চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রক্ত ঢেলে এনেছি বাংলা: এ দেশ ছাড়বো নাকো

অনেক করুণার ইতিহাস। অনেক বেদনার্ত ঘটনা। সড়কে সড়কে রক্তের সমুদ্র মানুষের রক্তের, নিরপরাধ নারী-পুরুষ-শিশুর রক্তের। সংখ্যা-গণনার অতীত সেই বিপুল সংখ্যক মানুষ। তাঁরা হিন্দু, তাঁরা মুসলমান, তাঁরা বৌদ্ধ, তাঁরা খৃষ্টান। তারা বাঙালি-তাঁরা অবাঙালি। তাদেরকে খুন করা হয়েছে-তাঁদের বাড়িঘর, সয়-সম্পত্তি লুঠ করা হয়েছে। এমন কি হিন্দু হোক, মুসলিম হোক, বৌদ্ধ হোক, খৃষ্টান হোক-তাঁদের বিবাহিত অবিবাহিত যুবতী মহিলাদেরকে অপহরণ করে ধর্ষণ করা হয়েছে-পৈশাচিক উল্লাসে গণধর্ষণও বাদ যায় নি।

এদের অপরাধ? এরা স্বাধীনতা চান। এরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করতে চান। স্বাধীন ভারতের স্বাধীন জাতীয় পতাকা ওড়াতে ও স্বাধীন রাষ্ট্রের নতুন জাতীয় সঙ্গীত গাইতে চান। তাই আধুনিকতার, মানবাধিকারের দাবীদার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের এ ভাবেই সংগ্রামরত ভারতবাসীকে জবাব দিয়েছেন।

অমানবিকতার এই চূড়ান্ত ও ঘৃণ্য পদক্ষেপ রুদ্ধ করতে ছুটে এলেন নেংটি পরা, হাড় জিরজিরে জননেতা মহাত্মা মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধী। তিনি ঘটনা ছিল গুলিতে ছুটে গেলেন-দেখে চমকে উঠলেন মানবিকতার এমন বিপর্যয় দেখে, শুরু করলেন অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন। যেন যাদুর স্পর্শ! থেমে গেল দাঙ্গা-রক্ষা পেল অজস্র প্রাণ তা-বের হাত থেকে। এক জায়গায় নয়। ভারত জুড়ে যেখানে এমনটি ঘটতে শুরু করেছে-ছুটে গেছেন-অনশন করেছে সেই সবগুলি স্থানে। ফলাফল একই কিন্তু তাতেও থামানো গেল না দাঙ্গাজনিত কারণে। পতিত জওয়াহের লাল নেহেরু, মাওলানা আবুল কালাম আজাদের দাঙ্গা থামাতে বারংবার জানানো আহ্বানও যখন বৃথা যেতে থাকলো সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ তাঁর সঙ্গী সাথীদের নিয়ে ইংরেজ শাসকদের ইন্ধনে দাবি উত্থাপন করলেন, মুসলমানদের জন্যে পৃথক একটি রাষ্ট্র গঠিত না হলে এই দাঙ্গার বিভীষিকা থামানো যাব না। এই তত্ত্বের নাম দেওয়া হলো দ্বিজাতিতত্ত্ব-অর্থাৎ হিন্দু এক জাতি-মুসলমান অপর একটি ভিন্ন জাতি।

কিন্তু বিবেচনায় নেওয়া হলো না ভারতবর্ষে সে সময়ে বসবাসকারী বৌদ্ধ ও খৃষ্টান ধর্মাবলম্বীর সংখ্যাও তো কম ছিল না । ঐ তত্ত্বে তাঁরা বাদ পড়লেন-অর্থাৎ তাঁদের স্থান হলো ভারতে-‘মুসলমানের’ পাকিস্তানে না। অসাম্প্রদায়িক, বাম প্রগতিশীল, গণতন্ত্রগামী জাতীয়তা বাদী হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খৃষ্টান নেতাদের আপত্তি স্বত্বেও মুসলিম লীগের জিদ মেনে নিয়ে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট বাংলার পূর্বাংশ, পাঞ্জাবের পূর্বাংশ, সিন্ধু, পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ-এই ভূখন।ড নিয়ে গঠিত হলো পাকিস্তান। আমরা অধিকাংশ বাঙালী পাকিস্তানের ভোগে পড়লাম। জনসংখ্যার অনুপাতে বাঙালি গোটা পাকিস্তানের মধ্যে সংখ্যায় সর্বাধিক।

