চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রবির কিরণ এখনও পাই সমান উজ্জ্বলতায়

আজ আমরা যে কথা ভাবছি, শত বছর আগে সেই একই কথা ভেবেছেন রবীন্দ্রনাথ। তার একেকটি চিন্তার কাছে গেলে মনে হয়, তিনি এই যুগটাকেও ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছেন। সেই যুগেও দেখতে পেয়েছিলেন একবিংশ শতকের সময়গুলো। এই তো সেদিনের কথা। গিয়েছিলাম ছাদকৃষির ধারণ কাজে।  বেশ কয়েক বছরে ছাদকৃষি তো ব্যাপকভাবেই সম্প্রসারিত হয়েছে।  ভালো লাগে শহর নগরের মানুষ তাদের বাসার ছাদে তো বটেই এর বাইরেও বিভিন্ন জায়গায় ছাদকৃষি করছেন। বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি দপ্তর ও স্কুলের ছাদে ছাদকৃষি সম্প্রসারিত হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলের ছাদে ছাদকৃষি গড়ে তুলেছেন স্কুলের গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষক শ্রীকান্ত চন্দ্র নন্দী।  কাজ করতে করতেই জানতে পেলাম, ওই স্কুলের সঙ্গে বিশাল গর্বের স্মৃতি রয়েছে। এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসেছিলেন। শুধু তাই নয়, এই স্কুলে রবীন্দ্রনাথ একটি বক্তব্যও রেখেছিলেন। ওই বক্তব্য সংগ্রহ করে স্কুলে রাখা আছে। জেনেই মন ভালো হয়ে গেল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্পর্শ রয়েছে যে প্রতিষ্ঠানে, সন্দেহ নেই সে প্রতিষ্ঠানটিতে পৃথক এক আলো জ্বলছে। সেই প্রতিষ্ঠানের ছাদে এমন সবুজের আয়োজন।  এই আয়োজনও যদি রবীন্দ্রনাথ দেখতেন তাহলে, এর অপরিহার্যতা নিয়েও নিশ্চয়ই প্রশংসাসূচক ও ইতিবাচক মন্তব্য তিনি করতেন!

বিজ্ঞাপন

যা হোক, প্রধান শিক্ষক কমলকান্তি আমাকে স্কুলের লাইব্রেরিতে নিয়ে গেলেন। সেখানে রবীন্দ্রনাথের সেই ছোট্ট ভাষণটি বড় করে টানানো। মনে হলো, যে সব কিশোর শিক্ষার্থী রবীন্দ্রনাথের এই ভাষণটি পড়ে আত্মস্থ করতে পারছে, তার জীবন তো এর মধ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে পারে এক ধাপ। আমি টানানো ভাষণটি দেখার পর আর অন্যদিকে দৃষ্টি ফেরাতে পারিনি। এক নিঃশ্বাসেই পড়ে নিলাম। ভাষণের কিছুটা এখানে উল্লেখ করতে চাই।

