চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মেজর সিনহার প্রয়াত জনকের এক ঝলক

সেনাবাহিনীর প্রাক্তন এক কর্মকর্তার অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর টেলিভিশনের স্ক্রলে উল্কিত। প্রমাদ গুণলাম সাম্প্রতিক নানা অস্থিরতার গুজব সংবাদের পটভূমিতে। রাশেদ সিনহা নামের এক ঝকঝকে স্বেচ্ছায় অবসর নেয়া সেনা কর্মকর্তা তরুণের মর্মান্তিক বিয়োগে দেশবাসী ব্যথিত, ক্ষুব্ধ এবং উত্তেজিত হতে থাকল। দেশবাসীর একজন আমিও। যায় দিন।

রাষ্ট্রশক্তি, গণ ও সামাজিক মাধ্যম দেশের সবচেয়ে অপরাধ সংবেদনশীল এলাকার গোপন চেহারার কিছুটা সিসেম ফাঁক করে দিতে বাধ্য হল। বিচার বহির্ভূত নিধনের নিদান শুরুতে জনপ্রিয় হয় বিচারবঞ্চিত সাধারণের কাছে। তারপরই ঘটে ভয়ংকর পরিণতি। আলাদা হবে কেন প্রদীপ – লিয়াকত কর্মকাণ্ড ! মর্মান্তিক শিকার হয়েছে কতোজন শুধুমাত্র একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশ প্রান্তরের হিসাব ধরুন।

বিজ্ঞাপন

ফিরে আসি সন্তানসম রাশেদ সিনহার কাছে।রাশেদ নিধনের কয়েকদিন পর হঠাৎ জানতে পেলাম আমার বন্ধু রাশেদের জনকের কথা। একটু সিনিয়র বন্ধু এরশাদ ভাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জহুরুল হক হলের। ছাত্র ইউনিয়নের নম্র ভদ্র গোছের। এই নম্রতা আর ভদ্রতার জন্য প্রতিপক্ষের কতো কথা শুনেছি। কিন্তু একাত্তর দেখিয়েছে নম্র-ভদ্র একেকজন ছাত্র ইউনিয়নের বন্ধু কতটুকু দৃঢ়চেতা। আমাদের কম কথা বলা এরশাদ ভাই তাদেরই একজন।

বিজ্ঞাপন

একাত্তর। ২৫ মার্চ। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মগজের প্রতিটি পরমাণু যে ভয়াল নৃশংসতায় সজ্জিত সে রাত তার প্রমাণ রেখেছিল। আমরা লাখো নিরস্ত্র প্রতিরোধীরা হতচকিত ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলাম। নানা কঠিন অভিজ্ঞতার ঢেউ মোকাবিলা করে করে জন্মভিটা চাঁদপুর পৌঁছুলাম ৪ এপ্রিল। ৭ এপ্রিল অগণিত আসমানি বুলেট নেমে এলো চাঁদপুরে পাকিস্তানি স্যাভর জেট থেকে। স্ট্রাইপিং। ৮ এপ্রিল বিকালে বুলেট, বারুদ, কামানের গোলা নিয়ে পাকিস্তানি সেনাদল চাঁদপুর পৌঁছালো। ফের ছিন্নভিন্ন। চাঁদপুরের ছাত্র ইউনিয়ন-তরুণ ন্যাপের অগ্রণীরা গোপন যোগাযোগ গড়ে তুলে কর্মধারা ঠিক করে নিলাম।

চাঁদপুর তখন মহকুমা। পুরো চাঁদপুর তন্ন তন্ন করে দেশের নানা প্রান্ত থেকে জন্মপ্রান্তে ফিরে আসা এবং সেখানকার সমমনাদের একজোট করে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া ছিল তখনকার কাজ। নিত্য দশ-পনেরো মাইল হেঁটে হেঁটে এক এক গোপন সভা। ফরিদগঞ্জ তখন থানা। সম্ভবত মে মাসের মাঝামাঝি সে থানার মানিকঝার গ্রামের এক জঙ্গল মাঠে আমরা বিশ পঁচিশ জন একখণ্ড সভায় মিলিত হয়েছিলাম। দেখি নম্র ভদ্র এরশাদ ভাই সে সভায়। নিকটেই তার জন্মভিটি। এদিকে খবর পেলাম আগরতলায় আমাদের নিজস্ব বাহিনী গড়ে তোলার ক্যাম্প সূচিত হয়েছে। চাঁদপুর মহকুমা থেকে আমরা ষাট জন হাজীগঞ্জের কাছে মিলিত হয়ে নৌকাযোগে খাল ধরে যাত্রা শুরু করলাম।

