চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

যেভাবে চালু হলো ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার

আপনি যদি কোনো দোকানদার হন, তাহলে ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে আপনি কাউকে বিশ্বাস করবেন? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যাদেরকে আপনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন এবং যাদের সঙ্গে লেনদেন করে এসেছেন তাদেরকেই তো বিশ্বাস করবেন। কিন্তু শহরের ক্ষেত্রে এই অবস্থা আরও ভয়াবহ।

বিবিসির টিম হারফোর্ড জানিয়েছেন, শহরের বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে চোখের দেখায় কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। সেক্ষেত্রে পরে মূল্য পরিশোধের জন্য ক্রেতাদের বিশেষ মুদ্রা, চাবির রিং সরবরাহ করে থাকে। এমনকি ১৯২৮ সালে কুকুর অঙ্কিত এক ধরণের বস্তু দেয়া হয় যাকে ‘‘চার্জা-প্লেটস’’ বলা হতো।

বিজ্ঞাপন

মূল্য পরিশোধ না করে এসব ক্রেডিট টোকেন দিয়েই ক্রেতারা স্বাচ্ছন্দে দোকানে গিয়ে ইচ্ছেমতো পণ্য নিতে পারতো। এরমধ্যে কোনো কোনো ক্রেডিট টোকেনকে নিজস্ব অধিকারের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো।

এরপর ১৯৪৭ সালে প্রথম এক ধরনের ক্রেডিট টোকেন আসে যা দিয়ে শুধু একটি দোকান থেকে নয়, কয়েকটি দোকান থেকে পণ্য কেনার সীমা বেধে দেয়া হয়। তবে এটা শুধু ব্রুকলিনের দুটি এলাকাতেই এটি অনুমোদিত ছিল।

এরপর ১৯৪৯ সালে ভ্রাম্যমান দোকানদারদের জন্য চালু করা হয় ডিনার্স ক্লাব কার্ড। এই কার্ড দিয়ে তারা খাবার ও জ্বালানি কেনা, হোটেলে রুম ভাড়াসহ যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ব্যবহারকারীদের একসঙ্গে করে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা যেতো।

তবে প্রথম বছরেই ব্যাপক চাপ থাকায় ৩৫ হাজার ব্যবহারকারীর ডিনার্স ক্লাব কার্ড বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর ১৯৫০ সালে ব্যাংকগুলো আমেরিকান এক্সপ্রেস চার্জ কার্ড এবং ক্রেডিট কার্ড চালু করে।

নিস্ক্রিয়তা দূরীকরণ
ব্যাংক অফ আমেরিকা ভিসা কার্ড প্রচলন করেন। আর তাদের প্রতিপক্ষ চালু করে মাস্টারকার্ড। কিন্তু শুরুর দিককার এই দুটি কার্ডেরই বড় সমস্যা ছিল। এর একটি হলো ডিম ও মুরগির ক্ষেত্রে। বিক্রেতারা উল্লেখযোগ্য ভোক্তা চাহিদা ছাড়া এই কার্ড গ্রহণ করতো না। অপরদিকে দোকানদাররা গ্রহণ করতে চাইতো না বলে অনেক ক্রেতাই নিবন্ধন করতে চাইতো না।

এই সমস্যা দূরীকরণে ১৯৫৮ সালে ব্যাংক অফ আমেরিকা ফ্রেস্নো, ক্যালিফোর্নিয়ায় ৬০ হাজার ক্রেতার মাঝে এক ধরণের প্লাস্টিক ক্রেডিট কার্ড সরবরাহ করে। প্রতিটি কার্ডে ৫শ ডলার সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়। তবে ৫ হাজার ডলার কেনাকাটা করার আগ পর্যন্ত কোন প্রশ্ন করা হতো না।

এই সাহসী পদক্ষেপ ফ্রেস্নো ড্রপ নামে পরিচিতি পায়। চোরেরা সহজেই কার্ড চুরি করায় এবং অনেক ঋণ হয়ে যাওয়ায় ব্যাংক লোকসানের মুখে পড়ে।

