চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মে মাসে সড়কে নিহত ২৯২, বেশি প্রাণহানি মোটরসাইকেলে

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন

করোনাভাইরাসের মধ্যে গণপরিবহন বন্ধ থাকার পরও গত মে মাসে সারাদেশে ২১৩ টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ২৯২ জন এবং আহত ২৬১ জন।

নিহতের মধ্যে ৩৯ জন নারী এবং ২৪ জন শিশুও রয়েছে । আর সবেচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। ৯৭টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৮৯ জন। যা মোট নিহতের ৩৩.৪৭ শতাংশ। এছাড়া সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে রাজশাহী বিভাগে।

বিজ্ঞাপন

বেসরকারী সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ৭টি জাতীয় দৈনিক, ৫টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ইলেক্টনিক গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।

বৃহস্পতিবার ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৪৫.৫৩ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ৫৬ জন পথচারী নিহত হয়েছে, যা মোট নিহতের ১৯.১৭ শতাংশ। পরিবহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ২১ জন।

দুর্ঘটনায় ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষ নিহত হয়েছেন ১৯৬ জন, অর্থাৎ ৬৭.১২ শতাংশ। এই সময়ে ৯ টি নৌ-দুর্ঘটনায় ২৮ জন নিহত, ১৭ জন নিখোঁজ হয়েছেন।

দুর্ঘটনায় ট্রাক যাত্রী ১৯, পিকআপ যাত্রী ১২, প্রাইভেট কার যাত্রী ৮, সিএনজি যাত্রী ১১, কাভার্ডভ্যান যাত্রী ৪, মাইক্রোবাস যাত্রী ৩, ট্রলি যাত্রী ৫, অটোরিকশা যাত্রী ২১, নসিমন-করিমন-ভটভটি-আলমসাধু- মাহিন্দ্র ইত্যাদি যানবাহনের ৬৪ জন যাত্রী নিহত হয়েছেন।

নিহতদের মধ্যে ৬ জন শিক্ষক, ১ জন চিকিৎসক, ১ জন সেনা সদস্য, ১ জন পুলিশ সদস্য, ১ জন গ্রাম পুলিশ সদস্য, ১ জন ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার, ২ জন স্থানীয় আঃ লীগ নেতা, ১ জন পরিবহন শ্রমিক নেতা, ১ জন কৃষি কর্মকর্তা, ১ জন ফুটবলার (জেলা অনুর্ধ-১৯ দলের অধিনায়ক), ২ জন ইমাম, ৯ জন পোশাক শ্রমিক এবং বিভিন্ন শ্রেণির ৪৮ জন শিক্ষার্থী।

মহাসড়কে দুর্ঘটনা ৪১.৭৮ শতাংশ
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে মহাসড়কে ৮৯টি (৪১.৭৮%), আঞ্চলিক সড়কে ৮৩টি (৩৮.৯৬%) এবং গ্রামীণ সড়কে ৪১টি (১৯.২৪%) ঘটেছে।

বিজ্ঞাপন

সংঘটিত দুর্ঘটনার মধ্যে ৫২টি মুখোমুখি সংঘর্ষ (২৪.৪১%), ৬১টি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে (২৮.৬৩%), ৮৪টি চাপা দেয়া ও ধাক্কা দেয়ার ঘটনা (৩৯.৪৩%) এবং অন্যান্য কারণে ১৬টি (৭.৫১%) ঘটেছে।

সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভোরে ৭.৫১ শতাংশ, সকালে ২৯.১০ শতাংশ, দুপুরে ২৩.০০ শতাংশ, বিকালে ১৮.৩০ শতাংশ, সন্ধ্যায় ৯.৩৮ শতাংশ এবং রাত ১২.৬৭ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

