চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘মা, আমি সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা হবো’

আমার বয়স যখন চার কিংবা পাঁচ, তখন ওই আধো আধো জ্ঞান বুদ্ধিতেই বুঝতে পারতাম – ১৬ ডিসেম্বর আনন্দের দিন, উৎসবের দিন। সবার মুখে হাসি, স্কুলের গেটে তালা আর সকাল-দুপুর জুড়ে বর্ণিল সব আয়োজন: এতো আনন্দ অন্য দিনে তো দেখি নি!

সময়ের চাকা ঘুরে বয়স যখন পনের কিংবা ষোলো, খুব মনে আছে এক ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যরাত। বারান্দায় গিয়ে দেখি একা বসে আছেন আমার বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবা। তার মতো শক্ত প্রশাসক আর কঠিন হৃদয়ের মানুষের চোখে জল! হিসেব মেলে না। আনন্দের বিজয় দিবস জল ঝরালো কেন বাবার চোখে? জিজ্ঞাসা করার সাহস সে বছর হয় নি। পরের সকালে উৎসবে যোগ দিয়েছি বাবার হাত ধরে। মনটা গুমোট।

তারও বছরখানেক পর। আবারও ১৫ ডিসেম্বর রাত। এদিন বাবা নিজেই ডাকলেন। একটা গাঁথা মালার মতো বলে গেলেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি। যুদ্ধের লোমহর্ষক বর্ণনা, সহযোদ্ধা হারানোর করুণ গল্প।

আর বললেন, ওরা তো দেখে যেতে পারলো না… দেশটা স্বাধীন করেছি আমরা। দুজনের চোখে একই জল। বাবা, আমি বড় হয়েছি। আমি বুঝতে পেরেছি বিজয় কেন তোমার চোখে জল আনে বছর বছর।দেখো, আমি লিখছি আর চোখ বেয়ে বিজয়ের আনন্দ ঝরছে…

আমি দুর্ভাগা। সৃষ্টিকর্তা আমাকে ৭১ দেখার সৌভাগ্য দিয়ে পৃথিবীতে পাঠান নি। সে ভাগ্যটা হয়েছে আমার বাবার। তাই আমার চোখে ৭১ মানে বাবার দিকে তাকিয়ে হা করে শোনা রূপকথার গল্প।

সেক্টর ৯, সুন্দরবন, ভারতে প্রশিক্ষণ, বীর মুক্তিযোদ্ধা মধু কাকা,পাগলাটে সেকেল কাকা, বাজারের ঘরটাতে অজ্ঞাত মহিলার পোড়া লাশের গন্ধ….আমার নাকে এসেও লাগে বছর বছর।কিভাবে? আমিও যে জানি না!

আমার ঠাকুরমার (দাদীর) ঝুলিতে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ কি ছিল জানো? তোমার নামটা রাখা। মা কিভাবে মুক্তি যুদ্ধের বছর বছর আগে দূরদর্শী হয়ে ছেলের নাম “রণজিৎ” রাখলেন? যুদ্ধ জিতেছে ছেলে। নামের শক্তিতেই কিংবা মায়ের চোখে দেখা ভবিষ্যতের স্বপ্ন সফল করতে।

চাইছিলাম এ বছর বিজয় দিবসে কিছু লিখি। স্পর্ধা হয়ে উঠতে সময় লেগেছে। বলতে পারেন… যে ৭১ দেখে নি, সে এসব নিয়ে কি লিখবে!

জবাব আছে আমার কাছে। স্বাধীনতার সুঘ্রাণ নিচ্ছি মুক্ত মাটিতে…বছরের পর বছর। একাত্তরের খানিকটা কি রক্ত মাংসের এই আমার আমার মগজে ঢোকে নি? উত্তর: না। মগজে ঢোকে নি একদম। হৃদয়ে মিশেছে প্রতি ক্ষণে। প্রতি মুহূর্তে।

খুব করে চাইছিলাম, লিখার আগে এবার মগজে কিছু নেই। হৃদয় নিংড়ানো তো অনেক হলো। বই খুঁজতে গিয়ে খোঁজা হয় নি। প্রকৃতির হিসেবগুলো কত অদ্ভুত, তাই না? অফিসে গিয়ে দেখি, আমার বস সরাফত স্যার আমার হাতে একটি বই ধরিয়ে দিলেন: একাত্তরের চিঠি। তার ভেতরে লেখা:

