চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মুক্তিযোদ্ধা বনাম ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ. ক. ম মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন: এখন পর্যন্ত তিন হাজার ১০৭ জন ‘ভুয়া’ মুক্তিযোদ্ধার গেজেট ও সনদ বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া গত ১০ বছরে বাদ পড়া ৪ হাজার ১৮৮ জন মুক্তিযোদ্ধার নাম গেজেটভুক্তির জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগে তবে কি ৪ হাজার ১৮৮ জনকে তালিকাভুক্ত করার জন্যই ৩ হাজার ১০৭ জনের সনদ বাতিল করা হয়েছে? আরও প্রশ্ন জাগে ভুয়ারা তালিকাভুক্ত হল কিভাবে? কারা ও কেন তাদের মুক্তিযোদ্ধার সনদ দিল? এখন বাদপড়াদের ভাতা উদ্ধার করে কি নতুনভাবে তালিকাভুক্তিদের দেয়া হবে? মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা ও বয়স নির্ধারণ বিষয়ক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত তাদের ১৩ বৎসর হতে হবে। এতে বলা হয়, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সুপারিশের আলোকে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি নির্ভরযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য তালিকা প্রণয়নের লক্ষে মুক্তিযোদ্ধার এ সংজ্ঞা ও বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনটিতে আরও বলা হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণায় সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যেসব ব্যক্তি বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন তারাই মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে গণ্য হবেন। বিভিন্ন শ্রেণিতে মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে বিভিন্ন ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন তারা।

আইনী জটিলতায় যাচাই বাছাই বন্ধ থাকার দীর্ঘ দিন পর পরবর্তীকালে যাচাই বাছাই হয়েছে। ৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি উপজেলা পর্যায়ে যাচাই বাছাই করেছে। এই কমিটিতে ছিলেন সংসদ সদস্য, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জেলা কমান্ডার, উপজেলা কমান্ডার, মন্ত্রণালয় ও জামুকার প্রতিনিধি, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রতিনিধি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী সারাদেশে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ২ লাখ ৯ হাজার ৮ জন। আরও বলা হয় এই মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যাদের নাম ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা ও লাল মুক্তিবার্তায় থাকবে তারা সনদ যাচাইয়ের আওতায় আসবে না। কিন্তু বাস্তবে কী ঘটছে? মুক্তিবার্তায় ও লাল মুক্তিবার্তায় যাদের নাম আছে তাদের বিরুদ্ধেও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগ আনা হচ্ছে। এমনকি বিভিন্ন উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নির্বাচনে যাদের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় থেকেছে তাদের বিরুদ্ধেও। তাদের ভোটে কমান্ডার নির্বাচিত হয়ে কতিপয় কমান্ডার সেইসব ভোটার মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধেই আবার ভুয়ার অভিযোগ তুলছেন! কেন ২০১০ ও ২০১৪ সালের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নির্বাচনে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে তাদের বাদ দেয়া হল না তখন? ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার ভোটটি তখন কি ঠিক ছিল? এর কি ব্যাখ্যা দেবে ৭ সদস্যের যাচাই কমিটি?

বিজ্ঞাপন

নেত্রকোনার মদন উপজেলার ২২ জন মুক্তিযোদ্ধার ভাতা নিয়ে চলছে ছেলেখেলা। গত ঈদে রহস্যজনক কারণে তাদের ভাতা স্থগিত করা হয়। পরবর্তীকালে ঈদের পরে আবার তাদের ভাতা দেয়াও হয়। এরপর থেকে তারা নিয়মিত ভাতা উত্তোলন করে আসছিলেন। গত ঈদুল ফিতরে আবার তাদের ৭ জনকে ভাতা তুলতে দেয়া হল না। সামনের ঈদে নাকি বাকী ১৩ জনকেও ভাতা উত্তোলন করতে দেবে না। এই সংবাদে ভুক্তভোগী মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম হতাশা ও ক্ষোভ। গত বছর ভুয়া হিসেবে ভাতা স্থগিতের খবর পেয়ে মদন উপজেলার বাগদাইর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেক তালুকদার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন, তিনি যদি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হোন তবে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে গার্ড অব অনার কিভাবে পেলেন? মদন উপজেলার রুদ্রশ্রী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা তাহের উদ্দীন আহমেদের সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, আমি মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই কমিটির সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হয়ে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল চেয়ারম্যান বরাবরে আপিল আবেদন করেছি। আবেদনে আমি এ কথাও উল্লেখ করেছি যে আমার মুক্তিযোদ্ধা সনদের পক্ষে যাবতীয় তথ্য প্রমাণ ও সাক্ষ্যও উপস্থাপন করতে পারব। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমার আপিল আবেদন নিস্পত্তির জন্য জামুকা থেকে কোনো চিঠি দেয়া হয়নি।

