চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ
Partex Group

মিরপুর লোহার ব্রিজ গণহত্যা

Nagod
Bkash July

মিরপুরে তুরাগ নদীর ওপর স্থাপিত লোহার পুরাতন ব্রিজটি গণহত্যার একটি দ্রষ্টব্য স্থান। ১৯৭১-এ মিরপুরের এই ‘লোহার ব্রিজ’টি রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল কশাইখানার মতো। এটি ঢাকার পশ্চিম প্রান্তের একমাত্র নদী কেন্দ্রিক ‘জলাবধ্যভূমি’ যেখানে প্রায় প্রতিরাতে গাড়ি বোঝাই করে বাঙালিদের ধরে এনে হত্যা করে ব্রিজ থেকে নদীতে লাশ ফেলে দেয়া হতো। গণহত্যার সময়কাল ছিল প্রতিরাতে গড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। পঁচিশে মার্চের কালোরাতে ‘অপারেশন সার্চলাইটে’র আওতায় সমগ্র ঢাকা জুড়ে যে গণহত্যার সূচনা হয়েছিল। তার মধ্যে মিরপুরের তৎকালীন ‘লোহার ব্রিজ’ উল্লেখযোগ্য। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই পুলটি একাত্তরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর গণহত্যার প্রত্যক্ষ স্মারক হয়ে এখনও টিকে আছে। ব্রিজের নিচে বসবাসকারী বয়ষ্ক গ্রামবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেছেন, এই লোহার ব্রিজে একাত্তরের নয় মাসে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছেন!

একাত্তরের ২৫ মার্চে মিরপুরে ইপিআরের দু’টি কোম্পানি অবস্থান করছিল। পঁচিশে মার্চের রাতেই পাকিস্তানি সেনারা অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়ে অধিকাংশ ইপিআর সদস্যকে বন্দি করে এবং এই ব্রিজের ওপর এনে গুলি করে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেয়। এভাবে ২৬ মার্চ থেকে শুরু করে ১৬ ডিসেম্বরের পূর্ব পর্যন্ত প্রতিরাতেই সামরিক ট্রাক ও জিপ ভর্তি করে বাঙালিদের ধরে এনে এখানে গুলি করে অথবা বেয়োনেট চার্জ করে হত্যা করা হয়। ঢাকায় স্থাপিত বিভিন্ন বন্দীশিবিরের নির্যাতিত বাঙালি বন্দীদের মৃতদেহও এখানে এনে ফেলা হয়। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় জুড়ে ঢাকায় অপহৃত অধিকাংশ বাঙালির শেষ ঠিকানা হয়ে ওঠে মিরপুরের এই পুরাতন লোহার ব্রিজটি!

