চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিরোধ যোদ্ধা এবং ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইয়ে যোগ দিয়েছিল যারা তাদেরকেই বলা হচ্ছে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাদের সমাহিত করা হয়। মাসিক বেতন, ভাতা, অনুদান ও ঋনসহ নানাবিধ আর্থিক সুবিধাও দেয়া হচ্ছে তাদের।

মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিতে আগ্রহী ব্যক্তির সংখ্যা দিনের পর দিন বেড়েই চলছে। যাচাই বাছাই কার্যক্রমে সনদধারী অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার অস্তিত্বও দৃশ্যমান হয়েছে। দৃশ্যমান হয়েছে সহযোদ্ধাদের নিকট হতে মুক্তিযোদ্ধাদের উৎকোচ নেয়ার বিষয়। আরও খবর বেরিয়েছে কমান্ডারদের টাকা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার সনদ প্রাপ্তির খবর।

বিজ্ঞাপন

জামুকা’য় কর্মরতদের বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভুয়াদের মুক্তিযোদ্ধার সনদ দেয়ার খবর বেরিয়েছে। এক মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে অপর মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগে মুক্তিযোদ্ধা শ্রেনীটির প্রতি সৃষ্টি হয়েছে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। যেসব অভিযোগ মিথ্যা ও শত্রুতামূলক সেক্ষেত্রে অভিযোগকারী মুক্তিযোদ্ধা কি মিথ্যাচার ও ভুয়া তথ্যদানের অভিযোগে অভিযুক্ত হয় না?

স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি এতে মুখ টিপে হাসছে আর চোখে আঙ্গুল দিয়ে প্রজন্মকে দেখাচ্ছে, দ্যাখো তোমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের।এদের তোমরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বলছো। নিজে মুক্তিযোদ্ধা হয়েও অপর মুক্তিযোদ্ধার নিকট হতে উৎকোচ নেয় তারা! বেতন ভাতার সংখ্যা যত উর্ধ্বমুখী হবে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হতে চাওয়ার সংখ্যাও ততো বাড়বে। বাড়বে নিজেদের রেষারেষি।

বাংলাদেশে মোট কতজন ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধ না করেও মুক্তিযোদ্ধার সনদ পাচ্ছেন ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, বেতন, ভাতাদি ও অনুদান সুবিধা নিচ্ছেন? ভুয়ামোর পুরস্কার হিসেবে নিজসহ নাতিপুতিদেরও বিশেষ সুবিধা দেয়া কি সঙ্গত?

একজন ভুয়া পরিচয়দানকারী যদি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত হয়, এই দায়ভার কার? ভুয়া পরিচয়দানকারী লোকটি জীবদ্দশায় ধরা-ছোঁয়ার আড়ালে থেকে সকল রাষ্ট্রীয় সুবিধা নিল আর মরার পরে তার বংশধররাও তা প্রাপ্ত হবে, তা কি ঠিক? যারা একজন সহযোদ্ধার নিকট হতে উৎকোচ নিতে চায় তারা আরও দায়িত্ব ও সুযোগ পেলে আর কী করবে?

কিশোরগঞ্জ জেলার একটি হাওরপাড়ে দেশ স্বাধীনের পরপরই একজন মুক্তিযোদ্ধাকে জনতা মেরে কুচিকুচি করে কেটে তার মাংসের টুকরোগুলো নদীতে ফেলে দিয়েছিল মাছের খাদ্য হিসেবে। এই মুক্তিযোদ্ধার নাম ছিল বসু। নিকলি বাজিতপুরে তার পরিচিতি বসু ডাকাত হিসেবে। স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে সে কুখ্যাত খুনী ও ডাকাত ছিল। তার নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতার কাহিনী এখনও মানুষের মুখে মুখে। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে ডাকাত বসু মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিল। যুদ্ধে পাকবাহিনী নিধনে বসু প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে। পাক সৈন্যরা বসুর নির্মমতাকে ভয় পেতো। দেশ স্বাধীন হল। মুক্তিযোদ্ধা বসু আবার ডাকাত ও খুনী হয়ে গেল। তার অত্যাচারে নিরীহ মানুষের জানমাল হয়ে ওঠে চরমভাবে নিরাপত্তাহীন।এক্ষেত্রে আমরা প্রশ্ন করতে পারি না কি? বসু কেন যুদ্ধে গিয়েছিল? এর মূলে ছিল কি দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক চেতনা না নির্মমতার মোহ? উচ্ছৃংখলের উচ্ছৃংখলতার মোহ? তবে এটা সত্য বসু যে কারনেই যুদ্ধে যাক তার সেদিনের ভূমিকা দেশের কাজে লেগেছিল।