বিজ্ঞাপন

মদন উপজেলার মাখনা গ্রামের মৃত মফিজের ছেলে আব্দুল মালেক বলেন: আমি গত ঈদুল ফিতরের আগে ব্যাংকে গিয়ে জানলাম আমার ভাতা স্থগিত। তিনি বলেন আমিসহ মদনের ৭ জন মুক্তিযোদ্ধা গত ঈদুল ফিতরে ভাতা তুলতে পারিনি। তিনি বলেন, আমি ভারতের পুরাকাইশ্যা ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। মদন উপজেলার নায়েকপুর ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা বকুল পাঠান বলেন, আমি আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগকারী পেলাম না। এখানে যারা অভিযোগকারী তারাই বিচারক। নিয়ম অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই কমিটিতে ৭ জন সদস্য থাকার কথা। কিন্তু মদনে ৫ জন। এখানে জামুকা ও মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রতিনিধি নেই। মদন উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের হাটশিরা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মতি মিয়া দীর্ঘদিন ক্যানসার রোগে ভুগছেন। তিনি ভাতা স্থগিত আতঙ্কে আরও বেশী অসুস্থ হয়ে উঠছেন। মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই কমিটির প্রতিবেদনে লিখেছে: ভাতাভোগী ২৬ জন ভাতাভোগী ব্যতীত ২ জনসহ মোট ২৮ জনের মধ্যে ৬ জন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সর্বসম্মতিক্রমে সঠিক বলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। অবশিষ্ট ২২ জনের আবেদন কন্ঠভোটের ভিত্তিতে ও যাচাই বাছাই কমিটির সদস্যদের প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে দিতে না পারায় সভাপতিসহ সকল সদস্যগণ নাকচ করেছেন।

অভিযুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বললে তারা বলেন, যাচাই বাছাই কমিটি আমাদেরকে কোন প্রশ্নই করেননি। আরেকটি বিষয় হল অভিযুক্ত ২২ জনের অভিযোগকারীই কমান্ডার ও ডেপুটি কমান্ডার। মদন ইউনিয়নের প্রাক্তন কমান্ডার শামছুদ্দীন। তার গ্রামের বাড়ি উপজেলার বাগদাইর গ্রামে। তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গার্ড অব অনার নিয়ে সমাহিত হয়েছেন। তার মুক্তিযোদ্ধা সনদ নং ৬৩০৩৮ ও মুক্তিবার্তা নং ০১১৬০৯০৪২৫,বেসামরিক গেজেট নং২৪৮২। জীবিত থাকাকালীন তার নামে ভুয়া অভিযোগ হয়নি তবে মারা যাওয়ার পরে কেন এই অভিযোগ? এখন কি তার গার্ড অব অনারও ফিরিয়ে নেয়া হবে? নির্দেশনায় বলা হয়েছে মুক্তিবার্তা ও লালমুক্তি বার্তায় যাদের নাম রয়েছে তাদের সনদ যাচাইয়ের আওতায় আসবে না। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার নাম ছিল মুক্তিবার্তা। এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা প্রকাশিত হয়। এই তালিকা অনুযায়ীই ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকার জন্য লালমুক্তি বার্তা নামীয় তালিকা করা হয়। এরপর মুক্তিবার্তা ও লাল মুক্তিবার্তার আলোকে দেয়া হয় মুক্তিযোদ্ধাদের সনদ। কিন্তু এসব সনদ কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায় কিভাবে?

মদন উপজেলার বাজিতপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মজিবুল হক, তার সনদ নং ম ৩৮৬৯৩, মুক্তিবার্তা নং ০১১৬০৯০০১০ ও বেসামরিক গেজেট নং২৪১৩, জাতীয় তালিকা নং ২০৪। কিন্তু তার এইসব মুক্তিযোদ্ধা সনদ নাকচ হয়ে গেল কণ্ঠভোটে। এই কণ্ঠভোটে কয়টি কণ্ঠ? তবে কি যারা সনদ দিল তারা ভুল করলো? মুক্তিবার্তার তালিকায় যাদের নাম তালিকাভুক্ত করল তারা ভুল করল? ভুল করল কি বেসামরিক গেজেট নং ও জাতীয় তালিকা নম্বর দিলো যারা তারা? এতগুলো তত্ত্বপ্রমাণ কি কণ্ঠভোটে নাকচ হতে পারে? প্রশ্নটা মুক্তিযুূদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিই রইল। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কেন এই ধূম্রজাল সৃষ্টি? তাদেরকে কেন সনদ দিয়ে তা আবার কেড়ে নেয়া? কেন তাদের ভাতা নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলা? এখন পর্যন্ত যে ৩ হাজার ১০৭ জনের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল করা হল এই বাতিলে কোন অন্যায্যতা নেই তো? ৪ হাজার ১৮৮ জন মুক্তিযোদ্ধাকে যে নতুন ভাবে মুক্তিযোদ্ধার সনদ দেয়া হচ্ছে ভবিষ্যতে এখানেও যে কারও কারও বিরুদ্ধে ভুয়ার অভিযোগ উত্থাপিত হবে না তার কি কোন গ্যারান্টি আছে? আর যদি কোন আসল মুক্তিযোদ্ধা ভুয়ার অভিযোগে হয়রানির শিকার হন কিংবা বাদ পড়ে যান এ দায় কার? নিশ্চয়ই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নয় কি?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View