মনদীপ,
তুমি শুধু আমার খুব প্রিয় একজন মানুষই নও,
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান…মনে রেখো।
– সরাফত।

অবাক হয়েছি! যা চেয়েছিলাম সকালে তা এভাবেও সত্যি হয়!
স্যারের সামনে বসে স্ত্রীর কাছে লেখা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার চিঠি পড়ছিলাম উচ্চস্বরে। কখন যে কন্ঠটা নেমে এসে থেমে গেল বুঝতেই পারলাম না। টেবিলের এপারে- ওপারে আমি এবং স্যার দুজনেই থামাতে পারি নি নিজেদের। আবেগ তাড়িত হওয়ার একমাত্র ভাষাই কি চোখদুটোর অবাধ্য জলরাশি!

এই স্যারের বড় ভাইয়েরা যুদ্ধে গেছেন তার চোখের সামনেই। পাঁচ বছরের মুগ্ধ শিশু তাকিয়ে দেখেছে, গর্ব করেছে অজানা গৌরবে। বড় বোন সেলিনা পরিবারের চোখ এড়িয়ে বর্ষার দিনে কাঁথার আড়ালে কান পেতে শুনতেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের রক্ত গরম করা তরঙ্গ। তরুণ, শিশু, কিংবা নারী… কার মনে দোলা দেয় নি প্রাণের একাত্তর?

খুব ছোটবেলায়, বয়সটা ঠিক মনে নেই, যেমন খুশি তেমন সাজো প্রতিযোগিতায় বীর মুক্তিযোদ্ধা সেজেছিলাম। আমার বড় বোন প্রতিভা সেজেছিল মুক্তিযুদ্ধে ছেলে হারানো পাগলিনী মা। একটা প্লেট জিতেছিলাম খুব মনে আছে।কিন্তু বাসায় ফিরে মন খারাপ!
মার কাছে বারবার একই আবদার করতে লাগলাম, ‘‘মা, আমি সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা হবো’’
মা সেদিন বলেছিলেন, ‘‘তুই তো আমার মুক্তিযোদ্ধাই!’’

Advertisement

মানেটা সেদিন বুঝিনি। আজ বুঝি। স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক পরেও কি যুদ্ধ চলছে না? দেশকে এগিয়ে নেওয়ার যুদ্ধ। আমি হয়তো আমার ক্ষুদ্র অবস্থান থেকে খুব বেশি কিছু করতে পারি নি। তবে, দূর থেকে ভালোবেসে যাওয়া পাগল প্রেমিকের মতো উজাড় করে ভালোবাসছি মাটি ও মানুষকে। বলুক না লোকে পাগল!

খ্যাতিনামা লেখক আনিসুল হকের ‘মা’ উপন্যাসটা পড়েছি হাসপাতালে অসুস্থ মায়ের পাশে বসে। সারারাত। মাকে সুস্থ করেই ছুটেছি আজাদের মায়ের কবরে। আমার সহধর্মিণী দেবযানী গাড়ীর বাইরে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতে বললো, কে জানে, তুমিই হতো আগের জন্মের আজাদ!

জানি না মিলটা কোথায়? যেদিন সাফিয়া বেগম (বীর মুক্তিযোদ্ধা আজাদের মা) মৃত্যুবরণ করেছিলেন, সেদিন আকাশ কেঁদেছিল। যেদিন আমি জুরাইন গোরস্তানে গেলাম, সেদিনও কেন কাঁদলো আকাশ? সব প্রশ্নের জবাব মিলবে না।

অভয়নগরের শান্তিলতা দেবীর কথা মনে আছে? ভারপ্রাপ্ত ইউএনও থাকার সময়টাতে তাকে খোলা আকাশের নিচে থেকে তুলে গড়ে দিয়েছিলাম শান্তি নীড়। সংবাদপত্রে খবর বের হলো একের পর এক। যা সবার দৃষ্টি এড়িয়েছে, সেটা আজ বলি। বিধবা শান্তিলতা দেবী যুদ্ধের সময় ভিটে ছেড়ে যান নি। একা রয়ে গেছেন মাটির মায়ায়। অনেকে এটাকে ঘুরিয়ে বলবেন তো, যে মাটির মায়া নাকি জমির লোভ? উত্তরটা দিয়ে দেই। স্বাধীনতার পর ভিটে ছাড়া বাকি সব জমি দান করে দিলেন স্কুলকে। যুক্তি একটাই:দেশের মানুষ পড়ালেখা শিখুক। আমরা এমনই পাগল! আবার এই স্বাধীন দেশেই তাকে ভিটেছাড়া করার পায়তারা চলছিল, যা একা হাতে ঠেকিয়েছি। আমরা এমনও!

