চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মোদি-হাসিনার এত মিল?

দ্বিতীয়বারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন নরেন্দ্র মোদি। গ্রীষ্মের দাবদাহে কৃষ্ণচূড়া ছাড়া কোথাও ‘লাল’ নেই ভারতে, বামেদের শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আসনের রাজ্য উত্তরপ্রদেশেও মায়াবতী-অখিলেশ যাদবের জোটকে ছাপিয়ে যাচ্ছে বিজেপি।

লোকসভা নির্বাচনে এখন পর্যন্ত ভোটের যে গণনা চলছে তাতে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের (এনডিএ) সহজ বিজয়ের চিত্র দেখা যাচ্ছে। বহুত্ববাদের ভারতে বামেদের ধুয়েমুছে যাওয়া ও সর্বভারতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসের গুরুত্ব হারানো এবং পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ দরকার।

বিজ্ঞাপন

প্রবল সমালোচনা সত্ত্বেও কোনো একটি রাজনৈতিক দলের পরপর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা সেই দলের ‘জনপ্রিয়তা’ নয়, বরং সেই দেশের বিরোধী শক্তির ‘অনৈক্য’ এবং ‘দুর্বলতা’কেই তুলে ধরে। কথায় আছে, জনতা যেমন, শাসকও তেমন। এন্টি আওয়ামী জোট করতে বাংলাদেশের বিরোধীরা যেমন দৈন্য, বিজেপির পুনরুত্থানের পেছনেও সর্বভারতীয় কন্ঠস্বরের শূন্যতাই বেশি দায়ি! মোদি হাসিনার বাইরে ‘নতুন কিছু’ নির্মাণের সংগ্রামে না থাকলে, মোদি-হাসিনা ‘খারাপ-খারাপ-খারাপ’ বলাটা সময়ক্ষেপন। আপনি যদি নিজে কোনো প্রতিষ্ঠান-ই খাড়া না করতে পারেন, তবে ‘প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা’ আপনার পক্ষে প্রায় অসম্ভব লড়াই।

গ্রীষ্মের দাবদাহে গাছে কৃষ্ণচূড়ার লাল রঙ ছাড়া পুরো বাংলাদেশ-ভারতে কোন লাল নেই, ময়দানের একাকী কৃষ্ণচূড়া যেন ক্ষয়িষ্ণু বিদায়ী বামপন্থার পাতাঝরা বৃক্ষ! শত শত সর্বভারতীয় লেখক, শিল্পী, চলচ্চিত্রকর্মী ও বিজ্ঞানী বিজেপিকে ভোট দিতে না করলেও, ভোটটা কাকে দেয়া যায় তা কিন্তু বলতে পারেনি! এর মাঝ দিয়ে প্রকৃত সংকটটাও বোঝা যাচ্ছে যে, মানুষ তার পছন্দের যোগ্য কোনো দলও খুঁজে পাচ্ছে না। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহাসিক ব্রিগেড সমাবেশ, আসামের বাঙালি প্রত্যার্পন, দিল্লিমুখী কৃষক মহামিছিল, শবরীমালা মন্দির, বামেদের দুই দিনব্যাপী বনধ, বিজেপি বিরোধী সর্বভারতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার চেষ্টা থেকে ভারতবাসী যোগ্য শাসক চিনে নিতে পারবে কি? বহুত্ববাদের পরম্পরায় গড়ে ওঠা ভারতবর্ষ কোনদিকে হাঁটবে?

ভারত এক মহাবিচিত্র দেশ। একে দেশ না বলে ‘ইউনাইটেড স্টেইটস অফ ইন্ডিয়া’ বলাটাই যুক্তিসঙ্গত। বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে আমি মনে করি, সফল হাসিনাকে অনুসরণ করেছেন কৌশলী মোদি। আজ আমি যদি দুই বাংলার কোনো সংবাদপত্রের সম্পাদক হতাম, আগামিকাল ব্যানার লিড করতাম- ‘মোদি ম্যাজিকে হাসিনার হাসি’।

