চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মোস্তফা কামাল সৈয়দ: পর্দার নেপথ্যে বরেণ্য মানুষ

মোস্তফা কামাল সৈয়দ। তার সাথে আমার দেখা হয়নি। এটি আমার দুর্ভাগ্য। আমি দেশের টেলিভিশন যুগের দ্বিতীয় প্রজন্মের তরুণ। বইয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে টেলিভিশনের প্রামাণ্যবিকাশে তার অবদানের কথা জানার সুযোগ হয়। আমি তাকে নিয়ে গর্বিত। প্রথম প্রজন্মের অনেকেই তাকে জানলেও ভুলে গেছেন। দুই হাজার সাল পরবর্তী টেলিভিশনের তরুণরা তাকে চেনেও না, জানেও না। রুধির ধারার মতো বাংলা ভাষার টেলিভিশনে বয়ে যাওয়া মানুষটির সাথে তার মৃত্যুর দিনেই অনেকের পরিচয়। চির বিদায়ের সাথে সাথে আবার ভুলে যাওয়াই যেনো নিয়তি। অনেকের বিস্ময় জিজ্ঞাসা,
‘উনি নাকি টেলিভিশনের অনেক বড় মানুষ। কখনো নাম শুনিনি তো।’

অর্ধ-মস্তিস্কের এই যুগে স্যাটেলাইট টিভির বাড়বাড়ন্তের কালে আমরা তাদেরকেই জানি যারা নিজের ঢোল নিজে সারাক্ষণ পেটাতে থাকেন। নিয়মিত টেলিভিশনের পর্দায় নিজের মুখ না দেখলে যাদের রাতের আরাম নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটে। মোস্তফা কামাল সৈয়দ তাদের দলে ছিলেন না। তিনি জ্ঞানী ও ধ্যানী। কর্মই ছিলো তার আজন্ম বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা।

বিজ্ঞাপন

জন্ম থেকে জ্বালিয়ে আলো
১৯৬৪ সাল থেকে ২০২০ সাল। পূর্ব পাকিস্তানে উপমহাদেশের প্রথম টেলিভিশনের সম্প্রচার থেকে বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশনের বিকাশ ও বিস্তৃতির পাঁচ দশকের পথ পরিক্রমা। ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় কামাল সৈয়দের নাম লিখা। সাদাকালো থেকে রঙ্গিন; ডিস এন্টেনা থেকে স্যাটেলাইট; বিচিত্র অনুষ্ঠান, সংবাদ, গান, সিনেমা, প্যাকেজ নাটক, বিদেশি সিরিয়ালের ডাবিং, নেপথ্য কণ্ঠ, আবহ সঙ্গীত সব প্রথমের সাথে কর্মবীর মানুষটি তার সাধনা, কর্ম ও সৃজনশীলতায় একাত্ম হয়ে আছেন। ২০০৩ সাল থেকে বেসরকারি টিভি চ্যানেল এনটিভির অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান ছিলেন। পূর্বে আরো কয়েকটি চ্যানেলে যুক্ত ছিলেন। তিনি সবখানেই ছিলেন আবার যেনো কোথাও ছিলেন না। টেলিভিশনের টেলপে সবচেয়ে বেশি প্রচারিত নাম হলেও নিভৃতচারি, সাদাসিধা মানুষটির মুখ দেখা যেতো কদাচিৎ। শুধু যারা তার সাথে কাজ করেছেন তারা জানেন কতটা সূক্ষ, কতটা সুনিপুণ, কতটা বৈচিত্র্যময়, কতটা খুঁতখুতে, মানের প্রশ্নে কতটা আপোষহীন মানুষ ছিলেন তিনি। বাংলা টেলিভিশনের জন্ম থেকে শিখা হয়ে ধূপের মতো নিজেকে পুড়িয়ে গিয়েছেন। সবাই শিখার আলো নিলেও ধূপটির খোঁজ নিলো খুব কমজনই।

