চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মুসলিমদের সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করছে মেলবোর্নের ইসলামিক মিউজিয়াম

সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকে ইন্দোনেশিয়ার মুসলিম জেলেরা প্রথম অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পা দিয়েছিলেন বলে ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়। উত্তর অস্ট্রেলিয়ার প্রাচীন মানবদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে ইন্দোনেশিয়ার ওই মাকাসার জেলেদের ভাষার প্রভাবও ইতিহাসবিদেরা লক্ষ্য করেছেন।

এরপর ঊনবিংশ শতাব্দীতে আফগানিস্তান, ভারত এবং পাকিস্তানের মুসলমানরা অস্ট্রেলিয়ায় সমবেত হতে শুরু করেন। তারা সেখানে পরিবহন খাত, খনি শিল্প এবং গৃহনির্মাণ সামগ্রী সরবরাহে কাজ করেছেন। তবে আলাদা দেশ থেকে গেলেও অস্ট্রেলিয়ায় এদের সবাইকেই আফগান বলা হতো। মরুভূমির রাজা উট চালনায় তাদের খ্যাতি অস্ট্রেলিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। দেশটির অবকাঠামো নির্মাণে এই উটের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।

জিহাদ: নিজের ভেতরের মন্দের সঙ্গে ভালো’র লড়াই

অস্ট্রেলিয়ায় মধ্যাঞ্চল পুরোটাই মরুভূমি। দুর্গম সেই মরুভূমিতে রেললাইন স্থাপনে সহায়তা করেছে উট। এর আগে অস্ট্রেলিয়রা রেল লাইন স্থাপনে ঘোড়াকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে। শুষ্ক মরুভূমিতে ঘোড়া টিকতে পারতো না। সে কারণে বিকল্প হিসেবে উটের ব্যবহার শুরু হয়। এসব সফলতার গল্প সেখানে আছে।

সেই সময় থেকে অস্ট্রেলিয়ায় উট লালন পালন শুরু হয়। উট সেখানে বংশ বিস্তার করে। অস্ট্রেলিয়ায় এখন এত বেশী উট লালন পালন করা হয় যে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বিশেষ করে সৌদি আরব সেখান থেকে উট আমদানি করে।

ইসলামিক মিউজিয়ামে ক্যালিগ্রাফ

বিংশ শতকে এসে অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সেখানে অভিবাসী শ্রমিকের চাহিদা বাড়তে থাকে। সে কারণে তুরস্ক, আলবেনিয়া, বসনিয়া এবং লেবাননের মুসলিমরাও অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমাতে শুরু করেন।

নানা ধর্মের মানুষের সমাগমে অস্ট্রেলিয়া বহুজাতির দেশে পরিণত হয়। সেখানে এখন ৭০ এর উপর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এবং একশ’ ২০টির বেশী ভাষার মানুষ বাস করেন।

মোট জনগোষ্ঠীর দুই শতাংশের কম মানুষ মুসলিম হলেও অস্ট্রেলিয়ার ব্যবসা, শিল্প-সাহিত্য, রাজনীতি এবং গণমাধ্যমে তারা এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

অভিবাসী মুসলিম কিশোরীর বানানো ম্যুরাল

বিজ্ঞাপন

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে নাইন ইলেভেনের সন্ত্রাসী হামলার পর সারাবিশ্বে ইসলামফোবিয়া (মুসলিমভীতি) বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়াও এর বাইরে না। অন্য ধর্মের সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। সেই ভীতি এখনও কম-বেশী বিদ্যমান।

মুসলমান মানেই যে সন্ত্রাসী নয়– এ ধরণের বক্তব্য প্রচার করতে গেলে পাল্টা যুক্তি শুনতে হয়। ইংরেজী সেই যুক্তির বাংলা করলে দাঁড়ায়, সব মুসলিম সন্ত্রাসী নয় কিন্তু সন্ত্রাসী হামলাকারীরা সবাই মুসলামান। (‘All Muslims are not terrorist but all terrorists are Muslim.’)। তাই অন্য কমিউনিটির মানুষের সঙ্গে চলাফেরায় এক ধরণের অস্বস্তি মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে।