“নারায়ণগঞ্জের প্রবেশদ্বার দিয়ে আমি পূর্ববঙ্গে প্রবেশ করেছিলাম। ফেরার পথে আবার এখানে এসেছি।  পূর্ববঙ্গের যেখানে গিয়েছি, আমার বলবার কথা বলেছি; কিন্তু বলার দ্বারা ফল হয় বলে আমি বিশ্বাস করিনে। কর্মের মধ্যদিয়েই আমাদের দেশের বিচিত্র সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। বাংলাদেশের বিদ্যালয়ে চাকুরিই ছিল শিক্ষার উদ্দেশ্য। লোকে চাকরি পাওয়ার জন্য নিজেকে শিক্ষিত করতে স্কুল-কলেজে পড়তে যায়। সৌভাগ্যক্রমে চাকুরির পথ সংকীর্ণ হয়েছে। তাই শিক্ষিত যুবকগণ স্বাধীন উপায়ে জীবিকার্জনে সচেষ্ট হয়েছে। রাজনীতির ক্ষেত্রেও কাজকর্মে এক পরিবর্তন এসেছে। এমন একটি সময় ছিল, যখন লোকে ভাবতেন বক্তৃতা দিয়েই তাঁরা তাঁদের কাজ উদ্ধার করতে সক্ষম হবেন। তাঁরা পুরাতন অভ্যাসবশতঃ এখনও ঐরূপ কাজ করে বসেন। কিন্তু বর্তমানে যুবসমাজ বাস্তব ও আসল কাজের দিকে তাকায়। বর্তমান আন্দোলনকালে যে উদ্দীপনা এসেছে, তাকে যেন তারা স্থায়ী করে। কবি বলেন- শান্তিনিকেতনে পূর্ববঙ্গের বহু ছেলে পড়ে। তাদরে মধ্যে চরিত্রের দৃঢ়তা, একাগ্রতা ও শ্রদ্ধার ভাব দেখেছি।  আমি পূর্ববঙ্গ ভ্রমণ করে দেখলাম, এটা একটা ভাল কর্মী সংগ্রহের স্থান। এখানকার ছেলেদের যে কাজেই লাগানো যাবে, তারা তাদের একাগ্রতা ও নিষ্ঠার দ্বারা কৃতকার্য হবেই। আমি যদি এখনও যুবক থাকতাম, তাহলে এখানে বক্তৃতা না করে হাত-নাতে কাজে লেগে যেতাম। এখানকার উর্বরা মাটির মতই এখানকার মানুষের উদ্যম আগ্রহও প্রবল।  কিন্তু আজ আমার বয়স এবং স্বাস্থ্য দুই-ই নেই। আমার কর্মক্ষেত্র পশ্চিমবাংলার এক সীমান্তে অবস্থিত। সেখানকার মাটি উর্বরা নয় এবং মানুষও অনেকটা উদাসীন।  পূর্ববঙ্গের এ অঞ্চলে উপযুক্ত পরিবেশে লোকে যদি তাদের কাজ আরম্ভ করে তাহলে তারা অতি সহজেই সফলকাম হবে। রাজনৈতিক নেতারা গ্রাম থেকে দূর শহরে শহরে খুব ভাল বক্তৃতা দিয়ে থাকে। এই উপায়ে গ্রামের কোন উপকার করাই সম্ভব নয়। পূর্ববঙ্গে পল্লী উন্নয়ন নিঃসন্দেহে সম্ভবপর।”

ভাষণটিতে আরো কয়েকটি পংক্তি রয়েছে। কিন্তু এটুকুর মধ্যেই বহু কথা তিনি বলে দিয়েছেন। আমি নতুন করে বিস্মিত হয়েছি তার বাস্তবতা দর্শন ও গভীরতা সন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। আমি বরাবরই রবীন্দ্রনাথের উন্নয়নমনষ্ক দিকগুলো জানতে ও দেখতে পছন্দ করি। সে কারণেই বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের বড় বড় স্মৃতিক্ষেত্রগুলি ঘুরেছি, শান্তি নিকেতন ও তার স্বপ্নের শ্রীনিকেতনের নানা কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেছি। ইংল্যান্ডের ডেভনে অবস্থিত ডার্টিংটন হলেও গিয়েছি উন্নয়কামী রবীন্দ্রনাথের ধ্যান-ধারণা বুঝতে। যত এগিয়েছি ততই অবাক হয়েছি। যে রবীন্দ্রনাথকে আমরা কবি, গীতিকার, নাট্যকার হিসেবে দেখি, সেই রবীন্দ্রনাথের উন্নয়নচিন্তা, সমবায় ভাবনা আর গণ মানুষের জীবনধারা পরিবর্তনের কাজগুলো কত শক্তিশালী।

বিজ্ঞাপন

রবীন্দ্রনাথ সেসময় তরুণদের উদ্দেশ্যে যে কথাগুলো বলতে চেয়েছিলেন, আজও সেই কথাগুলোই প্রযোজ্য। আজ উন্নত বিশ্বের ধ্যান-ধারনায় যেখানে ‘অনট্রপনারশীপ’ বা নিজস্ব উদ্যোগকেই সবচেয়ে বড় করে দেখা হয়। রবীন্দ্রনাথ সেসময়ে একথাও বলেছিলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্র নয়, নতুন উদ্ভাবনের ক্ষেত্র।

