চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মোটিভেশনাল স্পিচ ও প্লাসিবো মেডিসিন: গুরুর বাণী আর গরুর মূত্রপানের অত্যাধুনিক পণ্যায়ন

ভারতে ‘মোটিভেশনাল স্পিচ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান’ এবং ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান প্রায় সমানভাবে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। বিশ্বজোড়া খ্যাতিমান ও পরিচিত হয়ে উঠেছে শিব খেরা, ডায়ানা হ্যেইডেন, সি কে প্রহ্লাদ, শিভানি ভার্মা, চেতন ভগত, উজ্জাল পাটনি, রাহুল কাপুর, প্রিয়া কুমার, আভা বন্দোপাধ্যায় এই রকম আরো অজস্র নাম।

বিশ্ববাজারে প্রতিদিনই নিত্যনতুন ‘মোটিভেশনাল স্পিচ’ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং ‘মোটিভেশনাল স্পিকার’ যুক্ত হচ্ছেন। সুজি ওরম্যান, ম্যরিলিন হ্যিক্যি, বিফ নেইকেড, সুস্যান পৌটার নামগুলোও ব্যাপক পরিচিতি পেয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

শোনা যাচ্ছে বাংলাদেশেও নাকি মোটিভেশনাল স্পিচ এবং স্পিকারদের জমজমাট বাজার গড়ে উঠেছে।

‘প্লাসিবো ইফেক্ট’ বলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পেটের ভিতরেই আরেক রহস্যবিজ্ঞান আছে। ধরা যাক কেউ একজন কোনো এক দূরারোগ্য রোগে সারাজীবন ভুগছে। ডাক্তার কবিরাজ কোনো কিছুতেই অসুখ ছাড়েনা। তিনি শুনলেন, কামরূপ-কামাখ্যায় এক সাধক নারীর দেয়া এক পানি পড়ায় কাজ হয়। সেই নারীর কাছে গেলেন। সাধুনি তাকে জানাল এই পানি আনতে সাত বছর ধরে সাত পাহাড় ডিঙ্গাতে হয়েছে। তারপর দুর্বোধ্য কিছু নাম-শব্দসহ বিচিত্র অনুপানের মিশ্রণে মিশ্রণটি বানানো হয়েছে বলে জানাল। রোগী পানিটি খেয়ে সত্যি সত্যিই সুস্থ হয়ে উঠল।

আসলে তার রোগটি ছিল মানসিক। মিশ্রণটি হয়ত সাধারণ পানীয় জল ছাড়া অন্য কিছুই ছিলনা। আমাদের কৈশোরে একদল দুষ্ট কিশোর একটি শিশুর প্রস্রাবে কোক মিশিয়ে বিদেশি মদের বোতলে পুরে বিদেশি মদ নাম দিয়ে এলাকার এক মদাসক্ত যুবককে পান করতে দিয়েছিল। পান করে যুবকটি সত্যিসত্যিই মহামাতলামো শুরু করে দিয়েছিল যা করার আসলে কোনো বিজ্ঞানসম্মত কারণ ছিলনা। প্লাসিবো ইফেক্ট এমনই!

বিশ্বাসের ভর করে চলছে ওষুধি বেচাকেনা

অনেক ক্ষেত্রেই রোগ সমস্যা নয়, রোগীই বড় সমস্যা। রোগ সমস্যার জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞান আছে। রোগী সমস্যার জন্য কী আছে? আছে অ-চিকিৎসাবিজ্ঞান। এটি অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে।

