চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ম্যাচের জন্য লিখনের হাহাকার

বিপিএল চলার সময় টম মুডি এবং ম্যাককালাম লেগ স্পিনার লিখনকে দুটি প্রশ্ন করেছিলেন। লিখন তার উত্তর দিতে পারেননি। পরে মুডি মাশরাফীর সঙ্গে লিখনের ব্যাপারে আলাপ করেন। তিনি সেই প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন কি না, লিখনের সেটা জানা নেই। লিখন শুধু এতটুকু জানেন, ওই প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজেও জানেন না!

রংপুর রাইডার্সের অস্ট্রেলিয়ান কোচ মুডির প্রশ্নটি ছিল এমন, ‘তোমাকে কেন লিগে নেয়া হয় না?’ একই দলের কিউই ব্যাটসম্যান ম্যাককালামের প্রশ্নটি ছিল এমন, ‘বিপিএলে তুমি কয় উইকেট পেয়েছ?’ নেট অনুশীলনে রথী-মহারথীদের এমন প্রশ্নে বিব্রত লিখনের কণ্ঠে শুধু হাহাকারই ঝরেছে। বিপিএলে যে দলই পাননি। ম্যাচ খেলা তো দূরের স্বপ্ন। এবার তো প্রিমিয়ার লিগে থেকেও নেই লিখন। একাদশে সুযোগ পাচ্ছেন না এই লেগি।

 

 

‘জাতীয় দলের হয়ে যখন খেলেছি খারাপ কিন্তু করিনি। সময় মতো উইকেট পেয়েছি, লেগস্পিনাররা যেটা করে। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট বের করতে পেরেছি,’ চ্যানেল আই অনলাইনকে লিখন বলেন আর আক্ষেপ করেন, ‘আমার মাইনাস পয়েন্ট হল ঘরোয়া লিগে খেলা হয় না। এমনও হয়েছে জাতীয় দলে ভাল করেও ঘরোয়া লিগে ম্যাচ পাইনি।’

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লিখন এক ‘অমূল্য’ সম্পদ। যত নামীদামী কোচ তাকে দেখেছেন, সবাই এই কথাই বলেছেন। ঘরোয়া ক্রিকেটে শতশত অফস্পিনার দেখা গেলেও লিখনের মতো রিস্ট স্পিনার নেই। বিশ্বক্রিকেটেও ভালো মানের রিস্ট স্পিনার হাতেগোনা। যারাই আছেন সবাই দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করছেন। আফগানিস্তানের রশিদ খান কয়েকদিন আগেও ওয়ানডে, টি-টুয়েন্টি র‌্যাংঙ্কিংয়ে শীর্ষে ছিলেন। এখন শুধু টি-টুয়েন্টিতে শীর্ষে। ওয়ানডেতে দুই নম্বরে। সাউথ আফ্রিকা সফরে ভারত সাফল্য পেয়েছে ওই রিস্ট স্পিনের কল্যাণেই। অথচ বাংলাদেশে লিখন দল পান না। পেলেও মাঠে নামতে পারেন না!

লিখন জাতীয় দলে আসেন হাথুরুসিংহে যুগে। নেটে দ্যুতি ছড়িয়ে। ৬ টেস্ট, ৪ ওয়ানডে আর একটি টি-টুয়েন্টি ম্যাচ খেলার পর লম্বা বিরতি। ২০১৫ সালের নভেম্বরে মিরপুরে জিম্বাবুয়ের সঙ্গে নিজের অভিষেক টি-টুয়েন্টি লিখনের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। তিন সংস্করণ মিলে উইকেট নিয়েছেন ২২টি।

চলমান ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে লিখন মোহামেডানে। লিগে সাদা-কালো শিবির ৯  ম্যাচ খেলে ফেললেও লিখনের এখনও নামার সুযোগ হয়নি। মোহামেডানের সহকারী কোচ হুমায়ুন কবির শাহীন জানালেন টিম কম্বিনেশনের কারণে এমনটা হচ্ছে। তবে দল সুপারলিগে উঠলে টিম ম্যানেজমেন্ট লিখনকে নাকি খেলানোর ব্যাপারে ভাবতে পারে।