শুরুতেই আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান দাবি করেছিলাম। কারণ একটি বেসরকারি টেলিভিশনে আমি যাদের সহকর্মী তারা বিটিভিতে কামাল সৈয়দের নিবিড় সহকর্মী ছিলেন। চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর তাদের মধ্যে অন্যতম। পরম মমতায় তিনি তার বই ‘বাংলা টেলিভিশনের ৫০ বছরে’ স্নিগ্ধ সৈয়দকে তার যোগ্য সম্মানটুকু দিয়ে লিপিবদ্ধ করেছেন। টেলিভিশনের ইতিহাস পড়তে গিয়ে পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় নিয়মিত বিরতিতে মোস্তাফা কামাল সৈয়দের কর্মকুশলতার বিবরণ পেয়ে আমার কৌতুহল বেড়ে গিয়েছিলো। অপত্য স্নেহের সুযোগ নিয়ে সাগর ভাইকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এই সৈয়দ আবার কোন সৈয়দ! আমি তো এক সৈয়দের সাথে পরিচিত। তিনি তো মোস্তফা কামাল নন। মুচকি হেসে সাগর ভাই বলেছিলেন,
‘এই সৈয়দের কাছেই আমাদের টেলিভিশন পাঠ। চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান কৃষি ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব তোমাদের প্রিয় শাইখ সিরাজ তারই হাতে তৈরি। এনটিভির ঝকঝকে অনুষ্ঠান তার অবদান। পারলে তার একটা ইন্টারভিউ করে রেখো।’

ফুরসত মেলেনি সাক্ষাতের, দীর্ঘশ্বাসই এখন সঙ্গী
মোস্তফা কামাল সৈয়দের সাথে আমার সাক্ষাতের সুযোগ হয়নি। টেলিভিশনের পুরোনো সেই দিনের কথা শুনতে না পারা আমার চির দুঃখ হয়ে থাকবে। ব্যস্ততায় ভুলো মন আমাকে সৈয়দের কাছে যাবার ফুরসত দেয়নি। যখন তাকে নিয়ে প্রতিবেদন করি সেটি তার চিরবিদায়ের দিনে দীর্ঘশ্বাসে জীবনপাঠ। কোথাও তার সম্পর্কে খুব বেশি কিছু না পেয়ে হতাশ হই।

খুবই আশ্চর্য হই যখন বেশিরভাগ টেলিভিশন তাদেরই নিকটজন এই দিকপালকে যথাযোগ্য মর্যাদায় স্মরণ করার ক্ষেত্রে অবহেলা করে। বিটিভির ৫০ বছর পূর্তি, চ্যানেল আইয়ের জন্মদিনের মতো অনুষ্ঠানে ব্যক্তি সম্পর্কের টানে তিনি দুবার এসেছিলেন। তরুণ রিপোর্টাররা তাকে চিনত না। তিনি যেচে সাক্ষাৎকার দেয়ার মানুষ ছিলেন না। পরিচিত ছাড়া কারো ইন্টারভিউ টেলিভিশন প্রতিবেদনে স্থান কালেভদ্রে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া পায় না! চ্যানেল আই প্রতিবছর বিটিভির জন্মদিন পালন করে। অনুষ্ঠানে বাংলা টিভির সোনার মানুষদের সম্মান জানানো হয়। আর্কাইভ ঘেঁটে তাকে অবশেষে পাওয়া যায় ছাদ বারান্দায় সকালের এমন এক ঝলমলে অনুষ্ঠানে। নিভৃতচারি মানুষটিকে অনেকটা জোর করে মঞ্চে তুলেছিলেন তারই শিষ্য উন্নয়ন সাংবাদিকতায় প্রিয়মুখ শাইখ সিরাজ।

সাগরের বইয়ে সৈয়দের মুখ
বাংলা টেলিভিশনের ইতিহাস নিয়ে ফরিদুর রেজা সাগরের আলেখ্যগ্রন্থ পড়া না হলে মোস্তফা কামাল সৈয়দ আমার কাছেও অপরিচিত থাকতেন। নি:সন্দেহে বলতে পারি পাঁচশত তিরাশি পৃষ্ঠার বইটি সৈয়দের র্কীতি জানতে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্ভরযোগ্য সূত্র।