সেই অস্বস্তি কাটাতে মুসলমানরা নিজেদের কমিউনিটির মধ্যে এবং মুসলমানদের প্রতি সহনশীল অন্য কমিউনিটির মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে ইসলাম সম্পর্কে ইতিবাচক প্রচার-প্রচারণার উদ্যোগ নেয়।

অস্ট্রেলিয়ায় জনপ্রিয় সার্ফি বোর্ডে আাঁকা চিত্রকর্ম

বছর তিনেক আগে মেলবোর্নে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘ইসলামিক মিউজিয়াম, অস্ট্রেলিয়া’। এ মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠায় কমিউনিটির সদস্যরাই প্রাথমিকভাবে অর্থ যোগান দেয়া শুরু করেন। পাশাপাশি সেখানকার মুসলামনরা যেসব দেশ থেকে অভিবাসী হয়ে এসেছেন সেসব দেশের বিত্তবানদের কাছে সহায়তার আবেদন জানান।

ছোট ছোট অনুদান দিয়েই মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়। মুসলিম কমিউনিটির উদ্যোগ হলেও কেন্দ্র এবং স্থানীয় সরকার এটি প্রতিষ্ঠায় শুধু অনুমোদনই দেয়নি, পাশাপাশি অর্থের যোগানও দিয়েছে। সরকারের এই সহায়তা অব্যাহত আছে।

ইসলাম কী, এই ধর্মের সঙ্গে অন্য ধর্মের মিল কোথায়, সভ্যতার অগ্রগতিতে মুসলমানরা কী কী অবদান রেখেছেন– এরকম নানা ইতিবাচক বিষয় ইসলামিক মিউজিয়ামে স্থান পেয়েছে।

মেলবোর্নে ইসলামিক মিউজিয়ামের ভেতরের দৃশ্য

প্রবাসী জীবন যাপন করায় অস্ট্রেলিয়ার মুসলিম পরিবারের শিশুরাও ইসলাম সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে জানতে পারে না অনেক সময়। পরিবর্তিত পরিবেশে ইসলামের চর্চাও কম থাকে কোন কোন পরিবারে। অন্য ধর্ম বা কমিউনিটি দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ভীতি থেকে কোন কোন মুসলিম পরিবার নিজেদের পরিচয় গোপনও করে। আবার অন্য ধর্ম বা কমিউনিটির সদস্যরা নিজেদের শিশুদের মুসলিম শিশুদের সঙ্গে মেলামেশা করতে মানা করে দেন। সে কারণে কোন কোন মুসলমান শিশু এক ধরণের বিচ্ছিন্নতায় ভোগে। এমনকি একই পরিবারের মা-বাবার সঙ্গে সন্তানদের দূরত্ব তৈরী হতে দেখা যায়। বাবা-মা ধর্ম চর্চা করলেও সন্তানরা অনেক সময় আগ্রহ দেখায় না। দুই প্রজন্মের মানসিক দ্বন্দ্ব কখনো কখনো সংঘাতে রূপ নেয়।

মুসলমানদের এসব সঙ্কট অনুধাবন করে ধর্ম সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মিউজিয়াম পরিদর্শনের আহ্বান জানানো হয়। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও তাদের শিক্ষার্থীদের মিউজিয়াম পরিদর্শনে পাঠায়। মিউজিয়ামের মন্তব্য বই থেকে জানা যায়, বেশীরভাগ মানুষই ইসলাম সম্পর্কে ভুল জানতেন বা অনেক কম জানতেন। মুসলিম, অমুসলিম নির্বিশেষে এরকম মন্তব্য এসেছে। তাদের অনেকে ইসলামফোবিয়ার কারণে মুসলামনদের এড়িয়ে চলতেন বা মিউজিয়ামে যেতে অনাগ্রহী ছিলেন। কিন্তু তাদের সেই ভুল ভাংতে শুরু করেছে।

বিজ্ঞাপন