পাকিস্তান নীল সবুজ চাঁদ তারা মার্কা নতুন মার্কা সম্বলিত নতুন জাতীয় পতাকা, “পাক-সরজমিন সাদবাদ” ফার্সি ভাষার জাতীয় সঙ্গীত এবং কিম্ভুত কিমাকার একটি নতুন মানচিত্র নিয়ে “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” শ্লোগানে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা, নির্দোষ লক্ষ লক্ষ হিন্দু-মুসলমানের মৃত্যু, নারী-অপহরণ-ধর্ষণের পটভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হলো। বলা হলো পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাই হলো ঐ রক্তগঙ্গা থামানোর মহৌষধ।
পাকিস্তান হলো, ভারতবর্ষ ভেঙ্গে একটি মুসলিম রাষ্ট্রও প্রতিষ্ঠিত হলো। প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই মুসলমান হবেন, পাকিস্তান ইসলামিক রিপাবলিক হবে-তা-ও হলো। সাম্প্রদায়িকতার শতভাগ বিজয় যেন ।

কিন্তু মুসলমানের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রটির স্রষ্ট্রা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা দিলেন স্বয়ং “ঘড়ি অর্থাৎ আজ যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, হিন্দু আর হিন্দু থাকবেন না-মুসলমানরাও মুসলমান থাকবে না-আমরা সবাই মিলে এখন এক পাকিস্তানী জাতি।” তৎকালীন সময়ে ঘোষণাটি ঐতিহাসিক ছিল নিঃসন্দেহে।

কিন্তু গোল বাধলও কিছুদিন যেতে না যেতেই। বাধালেনও স্বয়ং জিন্নাহ। তাও আবার ঢাকায় এসে। বিশাল জমায়েতে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বললেন, “উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।”

মৌমাছির চাকে ঢিল মারলেন স্বয়ং। তাঁর মাতৃভাষা বাংলা না হলেও সমগ্র বাঙালী সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা যে বাংলা এবং বাঙালিরাই যে সংখ্যার দিক থেকে সমগ্র পাকিস্তানে সর্বাধিক-তা জেনেও বাংলা ভাষা ও বৃহত্তম বাঙালী সম্প্রদায়ের প্রতি প্রকাশ্য অবমাননা করার ধৃষ্টতা দেখালেন। জাতীয় পরিষদের সাংসদ, জননেতা ধীরেন দত্ত প্রস্তাব রাখলেন, ‘বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা হোক”। জবাবে তৎক্ষণাৎ বলা হলো, বাংলা মুসলমানের ভাষা নয়, পাকিস্তানের ভাষা নয়, বাংলা হলো ভারতের ভাষা-হিন্দুর ভাষা’।

ঐ করাচী অধিবেশনেই এই কথা বলে আবার পাকিস্তানকে হিন্দু-মুসলমানে বিভক্ত করা হলো-সাম্প্রদায়িকতাকে নতুন করে আবাহন করা হলো-দেশে আবার বিভেদ-বৈষম্য ডেকে আনা হলো। আর যায় কোথায়? সুযোগটা লুফে নিলো সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীরা। শুরু করলো হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টানদের ঘর-বাড়ী-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল, তাদের বিবাহিত-অবিবাহিত যুবতী মেয়েদের অপহরণও ধর্ষণ। শান্তিকামী হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টানেরা হাজারে হাজারে, লাখে লাখে সর্বস্বত্যাগ করে নিজেদের জীবন ও সম্ভ্রম রক্ষার্থে দেশত্যাগ শুরু করলেন। ১৯৫১ সালের জনগণনায় যেখানে সংখ্যালঘু হিন্দু জন সংখ্যা ছিল শতকরা ৩১ ভাগ-আজ তা কমতে কমতে ৭ ভাগে এসে দাঁড়িয়েছে।

কেন? কথা ছিল কি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অবসান ঘটিয়ে ইসলামকে কেন্দ্র করে একটি শান্তির দেশ-অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে পাকিস্তান। যা হোক, তার বিরুদ্ধে ১৯৪৮ সালেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সুরু করে বাঙালি তরুণরা জানান দিল, তার বাঙালি। বাংলা তাদের রাষ্ট্রভাষা-মুখের ভাষা-মায়ের ভাষা। এ ভাষা তারা জীবন দিলেও মর্যাদার সাহস রক্ষা করবে। আরও জানান দিল হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খৃষ্টান মিলে সবাই বাঙালি জাতি। ধর্ম কোথাও কোন জাতি গঠন করে না। দ্বিজাতিতত্ত্ব মিথ্যা ও অন্ত:সারশূন্য।

বিজ্ঞাপন

আন্দোলন চলতেই থাকলো রাষ্ট্রভাষার দাবীতে। ১৯৫২ সালে গুলি চললো। ৫/৭ জনের প্রাণ গেল ঐ আন্দোলনে। ধর্ম বিশ্বাসে তাঁরা সবাই মুসলমান কিন্তু জাতিতে বাঙালি। জীবন দিয়ে শহীদেরা তা প্রমাণ করলেন। আমরা সকল বাঙালি এক জাতি হলাম ভাষা আন্দোলনের ও ড. শহীদুল্লাহ্ প্রমুখদের চিন্তার প্রকাশের সৌজন্যে।