এবার একজন বোনের কথা বলি। প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়ের একাত্তরের ডায়েরি খু্ঁজে বেরিয়েছেন দিনের পর দিন। পুরনো ট্রাঙ্কের তালা ভেঙ্গে যখন হাতে এলো, সম্পাদনা করে বইয়ের রূপ দিতে দেরি করেন নি একদম। বইয়ের পুরোটা বেড়ে ওঠায় সাথে ছিলাম নিবিড়ভাবে। বলছি ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক উম্মে সালমা তানজিয়া আর তার ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা সাচ্চুর কথা। ডায়েরির পাতায় পাতায় চোখের সামনে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ, ৭১। কে বলেছে আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখি নি?

কত অদ্ভুত বলেন তো! একসাথে একবছর চাকরি করছি, অথচ জানতামই না প্রকিউরমেন্ট এর স্পেশালিস্ট হেলাল ভাই মনে পুরনো কষ্ট জমিয়ে বসে আছেন! ষাটের দশকের শেষ দিকে তার বাবা পাকিস্তান

বিমান বাহিনীতে ছিলেন। তারা সপরিবারে থাকতেন করাচিতে। একটা শিশু হিসবে প্রতিদিন শুধু বাঙালি হওয়ার দোষে খেলার দল থেকে বাদ পড়তেন। কষ্টটা এখনও আছে। ৬৮ তে দেশে ফেরার পর তার আপন বড় ভাই শহীদুজ্জামান ছুটেছিলেন যুদ্ধে।সবাইকে না জানিয়ে! এমন গল্প তো লাখ লাখ ঘরে!

কারও সাথে দেখা হলেই বলি, বাড়ি কোথায়? কবে বলবো আমার বাড়ি পুরো বাংলাদেশ? জেলায় জেলায় বিভেদ দেখে নিশ্চয়ই ওপারে হাসছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ফিরোজ।ভোলা জেলায় যার জন্ম, তিনি প্রাণ দিলেন গাইবান্ধায়, সম্মুখ যুদ্ধে। সেদিন একাত্তরের চিঠি বইটাতে তার লেখা মায়ের কাছে চিঠিতে বলেছেন, ‘যুদ্ধ করছি মা, বাংলাদেশের মধ্যেই কোথাও। এই তো চাই। এই এক থালাতেই পুরো বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি…’

থামতে মন চাইছে না। হাজার গল্প আর চিন্তা এসে ঠকঠক করে কড়া নাড়ছে মনের দরজায়। আর থাক। শেষ একটা গল্প বলেই থামি।

৭১ এর মাঝামাঝি। যুদ্ধ চলছে। বাবা আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। যে রুমে শুয়ে ছিলেন পাশেই পরে আছে লাশ। একজন নার্স ছিলেন তিনিও নাকি চলে গেছিলেন বাইরে। লাশের পাশে সেদিন বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবা অস্বস্তি আর ভয় কাটাতে সারারাত উচ্চকণ্ঠে আবৃত্তি করে গেছেন ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ। হ্যাঁ, আবৃত্তি জেনেশুনেই বলছি। এর চেয়ে রক্ত গরম করা কবিতা আর আছে কি?

সেদিনের রণজিৎ, আজকের মনদীপ কিংবা বাংলার প্রান্তরে ছড়িয়ে থাকা কোটি বাঙ্গালির বিপদসংকুল পরিস্থিতিতে আঁকড়ে ধরার মতো আর কিছু না হোক, ওই শব্দ দিয়ে বোনা কথামালা তো আছে….

‘‘…আর যদি একটা গুলি চলে…’’

‘‘মেঘবালিশে আজও অশ্রু কেন?
বিজয়ের দিনে কাঁদতে আছে নাকি?’’

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)