চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

যাযাবর জীবন!

আজ অনেকক্ষণ ধরে মেঘেদের সাথে উড়াউড়ি করলাম। দুপুরের খাবারের পুরো বিরতিটা জুড়ে তাদের সাথে খেললাম লুকোচুরি। হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিলাম অফিস সংলগ্ন স্যার জোসেফ ব্যাংকস পার্কে। সেখানে যেয়ে খোলা মাঠে হাঁটার সময় খেয়াল করলাম মাটিতে মেঘের ছায়া লুটোপুটি খাচ্ছে। উপরে চেয়ে দেখি মেঘেরা আমার দিকে চেয়ে মুচকি হাসি দিচ্ছে। তাদের ভাবখানা এমন খেলবে আমাদের সাথে ডাঙা-কুমির? একেতো নাচুনে বুড়ো তার উপর মেঘেদের উস্কানী। নেমে পড়লাম খেলতে।

এই খেলাটা মজার। আমরা ছোটবেলায় খেলতাম। বাড়ির চার ভিটায় ঘর এবং তার সামনে বারান্দা হলো ডাঙা আর পুরো উঠানটা হচ্ছে পানি আর সেখানে থাকবে একজন কুমির। দুই হাতের পাতার বিশেষ মারপ্যাঁচে ঠিক করা হয় কুমির কে হবে। এরপর বাকিরা এ বারান্দা থেকে ও বারান্দা এভাবে পার হতে চাইবে। যদি কাউকে কুমির ছুঁয়ে দেয় তখন সে কুমির হয়ে যাবে। আজ অবধারিতভাবেই আমি হলাম কুমির কিন্তু মেঘেদের সাথে পেরে ওঠা কি চাট্টিখানি কথা। একসময় হাপিয়ে উঠে বললাম তোমরা খেলো আমি একটু সমুদ্রের বাতাসে শরীরটা জিরিয়ে নিই।

বিজ্ঞাপন

সিডনির বোটানি বে

এরপর হেঁটে ওভারব্রিজটা পার হয়ে চলে গেলাম বোটানি পোর্টে। ওভারব্রিজে উঠতেই হওয়ার তোড়ে মনে হলো আমিও যেন মেঘেদের সাথে উড়ে যাচ্ছি। আসলে মেঘেরা চাইছিলো না আমাকে একা ফেলে যেতে তাই ওরা বাতাসের কানে কানে বলে দিয়েছিলো যেন আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যায়। আমি বাতাসকে বললাম বাপু আমারও তো সত্যিই উড়ে যেতে ইচ্ছে করছে গো কিন্তু আমাকে তো আবার অফিসে ফিরতে হবে; এইবারের মতো মাফ করে দাও। শুনে বাতাস মনে হলো একটু মন খারাপ করে তার গতি কমিয়ে দিলো। আমি তখন আবার বললাম, মন খারাপ করো না, তোমরাই তো আমার বার্তাবাহক; কতদিন বাবা মাকে দেখি না কিন্তু তোমাদের কোমল স্পর্শে মনে হয় আমি যেন আমার মায়ের কোলেই আছি। আর আমার মা আমার মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে আর বলছে আমার খোকার তো দেখি প্রায় অর্ধেক চুল সাদা হয়ে গেছে। একথা শুনে বাতাস আবার জোরে বইতে শুরু করলো। মেঘেদের সাথে হুটোপুটি করতে যেয়ে আমি ঘেমেনেয়ে একাকার হয়ে গিয়েছিলাম। বাতাসের কোমল স্পর্শে সেটা শুকিয়ে শরীরে কেমন একটা প্রশান্তির ভাব এসে গেলো।

এভাবে অনেকক্ষণ বাতাসের আদর মাখালাম আর বোটানি পোর্টে আসা বড় বড় জাহাজ থেকে মালামাল নামানো দেখলাম। আহা এমনি করে অস্ট্রেলিয়াতে প্রথম মানুষ এসেছিলো সেই সুদূর ইংল্যান্ড থেকে। তারপর থেকে শুধু মানুষ আসতেই আছে আর আসতেই আছে তার কোন বিরাম নেই। আমরাও একদিন এসেছিলাম। ঠিক কিসের আশায় এসেছিলাম সেটা বলা মুশকিল কারণ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ে, বিসিএস দিয়ে সর্বোচ্চ চাকরিতে ঢুকে কেউ কখনও বিদেশে আসে না। বাংলাদেশকে যতই বলা হোক গণপ্রজাতন্ত্র বা রাজনীতিকদের হাতের পুতুল আসলে দেশটার আসল মালিক হচ্ছে সরকারি লোকজন তাই সরকারি লোকজন চাইলেই অনেক কিছু করতে পারে বা অর্জন করতে পারে। ইংরেজরা এদেশ ছেড়ে চলে গেছে অনেক আগে কিন্তু রেখে গেছে তাদের সব নিয়ম কানুন যেগুলোর উপর ভিত্তি করেই এখন পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ কাজকর্ম চলে। তাই উপনিবেশবাদ গেলেও ঔপনিবেশিকতা থেকে আমাদের মুক্তি মেলেনি।