অত:পর যুক্তফ্রন্ট, আওয়ামী লীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রীলগের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী অজস্র আন্দোলন-যুক্ত নির্বাচনের দাবীতে আন্দোলন-‘ইসলামিক রিপাবলিক নয়’ ডেমোক্যাটিক রিপাবলিক অব পাকিস্তান গঠনের অসাম্প্রদায়িকতা পুনরুজ্জীবন ও তাকে স্থিতধী করার অসংখ্য অজস্র আন্দোলন। মানুষের মননে মনুষ্যত্বের আবারও বিকাশ।

পরবর্তীতে এলো ১৯৭১ হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বাঙালি জাতিকে আক্রমণে করে বসলো পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ১৯৭১ এর মার্চে। অপরাধ? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন। ঐক্যবদ্ধভাবে বাঙালি জাতি তাতে সাড়া দিয়েছেন। সে যুদ্ধ ছিল স্বাধীনতার জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য, জাতীয়তাবাদের জন্য ও সমাজতন্ত্রের জন্য। এই গুলিকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসাবেও ১৯৭২ এর সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে লিখিত হয়।

এত বড় বিজয় বাঙালির জীবনে স্থায়ী ভিত্তি পেলো না। একদিকে বিজয় জনিত আবেগ উচ্ছ্বাস, চরম আত্মতুষ্টি, শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে মর্মে ভ্রান্ত ধারণার ফলে নেতৃত্ব নিষ্ক্রিয় থাকলেও শত্রুরা ততোধিক সক্রিয় থেকে বাঙালির প্রাণের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের ভোর রাতে সপরিবারে হত্যা করা হয়। মুশতাক -জিয়া ক্ষমতায় এসে এবং জাতীয় নেতৃত্বের পলায়নপর কাপুরুষোচিত ভূমিকার কারণে বাহাত্তর সংবিধান থেকে মূল অংশ বাদ দিয়ে জামায়াত মুসলিম লীগও ধর্মাশ্রয়ী দলগুলিকে স্বাধীনতা বিরোধী হওয়া স্বত্বেও বৈধতা দেন (যা ৭২ সংবিধানে নিষিদ্ধ ছিল) এর সংবিধানের শুরুতে “বিসমিল্লাহ্‌” যোগ করে সংবিধানের এবং রাষ্ট্রের ইসলামী বা পাকিস্তানী করণ শুরু করেন। অত:পর এরশাদ ক্ষমতা দখল করে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ সংযুক্ত করে সংবিধান ও রাষ্ট্রের পাকিস্তানীকরণ আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যান।

অত:পর বহুবার ক্ষমতার অদল-বদল বহুবার ঘটে গেল। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নতুন করে গজিয় উঠতে থাকলো। এ আমলেও দিব্যি তা বহাল রাখা হলো। তদুপরি নতুন এক ইসলামী জঙ্গি উৎপাদন কারী দল হেফাজতে ইসলামকে আপন করে নিয়ে পাঠ্যপুস্তকের সাম্প্রদায়িকীকরণ করা হলো। আর চাই কি?

এখন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষ করে তাদের মধ্যে দরিদ্র জনগোষ্ঠী হয়ে পড়েছেন চরম অসহায়ত্বের শিকার। তাঁদের যাঁরা জেলে, কাঠমিস্ত্রি, লোহার কামার, কৃষিকাজ করেন, কুলিগিরি করতে লজ্জিত নন-তাঁদের অসুবিধা অনেক কম দেশত্যাগের পর শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের তরুণ-তরুণীদের তুলনায়। কিন্তু অনিশ্চয়তা সেখানেও তাঁদের ভয়ংকরভাবে তাড়া করে কারণ কোন পেশায় নিয়জিত যদি হনও-আশ্রয় মিলবে কোথায়? তারা ঘটি, বাংলাদেশিরা বাঙাল-এই পুরাতন বিভ্রান্ত আজও থেকেই যাচ্ছে। তাই সর্বাত্মক চেষ্টা নিয়ে সবাই দেশেই থাকতে চান।
কিন্তু নিরাপত্তার গ্যারান্টিতো চাই।

তা দিতে পারে রাষ্ট্র ও সমাজ। এবারের দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পরে পরেই দেশ ব্যাপী গড়ে উঠেছে সামাজিক প্রতিবাদ যা বহুকাল যাবত আদৌ চোখে পড়ে নি।

রাষ্ট্র? তার ওপর বহু কিছু নির্ভর করে কিন্তু রাষ্ট্রের ওপর ভরসা করার মত পরিস্থিতি আজও সৃষ্টি হয় নি। বিচারের সংস্কৃতি আজও গড়ে উঠছেনা। অপরাধীর দলীয় পরিচয় আজও বিশেষ ভূমিকা রাখে পুলিশ ও নিম্ন বা প্রাথমিক আদালতগুলির উপর। এই ধলণের বিচারিক সংস্কৃতির অবসান ও সামাজিক প্রতিরোধই ভরসা।

সোজা কথা-রক্তে আনা দেশটি আমার-দেশটি আমাদের। তাই কোথাও দেশটাকে ছেড়ে যাব না-এদেশ ছাড়বো না কো।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন