চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ
Partex Group

মেঘের কোলে রোদ হেসেছে…

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে করোনাক্রান্ত কোনো ব্যক্তির প্রথম খোঁজ মিলেছিলো গত বছরের ৮ মার্চ। এরই মধ্যে প্রায় আঠারোটি মাস অতিক্রান্ত। কোয়ারেন্টাইন-আইসোলেশন কিংবা শাটডাউন-লকডাউনের মতো শব্দগুলো ইতোমধ্যেই জায়গা করে নিয়েছে আমাদের রোজকার আড্ডায়। বদলে গেছে জীবনধারা। একটু হলেও পালটে গেছে চলার পথের গন্তব্য। ইংরেজিতে এই পরিবর্তনকে দেয়া হয়েছে এক নতুন অভিধা- ‘New normal life’.
এ সুদীর্ঘ সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সঙ্গেও মানুষের সখ্য অনেকটা বেড়েছে। হয়তো কখনো একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমেই খোঁজ মিলেছে একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার কিংবা আই সি ইউ বেডের। কখনো আবার এ ফেসবুকের মাধ্যমেই দরিদ্র করোনা রোগীদের চিকিৎসার্থে অর্থ তহবিল গড়ে তুলেছেন দেশের স্বাবলম্বী নাগরিকবৃন্দ।
pap-punno
মহামারীর দিনগুলোতে এমন প্রশংসনীয় উদ্যোগ মানুষকে যেমন নতুনভাবে বাঁচতে শিখিয়েছে; তেমনি দেখা মিলেছে এমন বহু খবরের, যা এক নিমেষেই বিষণ্ণ করেছে মন। এই তো সেদিন! বাংলাদেশে যারা ফেসবুক ব্যবহার করেন, তাদের অনেকেই দেখতে পেয়েছেন এক হৃদয়স্পর্শী ছবি। এক করোনাক্রান্ত মা। শুয়ে আছেন ঘরের ভেতর, বিছানায়। আর তার ছোট্ট শিশুপুত্রটি বসে আছে সে কক্ষের দরজায়। সন্তানের হাতের একটি আঙুলের সঙ্গে মায়ের হাতের একটি আঙুল লম্বা একটি ফিতা দিয়ে বেঁধে দিয়েছেন বাবা। কারণ সন্তান বায়না করেছে, মাকে সে ছোঁবে। কিন্তু রয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ। সংক্রমণের ১৪ দিন অতিক্রান্ত না হলে কোনোভাবেই করোনাক্রান্ত রোগীর কাছে নেয়া যাবে না শিশুদের। অনোন্যপায় হয়ে ছেলের মন মানানোর জন্য বাবাকে তাই এ বিকল্প পদ্ধতির শরণাপন্ন হতে হয়েছে।
কেবল এই ছেলেটিই নয়। সমগ্র বাংলাদেশে এরকম অসংখ্য শিশু রয়েছে, চলমান মহামারী যাদের প্রতিদিনের গল্পগুলোতে এমন অনেক বদল নিয়ে এসেছে। এই পরিবর্তনকে একবাক্যে অশুভ বলার সুযোগ যেমন নেই, তেমনই তা যে শিশুদের জন্য শুধু মঙ্গল বয়ে আনছে, সেটিও বলা অসম্ভব।
চাকুরিজীবী বাবা-মায়ের সন্তান যারা আছে, তাদের কাছে এ ঘরবন্দি জীবন যেন এক আশীর্বাদ হয়েই এসেছে। মহামারী পূর্ববর্তী সময়ে কেবল ছুটির দিন ব্যতীত বাবা-মায়ের সঙ্গ উপভোগের সৌভাগ্য এ শিশুদের খুব কমই হতো। খুব সকালে কাজের তাড়ায় বেরিয়ে যেতেন বাবা-মা। ওদের সারাটি দিন কাটতো পরিবারের অন্য বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য কিংবা গৃহপরিচারিকার তত্ত্বাবধানে। কোনো কোনো অভিভাবক আবার সন্তানকে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে রাখতেই অধিক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। সবমিলিয়ে, শিশুদের বড় করে তোলার যে এক সুস্থ, স্বাভাবিক প্রক্রিয়া; সেখানে বাবা-মায়ের অংশগ্রহণ থাকতো খুব সামান্য। যার ফলে শিশুদের সহজ-সুন্দর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সেই অর্থে কখনোই পূর্ণতা পেতো না।
কিন্তু করোনা মহামারী নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকার যখন সাধারণ ছুটি কিংবা লকডাউনের মতো নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন, তখন থেকেই শুরু হলো ঘর থেকে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুশীলন। ফলে কর্মজীবী বাবা-মায়েরা দিনের অনেকটা সময় তাদের সন্তানের সঙ্গে কাটানোর সুযোগ পেলেন। দশটা-পাঁচটা সময়সীমার কর্মদিবসের দিনগুলোতে সন্তানকে যেটুকু সময় তারা কাছে পেতেন; তাতে সন্তানের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, ভুল-ভ্রান্তি ইত্যাদি নানা বিষয়ে তারা সম্পূর্ণরূপে ওয়াকিবহাল হতে পারতেন না। সন্তান অন্যের কাছে সত্যিকার সুশিক্ষা পেয়ে বড় হয়ে উঠছে কি-না, তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশে কোনো ছেদ পড়ছে কি-না, এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উপলব্ধি করতে এই ঘরবন্দি দিনগুলো বাবা-মায়ের সহায়ক হয়ে উঠলো। পৃথকভাবে বলতে গেলে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য বাবা-মায়ের এই সঙ্গটার খুবই প্রয়োজন ছিলো; যা মহামারীতে স্থবির এই পৃথিবী তাদের উপহার দিয়েছে।
