চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

যে সিনেমায় জীবিত হয়ে উঠেছিলেন ৭৮ জন!

‘আলম আরা’ মুক্তির ৯০ বছর:

‘আলম আরা’র প্রচারণার জন্য নির্মাতারা লিখেছিলেন, “৭৮ জন মৃত মানুষ জীবিত হয়ে গেছে, তারা এখন কথা বলে।”

উপমহাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘আলম আরা’। যাকে বলা হয় টকি সিনেমা। এই সিনেমার নব্বই বছর পূর্ণ হলো রবিবার (১৪ মার্চ)।

নির্বাক ছবিতে শব্দের কোনো ব্যবহার ছিল না। তাই প্রয়োজন হতো না কোনো স্ক্রিপ্টের। গানও থাকতো না, তাই প্লেব্যাক সিঙ্গারের প্রয়োজনও ছিল না। উপমহাদেশের ছবিতে এসবই প্রথমবারের মতো নিয়ে এসেছে ‘আলম আরা’।

আরদেশির ইরানি পরিচালিত ‘আলম আরা’ ১৯৩১ সালের ১৪ মার্চ মুক্তি পায়। সেলুলয়েডের শব্দ যোগ করে সিনেমার নতুন অধ্যায় শুরু করেছিলেন এই নির্মাতা। সমাপ্তি হয়েছিল নির্বাক সিনেমার। তবে ইতিহাস গড়া এই সিনেমাটি অনেকেরই হয়তো দেখার সৌভাগ্য হয়নি।

১৯২৯ সালে আমেরিকান ফিল্ম শো বোট দেখে সবাক সিনেমা নির্মাণের অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন আরদেশির ইরানি। কিন্তু কাজটি সহজ ছিল না। কারণ, এই ছবি মুক্তির আগে ভারতের সব ছবি ছিল নির্বাক। ঝুঁকি নিয়েছেন নির্মাতা। বেশি দর্শক টানতে ছবিতে হিন্দির পাশাপাশি উর্দু সংলাপও রেখেছেন।

জোসেফ ডেভিডের পারস্যে নাটক অবলম্বনে তৈরি করা হয়েছে ‘আলম আরা’। রাজপুত্রের সঙ্গে এক জিপসি নারীর প্রেমের গল্প নিয়ে লেখা হয়েছে এই উপন্যাস। সিনেমায় মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন মাস্টার ভিথাল ও জুবেইদা। তবে অভিনয়ে ভিথাল দক্ষ ছিলেন না। তাই তার চরিত্রে খুব বেশি সংলাপ দেয়া হয়নি, দেখানোও হয়েছে খুব কম। ‘আলম আরা’ চরিত্রটিই প্রাধান্য পেয়েছে ছবিতে।

বিজ্ঞাপন

‘আলম আরা’ ছবিতে পৃথ্বীরাজ কাপুরও অভিনয় করেছিলেন। তিনি ছিলেন ‘আদিল খান’ চরিত্রে।

সিনেমায় শব্দ যোগ করার জন্য যন্ত্রপাতি ছিল না তখন। ‘আলম আরা’ সিনেমার শুটিং-এর সময়ে তাই শিল্পীরা পকেটে মাইক্রোফোন বহন করেছেন। শুটিং করার সময়েই তাদের সংলাপগুলো রেকর্ড করা হয়েছিল। বোম্বের ম্যাজেস্টিক টকিতে শুটিং করা হয়েছে ‘আলম আরা’র। কিন্তু স্টুডিওর পাশেই ছিল ট্রেনের লাইন। দিনের বেলায় শুটিং করলে ট্রেনের শব্দ যোগ হয়ে যাচ্ছিল দৃশ্যে। তাই শুটিং করা হতো রাত ১টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত। কারণ এই সময়ে ট্রেন চলাচল কম থাকতো।

সিনেমার গানগুলো তৈরি করা হয়েছিল তানার সাউন্ড সিস্টেমে। সিঙ্গেল সিস্টেম তানার ক্যামেরার মাধ্যমে রেকর্ড করা হয়েছিল গানগুলো। ‘দে দে খুদা কে নাম পে পেয়ারে’ গানে শুধু তবলা ও হারমোনিয়াম ব্যবহার করা হয়েছিল। এটি ভারতীয় সিনেমার প্রথম গান। গানটি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকেও রিয়েল সাউন্ড ব্যবহার করা হয়েছিল। মিউজিশিয়ানরা লুকিয়ে থাকতেন সেটের কোনায়, গাছের পেছনে।

সিনেমার নায়ক-নায়িকা নিজের কণ্ঠে কথা বলবেন, শুধুমাত্র এই কারণেই টিকেটের দাম ছিল চড়া। চার আনা দামের টিকেটের দাম নেয়া হয়েছিল ৫ রুপি করে।

‘আলম আরা’র প্রচারণার জন্য নির্মাতারা লিখেছিলেন, ‘৭৮ জন মৃত মানুষ জীবিত হয়ে গেছে, তারা এখন কথা বলে।’ এটা বলা হয়েছিল কারণ ‘আলম আরা’ ছবিতে ৭৮ জন শিল্পীর কণ্ঠ ছিল।

‘আলম আরা’ মুক্তির পর ব্যাপক সাফল্য পায়। এরপর আরদেশির ইরানি ভারতের প্রথম রঙিন ফিচার ফিল্ম ‘কিষাণ কানাইয়া’ সহও আরও অনেকগুলো সিনেমা নির্মাণ করেছেন।

দুঃখের বিষয় হলো ন্যাশনাল আর্কাইভস ইন্ডিয়া সহ কোথাও ‘আলম আরা’ সিনেমাটি সংরক্ষণ করা হয়নি। তাই অসাধারণ এই ছবিটি দেখার আর কোনো সুযোগও নেই।

বিজ্ঞাপন