বিজ্ঞাপন

আসলে আমাদের মূল সমস্যাই হল চেতনা ও নৈতিকতার দৈন্যতা। সেজন্যই অনেক মুক্তিযোদ্ধাকেও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের অনুসারী হতে দেখা যায় নি। মুক্তিযোদ্ধা হলেই যে তিনি দেশপ্রেমিক, সৎ হয়ে যাবেন এমন আশা অবাস্তব। অনেক মুক্তিযোদ্ধাকেই দেখা গেছে নিজেদের নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও সুবিধার জন্য স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে সখ্যতা গড়তে।

মুক্তিযুদ্ধে একটি সেক্টরের প্রধান ছিলেন জিয়াউর রহমান। তার বেলাতেই দেখি রাজাকারদের মন্ত্রী বানানো ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে পুনর্বাসন। কই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক চেতনাতো তাকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে এড়াতে সাহায্য করলো না? কোন কোন মুক্তিযোদ্ধাকেতো মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিতেও দেখা গেছে।

বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে দেখেছি বিএনপিতে যোগ দিতে। আবার ক্ষমতার পালাবদলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তাদের দেখা গেছে ফের আওয়ামী লীগে যোগ দিতে। তাহলে আদর্শিক চেতনাটা রইলো কোথায়? দেশ স্বাধীন হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে। তিনি বাঙালীর জাতির পিতা। তার আহ্বানেই মুক্তিযোদ্ধারা সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধে নেমেছিল।

সেই পিতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হল। তখন কোথায় ছিল মুক্তিযোদ্ধারা? মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে সবাই বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে লিপ্ত হলে কি বাঙালির ইতিহাস অন্যভাবে ফুটে উঠতোনা? মোশতাক সরকারের আর্মি, পুলিশ কয়জনকে গুলি করত? তবে হ্যা। কেউ কেউ প্রতিবাদ করেছিল। কতিপয় মুক্তিযোদ্ধা নেমেছিল প্রতিরোধ যুদ্ধে। তারা জাতির পিতার এই নির্মম হত্যাকাণ্ডকে মেনে নিতে পারেনি।

কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো সেইসব বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেরই মুক্তিযোদ্ধার সনদ নেই। তারা মৃত্যুর পরে পায়না কোন রাষ্ট্রীয় সম্মান। পায়না সরকারি বেতন ও অনুদান প্রাপ্তির সুযোগ। আর বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে যারা অনেকেই প্রান বাঁচাতে কাপুরুষের মতো লুকিয়েছিল তাদের অনেকেই পাচ্ছে রাষ্ট্রীয় সুযোগ। তাদের নাতিপুতিরাও পাবে বেতন-ভাতাদির সুযোগ। বংশ পরম্পরায় কি দেশপ্রেমের সার্টিফাই হয়?

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের মেয়ে রইসী বেগম স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার ছিল। রাজাকার ছিল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মেয়ে বেগম আখতার সোলায়মান বেবি।কই বাবার আদর্শতো মেয়েদের মধ্যে সঞ্চারিত হলনা? মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূল্যায়ন নিয়ে কেন এত অসঙ্গতি? যেসব মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধের স্থপতি হত্যার প্রতিবাদ করেও যারা মুক্তিযোদ্ধার সনদ পেলনা, এর দায়ভার কার?

সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই কার্যক্রম স্থগিত হল। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের অস্তিত্ব দৃশ্যমান করে কেন এই স্থগিতাদেশ? ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা নিজ হতে শুরু করে বংশপরম্পরায় রাষ্ট্রীয় সুবিধা ও সম্মান নেবে আর প্রকৃতরা বঞ্চিত রবে, এই দায় কার?সরকারের নীতিনির্ধারকগণ ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয় বিষয়টা ভাববেন কি?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

Bellow Post-Green View