চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মিনারের কবিতা, কবিতার মিনার

তার নির্বাচিত কবিতার বইয়ের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে মনে পড়বে জলপাই জমানার কথা। মনে পড়বে জলপাই পাতার মুকুটের বদলে খাঁড়া দুটো সিং। বিশ্ব বেহায়ার খপ্পরে পড়া স্বদেশের কথা মনে পড়বে। মনে পড়বে পদাবলী, কবির লড়াই। তখন ঘাতক ছিল লেফটেন্যান্ট জেনারেল ট্রাক। রাজপথে মিছিলে-মিছিলে ছাত্র-জনতা একেবেঁকে চলে গিয়েছে। বিপ্লব তখন অনেকটা মানুষের মতো। আমাদের পথ লাল হয়েছে মিছিলে এবং রক্তের প্রতিকণায় ছিল প্রতীক্ষা। সুঠাম পেশীতে সাহস বুনে সযত্ন রোদন সবার। ক্রন্দনের চেয়েও সরব শ্লোগান; আর প্লাকার্ডে-ফেস্টুনে-পোস্টারে কবিতার শ্লোগান কিংবা শ্লোগানে কবিতা। মনে করতে পারব, মিছিলে উচ্চারিত প্রতিটি শুদ্ধশব্দ কবিতা।
এক দফা এক দাবি এরশাদ তুই কবে যাবি; একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার; আমরা সবাই তাজুল হবো, তাজুল হত্যার বদলা নেবো; পাকিস্তানী মওদুদীবাদ, ছদ্মবেশী পুঁজিবাদ।

এক মুজিবের রক্ত থেকে লক্ষ মুজিব জন্ম নেবে; হলে হলে ব্রিগেড কর, স্বৈরাচার মুক্ত করো; বন্যেরা বনে সুন্দর, সৈন্যেরা ব্যারাকে; দিয়েছি তো রক্ত আরো দেবো রক্ত। এরশাদ তোর মরণ হবে, কাফন ছাড়া দাফন হবে; খুন হয়েছে আমার ভাই, খুনী তোদের রেহাই নাই; বাংলার ইহুদি, দেলোয়ার হোসেন সাঈদী; গোলাম আযমের চামড়া, তুলে নেব আমরা। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, প্রতিরোধে বসুনিয়া। রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়; বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই মুজিব।

বিজ্ঞাপন

আমাদের মনে পড়বে। সমস্বরে চিৎকার করে উঠেছিলাম- মানি না সামরিক শাসন।- কবির কলমে, মানুষের আগুনে ও ক্যামেরার ফ্রেমে সর্বত্র মানি না, মানি না।

সহসা ‘স্পর্শ’ করল শিল্প-সাহিত্যের প্রকাশনা; মনে করতে পারবো, সম্পাদনা করেছিলেন মোজাম্মেল বাবু। সময় ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬। মনে পড়ে, সাহিত্য জুড়ে সেখানে ছিলেন আজকের মিনার মনসুর।
তার লেখা মনে করতে পারব। অবিস্মরণ থেকে, যে মুক্তিযুদ্ধের দলিল: হাসান হাফিজুর রহমানের কবিতা। মিনার মনসুর ধাঁধার মতো বলেছিলেন- মৃত্যুময় করোটির সাম্রাজ্যের বেদনার্ত অন্ধকারেও তিনি (হাসান) দেখেছেন, অর্ধেক বাংলা আছে ওখানে আর আছে ভবিষ্যতের ভয়ঙ্কর গুপ্ত এক প্রতিজ্ঞা। পান্তরে, হাসান হাফিজুরের সঙ্গে পাঠে ‘বন্দী শিবির থেকে’ এক মধ্যবিত্ত কবির ‘যখন উদ্যত সঙ্গীন’ পরিস্থিতিতে হতচকিত ও অনন্যোপায়, অথচ বিন্দুমাত্র স্বার্থত্যাগে কুণ্ঠিত ও সংগ্রাম বিমুখী মানসের উজ্জ্বল দলিল হিসেবে প্রতিভাত হয়েছিল। মনসুরের আলোচনার সেই স্বর ও মনোভঙ্গি দিয়ে তার কবিতাতেও খুঁজে পাবো সমিল ভাবনার স্তর।

