চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মিথ্যের বেসাতি, ট্রাম্প এবং আমরা

রাজনীতি কি কেবল মিথ্যের বেসাতি? হ্যাঁ, অনেকের কাছে তেমনই ধারণা। এই ধারণাকে পাকাপোক্ত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে চলেছেন আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি তার বক্তব্যের সঙ্গে মিথ্যেকে একাকার করে ফেলেছেন। আমেরিকার কোনো কোনো সংবাদপত্র বলছে: জাহাজে শুধু একটাই পণ্য। মিথ্যে। জাহাজের নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিছুদিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসাবে দু’বছর পূর্ণ করেছেন। তারপরই চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করেছে একটি মার্কিন সংবাদপত্র। তাদের দাবি, এই দু’বছর বা ৭৩০ দিনে ট্রাম্প ৮,১৫৮টি মিথ্যা, ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশন করেছেন! দিনে গড়ে ১১টিরও বেশি!

কোনও দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এমন লজ্জার নজির গড়েছেন কি না, বলা কঠিন। কিন্তু তাতে কোনও হেলদোল নেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের। উলটে যত দিন গিয়েছে, ট্রাম্পের ‘মিথ্যা বলার’ গতি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। ওই রিপোর্ট অনুযায়ী, ক্ষমতায় আসার প্রথম বছরে ট্রাম্প দৈনিক গড়ে ৫.৯টি করে মিথ্যা বলতেন। দ্বিতীয় বছরে সেই হার দৈনিক গড়ে ১৬.৫টি, প্রথম বছরের প্রায় তিনগুণ! ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত রিপোর্টে আমেরিকা তো বটেই, বিশ্বজুড়ে হইচই পড়ে গিয়েছে। প্রতিবেদনের জন্য ট্রাম্পের প্রতিটি সন্দেহজনক বিবৃতি ও মন্তব্যের ক্ষেত্রে ‘ফ্যাক্ট চেকার্স’-এর তথ্যভাণ্ডার উল্লেখ করে দেখানো হয়েছে, সেটি ভুয়া বা মিথ্যা কি না। যার মোট সংখ্যা ৮,১৫৮। তার মধ্যে দ্বিতীয় বছরেই ট্রাম্প এমন ছ’হাজারটি মিথ্যা বলেছেন।

প্রেসিডেন্ট পদে বসার প্রথম একশো দিনে কোনও তথ্য-প্রমাণ ছাড়া ৪৯২টি মন্তব্য করেছিলেন। আর চলতি বছরের প্রথম কয়েক সপ্তাহেই তা টপকে গিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাক্কালে। সেই সময় সংখ্যাটি পৌঁছে গিয়েছিল ১২০০তে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ট্রাম্প সবচেয়ে বেশি মিথ্যা বলেছেন এবং তথ্য দিয়েছেন অভিবাসন ইস্যুতে। এ ক্ষেত্রে তাঁর ‘কৃতিত্ব’ ১,৪৩৩টি মিথ্যা বলার। দুই এবং তিন নম্বরে যথাক্রমে রয়েছে বিদেশ নীতি (৯০০) ও বাণিজ্য (৮৫৪) সংক্রান্ত তথ্য। অর্থনীতি (৭৯০) এবং কর্মসংস্থান (৭৫৫) রয়েছে চার ও পাঁচ নম্বরে।
তবে ২০১৬-র প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপ সংক্রান্ত তদন্ত নিয়ে তার ভিত্তিহীন দাবি মাত্র ১৯২টি! ওয়াশিংটন পোস্টের ব্যাখ্যা, প্রেসিডেন্টের প্রথম একশো দিনেই মিথ্যা বলার নজিরের সঙ্গে তারা তাল মেলাতে পারছিল না। তাই এই প্রকল্প শুরু হয়েছিল, যাতে হিসেব রাখা যায়। তবে ব্যতিক্রমও কি নেই? তা-ও আছে। দু’বছরে ৮২ দিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনও মিথ্যা বলেননি! কারণ, সে ক’দিন তিনি গল্ফ খেলতে ব্যস্ত ছিলেন!

মিথ্যে বলার জন্য শুধু ট্রাম্পকেই দোষারোপ করা চলে না। প্রত্যেক মানুষই কমবেশি মিথ্যা বলে। কেউ প্রয়োজনে বলে, কেউ আবার মনের আনন্দে বলে। তবে বিনা কারণে, বিনা প্রয়োজনে নির্বিকারভাবে মিথ্যা কথা বলে এমন লোকও আমাদের সমাজে কম নেই। কেউ কেউ অহঙ্কার করার জন্য মিথ্যা কথা বলে। অফিসের বসরা যেমন বলে থাকেন, আমার চেয়ে ভালো ইংরেজি এ অফিসে একজনও জানে না। কিংবা কাজে ফাঁকি দেয়া আমার ডিকশনারিতে নেই।
আমাদের বন্ধু-বান্ধবরাও বিস্তর মিথ্যা বলে। অনেকেই আছে যারা বঙ্গবাজার থেকে আনকোরা এক মাল গায়ে চাপিয়ে বলে, এটা আমার আঙ্কেল নিউজার্সি বা আন্টি ‘এলে'(লস-এঞ্জেলেস) থেকে পাঠিয়েছেন!

অনেকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অথবা জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জেরায় জর্জর হয়ে মিথ্যা কথা বলে। দেরি করে অফিসে পৌঁছে ঊর্ধ্বতনের কাছে, রাতে দেরি করে বাসায় ফিরে বউয়ের কাছে মিথ্যা কারণ দেখানোরও অনেকের প্রয়োজন পড়ে।

স্কুলের ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীরা মিথ্যা বলবে কিংবা অফিসে বসের কাছে কনিষ্ঠ সহায়ক অসত্য অজুহাত দেবে কাজ না করার, এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। বাড়ির কাজের লোক বাজার করে এসে সত্যি হিসাব দেবে, কিংবা লম্পট স্বামী স্ত্রীর কাছে সত্য বিবৃতি দেবে, এরকম আশা করাটাও অন্যায়।

এগুলোর তবু কার্যকারণ আছে। এসব মিথ্যা ভাষণের প্রয়োজন বোঝা কঠিন নয় এবং যে মিথ্যা বলছে তার কাছে এর প্রয়োজনও রয়েছে। কিন্তু এর বাইরে এক ধরনের প্রয়োজনহীন মিথ্যা কথা আছে। মনের আনন্দে নির্দ্বিধায় উল্টোপাল্টা ডাইনে-বাঁয়ে মিথ্যা বলা অনেকের স্বভাব এবং বলতে না পারলে তারা দম বন্ধ হয়ে পেট ফেটে মরে যাওয়ার অবস্থায় পৌঁছে যায়। ডাকটিকেট জমানো ও পুরনো মুদ্রা সংগ্রহের মতো অনেকের হবি হচ্ছে মিথ্যা বলা। তবে এসব মিথ্যা খুবই সাধারণ এবং নির্দোষ। এ ধরনের মিথ্যা কারও কোনো ক্ষতির কারণ হয় না। স্রেফ গল্প দেয়ার জন্যই তারা এ ধরণের মিথ্যা চর্চা করে থাকে। যেমন কবে কোথায় কোনো মেয়ে তার প্রেমে পড়েছিল, কবে একদিন একাই দুই ছিনতাইকারীকে পাকড়াও করেছিল- এসব মিথ্যাচার কারও কোনো ক্ষতির কারণ হয় না। তবে সব ধর্মেই এ কথা বলা আছে- মিথ্যা বলা মহাপাপ। এই আপ্তবাক্য অবশ্য মিথ্যুকদের সত্য কথা বলার ক্ষেত্রে খুব একটা প্রভাবিত করতে পারেনি। সুযোগসন্ধানীরা স্বার্থ-সুবিধা ও প্রয়োজনমতো ঠিকই মিথ্যা চর্চা অব্যাহত রেখেছে।

সত্য কথা বলে ফায়দা হাসিল হয় না। এ জগতে যে যত স্বার্থপর, লোভী, ভণ্ড, ধান্দবাজ, দুই নম্বর তার তত বেশি মিথ্যা কথা বলতে হয়। সব দুই নম্বরী মিথ্যা দিয়ে ঢাকতে হয়। জ্ঞানী-গুণীরাও বিষয়টি অনুধাবন করেছেন। তাই তারা সত্য বলার ব্যাপারে নমনীয় মনোভাব দেখিয়েছেন।

‘সদা সত্য কথা বলিবে’ এই মহৎ উপদেশ বাক্য সব সময় গ্রাহ্য নয়। প্রকৃত জ্ঞানীরা বলেছেন, অপ্রিয় সত্য কথা বলবে না। হয়তো জ্ঞানীদের রুচি ও বিবেকে বেধেছিল, তাই তারা সরাসরি বলতে পারেননি, ‘প্রিয় মিথ্যে কথা বলো’।

বিদেশি প্রবাদ আছে, যে মিথ্যা কথা কাউকে সান্ত্বনা দেয়, সুখী করে, সে অনেক ভাল যে সত্য কথা কাউকে আঘাত করে, আহত কার তার চেয়ে। এসব তত্ত্বকথা আপাতত থাক। আমরা বরং এ বিষয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করি বর্তমান জমানায় চারদিকে মিথ্যারই জয়জয়কার। বর্তমানে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, প্রেমিক-প্রেমিকা, পুলিশ, আমলা, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, রাজনীতিবিদ ও মন্ত্রীরা তো মিথ্যা বলেনই; এমনকি ধর্মগুরুরা পর্যন্ত মিথ্যা কথা বলেন।