২৫ মার্চ সন্ধ্যায় পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর মো. সালেহুজ্জামান মিরপুরে টহলরত অবস্থায় ছিলেন। তিনি লিখেছেন, “১৯৭১ সনের ২৫ শে মার্চ সন্ধ্যায় আমি এক প্লাটুন ফোর্সসহ মিরপুর এক নম্বর সেকশনে টহলে ছিলাম। সন্ধ্যার পরপরই আমি মিরপুরের সর্বত্র থমথমে ভাব লক্ষ্য করেছি। … এ পরিস্থিতিতে আমি আমার টহলরত পুলিশ ফোর্সকে মিরপুরের পশ্চিম দিকে গ্রামের দিকে চলে গিয়ে প্রাণপণ প্রতিরোধ করার নির্দেশ দিয়ে আমি আমার রাইফেল ও গুলি নিয়ে থানার বাসায় চলে যাই। থানায় ফিরে এসে আমি তৎকালীন মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার মি. আবুল হাসেম এবং অন্যান্য সাব-ইন্সপেক্টর, এএসআই ও বাঙালি পুলিশদের অত্যন্ত বিমর্ষ ও বিমূঢ় দেখতে পাই। থানায় বসে আমরা ওয়্যারলেসে বাঙালি কণ্ঠের বহু বীভৎস আর্তনাদ শুনতে পাই। রাত সাড়ে চারটার দিকে পাক পশুরা পুলিশ কন্ট্রোল রুম দখল করে সেখানকার ওয়্যারলেসে বাইরে টহলে নিযুক্ত বাঙালি পুলিশদের কর্কশ কন্ঠে বলছিল, ‘বাঙালি শালালোগ, আভী আ-কার দেখো, তোমারা কেতনা মা বাহেন হামারা পাস হায়..।’ একথা শুনে আমাদের বাঙালি পুলিশদের গা শিউরে ওঠে। আমি তৎক্ষণাৎ ওয়্যারলেস সেট বন্ধ করে দেই। সকাল হওয়ার পূর্বেই আমি থানা ও থানার বাসা ছেড়ে দিয়ে মিরপুরে অন্য এক বাসায় আত্মগোপন করে থাকি। সকালে আমি দেখলাম বাঙালি ইপিআরদের মিরপুর ইপিআর ক্যাম্প থেকে বন্দী করে আমাদের থানার সম্মুখে এনে পাক-পশুরা নিরস্ত্র করে থানায় বন্দী করছে। আমি আরও দেখলাম মিরপুরের সকল বাঙালি বাড়ীতে বিহারিরা কপালে সাদা কাপড় বেঁধে দানবের মত উল্লাসে ফেটে পড়ছে, আগুন লাগাচ্ছে, লুটপাট করছে।  ২৭ শে মার্চ সকালে কিছুক্ষণের জন্য কার্ফু তুলে নিলে আমি আমার পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে মিরপুরের বাইরে যাত্রা করি। মিরপুর গরুর হাট অতিক্রম করার সময় আমি দেখলাম পাকসেনাদের টহল ভেদ করে একটি ট্রাকে মহিলা ও শিশু মিরপুর ব্রিজের দিকে যাচ্ছিল, পাক সেনারা ঐ ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেয়। আর দু’টি যুবতী মেয়েকে তাদের জীপে উঠিয়ে নিয়ে যায়। মেয়ে দু’টি পাক পশুদের হাতে পড়ে প্রাণফাটা চিৎকারে আর্তনাদ করছিল। আমরা দূর থেকে গরুর হাট বরাবর বোরো ধানের ক্ষেতে আশ্রয় নিয়েছিলাম।” (তথ্যসূত্র : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র, অষ্টম খন্ড)

অতীশিপর মুক্তিযোদ্ধা ইব্রাহীম মিয়া মিরপুর লোহার ব্রিজের ওপর সংঘটিত গণহত্যার একজন প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি তার বাড়ির আঙ্গিনার একটি গাছ থেকে পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যার এসব দৃশ্য দেখেছেন। তাঁর ভাষায়‘আমাগো বাড়ি থেইকা মিরপুর লোহার ব্রিজ ৩০০ গজের মধ্যে। পাকিস্তানি মিলিটারি যুদ্ধের পুরা সময় ধইরা এই ব্রিজের ওপরে বহুত মানুষ মারছে। সংখ্যা লাখের ওপরে হইবো। প্রত্যেকদিন দুই থেকে চারটা মিলিটারি বড় ট্রাক ভইরা মানুষ আনছে। কতকটি জ্যাতা আনছে, কতকটি মাইরাও আনছে। জ্যাতাগুলি ব্রিজের ওপরে দাঁড় করায়া গুলি কইরা মারতো। বেওনেট দিয়া পারায়াও মারতো। ব্রিজের ওপরে হাঁটু পর্যন্ত রক্ত জইম্যা থাকতো। ব্রিজের পশ্চিম পাড়ের দুই নাম্বার পিলারের ওপরই এইসব ঘটনা বেশি ঘটাইছে। আমি এইসব ঘটনা নিজ চোখে দেখছি। আল্লায় দেখাইছে। আমার বাড়ির পূব মোড়ার কোনায় একটা গাছ আছিল, ঐহান থেইকা বইয়া পুরাই দেহা গেছে।’