হাসান হাফিজুরের মতো তার কবিতাও ‘বাংলাদেশ’ নামক ভূ-খণ্ডকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। সমাজ ও সমকাল চেতনা, বাঙালি জাতি ও ঐতিহ্যের প্রতি একাত্মতা অবিরত। আশির দশকের তরুণ তুর্কী মিনার মনসুর, সেদিনের কবিকে আজও মনে হচ্ছে- এই তো সেদিন, তিনি ছিলেন আন্দোলন, ঘটনা ও কবিতায়। মনে করতে পারবো বব ডিলানের সঙ্গে প্রতিতুলনা। আজ এই বৈরি সময়ে আগে আগে এসব কথা মনে পড়বে আমাদের যারা জন্ম হতে আজ পর্যন্ত ক্রান্তিকাল অতিক্রম করে চলেছে।
জ্বলে উঠছে রূপকথা মালা। সময়ের। আভাদীপ্ত সেই তো আমাদের বিস্মৃতির ভেতরে স্মৃতির দমকা। আমরা মনে করতে পারব তার প্রথম কবিতার বই ‘এই অবরুদ্ধ মানচিত্রে’ বের হয়েছিল ১৯৮৩ সালে। এবং নিষিদ্ধ হয়।

কররেখা, হ্যাঁ কররেখায় করতলের চিহ্নায়ন ও মনোনয়ন তাকে দিয়েছে কবিতার গতিপথ এই অবরুদ্ধ মানচিত্র থেকে পা পা করে পুষ্পমাল্য নয়, কোনও শোকসভা নয়, অন্তহীন ধূসরতার প্রতি গন্তব্য।

কবিতার বইয়ের পটে লেখা যে সূচি তাতে কাল গণনার সংকেত খুঁজে পাব। আমরা মনে করতে পারব তার সময়; কবিতা আবর্তিত হয়েছে- সময়ের স্রোতকে আধারিত করে।

এই অবরুদ্ধ মানচিত্রে, ১৯৮৩; অনন্তের দিনরাত্রি ১৯৮৬; অবিনশ্বর মানুষ, ১৯৮৯।
তারপর, নব্বই দশক।
আমার আকাশ, ১৯৯১; জলের অতিথি, ১৯৯৪।
শূন্য দশকে কবিতা সংগ্রহ, ২০০১। পরবর্তী দশকে, মা এখন নেমে যাওয়া নদী, ২০১২ এবং পা পা করে তোমার দিকে যাচ্ছি, ২০১৬।
মনে করতে পারব, কাব্য আলোচনার কোনও স্বত:সিদ্ধ মেথড অনুপস্থিত।

কালবেলায় কিংবা কুলায় কালো স্রোতে অথবা দক্ষিণায়নের দিনগুলি-তে বিরচিত কবিতায় আবিষ্কার করা যায় দেশ-কাল ও ভূবনায়নের অষ্ট প্রহরের আলোড়ন; মুখশ্রী ও মুখচ্ছবি; স্বর ও আলো; অনুধাবন ও অনুধ্যান; তাপ ও বরফ; প্রেম ও অপ্রেম; সমর্পন ও প্রত্যাহার; পেলবতা ও মুখরতা; খাণ্ডবদাহন ও মরুঝড়; মদিরা ও স্মৃতি; শাহবাগ ও সিসিফাস। লকলকে জিহ্বার গর্জনকেও তিনি অনুবাদ করেছেন কবিতায়। রচনা করেছেন আকাশ দেখার মুহূর্ত। অন্বেষা ও জিগীষা রক্ত ও অতের; কলমকে আঙুলের মধ্যে এবং আঙুলকে সীমায়িত করেছে অসীমের, অনন্তের ঠিকানায়।
বিদেশী কাব্য আন্দোলন ও নানা ভাবধারায় এবং অমরত্বের হাতছানিতে তার কবিতা দিশা থেকে নির্দেশিকা হয়ে ওঠেনি। ইয়োরোপের মোহাচ্ছন্নতা তাকে দিয়ে বিভূঁই হতে বিস্বাদ কবিতা লিখিয়ে নেয় নাই।