তবে ব্যাংকগুলো খুব দ্রুতই ফ্রেস্নো ড্রপ কাটিয়ে ওঠে। এরপর ১৯৬০ সালের শেষের ব্যাংক অফ আমেরিকা এক লাখ ক্রেডিট কার্ড চালুর ঘোষণা দেয়।

বিজ্ঞাপন

প্লাস্টিক ক্রেডিট আরও একটি সমস্যা ছিল। তা হলো দোকানে কোনকিছু কিনতে গেলে সেখান থেকে ব্যাংকে যোগাযোগ করা হয় লেনদেন সম্পন্ন করার জন্য।

তবে নতুন প্রযুক্তি এই হয়রানি থেকে পরিত্রাণ দিয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম হলো ম্যাগনেটিক স্টিপ। ১৯৬০ সালে সিআইএ সদস্যদের পরিচয়পত্রের জন্য প্রকৌশলী ফরেস্ট ডরিথা পারি এই ম্যাগনেটিক স্টিপ এর উন্নয়ন ঘটায়। তাপ এবং চাপের কার্যকর সমন্বয়ে তারা এই স্টিপ তৈরি করেন।

সংস্কৃতির পরিবর্তন
যদি আপনার ব্যাংক পুনরায় টাকা দিতে বিশ্বাস করে তাহলে কারো কিছু করার নেই। দোকানে দোকানে কম্পিউটার স্থাপন লেনদেনকে সহজ করে দিয়েছে। লেনদনের পর দোকানের কম্পিউটার থেকে রশিদ নিয়ে আপনি নিশ্চিন্তে বের হয়ে যেতে পারছেন।

সুতরাং এভাবে ক্রেডিট কার্ড সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। এবং যে কেউই একটি নেটওয়ার্কের আওতায় যুক্ত হয়ে শক্তিশালী বিশ্বস্ত গ্রুপের সদস্য হতে পারছে।

এটি একটি বড় সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। এখন কোনো ঋণ বা ঋণ নেয়ার কারণ দর্শানোর জন্য ব্যাংক ব্যবস্থাপককে তোষামোদের দরকার নেই। এখন চাইলেই সহজ ঋণের শর্তে কেনাকাটা করা যাচ্ছে।

তাহলে কি নগদ অর্থ লেনদন বিলুপ্ত হচ্ছে?
এসব সুবিধার জন্য মানুষ এখন ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কেনাকাটা করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কোনো কোনো দেশে নগদ অর্থের ব্যবহার বিলুপ্ত হতে চলেছে। সুইডেনে দোকানগুলোতে ২০ শতাংশ টাকা প্রদান করা হয় ক্রেডিট কার্ডে। আর মোট কেনাকাটার এক শতাংশ টাকা নগদ প্রদান করা হয়।

১৯৭০ সালের দিকেই আমেরিকার একটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের শ্লোগান ছিল ‘‘এটিকে টাকা মনে করুন”। এখন অনেক লেনদেন যেমন গাড়ি ভাড়া কেন্দ্র, বিমানবন্দর, হোটেল সবখানেই ক্রেডিট কার্ড চাওয়া হয়। এমনকি সুইডেনে কফিসপ, বার এবং কখনো কখনো শপিংমলেও ক্রেডিট কার্ড চাওয়া হয়।

ক্রেডিট কার্ডের অর্থ সীমাও এখন অনেক বাড়ানো হয়েছে। অনেকে বিলিয়ন ডলার পর্যন্তও খরচ করতে পারেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে প্রাপ্তবয়স্ক যে কেউ আড়াই হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ করতে পারবেন।

তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল জানিয়েছে, গৃহঋণ পেতে স্বল্প মেয়াদের জন্য ক্রেডিট কার্ড ভালো হলেও দীর্ঘমেয়াদের জন্য ঝামেলার।

Bellow Post-Green View