স্থানীয় বয়োঃজেষ্ঠদের মতে, মিরপুরের লোহার পুরাতন ব্রিজটি ব্রিটিশ আমলের তৈরি। তখন এতে ভারী যানবাহন চলাচল করতো না। ভারী যানবাহন চলাচলের জন্য ব্রিজের নীচে বিকল্প যোগাযোগ হিসেবে ফেরীর ব্যবস্থা ছিল। পঁচিশে মার্চের পর থেকে ষোলই ডিসেম্বরের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় প্রতিরাতেই মিলিটারি ট্রাক বোঝাই করে এই ব্রিজের ওপর মানুষ ধরে আনার ঘটনা ঘটেছে। হাত ও চোখ বাঁধা এসব হতভাগ্য মানুষগুলোকে ব্রিজের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে ব্রিজের নিচেই ফেলে দেয়া হয়েছে।  স্রোতের টানে আহত-নিহতরা ভেসে যেতেন দূর-দূরান্তে। মধ্যরাত থেকে শুরু করে ভোর রাত পর্যন্ত একের পর এক বাঙ্গালী বন্দিবাহী মিলিটারি ট্রাক তুরাগ পাড়ে হত্যার উৎসবে মেতে উঠতো। মিরপুর লোহার ব্রিজ সংলগ্ন তুরাগ নদীটি একাত্তরে লাশের নদীতে পরিণত হয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, অগণিত লাশের জন্য তখন নৌকা চলাচল ব্যাহত হতো। এছাড়া মিরপুর লোহার ব্রিজের দুই পাড়ে রাজাকাররা সব সময় পাহারা দিত। পাকিস্তানি মিলিটারির ক্যাম্প ছিল ব্রিজের দু’প্রান্তে। ব্রিজ সংলগ্ন ‘হিজলা’ গ্রামের হযরত আলীর ছেলে শাহাবুদ্দিন (৪৫) গ্রামের একমাত্র রাজাকার। এই লোহার ব্রিজের ওপর একাত্তরে প্রাণ দিয়েছেন হিজলা গ্রামের আমসু গোয়াল, সিরু রহমান, রহমত আলী ও রহমান পাগল। এঁদের কথা বলা হয়নি কোথাও, কখনো।

হিজলা গ্রামের পরিবহন চালক আখিলউদ্দিন আজও শিশুর মতো কেঁদে ওঠেন একাত্তরের লোহার ব্রিজের একটি ঘটনায়। যে মানুষটির জন্য তার দু’চোখ ভিজে ওঠে সে তার রক্ত সম্পর্কীয় কেউ ছিলেন না! সে তার গ্রামেই বেড়ে ওঠা এক প্রতিবন্ধি মানুষ ছিলেন। গ্রামের সবাই তাকে ‘রহমান পাগল’ বলে ডাকতো। সেই রহমান পাগলের মৃত্যুই তার কষ্টের কারণ। মিরপুর লোহার ব্রিজে রহমান পাগলের রক্ত লেগে আছে বলে আখিলউদ্দিন মনে করেন। এই ব্রিজের দিকে তাকালে একাত্তরের সেই দৃশ্যটা তার মনে পড়ে যায়। একাত্তরে যেদিন হিজলা গ্রামে পাকিস্তানি মিলিটারি আর সশস্ত্র বিহারীরা আক্রমণ করেছিল সেদিন দুপুরে রহমান পাগল তাদের বাড়িতে এসে ভাতের জন্য বায়না ধরেছিল। ক্ষুধার্ত রহমানকে আখিলউদ্দিনের মা রান্না শেষ হয়নি বলে একটু পরে আসতে বলেছিলেন। ভাত না পেয়ে পাগল রহমান কি মনে করে শত্রুসেনা বেষ্ঠিত মিরপুর ব্রিজে হঠাৎ উঠে যায়। তার আর ফেরা হয় না। ব্রিজের মাঝামাঝি পৌঁছাতেই সশস্ত্র বিহারীরা রহমান পাগলকে ধরে ধারালো ছুরি দিয়ে পেট ফেড়ে মুহুর্তের মধ্যে ব্রিজের নিচের নদীতে ফেলে দেয়। আখিলউদ্দিনের মতো গ্রামের অনেকেই দূর থেকে এ হত্যা দৃশ্য দেখেন কিন্তু তাদের কারই সেদিন কিছু করার ছিল না। শুধু আফসোস করা ছাড়া!