অর হতে শব্দ সাজিয়ে পারস্পরিক সংঘর্ষ কিংবা বুদবুদ নির্গলনের ছলাকলায় কবিতায় আঙুল কামড়ায় নাই কবি ও কবিতা। কবিতার মধ্যে কায়কেশে এঁটে দেয়া হচ্ছে রহস্যময়তা ও জাদু বিস্তার তখন শুদ্ধতম প্রয়োজনে রচিত এই বইয়ে কবিতাগুলো, অকপট প্রকাশে বলে দিচ্ছে ‘সুবোধ্যতম কবিতার’ নীরব ইশতেহার। স্বাভাবিক দতায় মিনার মনসুর কবিতাগুলো লিখে ফেলেছেন। তারপরেও এই প্রেম, এই আলো এই নির্জনতা তাকে হেনেছিল এবং ‘বাঁচিয়ে রাখে বাঁচার বিস্ময়।’
কবিতাকে বলি, আদি গাঁথা। আমাদের প্রাচীন গাঁথা- লোকমুখ থেকে প্যাপিরাস বাহিত হয়ে এইভাবে অগস্ত্য যাত্রা যেন। বিনিময়ের ভাষার মধ্যে গদ্যের প্রত্নচিহ্ন খুঁজে পাওয়া গেলেও কথা সাহিত্য খুঁজে পেতে, কথা আখ্যায়িকার সম্প্রসারণ পর্যন্ত যেতে আমাদের অনেকটা সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল এবং তৈরি করতে হয়েছিল নিজেদের জন্য নিজস্ব উদাহরণ।

কবিতা নানা রকম কোলাহল থেকে মুক্ত ছিল। কবিতা তাপিত ও যাপিত হয়েছে পদকর্তাদের সম্মিলনে।

জ্বীন-পরী, দৈত্য-দানবের দেশ এই আমার সোনার বাংলা। বর্গীরা ছিল, পারুল বোনকে বাঁচাতে যুদ্ধ করে গেছে লড়াকু ভায়েরা, কখনো শ্মশান ও গোরস্থান হাপিয়ে উঠেছে মরা-সৎকারে- লুণ্ঠিত ও ক্ষুধার্ত বাংলায়। তবু সোনার বাংলা অত্যাশ্চর্য এক কবি-কল্পনা। রূপকল্প তো দৈত্য-দানব, জ্বীন-পরীদের উপস্থিতিতে এই বাংলাদেশেও যখন স্বাধীনতার পর আজও সাম্প্রদায়িকতা অবাঞ্ছিত নয়।
কবির প্রতিভা রূপকল্প ক্রমাগত সৃষ্টি করে যায় যেমন অশনি সঙ্কেত প্রতিভাত হয় দৈত্য-দানবের হুংকারে। এই নিনাদ ও পরণেই আর্ত চিৎকারের ঝংকার ও কম্পনের মধ্যে অত্যাচারিত ও লাঞ্ছিত স্বদেশের বিভীষিকায় সংবেদী কবি কোনও তর্ক নয়, শেঁকল বন্ধন নয় কেবলমাত্র ভাঙা বেদনায় জাগরণে ও নিদ্রায় ÒA Poet feels vibrations beyond the range of ordinary man.Ó
টেবিল বাতির আলোতে মিনার মনসুরের কবিতার বই হাতে নিয়ে এই যে ব্যস্ততা, হঠাৎ দূরে অথচ নিকটেই যেন অনূদিত বব ডিলানের গান এই-

“আর কতবার চাইলে আকাশে
আকাশ খুঁজে পাবে?
Yes, ‘n’ how many years must one man have before he can hear people cry?
কত মৃত্যুর মূল্যে কিনেছ
অমূল্য এই জীবন?
জবাব আছে এই নি:শ্বাসে,
The answer is blowin’ in the wind.”

তার গান যেমন হয়ে উঠেছে মানবাধিকার আন্দোলনের মুখ তেমনি, যুদ্ধের বীভৎসতা ফুটে উঠেছে। কবিতা এক নগ্ন অস্তিত্ব। চারবেলা চারদিক আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধেছে ডিলানকে।

বব ডিলানের কলম ও গিটার অন্ধকারেও গর্জে উঠেছে।

কবিতার মিনার নিয়ে আলাপ করতে বসে বৃষ্টি-ভেজা প্রহরে বব ডিলানকে নিয়ে কথা ঘোরানো বাতুলতা মনে হলেও- নিজের ভেতর কবিতা আলোচনা, সংলাপ ও আলাপের একটি মেথডোলজি খুঁজতে সচেষ্ট হঠাৎ ভেতরে ধাক্কা খাই। সাহিত্য আলোচনার মেথডলজি আবিষ্কার করে উঠতে পারি নাই।

বিজ্ঞাপন

কবিতা আমাদের ধনুষ্টংকারে আক্রান্ত করেছে কিন্তু তাকে বুঝতে-পড়তে-গড়তে: নির্মাণ ও বিনির্মাণে আমরা কেবল চিকিৎসিতের জন্য আরোপিত/প্রয়োগকর্তা ব্যবস্থাপত্রকে বহু ব্যবহারে ব্যবহৃত মলিন ও দৈন্য-জীর্ণ করেছি।