এই ঘরবন্দি সময়ে কোনো কোনো অভিভাবক সন্তানদের নানা সৃজনশীল কর্মকাণ্ডেও যুক্ত করেছেন। কেউ কবিতা লিখতে শিখেছে; কেউ শিখেছে গান গাইতে। ছবি এঁকে শিশুরা যখন তা বাবা-মাকে দেখাচ্ছে, তারা প্রশংসা তো করছেনই; সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সে ছবি ছড়িয়ে দিতেও তারা ভুল করছেন না। ছোট্ট শিশুরা সেখান থেকেও অনেকের প্রশংসা কুড়াচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে, সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ডের প্রতি ওদের আগ্রহ বাড়ছে। কোনো কোনো শিশু আবার করোনা সংক্রমণ নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে ভিডিওচিত্র তৈরি করছে। এতে সেই শিশুটির ভেতরকার জড়তা যেমন দূর হচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষও সঠিকভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন।
Bkash May Banner
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠের মতো এ সময়ের কিছু নেতিবাচক দিকও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চলমান করোনা মহামারী অনেক স্বচ্ছল পরিবারকেও অর্থনৈতিক দীনতার মুখোমুখি করছে। সারাটিদিন ঘরে আবদ্ধ থাকতে থাকতে মানসিকভাবে অনেকেই ভেঙে পড়ছেন। উজ্জ্বল পারিবারিক সম্পর্কগুলোর মাঝে কখনোসখনো মরচে পড়ছে। বাড়ছে পারিবারিক সহিংসতা ও নারী নির্যাতন। চোখের সামনে একটি শিশু যখন এ ঘৃণ্য অপরাধগুলো সংঘটিত হতে দেখছে, তার মনে এ ঘটনাগুলো যে কতটা কুপ্রভাব সৃষ্টি করে চলেছে, তা সহজেই অনুমেয়।
তবে শিশুদের মাঝে কিছু ভালো অভ্যাসও গড়ে তুলছে এই মহামারী। করোনা সংক্রমণ শুরু হবার পর থেকেই আমাদের মাঝে নিয়মিত মাস্ক পরবার অভ্যাস গড়ে উঠেছে। অথচ বাংলাদেশের বায়ুদূষণপ্রবণ এলাকাগুলোতে, বিশেষত রাজধানী ঢাকা শহরে, এ অভ্যাস গড়ে তোলাটা কিন্তু বরাবরই বড্ড জরুরি ছিলো। একইভাবে এসে যায় ঘন ঘন হাত ধোয়ার কথা, শারীরিক পরিচ্ছন্নতা বিধি মেনে চলবার কথা। বর্তমান সময়ের শিশুরা এ সমস্ত অভ্যাসের মধ্য দিয়েই বড় হয়ে উঠছে। তাই ধরে নেয়া যায়, নিজেকে সুস্থ রাখতে প্রয়োজনীয় এ কাজগুলো ভবিষ্যতেও বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি থেকে তাদের দারুণ সুরক্ষা দেবে।
কিন্তু এই দুঃসময়ে মুক্ত আলো, মুক্ত বায়ুর বড্ড অভাব বোধ করছে শিশুরা। শহরাঞ্চলে যাদের বাস, তাদের তো স্বাভাবিক সময়েই দিনের অনেকটা সময় চার দেয়ালের মাঝে বন্দি থাকতে হয়। স্কুল-কোচিং-বাসা, এই তিন স্থানের চক্রেই সপ্তাহের অধিকাংশ সময় ব্যয় করতে হয় তাদের। কখনো যদি বাবা-মায়ের অবসর মেলে, একটু হয়তো পার্কে যাওয়া হয়। কিন্তু মহামারীর কারণে দীর্ঘদিন যাবত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিশুরা আজ সে সুযোগ হতেও বঞ্চিত। শিক্ষক-সহপাঠীদের সঙ্গে দেখা নেই।নেই খেলার মাঠের সবুজ ঘাসের পরশ। সারা দিন কেটে যায় ঘরবন্দি হয়ে, টেলিভিশন কিংবা কম্পিউটারের সামনে বসে। এ সকল অভ্যাস যে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে চরম হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
গ্রামাঞ্চলের শিশুদের আবার ভিন্নধর্মী সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আর্থিক দৈন্যদশার ভার সইতে না পেরে কন্যাশিশুকে বিয়ের পিঁড়িতে বসাতে চাইছেন পিতা। বন্ধ হচ্ছে লেখাপড়া। বৃদ্ধি পাচ্ছে বাল্যবিবাহ। ছেলেশিশুরা নিয়োজিত হচ্ছে শিশুশ্রমে। অন্নের অভাবে, হতাশায় পর্যবসিত হয়ে কেউ আবার জড়িয়ে পড়ছে মাদকাসক্তি কিংবা চৌর্যবৃত্তির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।

