চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘যেখানে জীবনের ঝুঁকি সেখানে বিনা পারিশ্রমিকে কেউ কাজ করলেও লাভ নেই’

মুখোমুখি দেশের জনপ্রিয় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘হার্টবিট প্রোডাকশন’ এর কর্ণধার তাপসী ফারুক…

চলচ্চিত্রের মানুষদের কাছে তাপসী ফারুক পরিচিত একটি নাম। ইন্ডাস্ট্রির দুঃসময়েও কোটি কোটি টাকা লগ্নি করে নিয়মিত সিনেমা নির্মাণ করে সাফল্য পেয়েছেন। তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের নাম ‘হার্টবিট প্রোডাকশন’। শুরু থেকে প্রচারের আড়ালে থাকা নামি এ প্রযোজক করোনায় কুপোকাত চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ অবস্থা নিয়ে কথা বললেন চ্যানেল আই অনলাইনের সাথে।

করোনাকালে অনেকেই কাজে ফিরতে চাচ্ছেন। আপনার প্রোডাকশন কাজে ফিরছে?
করোনার সঠিক ঔষধ বা ভ্যাকসিন এখনো আবিষ্কার হয়নি। তিন ফিট দূরে থেকে, মাস্ক পরে কীভাবে কাজ হবে? নায়ক-নায়িকা পরষ্পরের কাছে আসবে কীভাবে? সিনেমা ইউনিটে শত মানুষের ভিড় থাকে। এতো ঝুঁকি নিয়ে কেউ কাজ করবেন কিনা সন্দেহ আছে। সিনেমাহলগুলো ‘পাবলিক গ্যাদারিং’ বলে বন্ধ রাখা হয়েছে। ছবি বানিয়ে চালালেও তো মানুষ করোনার ভয়ে হলে আসবে না। তাহলে ছবি বানিয়েও বা কী হবে? একটাই জিনিস বুঝি, ২০২০ সাল হলো জীবন নিয়ে ভালোভাবে বেঁচে থাকার বছর।

বিজ্ঞাপন

করোনা না গেলে আমি কাজ শুরু করবো না। যেমন: একজন শাকিব খান দেশের সম্পদ। তাকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তো কোনো বিপদে ফেলতে পারিনা। করোনা না গেলেও ভ্যাকসিন আসুক। তারপর আবার ধুমধাম করে কাজ শুরু করবো। যেখানে আমার শিল্পী, পরিচালক থেকে সবাই নিরাপদ থাকবে, ব্যবসাও নিরাপদ থাকবে।

বিজ্ঞাপন

করোনায় ইন্ডাস্ট্রির স্বার্থে কাজ বাড়াতে অনেকেই শিল্পীদের পারিশ্রমিক কমানোর পরামর্শ দিচ্ছেন। বিষয়টি কতোটা ইতিবাচক হবে বলে মনে করেন?
পারিশ্রমিক কমাবে এটা তো ভালো দিক। কিন্তু করোনায় ঝুঁকি নিয়ে কাজের পারিশ্রমিক কমিয়েও লাভ নেই। শুটিংয়ে কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে দায় কে নেবে? যেখানে জীবনের ঝুঁকি সেখানে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করলেও তো লাভ দেখি না। আর এ ঝুঁকি অবস্থায় শুটিং করার মতো প্রযোজক কোথায়? করোনার পরে পারিশ্রমিক কমানোর মানসিকতা থাকলে সেটা খুব ভালো দিক হবে, অন্তত সিনেমার স্বার্থে। শিল্পীরা পারিশ্রমিক কমালে ছবির বাজেট কমবে। এতে প্রযোজকের মনের শান্তি থাকবে। কম বাজেটে ছবিতে টাকা ফিরত আসার নিশ্চয়তা থাকবে।

শিল্পীদের পাশাপাশি পরিচালকদেরও দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করতে হবে। পরিচালক থেকে ইউনিটে জড়িত সবারই পারিশ্রমিক কমাতে হবে। চলচ্চিত্রে ১৭ সমিতি রয়েছে। তাদের এ ব্যাপারে তৎপর হতে হবে। সর্বোচ্চ ছাড় দিয়ে কাজ করতে হবে। সম্মিলিত চেষ্টা করলে আবার ছবি বানাতে প্রযোজক আসবে এবং তাকে পুঁজি ফেরত দেয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। ঝামেলা মুক্ত রাখতে হবে।