স্যার জোসেফ ব্যাংকস পার্কের ছায়া সুনিবিড় পায়ে হাঁটার রাস্তা

বিজ্ঞাপন

যাই হোক বাতাসের দোল খেতে খেতে আর জাহাজ থেকে মালামাল নামানো দেখতে আমার দুপুরের খাবার সামান্য বিরতি ফুরিয়ে এলো। অফিসে ফেরার পথে আবার মেঘেদের সাথে পাল্লা দিয়ে হেঁটে আসা শুরু করলাম। স্যার জোসেফ ব্যাংকস পার্কে অনেকগুলো রাস্তা। ফেরার পথে অন্য রাস্তা নিলাম যেটা গাছেদের মধ্যে দিয়ে গেছে। রাস্তায় গাছের ছায়া পরে সুন্দর সব কারুকাজ তৈরি করছে। একটা গাছে বসে একটা কোকিল বিরামহীনভাবে ডেকে চলেছে। তার ডাক শুনে আমিও গলা মেলালাম। সেদিন আমার দশ বছরের মেয়ে তাহিয়াকে বলছিলাম, ছোটবেলায় আমরা কোকিলের ডাক শুনলেই গলা মেলাতাম। আর ওরাও আমাদের সাথে পাল্লা দিয়ে ডেকে চলতো। এখন তাহিয়া বাসায় থাকা অবস্থায় কোকিলের ডাক শুনলেই আমাকে গলা মেলাতে বলে এবং সেও মাঝেমধ্যে গলা মেলায়।

পার্কের মধ্যে সাপের চলার মতো আছে একটা আঁকাবাঁকা হ্রদ। সেই হ্রদের উপর আছে কাঠের সেতু অনেকটা বাংলাদেশের সাঁকোর মতো কিন্তু সাঁকোর মতো নড়বড়ে না। সাঁকোটা পার হয়ে ডান দিকের গাছের দিকে হঠাৎ চোখ গেলো। সেখানে পাখির জন্য কাউন্সিল থেকে ঘর বানিয়ে দেয়া হয়েছে। একটু পরেই বা দিকে দেখি পাশাপাশি দুটি গাছে একইভাবে পাখিদের জন্য ঘর বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এভাবেই আসলে এখানে প্রকৃতিকে রক্ষা করা হয় কারণ সবাই জানে প্রকৃতি না বাঁচলে আমরাও বাঁচবো না। প্রকৃতিই আসলে আমাদের মা।

স্যার জোসেফ ব্যাংকস পার্কের গাছে মানুষের তৈরি পাখির বাসা

হেঁটে হেঁটে পার্ক থেকে বের হয়ে আসার মুহূর্তে আবারও মেঘেদের দিকে তাকালাম। মেঘেদের বললাম, তোমরা তো উড়তে উড়তে সব দেশেই যাও? মেঘেরা বলল, সে আর বলতে, আমাদের তো আর তোমাদের মতো বিমানের টিকেট করতে হয় না আর পাখিদের মতো উড়তে উড়তে ক্লান্তও হতে হয় না বরং এই অবিরাম উড়াউড়িতেই আমাদের আনন্দ। আমি বললাম, তোমাদের দেখে আসলেই হিংসে হয়। তোমাদের কোন ভৌগোলিক বিধি নিষেধ নেই, যেখানে যখন ইচ্ছে যেতে পারো। তোমরা আমার হয়ে একটা কাজ করতে পারো। মেঘেরা উত্তরে বলল, অবশ্যই তা নাহলে আর বন্ধুত্ব কিসের বলো। আমি বললাম তোমরা যখন বাংলাদেশের উপর দিয়ে উড়ে যাবে দেখবে একজন মহিলা বাঁশের ঝাড়ের ছায়ায় বসে কাঁথা সেলাই করছে। আর তার পাশে একজন মধ্যবয়সী পুরুষ শুয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়ছে। ওরাই আমার বাবা মা। উনাদেরকে বলবে তোমাদের খোকা ভালো আছে।

এরপর মেঘেদের দিকে তাকিয়ে বললাম, তোমরা জানো তখন তারা দুজন কি বলবে? মেঘ বলল, তুমি জানো তারা কি বলবে? আমি বললাম, অবশ্যই তারাই তো আমাকে পেটে ধরেছেন, একটা বয়স পর্যন্ত বড় করেছেন। মেঘেরা বলল, উনারা কি বলবেন, বলতো? আমি বললাম, উনারা বলবেন- আমরা জানি আমাদের খোকা ভালো আছে কারণ আমরা সবসময় সৃষ্টিকর্তার কাছে তার জন্য দোয়া করি। মেঘেরা বলল, তাহলে আবার তুমি আমাদেরকে কেন বলছো তাদের কাছে তোমার ভালো থাকার খবর পৌঁছে দিতে। আমি বললাম, বাবা মায়ের মনতো যদিও তারা জানেন যে আমরা ভালো আছি তবুও তারা সেটা অন্যের মুখ থেকে শুনে নিশ্চন্ত হতে চান। বুঝলে বাবা মায়ের মন খুবই স্নেহকাতর। তারা আমাদের কাছে তো কখনও টাকা পয়সা চান না। নিঃস্বার্থভাবে শুধু চান যেন আমরা ভালো থাকি কারণ আমাদের ভালো থাকাতেই তাদের ভালো থাকা।

এই বলে মেঘেদের আর সুযোগ না দিয়ে অফিসের পথ ধরলাম। আমার কথাগুলো শুনে মেঘগুলো হয়তোবা ক্ষণিকের জন্য থমকে গিয়েছিলো অথবা পুরোটাই আমার কল্পনা।