যেখানে চাকরির জন্য ধর্না না দিয়ে নিজেই উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার মধ্যে যে দর্শন শত বছর আগে রবীন্দ্রনাথ বাতলে দিয়েছেন তা আজকের তরুণরা বাস্তবায়নও করছে। সবচেয়ে আশান্বিত হই যখন দেখি সারাদেশেই কৃষিতে, প্রযুক্তিতে, উৎপাদনমুখি কার্যক্রমে তরুণ প্রজন্মের নতুন নতুন উদ্যোগ সাফল্যমণ্ডিত হচ্ছে।  আজ দেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার আলো জ্বালিয়েছে আমাদের দেশের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তারা। যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করে চাকরির জন্য ধন্যা না দিয়ে একেকটি কৃষি উদ্যোগ নিয়ে বিস্ময়কর সাফল্যের নজির গড়ছেন। নাটোরের আতিক, ময়মনসিংহ ফুলবাড়িয়ার আবু বকর সিদ্দিক প্রিন্স, সাতক্ষীরার সাইফুল্লাহ গাজী, রাজশাহীর মনিরুজ্জামান মনির, সাভারের কোব্বাত হোসাইন অভি, রাজিয়া সালতানা, কুষ্টিয়ার শাহিনুর রহমানের মতো হাজারো তরুণ এখন দেশের সমৃদ্ধি ও সম্ভাবনার আলো জালাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ সে সময়েই পূর্ববঙ্গের তরুণদের মধ্যে বেশি সম্ভাবনা দেখেছিলেন। পূর্ববঙ্গের উর্বরা মাটির মতোই তরুণরাও যে সোনাফলা তা তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন।

আমি রবীন্দ্রনাথের কৃষি ও উন্নয়নচিন্তা এবং সমবায় ভাবনার কাজগুলো প্রত্যক্ষ করার চেষ্টা করেছি।  রবীন্দ্রনাথের কৃষি, পরিবেশ, সমাজ তথা মানবিক উন্নয়ন চিন্তার পরীক্ষাক্ষেত্র ছিল কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর আর নওগাঁর পতিসর। বাস্তবায়ন ক্ষেত্র ছিল পশ্চিমবঙ্গের বোলপুরে শান্তিনিকেতন সংলগ্ন শ্রীনিকেতন। যেখানে তিনি পল্লীর জীবন কাঠামোর একটি মডেল উপস্থাপন করেছিলেন। এই কাজে তার সহযোগী ছিল তারই ব্যক্তিগত সহকারি কৃষি অর্থনীতিবিদ লিওনার্দ এল্মহার্টস। সেখানে রবীন্দ্রনাথের অনেক প্রয়াসেরই স্মৃতিচিহ্ন রয়ে গেছে। তবে রবীন্দ্রনাথ যে আঙ্গিকে চিন্তা করেছিলেন তা প্রাণ পায়নি। রবীন্দ্রনাথ যে পূর্ববঙ্গের প্রতি বেশি আশাবাদী ছিলেন, এখানকার তরুণদেরকে বেশি কর্মঠ ভেবেছিলেন, এখানে একটি বীজ পুঁতলে তা নিশ্চিতভাবেই যে ফলবান গাছে পরিণত হবে, সে বিষয়টি রবীন্দ্রনাথের হিসেবের মধ্যে ছিল। ১৯২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলে এসে সে বিষয়টিই তিনি তুলে ধরেন বক্তৃতায়।