তবে মিথ্যা বলার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা আপসহীন ও অপ্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছে। স্বার্থ হাসিলের জন্য, দায় এড়াতে (পিঠ বাঁচাতে) এবং প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে এমন মিথ্যা চর্চা পৃথিবীর ইতিহাসে অন্য কেউ কখনও করেছে কিনা সন্দেহ।

প্রশ্ন হলো, মানুষ কেন মিথ্যে কথা বলে? মানুষ যা ভাবে সেটা প্রকাশ করলে কি কোনো অসুবিধা হয়? না, হয় না। বরং সত্য বললে মানসিক গ্লানি কমে, মনটাও থাকে ভালো। মনোবিজ্ঞানীরা এমনটাই বলছেন। কিন্তু মনোবিজ্ঞানীরা আরও কৌতুহলোদ্দীপক সব তথ্যও দিয়েছেন। তাদের মতে, ‘সৎ’ থাকা শুনতে বেশ ভালো লাগলেও বাস্তবে অতটা সহজ নয়। মানুষ নাকি দিনে ১৫০ থেকে ২০০ বার মিথ্যে বলে। এ ধরনের মিথ্যের মধ্যে পড়ে নীরব থাকা, বিদ্রুপ করা, কপ্লিমেন্ট করা ,জুয়াচুরি, নিজেই সত্যকে অস্বীকার করা অর্থাৎ মিথ্যে ভাবা এবং নম্রতা বা ভদ্রতার কারণে সত্য কথাটি ‘না’ বলা ইত্যাদি। এছাড়াও অনেকে মিথ্যে বলেন অভ্যাসের বসে বা ভয়ে।

কাউকে খুশি করতে কিংবা কোনো কারণে কাছের মানুষের মন ভালো করতে মিথ্যে কথা বলে থাকেন জার্মানরা। আর এ সব কারণেই শতকরা ৪৯ জন জার্মান মিথ্যে কথা বলেন। কিন্তু আমাদের দেশে কারণে অকারণে অনেকেই মিথ্যা কথা বলে থাকেন। কেউ অনেক বেশি পরিমাণে বলে থাকে কেউ প্রয়োজনে খুব কম বলে থাকেন। যারা দুর্নীতি করেছেন, তারা বলে আমি নির্দোষ। যারা জঙ্গি সৃষ্টি করছেন, তাদের মদদ দিয়েছেন, তারা বলেন, না ওসব মিথ্যা কথা। আমি মহান। কেউ তার অপরাধ স্বীকার করেন না, হাতেনাতে ধরা পড়লেও না। যাদের যা করার কথা তারা তা করেন না। অথচ নিয়মিত প্রতিশ্রুতি দেন। প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দিলে অস্বীকার করে বসেন। এভাবে মিথ্যা আর অসত্যের চাদরে সব কিছুকে ঢেকে ফেলা হয়েছে। সবাই যেন মিথ্যা বলার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। কেউ সত্য কথা বলছেন না। তারা অবশ্য মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিতও করতে পারছেন না। আজকের মিথ্যাকে আগামীকালই সত্য হিসেবে কবুল করছেন। তারপর শুরু করছেন নতুন করে মিথ্যাচার।

রাজনৈতিকীকরণআজ বাংলার রাজনীতির অভিধানে ‘মিথ্যা কথা’র পরিবর্তে প্রবেশ করতে পারে একটি নতুন শব্দ: ‘রাজনৈতিক কথা’। অর্থাৎ ডাহা মিথ্যা কথাও রাজনৈতিক হলে এখানে চলে যায়, চালানো যায়। রাজনীতিই যখন মুখ্য, সেখানে সত্য-মিথ্যার বাছবিচার দরকার কী। বরং সেই ফাঁকে স্বার্থ গুছিয়ে নেওয়াই বুদ্ধির কাজ়। সত্য বা সততা এখন বোকামির লক্ষণ। যে যত বুদ্ধিমান, সে তত মিথ্যা ও ভুলের প্রয়োজনমতো ব্যবহার করে স্বার্থের সিদ্ধি ও সুযোগের সদ্ব্যবহার করে নেয়। আমরা সবাই জানি এবং মানি যে, কাল দুই পা এগোনোর জন্য আজ এক পা পেছোনই ঠিক কাজ।

কিন্তু জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য থাকা জরুরি। যে ওষুধে রোগ নিরাময় হয়, তারই অতিরিক্ত সেবনে আবার হিতে বিপরীত হয়। চাণক্যের একটি উক্তি আছে: ‘‘যা কিছু মাত্রাতিরিক্ত তা-ই বিষ।’’ এই গুরুত্বপূর্ণ কথাটা রাজনীতি বিষয়েও প্রাসঙ্গিক।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)