বিজ্ঞাপন

প্লাসিবো চিকিৎসাবিজ্ঞানের সেবা কিনা এই নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে এটি যে জমজমাট বাজারি পণ্য সেই সম্পর্কে দ্বিমতের অবকাশ কম। সময়ান্তরে প্লাসিবো পণ্য নানাভাবে বাজার দখল করে। ‘বিশ্বাসে মেলায় বস্তু’ বলে আমরা এটিকে সিদ্ধতাও দিই! সত্তর ও আশির দশক জুড়ে হোমিওপ্যাথি নিয়ে বিতর্ক জোরদার হয়। প্রশ্ন উঠে আসলেই ক্যান্সারসহ নানা দুরারোগ্য ব্যাধি হোমিওপ্যথির দ্বারা নিরাময় হচ্ছিল কি-না। চিকিৎসকদের বড় বড় সংঘসহ খোদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হতে প্রমান আসছিল যে এ’সবই আসলে প্লাসিবো ইফেক্ট। একদল মানুষের হোমিওপ্যাথির প্রতি ধর্মবিশ্বাসের মতই গভীর ভক্তি ও অনুরক্তি ছিল। হোমিওপ্যাথি আসলেই কতটা কাজ করত প্রমাণ করা কঠিন হলেও ভোক্তার বিশ্বাস যে কাজ করত তা নিশ্চিত করেছিল সেই সময়ের চিকিৎসক সমাজ। হোমিও-অনুরক্তি মনের অসুখমুক্তি ঘটাত। ফলাফল শরীরেরও অসুখমুক্তি ঘটত। তাবিজ-কবজ পানিপড়ায়ও একই ঘটনাই ঘটত।

প্লাসিবো ব্যবসার সাম্প্রতিকতম ও অত্যাধুনিকতম একটি প্রকরণের নাম ‘মোটিভেশনাল স্পিচ’। বিশ্বজুড়ে ‘মোটিভেশনাল স্পিচ’ এই সময়ের সেরা প্লাসিবো পণ্য। পৃথিবী জটিলতর হচ্ছে। পরিবার, সমাজ, সংসার, সম্পর্ক ভাঙছে। জনারণ্যেও মানুষের একাকিত্ব, সুখের অভাব, বিষন্নতা, দূর্ভাবনা, হতাশা, আত্মহত্যাপ্রবণতা ইত্যাদি সবই বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মানুষের স্বস্তি খোঁজার চেষ্টা। অন্যের পরামর্শ ও উপদেশ নিয়ে আত্মশক্তি বাড়ানো, ইচ্ছাশক্তি বাড়ানো, মনোবল বাড়ানোর মধ্য দিয়ে হলেও বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা তীব্রতর হচ্ছে। বাজারে ‘মোটিভেশনাল স্পিচ’ এর পণ্যচাহিদা তৈরি হয়েই আছে। তাই উৎপাদন, যোগান, বাজারজাতকরণও হবে সেটিই স্বাভাবিক।

মজিদের লালসালু ব্যবসা, এখনো পর্যন্ত যুগের পর যুগ চলতে থাকা মাজার ব্যবসা, পীর-ফকিরি, তাবিজ-কবচ-তদবির কোনটির কবে কখন কমতি হয়েছে? কালে কালে সমাজে মানুষের ব্যর্থতা, হতাশা, মানসিক বঞ্চনাবোধ, পাওয়া না পাওয়ার অতৃপ্তির ধরণ পাল্টায়। মনের রোগ পাল্টায়। সঙ্গে তাল মিলিয়ে পালটায় অষুধও। ভারতে কয়েক লক্ষ ধর্মগুরু-গুরুণী আছে, অসংখ্য-অজস্র মঠ আছে, গুরুর ও গরুর মূত্রপান-বিষ্ঠাপানের মাধ্যমে রোগ নিরাময় সেবালয় আছে। এখানেও যুক্তির চেয়ে ভক্তির তেজই বরং খানিকটা বেশি। বিশ্ববাজারে ভগবান রজনিশের মত কতশত ভগবান যে রোজ রোজ যুক্ত হচ্ছে সে’সবের গোনা-গুনতি নেই। বাড়ছে ওমশিংরিকিওর মত অসংখ্য কাল্ট। মুড়ি-মুড়কির মত বাড়ছে কোয়ান্টাম ও স্পিরিচ্যুয়াল হিলিং কেন্দ্র, মেডিটেশন সেন্টার, লাফটার ক্লাব, রিহ্যাব, আরো কত কি! এইসব ব্যবসার বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে অহরহ অনেক প্রশ্নবিদ্ধ বৈজ্ঞানিক গবেষণাও হচ্ছে। মানুষজন আধুনিক হয়েছে। কম্প্যুটার, রোবোটিক্স, রকেট সাইন্স, ভিনগ্রহে উপনিবেশের চিন্তার এই সময়ে মানুষ সব কিছুতেই বিজ্ঞান খুঁজে বেড়াবে এটিই স্বাভাবিক। মানুষের এই বিজ্ঞানমূখীনতার চাহিদার কারণে প্লাসিবো চিকিৎসাকে সমর্থন করার মত বৈজ্ঞানিক গবেষণার যোগানও বাড়ছে।

