চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রক্তবাড়ির ইতিহাস, কুষ্টিয়ার কোহিনুর ভিলা গণহত্যা

১৮ সেপ্টেম্বর কোহিনুর ভিলা গণহত্যা দিবস

ইমাম মেহেদী

গত ১০ সেপ্টেম্বর, বেলা ১১টা। কথা হচ্ছিলো কুষ্টিয়া শহরের কোহিনুর ভিলার হালিম মল্লিক ও শিরু মল্লিকের সাথে। কুষ্টিয়া শহরের মধ্যে অবস্থিত বাড়িটিতে একাত্তর সালে গণহত্যা চালিয়ে ১৬ জনকে হত্যা করেছিলো স্বাধীনতা বিরোধী বিহারীরা। এ কারণে বাড়িটিকে রক্তবাড়ির ইতিহাস নামেও চেনে অনেকে।

আমার মাঠপর্যায়ের গবেষণার বিষয়বস্ত ‘কোহিনুর ভিলা গণহত্যা’। এ কারণে ২০১৯ ও ২০২০ সালেও শহীদ পরিবারের সদস্য, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষদর্শীর সাক্ষাতকার গ্রহণের জন্য কয়েকবার এসেছি এই বাড়িটিতে।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ভারতের হুগলী জেলার খানাকুল থানার পাঁচপীরতলা গ্রাম থেকে বাংলাদেশে আসেন দুইভাই পরিবারসহ। বসবাস শুরু করেন কুষ্টিয়া শহরের দেশওয়ালী পাড়ার রজব আলী খান সড়কের পাশে। বাড়ির নম্বর ৪০/১৯।
বাড়ির মালিকের নাম রবিউল হক মল্লিক ও আরশেদ আলী মল্লিক। মায়ের নামে বাড়িটির নাম রেখেছিলেন কোহিনুর ভিলা। পেশায় দুই ভাই কোহিনুর মিলকো ব্রেড এন্ড বেকারির মালিক ছিলেন। কুষ্টিয়া শহরের এই দেশওয়ালী পাড়ায় তখন নিচু জাতের বিহারীরা বেশি বসবাস করতো। একাত্তর সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অন্যান্য পরিবারের মত তারাও এলাকা ছেড়ে সদর উপজেলারই জিয়ারুখী ইউনিয়নের গোপালপুর কমলাপুর গ্রামে আশ্রয় নেন। ভয়ে এলাকার মানুষ পালিয়ে গ্রামের আত্মীয় স্বজনদের বাসায় আশ্রয় নিয়েছে। অনেকেই ভারতে গিয়ে শরণার্থী হয়েছিলেন। কুষ্টিয়া শহর তখন স্বাধীনতা বিরোধীদের পদাচারণা।
এভাবে পালিয়ে গ্রামে থাকা অবস্থায় আশে পাশের কয়েকজন পরিচিত বিহারীরা গিয়ে বুঝিয়ে নিয়ে আসলেন রবিউল হকের পরিবারকে। জানালেন, আপনারা আমাদের প্রতিবেশী। আমরা থাকতে আপনাদের কিছু হতে দেবো না। আপনারা এসে পুনরায় ব্যবসা শুরু করেন। কোন সমস্য হলে আমরা দেখবো। অবরুদ্ধ সময়ে বাড়িটিকে নিরাপদ ভেবে প্রতিবেশী বিহারীদের আশ্বাসে পুনরায় দুইভাই পরিবারসহ নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। কিন্তু সপ্তাহ খানেক পরই ঘটল উল্টো ঘটনা।