কবিতা অনুধাবণ দুর্ঘটনার পর আত্মসাক্ষ।তকার; অগ্নিকাণ্ডের পর পোড়া স্মৃতি অথবা ছাইয়ের ভেতর থেকে উকি দেয়া সস্তা নাকছাবি- অনিকেতসম।

মিনারের কবিতা নিয়ে এই আলোচনাবন্ধে আদ্রিত দিন শেষে বৃষ্টি মুখরিত পরদিবসে বব ডিলানের প্রতি উচ্ছ্বাস অহেতুক মনে হলেও সঙ্কটটা অন্যখানে এবং কিঞ্চিৎ এই মর্মে আভাস রাখা গেল যে, গ্রন্থলোচনার কোনও মেথড নিরূপন করা বঙ্গ সন্তানদের মুরোদে কুলায় নাই। সমালোচনা শাস্ত্র বুদ্ধদেব বসুতে ফুরাইল। কাব্যালোচনায়, হয় মতাদর্শী নয় রূপদর্শী আলোকপাত অথবা চাকি কিংবা ব্যক্তিক বহি:প্রকাশ ছাড়া পা হড়কায়, কলম ভাঙে লিখতে। অযাকামিডি সিয়ানদের কথা আলাদা। ছিদ্রাণ্বেষণে পণ্ডিতিতে তাহাদের বিলণ পদ্ধতি।

ঐক্য ও অনৈক্য বিজড়িত রয়েছে দু’জনার মধ্যে। তবু একটি তরঙ্গ উভয়কে কবিতার চুপকথার ভেতর দিয়ে সন্নিহিত করে বলেই ঐক্যের গানকে প্রাধান্য দিতে ইচ্ছুক।

কবিতা শব্দিত। কবিতা কানে শোনার। কবিতা হচ্ছে ধ্বনিমা।
একটি গিটার, অন্ধকার রাস্তা, গান শোনাও বলে ডাকা বাঁশিওয়ালার নাম বব ডিলান হলে অন্ধকারে কষ্ট এবং দীর্ঘ অন্ধকার করিডোর ধরে গন্তব্যহীন চলাফেরা করা কবি মিনার মনসুর, রক্তে করতালি বাজায় কবিতা।
“আমি কথা বলতে চাই
আমি কথা বলার স্বাধীনতা চাই
আমি কবিতা লেখার স্বাধীনতা চাই
আমি জানতে চাই-
সুন্দরের প্রতি নিষেধাজ্ঞা কেন?”
মানবিক প্রতিরোধের নকশা, ছক, অরায়ন করে গেছেন মিনার মনসুর।