হিজলা গ্রামের আমসু গোয়ালের ভাই হাজী সোহরাব মিয়া (৮৫) মিরপুর লোহার ব্রিজে গণহত্যার প্রসঙ্গে বললেন, ‘গাড়ি তো প্রতিরাতে কয়েকটা আইছে। একটা মাইরা ফালায়া থুয়া গেছে, তারপর আবার আরেকটা আইছে। তহন তো বাড়িতে থাকা পারি নাই। পলায়া পলায়া মসজিদে থাইকা থাইকা এইসব দেখছি। ব্রিজের নিচে ধপ্পর কইরা আওয়াজ হইতো। বড় বড় অফিসার চাকুরীজীবীগো ধইরা আইনা এইভাবে মারছে। যুদ্ধের সময় প্রত্যেক রাত্রেই মারতো। প্রায় পাঁচ হাজার বিহারি সামনে আর পিছনে পাকিস্তানি মিলিটারি আমাগো এই হিজলা গ্রাম অ্যাটাক করে। আমার ভাইয়ের (আমসু মিয়া) হাতে গুলি লাগে। সে গন্ডায় ডাক্তারের কাছ থেইকা ব্যান্ডিজ কইরা আসার পর পাকিস্তানি মিলিটারিরা ভাইকে ধরে নিয়ে যায়। পর্বত সিনেমা হলের পেছনে নিয়ে তাকে এসিড দিয়ে মুখ ঝলসে বেয়োনেট দিয়ে পারায়া মাইরা ফালায়।’

যোগমায়া’র বছর পঁচাশি। মিরপুর ব্রিজের উত্তরে ইশাকাবাদ গ্রামে তার জন্ম। একাত্তর তার কাছে‘নোড় পারা’র সময়। বললেন তিনি, ‘নয় মাস ভইরাই নোড় পারা লাগছে। রান্ধা নাই, খাওয়া নাই। আমাগো আখড়াটাও আগুন দিয়া জ্বালাইছে ঐ সময়।’ মিরপুর লোহার ব্রিজের গণহত্যা সম্পর্কে বললেন, ‘ধইরা আনতো। ধইরা আইনা ব্রিজে খাঁড়া করতো। খাঁড়া কইরা চোখ বানতো। চোখ বাইন্ধা এলা গুলি করছে। একটা কইরা চিক্কার দিছে। এলা জলের মধ্যে ফালাইছে ফেইক্কা-ফেইক্কা। লাশগুলা গাঙ দিয়া ভাসতো। প্রতিদিনই মারতো। আমাগো কালির জামাইরে পুলের ঐখান থেইকা ধইরা লয়া গেলো আর তো কোনো খবর হইলো না। কত মানুষ পইড়া গেল বাবা। মানুষ দেইখা মানুষ ডরাইছে। রান্ধা ভাত খাওন যায় নাই।’