বাংলাদেশ টেলিভিশন তখন ডিআইটি ভবনে (বর্তমান রাজউক)। জনপ্রিয় শিল্পী মোহাম্মদ আবদুল জব্বার ও জিনাত রেহানার একটি গানে সমুদ্রের প্রসঙ্গ ছিলো। কামাল সৈয়দ শিল্পীদের দিয়ে কালো বোর্ডে সাদা রঙের ঢেউয়ের ছবি আঁকিয়ে প্রথমবারের মতো গানের ফাঁকে ফাঁকে উপস্থাপন করেছিলেন। ৬০’র দশকে গানের অনুষ্ঠানে শিল্পীর পেছনে প্রিলুড-ইন্টারলুডের সময় পানির ঢেউয়ের ছবি ব্যবহার রীতিমতো বিপ্লবী সৃজনকর্ম। এখন ডাল-ভাত মনে হলেও প্রযুক্তির পশ্চাৎপদ সময়ে অবিশ্বাস্য ছিলো। বাংলা টেলিভিশনের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বৈচিত্রময় গানের অনুষ্ঠান নির্মাণের কৃতিত্বও তার। তিনি ছিলেন বৈচিত্র্যের গুরু। গানের অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে বিটিভিতে কোরআন তেলাওয়াত বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মসজিদের ছবি ব্যবহারের পথপ্রদর্শক তিনি। ‘বাংলা টেলিভিশনের ৫০ বছর’ বইয়ের ত্রিশ পৃষ্ঠা থেকে সৈয়দের খোঁজ পাওয়া যায়। কোন পাঠক কিংবা শিক্ষার্থী গল্পের ঢঙ্গে লেখা ‘বাংলা বোকা বাক্সের’ ইতিহাসের যত গভীরে যাবে ততই সৈয়দের কীর্তি, জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা ও নেতৃত্বে মুগ্ধ হতে বাধ্য হবে।

পূর্ব পাকিস্তান আমলে ঢাকা শহরে খুব বেশি উঁচু ভবন ছিলো না। মাত্র দুটি স্থানে ট্রাফিক লাইট ছিলো। বাংলা মোটর ও আজিমপুর। টেলিভিশনের টাওয়ার বসানোর জন্য সর্বোচ্চ উচ্চতার বিল্ডিং ছিলো ডিআইটি। এমন একটি দেশের টেলিভিশনে নগর পরিকল্পনা নিয়ে অনুষ্ঠান করার সাহস দেখিয়েছিলেন এই সৃজনশীল মানুষ। তার পরিকল্পনায় স্থাপত্য, গৃহনির্মাণ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে অনুষ্ঠান ‘একদিন প্রতিদিন’ উপস্থাপনা করতেন তরুণ স্থপতি ফরহাদুর রেজা প্রবাল।

মোস্তফা কামাল সৈয়দের হাত ধরে ঢাকা টেলিভিশন প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছিলো। জাপানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তার প্রযোজিত নাটক ‘কুল নাই কিনারা নাই’ প্রদর্শিত হয়েছিলো। আফজাল হোসেন ও সুবর্ণা মুস্তফা নাটকের প্রধান দুই শিল্পী ছিলেন। বাংলা টিভির ইতিহাসে এই স্মৃতি সবসময় দারুণ গৌরবের হয়ে থাকবে।

টেলিভিশন নাটক মানেই তখন রিহার্সেল ও ডায়ালগ মুখস্ত করা। হ্যালিকেন মেশিন আসার পর তিনি নাটকে আবহ সঙ্গীত যুক্ত করতে প্রচুর পরিশ্রম করেছিলেন । নাট্যকার মমতাজ উদ্দিন আহমদ বিশেষভাবে স্ক্রিপ্ট লিখতেন। মোস্তফা কামাল সৈয়দ দর্শকদের আবহ সঙ্গীতের মধুরতা ও সুরে আবিষ্ট রাখতেন।

বিজ্ঞাপন

পুরো বইয়ে তো আছেনই লেখক তার বইয়ের একটি অধ্যায়ের পুরোটা জুড়ে অদ্ভূত কর্মপাগল এই মানুষের প্রশংসা করেছেন। স্নিগ্ধ মানুষটি নিয়ে এই পর্বের নামও ‘স্নিগ্ধতার টেলিভিশন। বইয়ের ১০৫ পৃষ্ঠার মন্তব্য,
‘মোস্তফা কামাল সৈয়দ টেলিভিশনের যখন যে পদে থাকতেন তখন সেই পদই টেলিভিশনের কেন্দ্রবিন্দু। যেনো তিনি সূর্য তাকে ঘিরে কক্ষপথের গ্রহ নক্ষত্রগুলো প্রদক্ষিণ করে। তিনি যখন উপস্থাপনা শাখার প্রধান তখন তাকে দিনের বেশিরভাগ সময় স্বাভাবিকভাবেই স্টেশনে থাকতে হতো। সব পদে সততার সাথে কাজ করেছিলেন। যে কয়জন মানুষের আন্তরিক কাজের জন্য পুরোপুরি সরকারি প্রতিনিধি হয়েও টেলিভিশন জনগণের হতে পেরেছিলো তার সিংহভাগ কৃতিত্ব মোস্তফা কামাল সৈয়দের। নি:স্বার্থ এই মানুষটি সারাজীবন ভেবেছেন কিভাবে টেলিভিশনের পর্দাকে মানুষের কাছে জনপ্রিয় করা যায়।’