‘মোটিভেশনাল স্পিচ’ কেন পণ্য? এটি বেশ বড় ধরণের বিক্রয়যোগ্য শিল্পকলা বা আর্ট। বাজারজাতকরণ হয়। ভোক্তামহলে ব্যাপক চাহিদা আছে। ভোক্তারা টাকার বিনিময়ে পণ্যটি ক্রয় করেন। আধুনিক মোটিভেশনাল স্পিচ বইপত্র লেখাজোখায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন নগদ নারায়ন কেন্দ্রিক গ্ল্যামার ও বিনোদনের অংশ। সুবিশাল অ্যারেনা, গ্যালারি, আলো ঝলোমলো মিলনায়তন ভাড়া করে নজরকাড়া স্টেজে স্পিকার স্পিচ দেন। হাজার হাজার দর্শক-শ্রোতা জড়ো হয়। তাঁরা টাকা খরচ করে অগ্রিম টিকেট কিনেন। নাটুকে কথামালার যাদুকরিতে দর্শক-শ্রোতাদের হিপ্নোটাইজ করতে পারাই যেন স্পিকারের ধ্যান-জ্ঞান। আচ্ছন্নতার ঘোরে আটকে ফেলে মানুষের মনোযোগ দখলে নিতে পারার চেষ্টায় তাঁদের একাগ্রতার কমতি হয়না। ভোক্তা আকর্ষণের কৌশল-কলা রপ্ত করায় তাদের চেষ্টারও কমতি নাই! সুখ-শান্তি সন্ধানী মানুষজন কথার বিনোদনে সম্মোহিত হতে পারা কিনে। টাকা-পয়সা খরচ করে। সংক্ষেপে এই সবই মোটিভেশনাল স্পিচ-এর পণ্য-নমূনা।

মোটিভেশনাল স্পিচ শুনে অনেকেই উপকৃত হচ্ছেন বা হবেন বিষয়ে দ্বিমত করিনা। তবে স্পিকাররা যেসব উদাহরণ দেন যেমন রাস্তার নিঃস্ব গৃহহীনের বিলিওনেয়ার হয়ে যাবার গল্প, এটা-সেটা আরো অনেক অনেক আশা জাগানিয়া গল্প এ’সবের অধিকাংশই বাক-চাতুর্যে ভরা বানোয়াট ফ্যান্টাসি গল্প হিসেবে আস্তে আস্তে প্রমাণিত হচ্ছে। মোটিভেশনাল স্পিচ শুনে কেউ পাতাল হতে আসমানে উঠে এসেছে, এমন উদাহরণ এখনো নাই। তবে অনেকেই মনে করেন তাদের কিছু কিছু রোগমুক্তি ঘটেছে। কিন্তু এইসব অগ্রগতি যে আসলে ‘প্লাসিবো ইফেক্ট’ ছাড়া অন্য বিশেষ কিছু নয় তা বুঝতে রকেট সাইয়েন্টিস্ট হবার প্রয়োজন পড়েনা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)