বিজ্ঞাপন

হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত নরেন্দ্র মোদির জয় হতে যাচ্ছে এবং কৌশলী শেখ হাসিনার দেখানো পথেই হেঁটেছেন তিনি। বাংলাদেশের গত নির্বাচনে যেমন জাতীয়তাবাদ ও উন্নয়নের স্লোগান তুলেছেন শেখ হাসিনা, ঠিক একইভাবে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদের দেখানো পথে দেশরক্ষার জিকির তুলে সফল হতে যাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি। হাসিনা বলেছিলেন, আমি সব হারিয়েছি, আমি দেশের পাহারাদার। মোদি বলেছেন- আমি চৌকিদার। হাসিনা সিনেতারকা নিয়ে নেমেছেন, মোদিও সিনেতারকা নিয়ে নেমেছেন। হাসিনা মাশরাফিকে টেনেছেন আওয়ামী লীগে, মোদি টেনেছেন গৌতম গম্ভীরকে বিজেপিতে। হাসিনা কৌশলগত ঐক্য করেছেন হেফাজত তথা উগ্র ডানপন্থার সাথে, মোদি হেঁটেছেন উগ্র হিন্দুত্ববাদী আরএসএস’র হাত ধরে।

এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, ভারতে ভোট মওসুম শুরু হতেই প্রতিবেশি দেশের ভাবনা ও বাংলাদেশ-ভারতের নির্বাচনী মিল-অমিলে ব্যাখ্যা দিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম ৯ এপ্রিল তারিখ (ভোটের প্রচারে মোদী-হাসিনায় যত মিল), ভাবনাগুলো আজ হুবহু মিলে গেলো! পশ্চিমবঙ্গেও গতবারের চেয়ে বিজেপির এবার ভাল ফল করতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।

২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মোদি ঝড় থাকা সত্ত্বেও বাংলা থেকে মাত্র ২টি আসনে জয় পেয়েছিল বিজেপি। কিন্তু ইন্ডিয়া টুডে-অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া যৌথ জরিপে বাংলায় ৪২ টি আসনের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ২৩টি আসন পেতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। বিজেপি ভাল ফল করতে পারে বলে জানিয়েছে টুডেজ চাণক্য (১৮), টাইমস নাও-ভিএমআর (১১) এবং রিপাবলিক-জন কি বাত (১৮-২৬)-এর জরিপও।

আজ (২৩ মে) আনন্দবাজার অনলাইন জানাচ্ছে- ‘‘দেশ জুড়ে ফের গেরুয়া ঝড়। আর সেই ঝড়ে বেসামাল হিন্দি বলয় থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার-ওড়িশা, এমনকি উত্তর-পূর্ব। এককভাবে বিজেপি আগের বারের ২৮২ টপকে যাওয়ার মুখে। ৩০০ আসন পার করার ইঙ্গিত এনডিএ জোটের। উল্টো দিকে বিরোধী শিবিরে শুধুই হতাশা। ভোট গণনার প্রবণতায় স্পষ্ট ইঙ্গিত, কংগ্রেসের আসন সংখ্যা বাড়লেও সরকার গঠনের ধারে-কাছে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই ইউপিএ জোটের। চন্দ্রবাবু নাইডু, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মায়বতী-অখিলেশরা যে জোট গড়ার চেষ্টায় ছিলেন, নিজেদের রাজ্যেই শোচনীয় ফল তাদের।

আর পশ্চিমবঙ্গে? এখানে মমতা ব্যানার্জির উচিৎ তৃণমূলের প্রো-পাকিস্তানি ক্ষতিকর অংশগুলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের সাথে মৈত্রীর সম্পর্ক স্থাপন করা। তাহলে আজ পশ্চিমবঙ্গে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি সুবিধা করতো পারতো না, তৃণমূলও এভাবে খারাপ ফল করতো না। হাতে এখনো এক বছর সময় আছে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের আগে তিস্তার জলবণ্ঠনে মমতার উচিৎ একগুয়েমি ছেড়ে ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকার ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা। নইলে আমাদের বাংলাদেশের খালেদা জিয়ার মতো সময়ের কৃষ্ণগহ্বরে হারিয়ে যাবেন। ‘মোদি ম্যাজিকে হাসিনার হাসি’ যদি ব্যানার লিড হয়, তবে সেকেন্ড লিড করতাম- ‘মমতার ক্ষমতা কি খালেদা?’

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View