করোনা পরবর্তী অনেক সিঙ্গেল স্ক্রিন বন্ধ হবে। আগামিতে অনলাইন স্ট্রিমিং প্লাটফর্মকে টার্গেট করে ছবি বানিয়ে প্রযোজক লাভবান হতে পারবে? পাশের দেশসহ বহু সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি এটা করে সাফল্য পাচ্ছে।
এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে বড় বাজেটে ছবি বানিয়ে অনলাইন মুক্তি দিলে লাভের নিশ্চয়তা নেই। অন্যান্য দেশে অনলাইন টার্গেট করে ছবি বানিয়ে লাভের নিশ্চয়তা থাকে। সুপারস্টারদের ছবি টিভিতে প্রিমিয়ার করালেই এক থেকে দেড় কোটি মূল্য দেয়। এছাড়া স্পন্সর থেকে ভালো টাকা আসে। কিন্তু আমাদের এখানে সিনেমা হলের সুপারহিট ছবি টিভি প্রিমিয়ারের জন্য পাঁচলাখ টাকা দিতে চায়। তাই আমাদের দেশে ছবি বানিয়ে সিনেমা হল থেকেই লাভ করতে হয়। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি ভালো ছবি বানালে মানুষ ভাঙা চেয়ারে ছারপোকার কামড় খেয়েও ছবি দেখতে হলে যায়।

মহামারী করোনার কারণে ঢাকাই চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির কতটা ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করেন?
ক্ষতির পরিমাণ বিশেষজ্ঞরা বলতে পারবে। আমি মনে করি কয়েক শ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ইন্ডাস্ট্রির বহু মানুষ ইতোমধ্যেই বেকার হয়ে গেছে। অনেক প্রযোজক পরিচালক দিশেহারা। করোনা আসার আগেও ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা ভালো ছিল না। তখনও সরকারের সহযোগিতা দরকার ছিল। করোনা এসে একেবারে ইন্ডাস্ট্রির কোমর ভেঙে দিয়েছে। এখন সরকারি হস্তক্ষেপ (প্রণোদনা) ছাড়া আর কিছুই করার নেই। শিল্পীরা যতোই পারিশ্রমিক কমান না কেন সরকারি হস্তক্ষেপ লাগবেই।

আপনার প্রযোজনায় আসা কীভাবে?
একটি বেসরকারি টিভিতে শাকিব খানের একটা ইন্টারভিউ দেখেছিলাম। তাকে দেখতে খুব স্মার্ট লাগছিল। সেখানে সিনেমা নিয়ে, ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে শাকিব খান কথা বলছিলেন। আমাকে তা মুগ্ধ করে। তখন মনে হয় শাকিবকে নিয়ে ইন্ডিয়ার মতো ভালো ছবি করা সম্ভব। তারপর আমার ম্যানেজারকে ছবি নির্মাণের ব্যবস্থা করতে বলি। এরপর শাকিব খানের সঙ্গে যোগাযোগ করি। এভাবেই আমার সিনেমা প্রযোজনায় আসা। সেই থেকে আজও শাকিব খানের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক।

আপনার সবগুলো ছবি বাণিজ্যিক ধারার। অনেকে প্রযোজক ভিন্নধারার ছবি বানায়। আপনার প্রযোজনায় এমন ছবি নেই কেন?
আমাদের দেশের দর্শকদের বিরাট অংশ বাণিজ্যিক ছবি বেশি পছন্দ করে। আমার প্রযোজিত ছবিগুলোতে নায়ক থাকেন শাকিব খান। তিনি এসব ছবি করেই সুপারস্টার হয়েছেন। তাকে নিয়ে ছবি করার ইচ্ছার কারণেই বাণিজ্যিক ধারার ছবি করেছি। আর এভাবেই কাজ করেছি বলে বিনিয়োগ তুলতে পেরেছি।

আপনার প্রযোজিত ছবি কতগুলো? সাফল্য পেয়েছেন কটি?
এ পর্যন্ত ৮ টি ছবি প্রযোজনা করেছি। আমার প্রথম থেকে ৭ টি ছবির নায়ক শাকিব খান। প্রথম ছবি ‘মনে প্রাণে আছো তুমি’। তারপর ‘আমার প্রাণের প্রিয়া’, ‘মনের জ্বালা’, ‘খোদার পরে মা’, ‘ফুল এন্ড ফাইনাল’, ‘লাভ ম্যারেজ’ ও ‘সুপারহিরো’। সর্বশেষ বানিয়েছি ‘মনে রেখো’। কলকাতার নায়ক বনি সেনগুপ্তকে নিয়ে, নায়িকা ছিল মাহি।

আর শাকিবকে নিয়ে বানানো সবগুলো ছবিই সুপারহিট এবং সবগুলো ছবিতেই আমি ভালো লাভ করেছি। শেষ ‘সুপারহিরো’ ছবিটায় লোকসান হবে মনে করেছিলাম। মুক্তির আগে বিভিন্ন ঝামেলা গেছে। কিন্তু এদিক সেদিক দিয়ে আমি টাকা তুলতে পেরেছি। এখন আর লোকসান নেই। তবে ‘মনে রেখো’ ছবিতে আমি লাভ করতে পারিনি। দেশের বাইরে ছিলাম। প্রচারসহ একাধিক সমস্যায় পড়েছি। শুটিংয়ের সময় বাজেটও অনেক বেড়েছিল। এজন্য এই ছবিটায় আমার লোকসান হয়েছে।