যোগমায়া’র পুত্র জীবন রাজবংশী। অস্ত্র হাতে পাকিস্তানি সেনাদের মুখোমুখি হয়েছেন বেশ ক’বার। ষাটোর্দ্ধ এই মুক্তিযোদ্ধা এখনো তার গ্রামে সাহসী মানুষ হিসেবে সবার সমীহের পাত্র। বাল্যবন্ধু ও একাত্তরের সহযোদ্ধা রফিকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ একা বহন করে আনার স্মৃতিটাই তার আনন্দ ও বেদনার একমাত্র স্মৃতি! ২৯ জানুয়ারী ১৯৭২ মিরপুর শাহ আলী মাজারের কাছে যুদ্ধরত অবস্থায় বিহারি সন্ত্রাসীদের গুলিতে শহীদ হন মুক্তিযোদ্ধা রফিক। গোয়ালপাড়া স্কুলে তাঁর কবর দেয়া হয়েছে। মিরপুর লোহার ব্রিজে সংঘটিত গণহত্যা সম্পর্কে ইশাকাবাদ গ্রামের এ মুক্তিযোদ্ধা বললেন, ‘সন্ধ্যার সময় দাঁড়ায়া থাকলে ব্রিজের সব দেখা যেতো মানুষ ট্রাকে ভইরা আইনা এইখানে এই লোহার ব্রিজ থেইকা ফালাইতো। এটা সন্ধ্যার পরেই করতো। প্রতিদিন দুই-তিনটা আর্মির ট্রাক আসতো। লাশ আনতো, আবার তাজাও মারতো। চিৎকার শুনতাম। বহুত লাশ দেখছি তুরাগ নদীতে।’

যোগমায়া’র আত্মীয় শোভা রাণী (৭৫) দূরে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ শুনছিলেন আর বিড়বিড় করছিলেন। এক সময় তিনি ক্যামেরার সামনে এসে একাত্তরে তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে শুরু করেন ‘না পলাইলে আমাগো মাইরা ফালাইতো বাবা। পুলের (মিরপুর লোহার ব্রিজ) ওই মুড়া গেছি আর অমনি আগুন দিছে। পোলাপান লইয়া হপায় ঐ পাড়ে গেছি আর এই পাড় থেইকা ধুমায়া গুলি। আমাগো মাইরাই ফালাইতো। মইরাই গেতাম গা। ঘরবাড়ি সব জ্বালায়া দিছে। হেইদিন (২৮ মার্চ, ১৯৭১) পুলের ওপর থন গুলি করছে-গোলাপীর জামাইয়ের খুলি উইড়া গেছিল। কি দিন গেছে বাবা!’

ডা. মোজাম্মেল হোসেন রতনও শৈশবে মিরপুর লোহার ব্রিজে সংঘটিত গণহত্যার দুঃসহ স্মৃতি বহন করে চলেছেন। তার বর্ণনায় ‘যেদিন আমরা এই লোহার ব্রিজটি অতিক্রম করি, অভিনেতা আফজাল শরীফের মামা, আমরা বলতাম ‘ফিরোজ মামা’, তিনি একটি বড় নৌকা নিয়ে এসেছিলেন মিরপুর থেকে আমাদেরকে বের করে নিয়ে যেতে। কারণ তখন আমরা এক প্রকার বন্দী অবস্থায় ছিলাম। আমরা যখন ব্রিজের নিচে আসলাম, দূর থেকেই ব্রিজের ওপরে দেখলাম পাকিস্তানি মিলিটারিদের গাড়ি আসা-যাওয়া করছে। হয়তোবা সেই কারণেই নৌকার মাঝি আমাদের বললেন, জোরে জোরে সুরা পড়তে। আমরা যারা ছোট ছিলাম, তারা সুরা পড়তে পারিনি কিন্তু আমাদের মুরুব্বিদের দেখেছি তারা উঁচুস্বরে সুরা পড়া শুরু করলেন এবং মাঝিও উচু স্বরে দোয়া-দরুদ পড়তে শুরু করলেন। আমরা যখন ব্রিজের নিচে আসলাম তখন আমাদের নৌকাটি বারবার আটকে যাচ্ছিল। আমরা অবাক হয়ে তাকিয়ে লাশ দেখছিলাম। একটি করে লাশ আসতো নৌকার সামনে এবং নৌকাটি থেমে যেতো। আমার আব্বা ছিলেন এবং তার সাথে আফজাল শরীফের বাবা মো. আলী কাকাও ছিলেন। ওঁনারা দু’জনে লগি দিয়ে সেই লাশগুলো সরানোর চেষ্টা করলেন। কিছু কিছু লাশ দেখতাম অনেক মোটাসোটা, বুকে বেল্ট। আমরা বড় বড় চোখ করে সে লাশগুলো দেখেছি। মুরুব্বিরা তখন বলেছিলেন, এটা খুব সম্ভবত ইপিআরের লাশ হবে কিংবা কোনো পুলিশ সদস্যদের লাশ হবে। বুকে বেল্ট, কারও কপালে গুলি, কারও বুকে গুলি দেখেছিলাম। এই লাশগুলো সরিয়ে সরিয়ে আমরা তখন এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আমরা যে এলাকা দিয়ে যেতাম, সে এলাকায় আমরা দেখতাম মানুষ মুখে মুখে লাশ গুনতো। আজকে কয়টি লাশ আসলো। তারা গ্রামের মানুষেরা সে লাশগুলোকে দাফনের ব্যবস্থা করতো। হিন্দু-মুসলমান বলে কিছু ছিল না। যাঁকে পেতো, তাকেই তাঁরা দাফন করতো। এভাবেই যতোগুলো গ্রাম আমরা অতিক্রম করেছি, প্রতিটি গ্রামেই আমরা একই চিহ্ন দেখেছি। গ্রামের মানুষেরা বলতো তারা লাশের অপেক্ষায় আছে। তুরাগ নদী দিয়ে লাশগুলো ভেসে ভেসে আসছে, তারা সেই লাশগুলো সংগ্রহ করছে এবং যথাসাধ্য চেষ্টা করছে দাফন করার জন্য।’

