চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

যোদ্ধার হাতে অস্ত্র আছে তো?

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশরক্ষার জন্য জীবন বাজি রেখে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধারা। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর ঠিক আগের বছরে এসে এখন করোনার মহামারী থেকে সেই স্বাধীন সার্বভৌম দেশের মানুষের জীবন বাঁচাতে যে চিকিৎসক, নার্সসহ মেডিকেল সংশ্লিষ্টরা যুদ্ধ করছেন—তারাই এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় যোদ্ধা। কিন্তু তাদের হাতে আমরা কী ধরনের অস্ত্র দিতে পেরেছি? বা তাদের নিজেদের জীবন রক্ষায় আমরা কতটুকু ব্যবস্থা নিতে পেরেছি? সে আলোচনাটি এখন সর্বত্র।

বাংলাদেশে করোনাযুদ্ধ বড় আকারে শুরুর আগেই চিকিৎসাব্যবস্থার বেহাল দশাটি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়—যা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত ছিল না। এখানে সমস্যাটি বহুমাত্রিক। কিন্তু সমাধানের যেসব কথা সরকারের তরফে বলা হয়, তার সাথে অনেক সময়ই বাস্তবতার পার্থক্য ঢের। সব খবর গণমাধ্যমে আসে না। কারণ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কারো বক্তব্য ছাড়া সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার করা যায় না। কিন্তু গণমাধ্যমকর্মীরা অফ দ্য রেকর্ডে অনেক কিছুই জেনে যান। সামগ্রিকভাবে মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে করোনাযুদ্ধের সবচেয়ে বড় সংকট চিকিৎসাখাতে অব্যবস্থাপনা। আর এই অব্যবস্থাপনার মূল কারণ চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত সুরক্ষার অভাব; করোনা চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোয় শুধু ‘নেই আর নেই’, অর্থাৎ হাজারো সীমাবদ্ধতা এবং সর্বোপরি দুর্বল চেইন অব কমান্ড। চিকিৎসাপ্রশাসনে নন চিকিৎসক আমলাদের আধিপত্য নিয়ে ডাক্তারদের ক্ষোভ বহুদিনের। যেটি এবার করোনার মতো বৈশ্বিক মহামারী মোকাবিলায় নতুন করে প্রকাশিত হলো বলে অনেকে মনে করেন।

বিজ্ঞাপন

একজন চিকিৎসকের জীবনের প্রধান ব্রতই হলো মানুষের সেবা করা। কোনো চিকিৎসকই চান না, তার কোনো রোগীর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হোক। একজন রোগী যখন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যান, সেটিই একজন চিকিৎসকের সবচেয়ে বড় সন্তুষ্টি।

চিকিৎসা বাণিজ্যিকীরণ হয়ে গেছে, বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে ‘কসাইখানা’ বলাসহ নানা অভিযোগ নতুন কিছু নয়। কিন্তু তারপরও যখন দেশে একটি বড় ধরনের স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দেয়, তখন ফ্রন্টলাইনে থাকেন এই চিকিৎসকরাই। যাদেরকে আমরা ‘কসাই’ বলি, সেই মানুষগুলোই অসুস্থ মানুষদের সেবায় এগিয়ে আসেন। কারণ এটাই তার কাজ। এ মুহূর্তে একজন জেলা প্রশাসক, একজন পুলিশ সুপার, একজন সচিব এমনকি একজন মন্ত্রীর চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ একজন চিকিৎসক ও নার্স। কারণ যিনি যে পেশার হোন না কেন এবং তিনি রাষ্ট্রের যত ক্ষমতাধর ব্যক্তি হোন না কেন, অসুস্থ হলে একজন চিকিৎসকের কাছেই তাকে যেতে হয়। সুতরাং কোটি কোটি মানুষের সুস্থ হওয়া, তাদের চিকিৎসা দেয়ার দায়িত্ব যে মানুষগুলোর উপরে, তাদের সুরক্ষাই তো সর্বাগ্রে বিবেচিত হওয়ার কথা। তাদের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাই তো রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু সেটি হচ্ছে কি? করোনা চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত একটি হাসপাতালের নার্স খাদ্যের অভাবে কান্নাকাটি করেছেন—এমন সংবাদও গোপন থাকেনি। তাহলে কোথায় আমাদের প্রস্তুতি? যারা মানুষ বাঁচানোর যুদ্ধ করছেন, তাদের বাঁচানোর দায়িত্ব তো রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র এখানে কতটা সতর্ক—সে প্রশ্ন কি উঠবে না? কেউ হয়তো একটি দুটি ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন বলে ভাবতে চাইবেন। কেউ হয়তো বলবেন, সিলেটে করোনায় আক্রান্ত একজন চিকিৎসকের আইসিইউ সাপোর্ট না পাওয়াটাও বিচ্ছিন্ন ঘটনা; কিন্তু এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোই তো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, আমাদের প্রস্তুতির হাল।