বিজ্ঞাপন

১৮ সেপ্টেম্বর ভয়াল রাত। কুষ্টিয়া শহরের ঘৃণিত রাজাকার মজিদ কসাই, ফোকু কসাই ও কোরবান বিহারির নেতৃত্বে পঁচিশ তিরিশ জনের বিহারী মিলে জোট বেঁধে কোহিনুর ভিলায় প্রবেশ করে। তখন গভীর রাত। সবাই ঘুম। বাড়ির চারপাশ ঘিরে ফেলে। সজোরে দরজার কড়া নাড়লেও প্রথমে কেউ দরজা খোলেনি। পরে হালিম বিহারী বার বার নিজের নাম করে দরকার আছে বলে দরজা খোলার কথা বললে, আরশেদ আলীর বড় ছেলে আশরাফ দরজা খুলে দেয়। সাথে সাথে সবাই একসাথে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মহিলা পুরুষ কণ্ঠের আর্ত চিৎকার- আমরা আপনাদের কি ক্ষতি করেছি, আমাদের মারবেন কেন? বিহারী ভাইয়েরা কে কোথায় আছ, আমাদের বাঁচাও, আমাদের মেরে ফেলল। তারপর হঠাৎ সবাই চুপ।
বাড়ির সব সদস্যকে ধরে দড়ি ও মশারি কেটে হাত-পা, মুখ দিয়ে বেঁধে ফেলে। জীবন ভয়ে কেউ কেউ পালানোর চেষ্টাও করেছিলেন। দেশীয় অস্ত্র ছুরি ও তলোয়ার দিয়ে বাড়ির গৃহকর্তা রবিউল হক, তাঁর স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী, সন্তান ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মচারীসহ ১৬ জনকে জবাই করে হত্যা করে নির্মমভাবে। জবাইয়ের আগে ও পরে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে চালানো হয় নির্যাতন। খুনিরা টাকা পয়সা ছাড়াও বাড়ির মূল্যবান জিনিসপত্রও লুট করে নেয়।
সকালে পৌরসভার ড্রেনে রক্ত দেখে এলাকাবাসী এসে বাড়ির ভিতর ও আশেপাশে ক্ষতবিক্ষত লাশ দেখতে পায়। রবিউল হক মল্লিকসহ তিন/চারজনের লাশ পড়েছিলো বাাড়ির দক্ষিণপাশে নফর শাহর মাজারের পাশে। কয়েকজনের লাশ পড়েছিলো বাড়ির পূর্বপাশে পুকুড় পাড়ে। বাড়ির মধ্যে, বাতরুমে, রান্না ঘরে, শোবার ঘরের মেঝেতে রক্তাক্ত ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পরেছিলো সবার লাশ। ছোট রাজুকে হত্যা করে ফেলে দিয়েছিল পুকুর পাড়ে। অনেক লাশের অবস্থা ছিলো বিভৎস ও বিবস্ত্র।
পরে বেলা দশটা সাড়ে দশটার দিকে গাড়িতে কয়েকজন সৈন্যসহ একজন পশ্চিমা পাকিস্তানি মেজর এসেছিলেন সংবাদ শুনে। তিনিও এই নির্মম ও বিভৎস্য হত্যাকণ্ডের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, এত বছরের চাকুরিজীবনে এমন নৃশংস ঘটনা তার চোখে পড়েনি। এর জন্য তিনি একটি তদন্ত কমিটিও করেছিলেন। কিন্ত ঐ পর্যন্তই শেষ। তিনিই পুরুষদের জন্য রওশন বিহারী ও নারীদের জন্য রুপজান বেওয়াকে নির্দেশ দিয়েছিলেন অন্যান্যদের সাথে করে দ্রুত বাড়ির পেছনে লাশ গুলোকে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। সে সময় লাশগুলোকে শনাক্ত ও গোসলের জন্য সহযোগিতা করেছিলেন প্রতিবেশী রুপজান বেওয়া। বাড়ির পেছনে পূর্বপাশে ফাকা জায়গায় চারটি কবরে মোট ১৬ জনকে কবর দেওয়া হয়েছিলো। দুইটি কবরে ছোটদের পাঁচজন করে এবং অন্য দুটি কবরে বড়দের তিনজন করে দাফন করা হয়। ঐদিন রাতে কোহিনুর ভিলায় আকেজন কর্মচারী ছিলেন যার নাম আকুল। তিনি ঐ সময় প্রকৃতির ডাকে বাইরে থাকাবস্তায় বাড়ির ভিতরে এরকম চিৎকার চেঁচামেচির ফলে তিনি রুটি তৈরির তন্দুর ঘরে মাচায় উঠে ভয়ে বসে ছিলেন সারারাত।
ভোরে উঠে তিনি বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলেন। বহুদিন তিনি আর শহরে আসতেন না ভয়ে। পরে কয়েকবার পরিচিত কারো কারো সাথে হঠাৎ দেখা সাক্ষাৎ হলেও আর খোঁজ পাওয়া যায়নি তার।