যাহোক রবীন্দ্রনাথ তার জীবনে চেষ্টার কমতি করেননি। তিনি চেয়েছেন তৎকালীন সময়ে গোটা পৃথিবীতেই উৎপাদনমুখি জীবন ব্যবস্থার এক বিপ্লবের সূচনা হোক। কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতি তখন থেকেই বাণিজ্যমুখি, চাকুরিমুখি ও সমাজের নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষ সবকিছু ভোগ করার প্রক্রিয়ার মধ্যে চলে গেছে। রবীন্দ্রনাথের উন্নয়নমুখি কর্মতৎপরতা খুঁজতে আমি গিয়েছিলাম ইংল্যান্ডের ডেভনে অবস্থিত ডার্টিংটন হলে। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের শ্রীনিকেতন প্রকল্প দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন এল্মহার্স্ট। এল্মহার্স্ট যখন শ্রীনিকেতনের কাজ শেষ করে দেশে ফিরে গেলেন তখন রবীন্দ্রনাথের উন্নয়নচিন্তাকে কাজে লাগাতেই তার স্ত্রীর ডরথির বিশাল ভূ-সম্পত্তিতে গড়ে তোলেন ডার্টিংটন হল। বাংলার উদ্যোগগুলোর সঙ্গে কৃষি সবচেয়ে আগে থাকলেও ডাটিংটন হলে ছিল শিক্ষা, মানবিক বোধ ও পরিবেশ উন্নয়নের বিষয়গুলো।  রবীন্দ্রস্মৃতির জলন্ত এক কেন্দ্র হিসেবে ডার্টিংটন হল আজও মানুষকে উজ্জীবীত করে। এখনও বছরের বিভিন্ন সময় ডার্টিংটন হলে তারুণ্যেও শক্তি জাগানিয়ে নানা অনুষ্ঠান হয়, যেগুলো বহুবছর আগে রবীন্দ্রনাথই নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

নারায়ণঞ্জ হাইস্কুলের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের এই স্মৃতি-সম্পর্ক দেখে, বক্তৃতাটি পড়ে যারপরনাই অভিভুত হলাম। জানলাম ভাষণটি নারায়ণঞ্জের দুবৃর্ত্তদের হাতে নিহত সংস্কৃতিবান কিশোর ত্বকির বাবা রফিউর রাব্বি সংগ্রহ করে দিয়েছেন। তার বাসাতেও গিয়ে হাজির হই এ বিষয়ে জানতে।

তিনি জানান, বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ভূইয়া ইকবাল-এর ‘বাংলাদেশে রবীন্দ্র সংবর্ধনা’ গ্রন্থে কবিকে নারায়ণগঞ্জের সংবর্ধনাতে প্রদানকৃত মানপত্র ও কবির পূর্ণাঙ্গ ভাষণটি তুলে ধরা হয়েছে। সেখান থেকেই তিনি ভাষণটি সংগ্রহ করেন। ওই বইতে উল্লেখ রয়েছে, ১৯২৬ সনের ২৭ শে ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা নাগাদ তিনি নারায়ণগঞ্জ এসে পৌঁছান। স্থানীয় ছাত্র সংস্থা স্টিমার ঘাটে কবিকে এবং তাঁর দলের সকলকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। ছাত্ররা সেখান থেকে শোভাযাত্রাসহ কবিকে নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুলে নিয়ে আসেন। নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুল প্রাঙ্গণে এক সভায় কবিকে সংবর্ধনা জ্ঞাপনের ব্যবস্থাও করা হয়। রবীন্দ্র জীবনীকার প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় ‘রবীন্দ্র বর্ষপঞ্জী’তে তা সবিস্তারে উল্লেখ করেছেন।

কবি দীনেশ দাশ বলেছেন, ‘তামার পায়ের পাতা সবখানে পাতা’। উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন সভ্যতার সব সংকটে রবীন্দ্রনাথ এক বিশাল সমাধান। রবীন্দ্রনাথ এই বাংলাদেশকে যে সম্ভাবনাময় পথে অগ্রসর হতে দেখেছিলেন, সে সম্ভাবনার বাস্তবায়নে সবচেয়ে বেশি অগ্রসর আমাদের কৃষি অনুরাগী ও উদ্যোগী তরুণরা। এখনও যারা চাকরিকেই জীবনের ব্রত হিসেবে ধরে অনেকটা জীবনকে নিরূপায় এক স্তরে নিয়ে আছে, তাদের সামনে এখনও এক বাস্তবমুখি ব্যবস্থাপত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ।

Bellow Post-Green View