একাত্তরের ২৫শে মার্চের রাতে গাড়িচালক হাজী সালাউদ্দিনের (৭২) বিয়ের দিন-তারিখ নির্ধারিতই ছিল। ব্রিজের নিচের হিজলা গ্রামে তখন কারেন্ট ছিল না। মিরপুর লোহার ব্রিজের ওপরে টিউবলাইট ছিল। আশেপাশের গ্রামবাসীরা হারিকেন ব্যবহার করতো। এ প্রসঙ্গে হাজী সালাউদ্দিনের বললেন ‘যখন নাকি টিউবলাইটটা (ব্রিজে) অফ করে দিতো, তখনই বুঝতাম যে, কিছু একটা করতাছে। তখন একটা গাড়ি আসতো আর্মির। গাড়ি কইরা যাদেরকে নিয়া আসতো, লাইন ধরাইতো ব্রিজের সঙ্গে। ঐখান থেইকা ব্যানার (বেওনেট) দিয়া গুলি দিয়া মাইরা নদীতে পানিতে ফালাইতো। ব্রিজের ওপর যখন পার দিয়া মারতো, তখন ব্রিজে রক্ত পড়তো। আমাদের এলাকার লোক ধইরা নিয়া ঐ বালু-মাটি এগুলি দিয়া ঢাকাইতো। এই ঘটনা পুরো যুদ্ধের সময় ধইরা হইছে।’ মিরপুর লোহার ব্রিজে হত্যার জন্য ধরে আনা একজন ভাগ্যগুণে ব্রিজ থেকে পড়ে বেঁচে গিয়েছিলেন। হাজী সালাউদ্দিন বললেন‘একদিন ঘটনাচক্রে এক লোক সাহসিকতা দেখাইয়া ঐ ব্রিজের যে ফাঁকটা ছিল, ঐ অবস্থাতেই সে ফাঁকটা দিয়া পইড়া নদীতে লাফ দেয়। নদীতে জলের ওপর পইড়া ভাটিতে গিয়া ব্রিক ফিল্ডের ইটের স্টেক (দ্বীপনগর) ধইরা হামাগুড়ি দিয়া উঠে ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলার পর পাশের বড়দেশী গ্রামের লোকজন নৌকা নিয়া তাকে উঠায়া আনে। ওনার বাড়ি ছিল নারায়ণগঞ্জ। উনি অফিসার ছিলেন। চাকরি কইরা বেতন নিয়া বাইর হইছিলেন। ঐখান থেইকা তাঁকে উঠায়া নিয়া আসে। তারপর এই মিরপুর ব্রিজে এই ঘটনা।’