দায়ী যানবাহন
দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ট্রাক ৩৫.৬৮ শতাংশ, মোটর সাইকেল ৪৫.৫৩ শতাংশ, পিকআপ ১০.৭৯ শতাংশ, কাভার্ডভ্যান-ট্রলি-ট্রাক্টর ১০.৩২ শতাংশ, কার-মাইক্রোবাস-জীপ ৬.১০ শতাংশ, ইজিবাইক-সিএনজি অটোরিকশা ১৬.৪৩ শতাংশ, নসিমন-করিমন-ভটভটি ১১.২৬ শতাংশ এবং অন্যান্য যানবাহন ৯.৮৫ শতাংশ দায়ী।

এসব দুর্ঘটনায় আক্রান্ত যানবাহনের সংখ্যা ৩১১ টি। (ট্রাক ৭৬, কাভার্ডভ্যান ৭, পিকআপ ২৩, ট্রলি ৮, ট্রাক্টর ৭, তেলবাহী ট্যাংকার ১, সড়ক মেরামত কাজে ব্যবহৃত ট্রাক ১, পোশাক শ্রমিক বহনকারী বাস ২, মাইক্রোবাস ৫, প্রাইভেট কার ৭, জীপ ১, পাওয়ারটিলার ১, ধান মাড়াইয়ের মেশিন গাড়ি ৪, মোটর সাইকেল ৯৭, বাই-সাইকেল ৩, ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা ৩৫, নসিমন-করিমন-ভটভটি ২৪, টমটম ৩, আলমসাধু ৩, মাহিন্দ্র ২, চান্দের গাড়ি ১টি।

বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান
দুর্ঘটনার বিভাগ ওয়ারী পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা বিভাগে ১৯.২৪%, রাজশাহী বিভাগে ২১.৫৯%, চট্টগ্রাম বিভাগে ১১.৭৩%, খুলনা বিভাগে ১২.৬৭%, বরিশাল বিভাগে ৭.৯৮%, সিলেট বিভাগে ৯.৩৮%, রংপুর বিভাগে ৭.০৪% এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ১০.৩২% দুর্ঘটনা ঘটেছে।

বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে রাজশাহী বিভাগে। ৪৬টি দুর্ঘটনায় ৬৮ জন নিহত। কম বরিশাল বিভাগে। ১৭ টি দুর্ঘটনায় নিহত ২৪ জন। একক জেলা হিসেবে ময়মনসিংহে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। ১২টি দুর্ঘটনায় ১৭ জন নিহত। সবচেয়ে কম কুষ্টিয়ায়। ১টি দুর্ঘটনায় নিহত ১ জন।

সড়ক দুর্ঘটনার কারণসমূহ
১. ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন; ২. বেপরোয়া গতি; ৩. চালকদের অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা; ৪. বেতন-কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট না থাকা; ৫. মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল; ৬. তরুণ-যুবদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো; ৭. জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা; ৮. দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা; ৯. বিআরটিএ’র সক্ষমতার ঘাটতি; ১০. গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।

সুপারিশসমূহ
১. দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বৃদ্ধি করতে হবে; ২. চালকদের বেতন-কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট করতে হবে; ৩. বিআরটিএ’র সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে; ৪. পরিবহন মালিক-শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারীদের প্রতি ট্রাফিক আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে; ৫. মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন বন্ধ করে এগুলোর জন্য আলাদা রাস্তা তৈরি করতে হবে; ৬. পর্যায়ক্রমে সকল মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ করতে হবে; ৭. গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে; ৮. রেল ও নৌ-পথ সংস্কার করে সড়ক পথের উপর চাপ কমাতে হবে; ৯. শুধু কমিটি গঠন এবং সুপারিশমালা তৈরির চক্র থেকে বেরিয়ে টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা পোষণ করতে হবে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, গণপরিবহনে লকডাউন চলাকালীন সময়েও সড়কে মৃত্যু বেড়েছে। গত এপ্রিল মাসের তুলনায় মে মাসে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ও প্রাণহানি উভয়ই বেড়েছে। এপ্রিল মাসে ১১৯ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৩৮জন নিহত ও ১১২জন আহত হয়েছিল।