চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

যেভাবে বেঁচে আছেন সু-মেকার মন্টু দাসরা

করোনাভাইরাসের কারণে সেই ২৫ মার্চ থেকে কাঁচাবাজার, মুদী দোকান আর ফার্মেসি ছাড়া ঢাকার সব দোকানপাটই বন্ধ। বন্ধ অফিস-আদালতও।

সারাদিন প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা ঢাকা এখন অনেকটাই মৃতনগরী। যে ঢাকা শহর ছিল গরিব দুঃখী আর স্বল্প আয়ের মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন করোনার কারণে সেই ঢাকা শহর এখন অনেকটাই নিষ্ঠুর। সেই নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছেন রাজধানীর সু- মেকারাও। দীর্ঘদিন ধরে কাজ করতে না পারার কারণে সু-মেকারদের পেটে ভাত জুটছে না। কর্মহীন হয়ে পড়ার কারণে হাজার হাজার সু-মেকার পরিবার বড় এক দুর্দিনের মধ্যে পড়েছেন। অনেক পরিবারই এখন অর্ধহারে অনাহারে দিনাতিপাত করছেন।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা শহরের বিভিন্ন আনাচে কানাচে শত শত সু-মেকার সেই সাত সকালেই তাদের বাক্সপেটরা নিয়ে বসতেন। এর বাইরে আবার বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশনে ঘুরে বেড়াতেন ভ্রাম্যমান সুমেকাররা। জুতা পালিশ, জুতা সেলাই থেকে শুরু করে চামড়ার বিভিন্ন জিনিস মেরামত করাই ছিল তাদের নিত্যদিনের কাজ। সারাদিনের আয় দিয়েই তাদের সংসার চলতো। কিন্তু গত একমাসেরও বেশি সময় ধরে এই পেশার মানুষদের কোনো আয় নেই। একেবারে কর্মহীন হয়ে ঘরে বসে আছেন তারা। কেউ কেউ পেটের ক্ষুধা মেটাতে এখানে-ওখানে কিছু সময়ের জন্য বসলেও বাইরে লোক সমাগম না থাকার কারণে অনেকটা শূন্য হাতেই বাড়ি ফিরে যেতে হচ্ছে। সে কথাই বলছিলেন সু-মেকার মন্টু দাস। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডের মাথায় তিনি বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে জুতা স্যান্ডেলের কাজ করেন। একমাস বাড়িতেই বসেছিলেন। অভাবের তাড়নায় দুদিন আগে বাক্সপেটরা নিয়ে নূরজাহান রোডে নিজের নির্দিষ্ট স্থানে বসেন যদি কিছু আয় হয় এ আশায়। সামান্য কিছু উপার্জনও করেন। কিন্তু দুপুরের পর তাকে চলে যেতে হবে। মন্টু দাস বলছিলেন, এক মাসের বেশি সময় ধরে কাজ না থাকার কারণে বড় বিপদে পড়েছেন। এখন দায় দেনা করে চলতে হচ্ছে। খুব অভাবের মধ্যে পড়েছেন তারা। এই অবস্থা চলতে থাকলে তাদেরকে আরও মহাসংকটের মধ্যে পড়তে হবে। মন্টু দাস আরও জানালেন, আগে প্রতিদিন কাজ করে যা আয় করতেন তা দিয়ে খুব ভালভাবে তাদের সংসার চলে যেত। কিন্তু এখন তাদের জন্য এক মহা দুঃসময়। জীবনে অনেক খারাপ সময় এলেও কখনই ভাবেননি এভাবে সবাইকে নিয়ে এরকম একটা বিপদে পড়বেন। এখন তাদের ঘরে চাল কেনার পয়সা নেই। খুব কষ্টে জীবনযাপন করছেন। সঞ্চয় যা ছিল ভেঙে খেয়ে ফেলেছেন। কোনো সাহায্য সহযোগিতা পেয়েছেন কিনা জিজ্ঞেস করলে মন্টু দাস আক্ষেপ করে বলেন, এ পর্যন্ত কিছ্ইু পাননি। কোনো ত্রাণের প্যাকেট চোখে দেখেননি। বললেন, ‘এমনিতেই আমাদেরকে একটু নিচু চোখে দেখা হয়। আমরা আমাদের কথা সবাইকে বলতে পারি না। কিন্তু আমাদের ঋষিপাড়াতে এখন অনেক পরিবারকেই খুব কষ্ট করতে হচ্ছে।’

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

মন্টু দাসের বাসা কেরানীগঞ্জের তারানগর ইউনিয়নের ভাওয়ালে। ওখানে কয়েক হাজার ঋষি পরিবার বংশ পরম্পরায় বসবাস করে। ভাওয়ালের ঋষি পরিবারের সদস্যরাই মোহাম্মদপুরের টাউন হল, বাসস্ট্যান্ড এলাকা, শিয়া মসজিদের মোড়সহ আশেপাশে যুগ যুগ ধরে জুতা-স্যান্ডেলের কাজ করে থাকেন। মন্টু দাস আরও বললেন, শুধু তিনি নন তাঁর বৃদ্ধ বাবা অখিল দাস যিনি নিয়মিত শিয়া মসজিদের মোড়ে জুতা পালিশের কাজ করতেন তিনিও বেকার। বেকার তাদের পাড়ার দিলীপ দাসও। যিনি মোহম্মদপুরের টাউন হলে নিয়মিত জুতা পালিশের কাজ করতেন। বেকার তাদের পাড়ার মনতোষ, সুখেন, সুদীপ, অচিন্ত, রাখাল, প্রদীপসহ আরও অনেকে। পরিবার নিয়ে সবাইই আকালের মধ্যে পড়েছেন।

করোনা ভাইরাসের বর্তমান অবস্থায় ভীষণ বিষণ্ণ মন্টু দাস। সব শেষে বললেন, ‘অন্নদাতা (ইশ্বর) কবে মুক্তি দেবে আমাদের। এ অবস্থা চললে ছেলেপুলে নিয়ে আমাদের মারা যেতে হবে।’

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)