কবি মিনার মনসুর

বব ডিলান কেবল প্রতিবাদের রাজপুত্র হয়ে থাকতে চান নাই। নিজের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। অনুরাগীদের প্রত্যাশিত চেহারায় জাহির হতে অনিচ্ছুক ছিলেন, চিন্তার স্বাধীনতাকে অগ্রগণ্য করেছিলেন। তার কথা, নিজের জন্য বলা, I AS ANOTHER|
মিনার মনসুর নিজেকে তুলে ধরেছেন এই বলে, “অবরুদ্ধ মানচিত্রে আমি সেই সর্বশেষ সংবাদ পাঠক।” যেহেতু
‘শতাব্দীর ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডে
আমিই ঘাতক-
আমি সেই লোলুপ দর্শক।’ তিনি জবাব খুঁজেছেন ক্রিয়া- প্রতিক্রিয়াহীনতার। নিজের টানাপোড়েন লুকিয়ে রাখেন নাই।
“আমি কী জবাব দেবো তবে?
কী করে জানাবো বলো- এই অমতা, এই পাপ,” -জনতার ভেতরেও নির্জন থাকতে পেরেছেন মিনার মনসুর। শ্লোগান মুখরিত রাজপথে এক জন কবির মগ্ন চৈতন্য ও নিষ্ক্রপ্র কণ্ঠস্বর। তার কণ্ঠস্বর অনুচ্চ অথচ প্রতিধ্বনি করে প্রান্তরে।
“বাংলাদেশ মানে চিরায়ত এক নদী।
এ-নদীর কোনো ধর্ম নেই-
তবু সে নিবিড় বহমান নিরবধি।”
ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে আছে ভাষা। কবিতা ও ভাষা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
মিনার মনসুরের কবিতা তার ভূ-খণ্ডকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। এই ভূমির ভাষার ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ফেলে যেতে পারে নাই।
“এতো মাটি নয় মাটি নয়-
ফোরাতের খল-জলে ভেসে যায় আলীর তনয়।
কী বিষ দিলে হে জয়নব সব জ্বলে-পুড়ে যায়-
লাল পিঁপড়ায় যেন ভেতরটা ছিঁড়ে খুঁড়ে খায়।
বাল্মিকীর সঙ্গে তার হয়েছিল দেখা অযোধ্যায়,
শূন্যে শরবিদ্ধ তিনি- সপ্তকাণ্ডে নিষাদের ঘাটি।
মহাপ্রস্থানের পথে- শোণিত সমুদ্রে-মৃতপ্রায়
যুধিষ্ঠির শুধু বলেছিল: এখানে কোথায় মাটি!
ইতিহাস-সভ্যতার সব পথ হেঁটে
পুরাণ-দর্শন আর ঢের আলো-অন্ধকার ঘেঁটে-
এ কোন আঁধারে তবে সমর্পিত পৃথিবী-পথিক
জীবনের তীক্ষ্ন দাঁত- খাঁই তার মৃত্যুর অধিক।”
ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে রোদ্দুরে নেমে কবিতা পড়ি অথবা রোদ্দুর থেকে ছায়ার তলায় গিয়ে চ্যালেঞ্জ করি কবিকে, এবং রক্তে প্রবেশ করি কবির।
“বস্তুত এই খানেই বিচ্ছেদপর্ব শুরু। কারণ তাহারা যুগলভাবে টুপিকে আপদকালীন আশ্রয় জ্ঞান করিয়া তৎমধ্যে প্রবিষ্ট হইলেও টুপি কিন্তু তাহাদের ছাড়িল না। বরং অনতিবিলম্বে তাহাদের একজনকে মুর্দার মতো আষ্টে পৃষ্টে জড়াইয়া ফেলিল তাহার শুভ্রকাফনে।”
ঘুম (বিচ্ছেদ পর্ব)

এ কার কণ্ঠস্বর? আস্তিন ধরে টান মারছে কবরে ঢোকাবে বলে- আর কেউ তো নন, মিনার মনসুর যথা নব্বইয়ের কবিতার পালাবদল তিনি খোদিত করে রেখেছেন আকাশে ও জলে।

ঝড়িছে শব্দিত অর- “একদম বোবা হয়ে যাও। না, কোনো বিকল্প নেই। চিত্রকল্প ট্রামের তলায় জীবনানন্দের সহগামী হয়েছিল। কিঞ্চিৎ আগে কিংবা পরে। সঠিক সময় নিরূপণের দায়িত্বটি তুমি বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিকদের ওপর ছেড়ে দাও। তেলাপোকারা ওদের চেয়ে বেশি গ্রন্থপ্রিয় এবং দীর্ঘজীবী এবং সংযমী।”

কবিতা আবর্তিত হতে হতে একটি সুদর্শন চক্র অন্যত্র এবং সর্বত্র। ব্যতিক্রমও নির্দিষ্ট। এইভাবে দ্বিতীয় দশকে এসে কবিতার মুখে অন্যভাষা, উদ্বেলিত ও নিজস্ব।

“… মা মৃত্যু শয্যায়। কিশোরী কন্যা তার বিবস্ত্র পড়ে আছে। অন্ধকার অক্টোপাসের মত নৃত্য করে তাকে ঘিরে। কলেজ পড়ুয়া ছেলে আলো আনতে গিয়েছিল। এখন মরে পড়ে আছে শেয়াল কুকুরের মতো। নাম জামাল ফকির। সাকিন …

না, প্রমিথিউসের নাম সে শোনে নি কখনো।”

সত্তর দশকের এই কবি হৈ চৈ বিহীনভাবে কবিতায় নিমগ্ন এক অনন্তের যাত্রী। কবিতা তোমায় দিলাম ছুটি- এই বলে গল্পে গাঁটছড়া বাঁধে নাই।

কবিতাই তার অন্ধ কথালাপ। শেষ পর্যন্ত কাব্যলোচনার কোন স্বত:মেথডলজি উন্মুক্ত হলো না।

নির্বাচিত কবিতা: মিনার মনসুর
প্রকাশক: পাঞ্জেরী পাবলিকেশন ( ঢাকা: ২০১৬)।
প্রচ্ছদ: রাজীব রাজু।
দাম: ২৫০ টাকা।

সৌজন্যে: বইনিউজ