চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মুক্তিযোদ্ধা-পপগুরু আজম খান, ভোলা কি যায়!

আজম খানের ৬৮ তম জন্মদিন:

বেঁচে থাকলে আজ তার ৬৮ তম জন্মদিন হত। অথচ তিনি নেই। সত্যিই কি নেই! আছেন তিনি। ‘রেল লাইনের ঐ বস্তিতে’আছেন। ‘অভিমানী তুমি কোথায় হারিয়ে গেছ’ প্রশ্নের মাঝে আছেন। আছেন ‘সালেকা মালেকা’ দের মাঝে। আছেন ‘আলাল ও দুলাল’ দের ভীড়ে। সবশেষে পপগুরু ‘আসি আসি বলে’ আর আসেননা।

তিনি মুক্তিযোদ্ধা। ৭১ সালে অস্ত্র হাতে সম্মুখ সমরের যোদ্ধা। ক্র্যাক প্লাটুনের যোদ্ধা। মেলাঘরের যোদ্ধা। তিনি একজন গায়ক,  জীবন সংগ্রামের এক নির্লোভ সৈনিক। বাংলা সংগীতে নতুন ধারা শুরুর অগ্রদূত। স্বাধীন বাংলাদেশে জনপ্রিয়তার অগ্রণী মানদন্ড। তার হাত ধরেই বাংলা গানে, বাংলাদেশের পাশ্চাত্যের ঢল এসেছিল। তাই তিনি পপগুরু। সবসময়ের গুরু। তিনি আজম খান।

বিজ্ঞাপন

পুরো নাম মোহাম্মদ মাহবুবুল হক খান।  ১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আজিমপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মোহাম্মদ আফতাব উদ্দিন খান, মা জোবেদা খাতুন। সেখানে তারা ১০ নম্বর সরকারি কোয়ার্টারে থাকতেন। তার বাবা ছিলেন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার। সেক্রেটারিয়েট হোম ডিপার্টমেন্ট। ব্যক্তিগতভাবে হোমিওপ্যাথির চিকিত্সক ছিলেন। তার তিন ভাই ও এক বোন ছিল। বড় ভাই সাইদ খান (সরকারি চাকরিজীবী), মেজো ভাই আলম খান (সুরকার), ছোট ভাই লিয়াকত আলী খান (মুক্তিযোদ্ধা) এবং ছোট বোন শামীমা আক্তার খানম।  তার শৈশবের পাঁচ বছর কাটে আজিমপুর কলোনিতে। তারা ৪ ভাই ও এক বোন ছিলেন।

