চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মৌলবাদ প্রতিরোধে বাঙালির চেতনা

মৌলবাদের বিরুদ্ধে স্বল্প মেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা গ্রহণের স্বপক্ষে বুদ্ধিজীবীগণ বিভিন্ন বক্তৃতা, বিবৃতি দিয়ে থাকেন। এর পিছনে যে অন্তর্নিহিত কারণটি রয়েছে তা হলো: পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য স্বল্প মেয়াদী পদক্ষেপ; ভবিষ্যতের সুস্থ সুন্দর পৃথিবীর প্রত্যাশায় দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়ে থাকে। আশার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশ সরকার মৌলবাদ, জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। শুধু কাগজে কলমে গ্রহণ করেছে বিষয়টা এমন নয়; বাস্তবিকক্ষেত্রে প্রয়োগও ঘটিয়ে চলেছে অবিরাম। সমসাময়িক চলমান বিশ্বে মৌলবাদ সমস্যাটি আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। তার সমাধানের নিমিত্তে বিশ্বনেতারা বিভিন্ন উপায় বের করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু তারপরেও সমূলে নিপাটের মতো কোন উপায় বের হয়ে আসছে না। বর্হির্বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও সমস্যাটি প্রকট থেকে আরো ঘনীভূত হচ্ছে। সমস্যাটি আরো ভয়ংকর আকার ধারণ করছে জনসাধারণের নিকট। শ্বাপদসংকুল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের সরকারও বিভিন্ন রকমের গণমুখী পদক্ষেপ নিচ্ছেন যা সত্যিকার অর্থেই প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু তার ফলে কি মানুষের ভয়ের সংস্কৃতি দূর হচ্ছে? অবশ্যই হচ্ছে না কারণ, মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ব্যাঘাত ঘটছে মৌলবাদের বিস্তার এবং প্রসারের কারণেই। বিশেষ করে বলতে হচ্ছে; মৌলবাদের অর্থনৈতিক ভিত এবং রাজনৈতিক ব্যাপকতা দীর্ঘদিন ধরে বিস্তৃতি লাভ করায় সুসংহত অবস্থায় চলে এসেছে। কাজেই মৌলবাদের বিরুদ্ধে বহুমাত্রিক, সর্বব্যাপী এবং সংঘবদ্ধ আন্দোলনের প্রয়োজন রয়েছে। এ কথা দ্ব্যর্থহীন বলতে হচ্ছে; মৌলবাদের ভয়াবহতা সম্পর্কে সকলেই অবগত থাকার পরেও মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামে সবাইকে সামিল করার ব্যর্থতাকেই পুঁজি করে মৌলবাদি শক্তি দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতা নিয়ে ষড়যন্ত্র করতে বদ্ধপরিকর।

বাঙালি জাতি বীরের জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে তাঁদের তেজোদীপ্ত ও দুঃসাহসী কার্যকলাপের মাধ্যমে। কারণ সংগ্রাম আন্দোলন ও ত্যাগের মহিমার ভেতর দিয়ে বহু অর্জন ছিনিয়ে আনার প্রয়াস নিয়েছেন বাঙালিরা। কাজেই বাঙালি জাতিসত্তায় কখনো মৌলবাদি শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করবে এটা প্রায় অসম্ভব। তবু পরাজিত শক্তি সম্পর্কে সজাগ থাকার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অবয়াভবে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের দেশপ্রেমের মোহনায় উজ্জীবিত করে তুলতে হবে। সমসাময়িক কালে কোন জাতি আন্দোলনে ব্রতী হলে উদাহরণ হিসেবে বাঙালি জাতি, বাঙালির সাহসিকতাকে সামনের কাতারে নিয়ে আসে। সেই বীরের জাতি কোন সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারে না, কতিপয় দেশবিরোধী চক্র ও স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি কায়েম করে সাম্রাজ্যবাদ শক্তির রাজত্ব কায়েম করতে চায়। দেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বকে রক্ষার জন্য বাঙালিরা যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে সদা প্রস্তুত। তারই ধারাবাহিকতায় মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জ্ঞাতার্থে দেশপ্রেমিক জনতাকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ প্লাটফরম গঠন করা প্রয়োজন যেখানে মানবিকতা, মূল্যবোধ, স্বজাত্যবোধ, দেশপ্রেমের অনুশীলন করা হবে এবং এর ফলশ্রুতিতে মৌলবাদি শক্তি নিপাত যাবে অচিরেই।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