কুষ্টিয়া শহর জনমাবনহীন হয়ে গেলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও রাজাকারদের পৃষ্ঠপোষকতায় বিহারীরা ক্ষুন, ধর্ষণ, লুটপাট চালাতো। এলাকায় আধিপাত্য বিরাজ করে ক্ষমতা প্রদর্শন করতো। এই হত্যাকান্ডের কারণ হিসেবে প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান ও ইতিহাস অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, যেইদিন হত্যাকান্ড ঘটে সেইদিন বেকারী পুনরায় চালু করার উদ্দেশ্যে ব্যাংক থেকে ৬০ হাজার নগট টাকা উত্তোলন করেছিলেন বাড়ির মালিক রবিউল হক। এই টাকা লুট করার জন্যই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলো বিহারীরা।
আরও জানা যায়, এই হত্যাকাণ্ডের চার পাঁচদিন আগে স্টেশন রোডে মিলকো ব্রেড এন্ড বেকারীর সামনে সুরুজ মিয়া নামে পোড়াদহের এক ব্যবসায়ীকে হত্যা করেছিলেন বিহারী রাজাকারেরা। এই ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন রবিউল হক মল্লিক ও আরশেদ আলী মল্লিক। এলাকার শান্তি শৃংখলা রক্ষার্থে এলাকাভিত্তিক তদন্ত শুরু হয় উপরের নির্দেশে। কোহিনুর ভিলার হত্যাকন্ডের পরেরদিন তদন্ত কমিটির সদস্যদের আসার কথা ছিলো সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য। এ কারণে অনেকরে ধারণা সুরুজ মিয়া হত্যাকাণ্ডের প্রতক্ষ্য স্বাক্ষ্য হওয়ার কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলো বিহারীরা।
এছাড়াও অভিযোগ ছিলো, মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রতিরোধ যুদ্ধের সময় বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছিলো তার পরিবার। গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের অর্থ, পাউরুটি, বিস্কুট সরবরাহ করা, মানসিক ও পারিবারিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং বাড়ির বড় ছেলে আব্দুল মান্নান ছিলেন জয়বাংলা বাহিনীর সদস্য হওয়ার কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলো। বাড়ির মালিক ছিলেন স্থানীয় সজ্জন ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি। কোহিনুর ভিলার মালিক রবিউল হক মল্লিক ছিলেন, পাশেই মুসলিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। স্থানীয় বিহারীদের নজর পরেছিলো কোহিনুর ভিলার মেয়েদের উপর। সুযোগ বুঝে মহিলাদের উপর নির্যাতন শেষেই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলো।
ওই রাতের নির্মম হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় শহীদ হন পরিবারের সবাই। বাংলাদেশে রবিউলের আর কোনো আত্মীয়স্বজন ছিল না। দেশ স্বাধীন হলে স্থানীয়রা ভারতের হুগলিতে খবর পাঠায়। সেখানে রবিউল হক মল্লিকের অন্যান্য ভাইয়েরা বসবাস করতেন। পরবর্তীতে বড় ভাই ইসমাইল মল্লিক খবর পেয়ে কোহিনুর ভিলায় এসে আলো জ্বালানোর ব্যবস্থা করেন। সেই ইসমাইল মল্লিকও মারা গেছেন। ওয়ারিশ সূত্রে এখন বাড়িটিতে ইসমাইল হোসেনের দুই ছেলে মো. হালিম মল্লিক, শিরু মল্লিক (ডালিম) ও এক মেয়ে আকলিমা খাতুন কোহিনুর ভিলায় বসবাস করছেন।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