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আলম চান কথা বলেন ঢাকার আঞ্চলিক টানে। এখন থাকেন আমিনবাজারের দেওয়ানবাড়িতে। মিরপুর ব্রিজে সংঘটিত গণহত্যার স্মৃতির ভার এখনো তাকে হতবিহ্বল করে। তিনি বললেন, ‘পঁচিশে মার্চের সময় আমরা ঐ গ্রামে (বড়দেশী, আমিনবাজার) নৌকার মধ্যে লুকায়া থাকতাম। পাকিস্তানি মিলিটারি গাড়ি দিয়া আইতো। গাড়ি এই ব্রিজে থামাইতো। বাত্তি অফ করতো। মারে-বাবারে কইয়া চিক্কার পারছে। আমরা শুইনা আমরা নিজেরা আতংক খায়া গেছি। সকাল ভোরে আইসা আমরা এই লাশ যাঁরা মুসলমান, তাগো মাটি দিতে চেষ্টা করছি। কিন্তু আমরা সব দিতে পারি নাই। আমরা টাইনা সব লাশ ভাসায়া দিছি। শ-শ লাশ ডেইলি। দুই তিন মাস খালি লাশই টানছি।’

হিজলা গ্রামের হাবিবুল্লা হবিও দেখেছেন মিরপুর লোহার ব্রিজে প্রতি রাতের সিরিজ গণহত্যা। তার জবানিতে, ‘রাত ১২টা-১টা বাজলেই দুই গাড়ি, তিন গাড়ি, চার গাড়ি মানুষ ভইরা লইয়া আইতো। হিজলার বড় মসজিদের মিনারের ওপর চইড়া আমরা দেখছি আর ওখানে শুনছি খালি চিৎকার দিছে। বাবাগো বইলা যে চিৎকারটা দিছে, আমরা চিৎকারডা শুনছি।’

মুক্তিযোদ্ধার সহযোগি হিজলা গ্রামের মোস্তফা বললেন, ‘পঁচিশে মার্চের থেইকা শুরু কইরা একটা রাতও মিস হয় নাইকা। প্রতিটা রাতে দুই গাড়ি তিন গাড়ি কইরা লোক আইনা ফালাইছে এই লোহার ব্রিজে। বেনার (বেওনেট) দিয়া পাড় দিয়া দিয়া মারছে। এই নয় মাসই এইহানে মানুষ ফালাইছে। নদীর ঐ হানে একটা তিন দাগ আছে (তুরাগ নদীর ত্রিমোহনায়)। সব মানুষ ঐহানে যাইয়া ফুইলা উঠতো।’

ইশাকাবাদের মাঝি মো. আলি (৭২) জানান, ‘বড় বড় জাম বডির গাড়ির মধ্যে ভইরা হাত-পা বাইন্ধা আইনা মারছে। ওরা হইলো ইপিআর সৈন্য। ব্রিজে আইনা দাঁড়া করছে আর গুলি করছে এই চান্দির মধ্যে। সব কটা গুলি এইহানে (মাথা দেখিয়ে) করছে। খালি একজন লোক ফাল দিয়া পইরা গেছিল। ভাইসা যাইয়া আমাগো বাড়িতে উঠছিল। সে কইছিল, ভাই আমি ইপিআর সৈন্য। তুরাগের বুকে মো. আলি এ বয়সেও নৌকা বেয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। একাত্তরে মিরপুর লোহার ব্রিজের ওপর তিনি স্বচক্ষে দেখেছেন, পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যা। গণহত্যা সম্পর্কে বললেন তিনি, ‘ব্রিজে এমন বাত্তি দিছে, যে সুঁইও দেখা গেতো। আমি প্রতিদিন দেয়ালের আড়ালে গিয়া পলায়া থাকতাম। গাড়ি আইলেই বাত্তি অফ কইরা দিয়া তারপর গুলি কইরা মারতো। পরদিন সকালে দেখছি হাঁটু পর্যন্ত রক্তমাখা পুরা ব্রিজ! দেহি যে, মজক দিয়া বোঝাই! আহারে, ইপিআর সৈন্যগুলি যে মারছে আর এই যে রক্ত মগজগুলি দেখছি। এইগুলি দেইখ্যা তো আতংক! বেগুনবাড়ি গ্রামে বিমানের একজন ইঞ্জিনিয়ারও মারছে। বিহারিরা খালি ব্যোম মারছে আর আগুন জ্বালাইছে। মানুষের খাওন-খাদ্য কাইড়া লয়া গেছে গা।’