গুলশানের হলি আর্টিজান হোটেল, কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া এবং কল্যাণপুরে জঙ্গীদের সাথে পুলিশের মুখোমুখি সংঘর্ষের পরে মৌলবাদের বিরুদ্ধে দেশের মানুষের যে বিশাল সাড়া পাওয়া গেছে সত্যিই তা অনৈক্যের পৃথিবীতে বিরল। দেশের প্রতিটি মানুষ নিজস্ব উদ্যোগে যে যেভাবে পারেন প্রতিবাদ জানিয়েছেন, তথ্য দিয়ে কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করেছেন। দেশের প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানেও আমরা দেখেছি মৌলবাদের বিরুদ্ধে সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহণ। এ দৃশ্যটি ঐক্যবদ্ধ বাঙালির স্বাধীকার ও মুক্তি আন্দোলনের বহু ঘটনাকেই মনে করিয়ে দেয়। কারণ মহান মুক্তিসংগ্রামে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাঙালির আপামর জনসাধারণ যোগ দিয়েছিল বলেই স্বাধীনতা অর্জন সম্ভবপর হয়েছিল। সে দিন হয়ত বেশি দূরে নয় যেদিন বাংলাদেশকে আমরা মৌলবাদের ভয়াল থাবা থেকে মুক্ত করতে পারব। মানুষের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি পরিলক্ষিত হবে না, বাঙালি জাতি স্বমহিমায় তাদের চিরাচরিত ঐতিহ্য, সংস্কৃতি অবলীলায় ধারণ করতে পারবে কালের যাত্রায়।
দেখা গেছে, পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক না থাকায় ছেলেমেয়েরা বিপথগামী হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন: বাচ্চাদেরকে বাবা-মায়েদের আরো বেশি সময় দেওয়া প্রয়োজন। কিশোরদের সাথে পরিবার এবং সমাজের আত্নিক বন্ধনকে আরো মজবুত ও সুসংহত করতে হবে। সামাজিক বন্ধন যত বেশি সুদৃঢ় হবে আপনি ততবেশি মাত্রায় সামাজিক নিরাপত্তা বলেন কিংবা সমাজের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবেন। আর সমাজের নিয়ন্ত্রণে থাকা কোন মানুষের মধ্যে মৌলবাদি ধ্যান ধারণা ও চিন্তা চেতনার অভিপ্রায় লক্ষ্য করা যায় না। আর আপনি কিংবা আমি ঠিক তখনই সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হবো যখন আমাদের মধ্যে সামাজিক রীতি-নীতি, প্রথা, বিধি-বিধান, বিশেষ করে বাঙালিয়ানাকে ধারণ করতে পারবো। একটি বিষয়ের সঙ্গে অন্য বিষয়গুলো অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, সুনির্দিষ্ট করে বললে বলা যায়, নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করে থাকে সামাজিক প্রথাগুলো। সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় হওয়ার মানেই হলো, আমরা সমাজকে বিশ্বাস করি তথা অনুসরণ করার চেষ্টা করি। ঠিক তেমনিভাবে সমাজের প্রতি আমাদের সকলের কিছুটা হলেও দায়িত্ববোধ রয়েছে এবং দায়িত্ববোধের ধারাবাহিকতায় সমাজের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান ও অনুসঙ্গের সঙ্গে জড়িয়ে পরে দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিটি কখনো মৌলবাদি শক্তির সঙ্গে দেশবিরোধী আঁতাতে জড়িত থাকতে পারেন না। মোদ্দাকথা হচ্ছে, দেশীয় সংস্কৃতি ও সভ্যতায় আড়ষ্ট মানব নিশ্চিতভাবেই দেশপ্রেমের মহিমায় উজ্জীবন শক্তিতে আদিষ্ট হয়ে সকল ধরনের অপশক্তিতে প্রতিহত করার আন্দোলনে সোচ্চার থাকেন।

মৌলবাদকে চিরতরে নিপাট করা যাবে না যতক্ষণ না পর্যন্ত স্বজাত্যবোধ আমাদের মধ্যে জাগ্রত হয়। এছাড়া যে বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত তার মধ্যে অন্যতম হল: যুদ্ধাপরাধের বিচার দ্রুতগতিতে শেষ করতে হবে; জঙ্গীবাদের অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে, জঙ্গী অর্থায়নের উৎসমুখ বন্ধ করতে হবে; অস্রোপর উৎস সম্পর্কে গণমাধ্যমে সঠিক তথ্য প্রচার করতে হবে, ইতিমধ্যে প্রমাণিত এবং সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গীদের সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে, বাজেয়াপ্ত সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা রাখতে হবে এবং এটি একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে বিশেষ করে যারা অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জন করে তাদের ক্ষেত্রে। পাশাপাশি মৌলবাদে মদদদাতাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। মৌলবাদের আর্থিক যোগানদাতা হিসেবে যে সব প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে সবগুলোর বিরুদ্ধে তড়িৎগতিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সন্ত্রাসবাদ ও মৌলবাদ বিষয়ে স্কুল কলেজের পাঠ্যক্রমে মৌলবাদের ভয়াবহতা নিয়ে আলোচনা অন্তর্ভুক্ত রাখতে হবে। দেশে মৌলবাদ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কার্যকর আইনের বাস্তব প্রয়োগ ঘটাতে হবে, অন্যথায় মৌলবাদ যে ভয়ের সংস্কৃতি চালু রেখেছে তা থেকে বের হয়ে আসা দুস্করই বটে।
সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, স্বাধীকার মর্যাদা রক্ষায় বাঙালি জাতির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কোন বিকল্প নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে বাঙালি জাতি বরাবরই আপোসহীন। স্বাধীনতার যুদ্ধের মহারণে সাড়ে ৭ কোটি বাঙালির মধ্যেও কিছু কুচক্রী মহল ছিল। এখনো প্রায় ১৮ কোটি বাংলাদেশীর মাঝে কিছু কুট ষড়যন্ত্রকারী রয়েছে এবং থাকাটাই স্বাভাবিক, ষড়যন্ত্রকারীদের যে কোন মূল্যে পদদলিত করতে হবে। কারণ পরাজিত শক্তির প্রেতাত্না এখনো কিছু মানুষের কাছে বহমান এবং তারাই যোগসাজসে মৌলবাদি শক্তির উত্থান ও বিস্তারের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে তৎপর। পরাজিত শক্তি বিশেষ করে মৌলবাদি শক্তিকে প্রতিহত করে সুখী, শান্তি, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। স্বাধীনতা অর্জনের ন্যায় বাংলাদেশ থেকে যে কোন মূল্যে সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ নির্মুল করতে হবে। আর এ জন্য নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের সামনে এসে নেতৃত্বদানের সময় এসে পড়েছে, কেননা প্রকৃতি কখনো শূন্যস্থান পছন্দ করে না। সকল বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা বহমান থাকুক স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মানে ইহাই প্রত্যাশা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)