টেলিভিশন আর্কাইভের ডিকশনারি ছিলেন তিনি। উপস্থাপন শাখার প্রধান হিসেবে টিভি ভবনের ২১২ নম্বর কক্ষে বসে একমূহূর্তে বলে দিতে পারতেন আর্কাইভের কোন তাকে কোন টেপে কোন শিল্পীর গান রয়েছে। শুধু তাই নয় ‘অনএয়ার’এর জন্য নির্ধারিত গান টেপের কত নম্বর সেটিও বলতে পারতেন। অবাক লাগে কতটা ভালোবাসলে এতটা একাত্ম হওয়া সম্ভব। আর্কাইভ মনে রাখার এই কাজ সবসময় খুবই ক্লান্তিকর, একঘেয়ে এবং বিরক্তিকর বলেই মনে করা হয়।

আশির দশকে যারা টেলিভিশন দর্শক তাদের নিশ্চয় আমেরিকান আধুনিক জীবনযাত্রার ছবি ‘ডায়নেস্টির’ কথা মনে আছে। যখন বাংলাদেশ টেলিভিশনে দর্শকরা বিশ্বের বিখ্যাত ছবি, বিদেশি অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার দেখতো তখন সরকারী অফিস থেকে বাংলাদেশের বাইরে ফোন করা রীতিমতো কষ্ঠসাধ্য ব্যাপার ছিলো। রামপুরার পুরো টিভি ভবনে একটিমাত্র আইএসডি ফোন ছিলো । চিঠির যোগাযোগের উপর নির্ভর করে হলিউডের ছবি নিয়ে ঢাকায় বসে সিদ্ধান্ত নেয়া, আমেরিকান টাইম মিলিয়ে রাত ১০-১২টায় একমাত্র টেলিফোন থেকে আমেরিকায় ফোন করা সবই করেছেন। এই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে জনপ্রিয় সিরিয়াল ম্যাকগাইভার, দ্য ফল গাই, দ্য এ টিমের মতো দর্শক নন্দিত ডাবিংকৃত ইংরেজী সিরিয়াল বিটিভিতে প্রচারিত হয়।

অনুষ্ঠানের বাইরে মোস্তফা কামালের সৈয়দের ক্রিকেট খেলা নিয়ে আগ্রহ ছিলো। তার উদ্যোগের কারণে বিটিভির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত খেলা মুহূর্তেই দর্শকরা এখনো দেখতে পায় ।
স্যাটেলাইট টেলিভিশনে এই যুগে প্যাকেজ নাটকের ছড়াছড়ি। সরকারি লাল ফিতার দৌরাত্ম জয় করে তিনি বিটিভিতে নীতিমালা তৈরি করেছিলেন । নির্মাতা, পরিচালক, প্রযোজকদের জন্য টেলিভিশন নাটকে নতুন যুগের সুচনা করেছিলেন সৈয়দ।

টেলিভিশনের ইতিহাসে মোস্তফা কামাল সৈয়দ একমাত্র ডিডিজি (উপ-মহাপরিচালক) যিনি সংবাদ ও অনুষ্ঠান বিভাগে একই সাথে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অনুষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার পরও সংবাদের দায়িত্বে থাকা কালে তিনি ক্যামেরার কাজ থেকে সংবাদের আঙ্গিকেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছিলেন।

বাংলা টেলিভিশনের ফাউন্ডিং ফাদারদের অন্যতম এই র্কীতিমানকে নিয়ে নিশ্চয় তার সহযাত্রী, শিষ্য, শুভাকাঙ্খিরা স্মৃতিচারণ করবেন। ক্ষুদ্র এই কলামের মাধ্যমে তার সব মহৎ কীর্তির পূর্ণ নান্দীপাঠ আমার মতো অর্বাচীন তরুণের পক্ষে সম্ভব নয়। যারা তার সান্নিধ্য পেয়েছিলেন তাদের স্মৃতিকে উসকে দেয়ার জন্য এই আস্পর্ধা দেখিয়েছি। উত্তরযুগের তরুণ হিসেবে আমার দায় এই প্রাণপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যারা তার সাথে কাজ করেছেন তাদের কাছে আরো কৌতুহলোদ্দিপক অনুপ্রেরণামূলক তথ্য আছে। একটি সত্য ঘটনা বলে শ্রদ্ধাঞ্জলী সমাপ্ত করবো।