আমিন বাজার ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মির্জা সাওকাত আলী (৭৬) জানালেন ‘২৫ শে মার্চ রাতে গাড়ির লাইটের আলো, রাইফেলের গুলির শব্দ, মানুষের ‘বাঁচাও বাঁচাও’ চিৎকার আর্তনাদে আমরা সবাই জেগে উঠি। ঘটনা ভোর পর্যন্ত চলে। সকাল থেকে শুরু হয় কার্ফু জারি। আমরা বের হতে পারলাম না। পরের ২৬-২৭ শে মার্চ একই অবস্থা। ২৮ মার্চ সকালে আমরা বাইরে আসি। মিরপুর লোহার ব্রিজের ওপর দেখলাম, রক্তের ঢেউ! রক্তই রক্ত! সমস্ত পুল বুলেটের আঘাতে চিকচিক করতেছে এবং মৃত ভেসে আছে নদীতে।’

প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, আনুমানিক ২০ হাজার মানুষ একাত্তরে এই লোহার ব্রিজে নির্মম হত্যার শিকার হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়। মিরপুর লোহার ব্রিজে শহীদদের অধিকাংশই ছিলেন বহিরাগত। শুধু পাঁচজন স্থানীয় শহীদের নাম পাওয়া যায়, যারা ব্রিজ সংলগ্ন গ্রামগুলোর বাসিন্দা। মিরপুর লোহার ব্রিজে গণহত্যায় মূল ভূমিকা পালন করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনি। তাদেরকে সহযোগিতা করে স্থানীয় অবাঙ্গালী নির্ভর রাজাকার বাহিনি ও শান্তি কমিটির সদস্যরা। ইসলামী ছাত্র সংঘের তৎকালিন নেতা কাদের মোল্লার রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে অবাঙ্গালী আখতার গুন্ডা ও তার সহযোগিরা মিরপুরে বাঙ্গালী নিধন উৎসবে মেতে ওঠেছিল।

দেশের গণহত্যা বিষয়ক লেখক-গবেষকদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজনের লেখায় ‘মিরপুর লোহার ব্রিজ’ এ সংঘটিত গণহত্যার বিয়য়টি সামান্যই উঠে এসেছে এবং স্থানীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও গ্রামবাসীদের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও শহীদদের স্মৃতি বিজরিত এই জলাবধ্যভূমিটির ওপর এখন পর্যন্ত কোনো ‘স্মৃতি স্মারক’ বা ‘স্মারক প্রকাশনা’ তৈরির কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। মিরপুর ব্রিজ সংলগ্ন এলাকার নতুন প্রজন্ম এই গণহত্যা সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না। গণহত্যা নিয়ে সেখানে কোনো আলোচনাও হয় না। হিজলা গ্রামের অতীশিপর মুক্তিযোদ্ধা ইব্রাহীম মিয়া আক্ষেপের স্বরে পুরাতন লোহার ব্রিজের নীচে একটি স্মৃতিফলকের দাবী জানান। তাঁর আকাংখা সরকারীভাবে এটি সংরক্ষনের উদ্যোগ নেয়া হোকজ্জযাতে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধে বাঙ্গালী জাতির চরম আত্মত্যাগের বিষয়টিকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পায়।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

BSH
Bellow Post-Green View
Bkash Cash Back