Advertisement

শাহীন নিজেও ছিলেন লেগস্পিনার। আলাদা করে লিখনকে নিয়ে কাজ করছেন এবারই কোচিংয়ে নাম লেখানো এ তরুণ কোচ। তিনি বলেন, ‘আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারলে লিখন হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের বোলিংয়ের অন্যতম অস্ত্র। ও এখন পরিশ্রম করছে। আগের চেয়ে উন্নতিও চোখে পড়েছে। আগে বেশিরভাগ বল হাওয়ায় ভাসিয়ে দিত। এখন জোরের উপর ডেলিভারি দিচ্ছে।’

জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার পর সেইভাবে আর অনুশীলন করা হয়নি লিখনের। এখন চেষ্টা করছেন পুষিয়ে নেয়ার, ‘সত্যি কথা বলতে জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার পর ফোকাস থেকে একটু সরে গিয়েছিলাম। ঘরোয়া লিগে খেলা হয়নি। ওই সময় বিরতি পড়ে গিয়েছিল। ক্যাম্পে না থাকলেও অনেক সময় একটু গাছাড়াভাব চলে আসে, সেটা আমার হয়েছিল। কিন্তু এইচপি এবং ফিটনেস ক্যাম্পে ছিলাম বলে আবারও নিজেকে ফিরে পাচ্ছি। ফিটনেস ক্যাম্পে বিপ টেস্ট আমার ভাল ছিল। ওজনও কমছে ৩ কেজি। এখন যেখানেই সুযোগ পাচ্ছি অনুশীলন করছি। গতি ও অ্যাকুরিসি বেড়েছে।’

মুডির সঙ্গে ওই আলাপের কথা জানাতে জানাতে লিখন বললেন মাশরাফীর এক ‘উপদেশে’ অনুপ্রাণিত হওয়ার কথা, ‘‘রংপুর রাইডার্সের সঙ্গে নেটে যখন অনুশীলন করছিলাম মাশরাফী ভাই আমাকে একটা ভাল কথা বলেছেন। উনি বলেন, ‘৪-৫ বছর ঘরোয়া লিগ না খেললেও তোর মতো অনুশীলন করে যা। তোর ভেতর ওই সম্ভাবনা আছে, ভাল কিছু করতে পারবি।’

লিখনের এখন ভরসা বলতে ‘এ’ দল। সেটা নিয়েই আছেন, ‘আমার সময় এখনও ফুরিয়ে যায়নি। ৫ বছর যদি নাও খেলি, আরও শক্তিশালী হয়ে জাতীয় দলে ফিরতে পারি। এরপর যেন আর বাদ পড়তে না হয়। কাজ করে যাচ্ছি। মানসিকভাবে শক্তিশালী হওয়া, ত্রুটিগুলো শুধুরে নেয়া-এসব দিকে গুরুত্ব দিচ্ছি। ঘরোয়া লিগে না খেলেও এ টিমে সুযোগ পাচ্ছি, এইচপিতে থাকছি।’

লিখন প্রসঙ্গে বিসিবি কোচ মিজানুর রহমান বাবুল বললেন, ‘ও সম্ভাবনাময় একজন লেগস্পিনার সেটি নিয়ে কারও সন্দেহ নেই। তবে তার জাতীয় দলে আগমন খুব অল্প বয়সে হয়ে গেছে। আরেকটু পরিণত হয়ে আসলে হয়ত বাইরে থাকতে হতো না। এখনো সুযোগ আছে। মাত্র ২২ বছর বয়স। তবে আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হবে।’

ফতুল্লা টেস্টে ভারতের বিরাট কোহলি, অরিন্দম সাহার উইকেট নেয়ার পর লিখন সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান বলেছিলেন, ‘লিখনকে পর্যাপ্ত ম্যাচ খেলতে দিন, সে বাংলাদেশের হয়ে ৪০০ উইকেট নিয়ে দেখিয়ে দিবে।’

সাকিবের কথা কেউ শুনেছেন বলে মনে হয় না। তবু লিখন আশায় আছেন সুযোগ একদিন আসবে। এত এত গ্রেটদের মূল্যায়ন নিশ্চয়ই ভুল হতে পারে না!