১৯৫৫ সালে তিনি প্রথমে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে তার বাবা কমলাপুরে বাড়ি বানালে সেখানে এসে কমলাপুরের প্রভেনশিয়াল স্কুলে প্রাইমারিতে এসে ভর্তি হন। তারপর ১৯৬৫ সালে সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুলে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকে ১৯৬৮ সালে এসএসসি পাস করেন। ১৯৭০ সালে টি অ্যান্ড টি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। মুক্তিযুদ্ধের পর পড়ালেখায় আর অগ্রসর হতে পারেননি। ১৯৮১ সালের ১৪ই জানুয়ারি ঢাকার মাদারটেকে তিনি সাহেদা বেগমকে বিয়ে করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ৩১ বছর। তার এক ছেলে এবং দুই মেয়ে। প্রথম সন্তানের নাম ইমা খান এবং দ্বিতীয় সন্তানের হৃদয় খান এবং তৃতীয় সন্তানের নাম অরণী খান।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময়ে আজম খান পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তখন তিনি ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর শোষণের বিরুদ্ধে গণসংগীত প্রচার করেন। ১৯৭১ সালে বাবা আফতাব উদ্দিন খান সচিবালয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে ছিলেন। তার অণুপ্রেরণায় যুদ্ধে যাবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন তিনি। যুদ্ধ শুরু হলে তিনি পায়ে হেঁটে আগরতলা চলে যান। আগরতলার পথে সঙ্গী হন তার দুই বন্ধু। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন ২১ বছর বয়সে। তার গাওয়া গান প্রশিক্ষণ শিবিরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণ যোগাতো। তিনি প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন ভারতের মেলাঘরের শিবিরে। যুদ্ধ প্রশিক্ষণ শেষে তিনি কুমিল্লায় পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশ নেয়া শুরু করেন। কুমিল্লার সালদায় প্রথম সরাসরি যুদ্ধ করেন। এর কিছুদিন পর তিনি পুনরায় আগরতলায় ফিরে আসেন। এরপর তাকে পাঠানো হয় ঢাকায় গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য। ছিলেন দুই নম্বর সেক্টরের একটা সেকশনের ইন-চার্জ। আর সেক্টর কমান্ডার ছিলেন কর্নেল খালেদ মোশাররফ। ঢাকায় তিনি সেকশন কমান্ডার হিসেবে ঢাকা ও এর আশেপাশে বেশ কয়েকটি গেরিলা আক্রমণে অংশ নেন। আজম খান মূলত যাত্রাবাড়ি-গুলশান এলাকার গেরিলা অপারেশনগুলো পরিচালনার দায়িত্ব পান। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল তার নেতৃত্বে সংঘটিত ‘অপারেশান তিতাস’। তাদের দায়িত্ব ছিল ঢাকার কিছু গ্যাস পাইপলাইন ধ্বংস করার মাধ্যমে বিশেষ করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল (বর্তমান শেরাটন হোটেল), হোটেল পূর্বাণী’র গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানো। তাদের লক্ষ্য, ঐ সকল হোটেলে অবস্থানরত বিদেশীরা যাতে বুঝতে পারে যে দেশে একটা যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধে তিনি তার বাম কানে আঘাতপ্রাপ্ত হন। যা পরবর্তীতে তার শ্রবণক্ষমতায় বিঘ্ন ঘটায়। আজম খান তার সঙ্গীদের নিয়ে পুরোপুরি ঢাকায় প্রবেশ করেন ১৯৭১-এর ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। এর আগে তারা মাদারটেকের কাছে ত্রিমোহনীতে সংগঠিত যুদ্ধে পাক সেনাদের পরাজিত করেন।

একটি সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে যুদ্ধে যোগ দেয়ার বর্ণনায় তিনি বলেছিলেন, আম্মাকে বললাম, আমি যুদ্ধে যাচ্ছি। আম্মা বললেন, যুদ্ধে যাবি, ভাল কথা, তোর আব্বাকে বলে যা। আব্বা ছিলেন সরকারি চাকুরে। ভয়ে ভয়ে তাকে বলালাম, যুদ্ধে যাচ্ছি। উনি বললেন, যাবি যা, তবে দেশ স্বাধীন না করে ফিরবি না! তার কথা শুনে অবাক হয়ে গেলাম। একটা সালাম দিয়ে যুদ্ধে যাই। তখন আমার বয়স ২১ বছর। সেক্টর ২ এ খালেদ মোশাররফের অধীনে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি।