বিজ্ঞাপন

এই ষাট জনের একজন রাশেদ জনক এরশাদ ভাই। নানা ঘটনা মিলিয়ে তিন দিনে আগরতলা। তার কয়েকদিন পরেই আকাশ। মানে সামরিক বিমানযোগে আসামের তেজপুরে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ প্রান্তরে। এরশাদ ভাই ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়ন – কমিউনিস্ট পার্টির মিলিত বিশেষ গেরিলা বাহিনীর দ্বিতীয় ব্যাচের প্রশিক্ষণার্থী প্রায় চারশ জনের একজন। আড়াই মাসের কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে স্বদেশ প্রবেশে উন্মুখ আমরা অস্ত্রের অপেক্ষায় ত্রিপুরার বাইখুরা ক্যাম্পে। অবশেষে ১১ নভেম্বর একাত্তর।

বিক্রমপুর, রায়পুরা ও মানিকগঞ্জ….……বৃহত্তর ঢাকার ৬৮ সদস্যের তিনটি গেরিলা গ্রুপ নোয়াখালী -চাঁদপুর হয়ে উদ্দিষ্ট স্হানে পৌঁছাবার জন্য ত্রিপুরার ভৈরব টিলা থেকে রাত সাড়ে দশটার দিকে কমান্ডার স্থপতি ইয়াফেস ওসমানের নেতৃত্বে স্বদেশের বেতিয়ারা গ্রামে পা রাখলাম। নভেম্বরের শীত শিশিরের মাতৃভূমি। সেই অনুভব যথাযথ ভাষা খুঁজে মরে এখনও। দশ মিনিটেই সে অনুভব বেতিয়ারা গ্রামভেদী ঢাকা চট্টগ্রাম সড়কে উঠতে না উঠতেই ছিন্নভিন্ন। সেখানে ওঁৎ পেতে থাকা পাকিস্তানি হানাদারদের আকস্মিক হামলা প্রতিহত করে পাল্টা হামলা চালিয়ে আমরা একসময় পিছিয়ে এলাম। বেতিয়ারা ধানের মাঠের সবুজে আমাদের বাহিনীর কয়েকজন শহীদের লাল রক্ত যোগে নবমানচিত্রের লাল সবুজ পতাকা প্রাকৃতিকভাবে নির্মিত হলো সে রাতে। আমরা পূর্ব নির্ধারিত ভৈরব টিলায় মিলিত হতে থাকলাম।অনেকে আহত। তবুও শত্রুর উপর পাল্টা হামলা চালাতে অধীর অনেকে।

স্থির প্রত্যয়ে আমরা মূলদল পুণঃপ্রস্তুুতিকল্পে পিছনে আশ্রয় গড়ে নিলাম। আমাদের অনেকে ফেরেনি। ভৈরব টিলায় তাই রয়ে গেলাম দলনেতা ইয়াফেস ভাইসহ আমরা তিনজন। রাতভর আমাদের সহযোদ্ধা অনেকে রক্ত, কাদাপানি আর প্রমত্ত আবেগ মেশানো জীবন্ত ভাস্কর্যের অবয়ব হয়ে ফিরতে থাকলো। ভোর হয় হয়। এমনি সময়ে একজন। আবছা কুয়াশায় আমাদের দেখে শংকিত। চিনতে পেরে গগনবিদারী ডাকে বলে উঠলাম…… এরশাদ ভাআআআই!!!

ঢাকা চট্টগ্রাম সড়ক পেরিয়ে দলছুট তিনি সারারাত ঘুরে ঘুরে ফিরে এলেন ঠিকানায়। ভুল শুদ্ধ হিসাব করে পুরো এলাকার মানচিত্র এঁকে ৩ ডিসেম্বর পুণঃপ্রস্তুতি নিয়ে সেই বেতিয়ারা পথ ধরেই মাতৃভূমিতে মাতৃসন্তানেরা ফিরে এলাম। পথে পথে পলায়নপর পাকিস্তান ও অনুচর বাহিনীর সাথে খণ্ডযুদ্ধ। এখানেও সশস্ত্র এরশাদ ভাই। তারপর? বেতিয়ারা বাহিনীর আমরা ‘কে কোথায় গেলেম’।এরশাদ ভাই রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা। রাজনীতির বাস্তবতায় সংযোগরহিত থাকলাম।

হঠাৎ একদিন শুনলাম মানিকঝার গ্রামের বীরমানিক সহযোদ্ধা এরশাদ খান জাগতিক প্রক্রিয়ায় পৃথিবীতে আর নেই। দিন যায়। রাশেদ সিনহার নৃশংস হত্যাকান্ডের তোলপাড়ে উত্তাল বাংলাদেশের গভীর থেকে ভেসে উঠলো ফের একাত্তর। বেতিয়ারা সহযোদ্ধা। শহীদ। চলে যাওয়া আর বেঁচে থাকাদের অস্বচ্ছ ছবি। তবে হঠাৎ মূর্ত হয়ে উঠলেন রাশেদ জনক এরশাদ খান।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)