকা, মীরা ও শমীন্দ্রনাথ। বিয়ের পরই একবার নিজ বাড়ি দক্ষিণডিহিতে এসেছিলেন ভবতারিণী। এরপর আর আসতে পারেন নি।

বিজ্ঞাপন

রবি মামার বাড়ি এলেও শ্বশুরবাড়ি এসেছেন কিনা জানা যায় না। তবে বিয়ের আগে পাত্রী দেখার উছিলায় একবার বোধকরি ঘুরে গিয়েছিলেন। বাধ্য হয়ে নিজেদের এস্টেটের কর্মচারীর মেয়েকে বিয়ে করায় বোধকরি একরকম অস্বস্তি ছিল। অস্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করতেন হয়তো। রবির পিতৃব্য ও চিত্রশিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর জানিয়েছেন, বিয়ের ব্যাপারে এক রকম চাপে পড়েই শেষ পর্যন্ত নিমরাজি হয়েছিলেন রবি। তাহলে তিনি কি অন্য কারও প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত ছিলেন?

একটি সূত্রে জানা যায়, একটি মামলার কারণে খুলনা মহকুমা হাকিমের আদালতে তাঁকে হাজিরা দিতে হয়। সেই সুবাদে ১৯০৮ সালের ৪ ডিসেম্বর শ্বশুরবাড়ি নাকি বেড়াতে আসেন। অবশ্য তার আগেই ১৯০২ সালের ২৩ নভেম্বর ভবতারিণীর মৃত্যু হয়। দক্ষিণডিহির কোথায় রবির মামাবাড়ির ভিটা, তা সঠিকভাবে জানা যায় নি।

ভবতারিণীর পরিবার অনেক আগেই কলকাতা চলে গেলেও সেখান থেকেই সম্পত্তির দেখভাল করা হতো। কিন্তু দেশভাগের পর এই সম্পত্তি আস্তে আস্তে বেদখল হতে থাকে। তারপরও ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত ক্ষীণ হলেও তাঁদের একটা যোগাযোগ ছিল। ক্রমান্বয়ে তা চলে যায় দখলদারদের কবজায়। একপর্যায়ে এটি হয়ে পড়ে ঠিকানাবিহীন।
পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হওয়ার কারণে ১৯৯৫ সালে খুলনা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বাড়িটি উদ্ধার করা হয়। এটি এখন পরিচিত ‘দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্স’ নামে। ১৯৯৯ সালের ১৯ নভেম্বর বাড়িটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তখন থেকে এটি পরিচালনা করে আসছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।

প্রথমে বাড়িটি ছিল দোচালা টিনের। ভবতারিণীর সঙ্গে রবির বিয়ের পর সেখানে দ্বিতল পাকা ঘর নির্মাণ করা হয়। বর্তমান কাঠামোটি সে সময়ের। নিজেদের মর্যাদার খাতিরে ঠাকুর পরিবারই এটা নির্মাণ করে দেয়। এখন বাড়িটির অবয়ব আর আগের মতো নেই। খোলনলচে খানিকটা বদলে ফেলা হয়েছে। তবে বেড়েছে সীমানা। সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে মঞ্চ। ভবনটির অবকাঠামো ছাড়া অতীতের তেমন কিছু নেই। হাল আমলে সংযোজিত হয়েছে কিছু ফটোগ্রাফ।

দক্ষিণদিহি গ্রামটি এখন পরিচিত ‘পাঁপর‘ গ্রাম হিসেবে। দেখতে পেলাম, কমপ্লেক্সের বিরাট চত্বরে কার্তিকের রোদে শুকানো হচ্ছে মচমচে এই ভাজা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুর বাড়ি কালের ধুলোয় একসময় হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু একটু একটু করে ফিরছে তার উজ্জ্বলতা। মচমচে ভাজার গ্রামটি ক্রমে ক্রমে পরিচিতি পাচ্ছে রবি বাবুর শ্বশুরালয় হিসেবে। জীবিত থাকলে সেটা তিনি চাইতেন কিনা সন্দেহ। তবে অনেকের কাছে সেটাই হয়ে ওঠেছে মস্ত আকর্ষণ।

দক্ষিণডিহি থেকে পিঠাভোগের দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। বহুকাল আগে ইতিহাসের পাতায় এই দুটি গ্রামের মধ্যে সৃষ্টি হয় আত্মীয়তার বন্ধন। এর ফলে বদলে যায় ইতিহাসের ধারাক্রম। খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার ৫ নম্বর ঘাটভোগ ইউনিয়নে অবস্থিত পিঠাভোগ গ্রাম। এ গ্রামের কুশারী বাড়িতে বসবাস করতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষরা।
মিঠেল সোনালি আভায় বিকেল বেলা ইঞ্জিন নৌকায় রূপসা নদী অতিক্রম করি। পড়ন্ত সূর্য নদীর বুকে এঁকে দিতে থাকে জলছবি। ইজি বাইকে অনেকটা পথ যাওয়ার পর ইঞ্জিন চালিত ভ্যানে পৌঁছে যাই ‘পিঠাভোগ রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালা’য়। সারি সারি গাছ-গাছালির মধ্যে দিয়ে পাকা রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে পাওয়া যায় মায়াবী পরশ। কোথাও একটুও হোঁচট খেতে হয় নি। প্রত্যন্ত এলাকায় দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায় নবনির্মিত একটি ফটক।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষের কারুকার্যখচিত আদি ভিটাবাড়ি ১৯৯৪ সালে ভেঙে ফেলা হয়। হারিয়ে যায় ইতিহাসের একটি অমূল্য নিদর্শন। এ নিয়ে পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশিত হলে এই ভিটা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয় জেলা প্রশাসন। শূন্য ভিটায় নির্মাণ করা হয়েছে রবীন্দ্র সংগ্রহশালা। একতলা এই ভবন সংলগ্ন গড়ে তোলা হয়েছে উম্মুক্ত একটি মঞ্চ। আদি ভিটাবাড়ি না থাকলেও অনেকটাই অকৃত্রিম আছে এ এলাকার গ্রামীণ পরিবেশ ও প্রকৃতি। অসংখ্য গাছগাছালি। পেছনে মস্ত একটি নির্জন পুকুর। তাতে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে শাপলা। পাশে ছন আর টিনের ঘর। গোধূলি চারপাশে ছড়িয়ে দিতে থাকে তার মাধুরী। যেন থমকে আছে আবহমানকালের চিরায়ত বাংলা।

পূর্বপুরুষের ভিটায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কখনও এসেছিলেন কিনা জানা যায় না। তবে ভিটা সংলগ্ন এলাকায় এখনও বসবাস করেন কুশারী পরিবারের বংশধররা। তাঁদের আর্থিক অবস্থা মোটেও স্বচ্ছল মনে হলো না। তাঁরাই দেখভাল করেন সংগ্রহশালা।

দর্শনার্থীরা এলে খুলে দেন ইতিহাসের সিংহদ্বার। তবে লতা-পাতায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বংশধর হতে পেরেও তাঁরা খুবই গর্ব অনুভব করেন। যত দূরের সময়ের হোক না কেন, এই মাটিতে পোতা বীজের এক সন্তান আলোকিত করেন বিশ্ব সাহিত্যের ভুবন। এ গর্বটুকু আমাদেরও ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View