দেশ স্বাধীন করে বীরের বেশে ঘরে ফিরলেন আজম খান। গানই তার একমাত্র নেশা হয়ে যায়। নিজে করেন কথা-সুর। নিজেরই কণ্ঠ। ১৯৭২ সালে লাকি আখন্দ ও হ্যাপি আখন্দ এই দুই ভাইকে নিয়ে ‘উচ্চারণ’ নামের ব্যান্ড গঠন করেন। এর মধ্য দিয়ে পপসংগীতের পথে তার যাত্রা শুরু হয়। বন্ধু নিলু আর মনসুরকে গিটারে, সাদেক ড্রামে আর নিজেকে প্রধান ভোকাল করে করলেন অনুষ্ঠান। শুরু হয় বাংলাদেশে পপসংগীতের চর্চা। সে বছর বিটিভিতে সেই অনুষ্ঠানের ‘এতো সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে’ ও ‘চার কালেমা সাক্ষী দেবে’ গান দু’টি সরাসরি প্রচার হলো। ব্যাপক প্রশংসা আর তুমুল জনপ্রিয়তা এনে দিলো এ দু’টো গান। দেশজুড়ে পরিচিতি পেয়ে গেলো তাদের দল। ১৯৭৪-১৯৭৫ সালের দিকে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনে বাংলাদেশ (রেললাইনের ঐ বস্তিতে) শিরোনামের গান গেয়ে হৈ-চৈ ফেলে দেন। এরপর ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’, ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’, ‘আসি আসি বলে তুমি আর এলে না’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘হারিয়ে গেছে খুঁজে পাব না’ এ গানগুলো গেয়ে শ্রোতাদের হৃদয় দখল করেন তিনি।  তার পাড়ার বন্ধু ছিলেন ফিরোজ সাঁই। পরবর্তীকালে তার মাধ্যমে পরিচিত হন ফকির আলমগীর, ফেরদৌস ওয়াহিদ, পিলু মমতাজের সাথে। এক সাথে বেশ কয়েকটা জনপ্রিয় গান করেন তারা। এরই মধ্যে আরেক বন্ধু ইশতিয়াকের পরামর্শে সৃষ্টি করেন একটি এসিড-রক ঘরানার গান জীবনে কিছু পাবোনা এ হে হে! যা বাংলা গানের ইতিহাসে- প্রথম হার্ডরক।

এছাড়াও তার রয়েছে ‘আমি যারে চাইরে’,  ‘নেই কোন অভিযোগ’, ‘হারিয়ে গেছে খুঁজে পাবনা’,  ‘অনামিকা’, ‘অভিমানী’, ‘আসি আসি বলে’, ‘হাইকোর্টের মাজারে’, ‘জীবনে কিছু পাব না’, ‘পাপড়ি কেন বোঝে না’, ‘সাঁইজি’, ‘সব মানুষই সাদা-কালো’, ‘এমনি চলে যাব’সহ আরও অনেক শ্রোতাপ্রিয় গান।  ১৯৮২ সালে প্রকাশিত প্রথম একক এ্যালবাম ’এক জনম’। তিনি একে একে ১৬৮টি একক গান ৩০টি মিক্সড গানসহ ১৪টি অ্যালবামের মাধ্যমে শ্রোতাদেরকে অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দেন।

চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। ১৯৮৬ সালে ‘কালা বাউল’ নামে একটি নাটকে কালা বাউলের চরিত্রে এবং ২০০৩ সালে ‘গডফাদার’ চলচ্চিত্রে নামভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। হয়েছেন বিজ্ঞাপন চিত্রের মডেল। ক্রিকেটার আজম খান হিসেবে তার আরেকটি পরিচয়ও ছিল। খেলেছেন ক্রিকেট। ১৯৯১-২০০০ সাল পর্যন্ত গোপীবাগ ফ্রেন্ডস ক্লাবের হয়ে তিনি প্রথম বিভাগে ক্রিকেট খেলেছেন। নিজে সাঁতার কাটতেন এবং নতুন সাতারুদের মোশারফ হোসেন জাতীয় সুইমিং পুলে সপ্তাহে ৬ দিন সাতার শিখাতেন। ক্রিকেট ও ফুটবল খেলোয়াড় হিসাবে ছিলেন খুবই পারদর্শী।

পপসম্রাট আজম খান দীর্ঘদিন দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০১১ সালের ৫ জুন মৃত্যুবরণ করেন। তাকে মিরপুর বুদ্ধিজীবি কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

শুভ জন্মদিন, মুক্তিযোদ্ধা পপগুরু আজম খান। তাকে কি ভোলা যায়!

Bellow Post-Green View