রাতের আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটির নাম ‘লুব্ধক’। তবে বাংলা অভিধানের পাতা ওল্টালে এ শব্দটির আরো কিছু খারাপ অর্থেরও দেখা পাওয়া যায়। যেমন, চোর বা চরিত্রহীন। কিন্তু ‘লুব্ধক’ শব্দটি উচ্চারিত হলে চোখের সামনে কিন্তু সেই জ্বলজ্বলে নক্ষত্রটির ছবিই সর্বাগ্রে ভেসে ওঠে। তেমনই এই করোনা মহামারী শিশুদের জীবনে কিছু নেতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে ঠিক। কিন্তু, ইতিবাচক পরিবর্তনও কিন্তু নেহাতই কম নয়। তাই সর্বপ্রথমে, শিশুদের মাঝে যে শুভ অভ্যাসগুলির চর্চা এসময়ে শুরু হয়েছে; পৃথিবী সুস্থ হলেও যেন সে চর্চা অব্যাহত থাকে, সেদিকে গুরুত্বারোপ করা আবশ্যক। আর যেটুকু অশুভ, তার বিনাশে এগিয়ে আসতে হবে সমাজের সকলকে। সরকারি পর্যায় থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত পর্যায় পর্যন্ত, সকল স্তরের মানুষ কার্যকরী পদক্ষেপ নিলে মহামারীর দিনগুলোতে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পরিপূর্ণতা আনা সম্ভব। প্রতিরোধ করা সম্ভব বাল্যবিবাহ সহ নানা সামাজিক অবক্ষয়মূলক কর্মকাণ্ড।

একদিন এ মহামারী বিদায় নেবে, নব অরুণিমায় উদ্ভাসিত হবে পৃথিবী। শিশুদের নিষ্পাপ হাসিতে সেদিন ফুলে ফুলে আনন্দ আসবে নেমে। ঘোর দুঃসময় কাটিয়ে ওদের সকলের কণ্ঠে বাজবে কবিগুরুর সেই অমর সংগীত- ‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে, বাদল গেছে টুটি। আজ আমাদের ছুটি ও ভাই, আজ আমাদের ছুটি…’

বিজ্ঞাপন

Bellow Post-Green View
Bkash May offer