বিজ্ঞাপন

আবার উল্টো চিত্রও আছে। সুরক্ষাব্যবস্থা থাকার পরও সব চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীরা হাসপাতালে যাচ্ছেন না। অনেক জায়গায় সিনিয়র চিকিৎসকরাও যাচ্ছেন না। সিনিয়ররা না গেলে জুনিয়ররা ভরসা পান না। বরং এরকম সংকটকালে জুনিয়রদের মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখার দায়িত্ব সিনিয়রদের। একজন অধ্যাপক যখন তার সহযোগী বা সহকারী অধ্যাপকের মাথায় হাত বুলিয়ে ভরসা দেন, বলেন যে অমুক রোগীটাকে দেখে এসো, তখন সেই জুনিয়র সহকর্মী মনে করেন তার মাথার উপরে ছাতা আছে। কিন্তু যখন জুনিয়ররা যদি হাসপাতালে এসে দেখেন সিনিয়ররা নেই, তখন তারা আরও বেশি ভীত হয়ে পড়েন। আগেই বলেছি, অফ দ্য রেকর্ডে সাংবাদিকরা অনেক কিছু জেনে যান। সেই জানা থেকেই হাসপাতালের নাম উল্লেখ না করে কথাটি লিখলাম।

দেশের সব মানুষের সাহস, ধৈর্য্য, সংবেদনশীলনতা, মানবিকতা, মূল্যবোধ, কালচার যেমন এক নয়, তেমনি চিকিৎসকদের মধ্যে সবাই একরকম হবেন না। সুতরাং করোনার মতো বৈশ্বিক মহামারির বিরুদ্ধে দেশের সব চিকিৎসক সমানভাবে ঝাঁপিয়ে পড়বেন, সেটিও আশা করা ভুল। কিন্তু যাতে সব চিকিৎসক অন্তত এটা মনে করেন যে, তাদের মাথার উপরে ছাতা আছে, তারা স্বাধীনভাবে কাজগুলো করতে পারবেন, তাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মনে রাখতে হবে প্রত্যেক চিকিৎসকের একটি পরিবার আছে। এই দুঃসময়ে তার স্ত্রী, তার বাবা মা এবং তার সন্তানেরও এই অধিকার আছে যে, এখন তিনি বাইরে যাবেন না। কিন্তু চিকিৎসকরা পরিবারের সেই চাওয়াকে উপেক্ষা করেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাসপাতালে যান। পিপিই তাদের কতটা সুরক্ষা দেয়, তা নিয়েও প্রশ্নের শেষ নেই। কারণ সারা পৃথিবীতে এ পর্যন্ত করোনায় যত লোক মারা গেছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই চিকিৎসক। সুতরাং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে মানুষগুলো রোগীদের কাছে যাচ্ছেন, তাদের একশো ভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলেও সীমিত সাধ্য আর সম্পদে তাদের জন্য যতটুকু ব্যবস্থা করা যায় ততটুকু সঠিকভাবে হচ্ছে কি না, সেটি নিশ্চিত করা এবং তাদেরকে মানসিকভাবে দৃঢ় রাখা ও ভরসা দেয়াটা জরুরি।

চিকিৎসকদের মঞ্চ বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশন (বিডিএফ)-এর তথ্য বলছে, চিকিৎসকসহ অন্তত ২৯ জন স্বাস্থ্যকর্মী এরইমধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজন কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকদের আক্রান্ত হওয়ার কারণ রোগীদের রোগের তথ্য প্রকাশ না করা, চিকিৎসকদের জন্য সঠিক মানসম্মত সুরক্ষা পোশাক পর্যাপ্ত না থাকা এবং করোনার পরীক্ষা-নিরীক্ষার সংখ্যা কম হওয়া। সুতরাং শুধু করোনার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালই নয়, দেশের অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালেও প্রতিদিন যেসব রোগী চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে কতজন করোনায় আক্রান্ততা পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়া সম্ভব নয়। আবার সবাইকে গণহারে পরীক্ষা করাও সম্ভব নয়। তার মানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন চিকিৎসক ও চিকিৎসা-সংশ্লিষ্টরাই। সুতরাং তাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষাই সর্বাগ্রে বিবেচনা করতে হবে। দায়িত্ব পালন করতে চান না বলে বরখাস্ত করার আগে কেন তারা দায়িত্ব পালন করতে অনীহা প্রকাশ করছেন, সেটি অনুসন্ধান জরুরি।

করোনাভাইরাসমনে রাখা দরকার, ডাক্তারদের করোনা পজিটিভ হওয়ার সংখ্যা বাড়তে থাকলে হাসপাতালে ডাক্তারের সংখ্যা কমতে থাকবে। কারণ আগে তাদের নিজেদের বাঁচতে হবে। এই দুঃসময়ে আমলা ছাড়াও দেশ চলবে। কিন্তু অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসা দেয়ার লোক না থাকলে আমলা-রাজনীতিবিদ-সাংবাদিক-টকশোজীবী কেউই বাঁচবেন না।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)