বিজয়ের এত বছরেও কোহিনুর ভিলা গণহত্যার স্থান ও গণ কবরগুলি বিশেষভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। একাত্তর সালে বাড়ির আশে পাশে অনেক ফাকা জায়গা ও পূর্বপাশে ডোবা পুকর ছিলো। এখন বাড়ির চারপাশে পাকা দালান বাড়ি নির্মিত হয়েছে। ডোবা পুকর ভরাট হওয়ার পর বসতবাড়ি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হয়েছে। ১৬ জনের চারটি গণকবরের তিনদিকে পাকাবাড়ি ও একদিকে বর্তমানে ফাকা জায়গা রয়েছে। তবে সেটি অন্যর মালিকানা জায়গা। কবরের চারপাশে নামমাত্র পাঁচিল আছে। পাঁচিলের ভিতরে হরেকরকম লতাপাতা ও কয়েকটি গাছ রয়েছে। গণকবরের আসা যাওয়ার জন্যও বিশেষভাবে কোন রাস্তা বা গলি সংরক্ষিত করা হয়নি।
শুধু কবরের জায়গাটুকু খালি পরে আছে। প্রতিবেশিদের বাড়ির ভিতর দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে যেতে হয়। কোহিনুর ভিলার পুরাতন বাড়িটির অবস্থা খুবই শোচনীয়। বাড়িটির পুরাতন ছাদ ও পলেস্তরা খসে পড়ছে। পুরো বাড়ির বাড়িটিতেই হত্যাকান্ড ঘটেছিলো কিন্তু সেখানে ও গণকবরে কোন স্মৃতিস্তম্ভ কিংবা নামফলক আজও নির্মিত হয়নি। যে কোন সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। শুধু বাড়ির পশ্চিমপাশে রাস্তার পাশে ২০১০ সালে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ ৭১, খুলনা বিভাগ কর্তৃক একটি নামমাত্র নামফলক নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে শহীদদের পূর্ণাঙ্গ নামের তালিকা নেই। শহীদদের নামের পাশে উল্লেখ করা বয়স নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে।
প্রতিবছর ১৮ সেপ্টেম্বর কোহিনুর ভিলার গণহত্যার দিনটিকে সরকারি-বেসরকারিভাবে স্মরণ করা হয়না। কেবলমাত্র গণমাধ্যমকর্মীরা এ বাড়িটিকে ঘিরে সংবাদ প্রচার করে আসছে। নতুন প্রজন্ম জানেনা এই বাড়িটির ইতিহাস সম্পর্কে। জানে না গণহত্যার শিকার শহীদদের সম্পর্কে এবং কারা গণহত্যা চালিয়েছিলো। অথচ ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধ কোষ দ্বিতীয় খন্ড, সুকুমার বিশ্বাস রচিত একাত্তরের গণকবর ও বধ্যভূমি, বেগম নুূরজাহানের একাত্তরের আমি ও মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়া এবং রাশেদুল ইসলাম বিপ্লব রচিত কুষ্টিয়ার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থেও কোহিনুর ভিলার নির্মম গণহত্যার কথা সংক্ষেপে উল্লেখ রয়েছে।
বর্তমানে বাড়িতে বসবাসকারী শহীদ পরিবারের সন্তান মো. হালিম মল্লিক জানালেন, আমি প্রায় ২০টি বছর মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি এই বাড়ি ও কবরটি রক্ষা করার জন্য। স্বাধীনতার এত বছরেও এখানে কোন স্মৃতিস্তম্ভ বা গণকবর সংরক্ষণের কোন উদযোগ গ্রহণ করা হয়নি।
আমরা শহীদ পরিবারের মর্যাদাও পাইনি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে আমার পরিবারের এতবড় ত্যাগের ইতিহাস রয়েছে। আগামী প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগকারীদের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার জন্যই এই গণহত্যার স্থান ও গণকবর সংরক্ষণ করা উচিত। তাহলেই শহীদের পরিবার হিসেবে আমরা শান্তি পাবো এবং শহীদদের আত্মাও শান্তি পাবে।