বই পড়া তার নেশা ছিলো। টেলিভিশনের সাথে বইয়ের দারুণ সেতুবন্ধন রচনা করেছিলেন তিনি । টিভির প্রথম যুগে একদিন হঠাৎ দেখা গেলো মোস্তফা কামাল সৈয়দ পরপর কয়েকদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমাপ্তি’ গল্পটা পড়ছেন। কী ব্যাপার প্রতিদিন কেন তিনি ‘সমাপ্তি’ পড়ছেন? তাকে জিজ্ঞাসার পর জানা গেলো আসল রহস্য। একজন প্রখ্যাত নাট্যকার এই গল্পের নাট্যরূপ দিয়েছেন। স্ক্রিপ্ট পড়ার পর তার মনে হয়েছে নাট্যকার গল্পের মূল বক্তব্য থেকে সরে গিয়েছেন। নাট্যকার যেহেতু বিখ্যাত তাই তিনি এটাও মানতে পারছিলেন না নাট্যকার না বুঝে কিছু করেছেন। যে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নাট্যরূপ দেয়া হয়েছে সেটি সঠিক কিনা বুঝতে বারবার তিনি ‘সমাপ্তি’ পড়েছিলেন।

শুধু সমাপ্তি নয় জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত টেলিভিশনের প্রতিটি অনুষ্ঠানের জন্য তার ছিলো এমন পরম মমতা, গভীর আন্তরিকতা, নিবিড় অভিনিবেশ।

মোস্তফা কামাল সৈয়দ প্রজন্মের চ্যালেঞ্জ ছিলো পরাধীন দেশে ও সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে প্রমাণ করা বাঙ্গালিরাও পারে। নিজেদের সক্ষমতা দিয়ে দেখিয়েও দিয়েছিলেন আমরাও পারি। দেশের মানুষকে হৃদয়ে ধারণ করে সকল সীমাবদ্ধতাকে জয় করে নিজেদের সৃষ্টিশীলতা দিয়ে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। বাংলা টেলিভিশনের ভবিষ্যত গতিপথ নির্ধারণ করতে হলে একজন মোস্তফা কামাল সৈয়দ পাঠ জরুরি। তার সহযাত্রী জেষ্ঠ্যজনেরা, তার স্নেহের ছায়ায় তৈরি হওয়া সোনালী পর্দার কর্মীরা স্মৃতিচারণের মাধ্যমে তার স্বর্ণোজ্বল বর্ণাঢ্য জীবন আরো আলোকপাত করবেন এই প্রত্যাশা রইলো। স্বর্ণকণ্ঠের নিভৃতচারী মোস্তফা কামাল সৈয়দকে না জানলে আমরা জানতে পারবো না আমাদের। টেলিভিশনের নিত্য পরিবর্তনের সংকট কালে পূর্বপুরুষ পাঠ পথ দেখাবে আলোকজ্জ্বল আগামীর।

মোস্তফা কামাল সৈয়দ আপনার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা।

পাদটিকা: বাংলা টেলিভিশন ইতিহাসের এই প্রাণপুরুষ গত ৩১ মে আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তাকে নিয়ে টেলিভিশন, সংবাদপত্রে খুব বেশি অনুষ্ঠান বা লেখালেখি দৃষ্টিগোচর হয়নি। মৃত্যু দিনে চ্যানেল আই ও এনটিভি তাকে স্মরণ করে। জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র নির্মাতা হানিফ সংকেত গত ৯ জুন ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ পত্রিকায় তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন। দৈনিক প্রথম আলোতে লেখেন জনপ্রিয় অভিনেতা আবুল হায়াত ‘একজন ভালো মানুষের সংজ্ঞা’। মাছরাঙ্গা প্রোডাকশনের সাবেক প্রধান পঙ্কজ বনিকের শ্রদ্ধা ‘আমার শিক্ষক মোস্তফা কামাল সৈয়দ’ অনলাইন পত্রিকা সারাবাংলা প্রকাশ করে। চ্যানেল আইতে রমজানে মাগরিবের আযানের দোয়া ও বঙ্গানুবাদ প্রচারিত হয়। মোস্তফা কামাল সৈয়দের প্রদত্ত সর্বশেষ কণ্ঠ আযানের দোয়া। চির বিদায়ের দিনে আই সংবাদে প্রচারিত প্রতিবেদনে কৃষি ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজের নির্দেশনায় আরো অনেক ছবি ও ভিডিওর সাথে তার দেয়া সেই কণ্ঠ ব্যবহার প্রতিবেদনকে ভিন্ন মাত্রা দেয়।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)